প্রধানমন্ত্রী বিমা প্রকল্পঃসুরক্ষার আড়ালে মোদির ঢাক পেটানোর কৌশল

0
5

 কলকাতায় প্রধানমন্ত্রী জীবন জ্যোতি বিমা যোজনা প্রকল্পটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তবে এর আগে থেকেই অনেক ব্যাঙ্কে গেলেই দুটি ফর্ম ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যার মধ্যে একটি এই জীবন বিমা সংক্রান্ত। ফর্মে বলা আছে এই প্রকল্পে যোগ দেওয়ার পর যে কোন কারণে কোন ব্যক্তির মৃত্যু হলে বিমাকারীর পরিবারের মনোনীত সদস্যের মিলবে ২ লক্ষ টাকা। এর জন্য গ্রাহকদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থেকে প্রতি বছর ৩৩০ টাকা কেটে নেওয়া হবে। ১৮-৫০ বছরের বয়সের যারই সেভিংস ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট আছে তিনি এই প্রকল্পে যুক্ত হতে পারবেন। শুধু একটা ফর্ম পূরণ করে ব্যাঙ্কে জমা দিলে এই প্রকল্পে যোগ দেওয়া যাবে। কিন্তু প্রকল্পের জন্য দেওয়া ফর্মে( অন্তত UBI ব্যাঙ্ক থেকে দেওয়া ফর্মে ) কোথাও বলা নেই কত বছরের মধ্যে মৃত্যু হলে ওই ক্ষতিপূরণ মিলবে। সরকারের তরফে সংবাদপত্র ও টেলিভিশনে দেওয়া ঢালাও বিজ্ঞাপনেও নেই এই তথ্য। আসলে কোন ব্যক্তির জীবতকালের ৫৫ বছর পর্যন্ত চালু থাকবে এই প্রকল্প। তার পর তাঁর মৃত্যু হলে একটি টাকাও পাবে না মৃতের পরিবার। কিন্তু এই কথাগুলি সরকারের প্রকল্পের বিজ্ঞাপন বা ব্যাঙ্কের তরফে জারি করা বিজ্ঞাপনে স্পষ্ট করে বলা নেই।
এর আগে চালু হওয়া প্রধানমন্ত্রী জনধন প্রকল্পে কেউ নতুন অ্যাকাউন্ট খুললেও তিনি পাচ্ছেন ১ লক্ষ টাকার দুর্ঘটনা বিমা। অথচ শনিবার নরেন্দ্র মোদি উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী সুরক্ষা বিমা যোজনা নামে আরেকটি দুর্ঘটনা বিমা। বছরে ১২ টাকা দিলে দুর্ঘটনার কারণে মৃত্যু হলে ক্ষতিপূরণের অঙ্ক ২ লক্ষ টাকা , বিকলাঙ্গ হয়ে গেলে মিলবে ১ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ। প্রশ্ন উঠছে জনধন অ্যাকাউন্ট হোল্ডারদেরই এই বাড়তি সুবিধা যুক্ত করে দিলে তো সাশ্রয় হত নতুন প্রকল্প চালু করার জন্য হওয়া কোটি কোটি টাকার খরচ।

এইভাবে একটা আলাদা প্রকল্প চালু করার অর্থ কি শুধুই সামাজিক সুরক্ষা প্রদান করা? না কি একই ধরনের সামাজিক সুরক্ষার প্রকল্পগুলিকে নতুন প্রকল্পের নাম দিয়ে চালু করে ভোটের বাজারে মানুষকে বিভ্রান্ত করা? এটা কি শাসকদলের নিজের ঢাক নিজের পেটানোর কৌশল নয়!
এর আগে প্রধানমন্ত্রী জনধন প্রকল্পটি নিয়েও উঠেছে বিতর্ক। ২০১৪ সালের ২৮ অগস্ট এই প্রকল্পরে আনুষ্ঠানিক সূচনা করেন প্রধানমন্ত্রী । কিন্তু সত্যি কি প্রকল্পটি আদপেই নতুন?
প্রধানমন্ত্রী জন- ধন যোজনা প্রকল্পে বলা হয়েছে শুধু ছবি নিয়ে ব্যাঙ্কে কেউ গেলেই তিনি অ্যাকাউন্ট খুলতে পারবেন। ৬ মাসের মধ্যে কেওয়াইস-র নিয়ম মেনে পরিচয় পত্র ও ঠিকানার প্রমাণপত্র দাখিল করতে পারবেন। যদি তাও না করেন তাহলে আরো ৬মাস চালু থাকবে তাঁর অ্যাকাউন্ট। তবে তিনি যদি এই প্রমাণ দাখিল করতে পারেন যে তিনি পরিচয় পত্রের জন্য আবেদন করেছেন তাহলে আরো এক বছর তাঁর অ্যাকাউন্ট চালু থাকবে। এর ফলে নিশ্চিতভাবে অসংখ্য গরীব মানুষের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খুলতে সুবিধা হবে । তবে এটা কোন নতুন প্রকল্প নয়।বর্তমানেও রিজার্ভ ব্যাঙ্কের নিয়ম অনুযায়ী এই ভাবে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খোলা যায়। এই ধরনের অ্যাকাউন্টকে বলা হয় ছোট অ্যাকাউন্ট। ২০১০ সালের ১৬ ডিসেম্বর অর্থমন্ত্রকের নির্দেশের জেরেই রিজার্ভ ব্যাঙ্ক সহজ করে এই ছোট অ্যাকাউন্ট খোলার নিয়ম। ২৭ জানুয়ারি ২০১১ জারি করে সার্কুলার। তবে এটা অন্য কথা যে অধিকাংশই ব্যাঙ্কের শাখাই জানে না এই নিয়ম বা জানলেও না জানার ভান করে। তাই তা খুলতেও চায় না অ্যাকাউন্ট। বিষয়টি প্রথম সামনে আনেন আইআইটি বোম্বের এক অধ্যাপক।

২০১২ সালে তিনি ১৯টি ব্যাঙ্কে এই ধরনের অ্যাকাউন্ট খুলতে গিয়ে ব্যর্থ হন তিনি। তাই প্রধানমন্ত্রী জন- ধন যোজনা প্রকল্পটি আদপেই নতুন নয়। ১ লক্ষ টাকার দুর্ঘটনা বিমা ও ৩০ হাজার টাকার জীবন বিমা সহ বাড়তি কিছু সুবিধা জুড়ে দেওয়া হয়েছে মাত্র। তবে একথা সত্যি প্রধানমন্ত্রী জন-ধন যোজনা নিয়ে সরকারি তরফে বাড়াবাড়ি ধরণের প্রচারের ফলে ব্যাঙ্কে অ্যাকাউন্ট খোলা অনেকটা সহজ হয়েছে এখন। তার সঙ্গে বেড়েছে অ্যাকাউন্ট খোলার টার্গেট পূরণ করার জন্য ডুপলিকেট অ্যাকাউন্টের সংখ্যাও।

রীতেন্দ্র রায় চৌধুরীর এই লেখাটি ১২.৫.২০১৫ দৈনিক স্টেটসম্যানে প্রকাশিত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

6 − 6 =