ট্রেন চালাক বেসরকারি কোম্পানিও,বেসরকারি সংস্থার হাতে প্ল্যাটফর্মের পানীয় জল তুলে দেওয়ার বিবেকদেব রায় কমিটির প্রস্তাব

রেলবাজেটে বিবেক দেবরায় কমিটির অনেক সুপারিশই গ্রহণ করেছে বলে জানিয়েছেন রেলমন্ত্রী। সেই  সুপারিশ ঠিক কী সেই বিষয় রীতেন্দ্র রায়চৌধুরীর দৈনিক স্টেটসম্যানে প্রকাশিত লেখাটি পুনরায় আপলোড করা হল।
কাগজ খুললেই মাসে একটা রেল দুর্ঘটনার খবর চোখে পড়বেই। কারণ জানতে চাইলেই মন্ত্রী বলেন রেল সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় টাকার অভাব রয়েছে। তার পরই বলেন দুর্ঘটনার তদন্ত হবে। কিন্তু কোন রেল দুর্ঘটনার কারণ কী ছিল, দোষীদের কী শাস্তি হল তা আজ পর্যন্ত যাত্রীদের জানানোর রেওয়াজ নেই। অর্থনীতিবিদদের একটা বড় অংশ বলে থাকেন সরকারগুলো রেলের সর্বনাশ করেছে। ভাড়া না বাড়িয়ে রেলের আর্থিক অবস্থা কাহিল করে দিয়েছে। চারদিকে একটাই রব ভারতীয় রেল যেভাবে চলছে সেভাবে আর চলতে পারে না। পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা থেকে শুরু করে যাত্রী নিরাপত্তা সব বিষয় রেলের খামতি প্রতিদিন প্রকট হয়ে উঠছে। তবুও সস্তার সওয়ারি হিসাবে রেলের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নাতীত। কিন্তু আর্থিক দিক থেকে ক্রমশ পঙ্গু হয়ে পড়া রেলে প্রয়োজন নতুন বিনিয়েগ। নতুন বিনিয়োগ না এলে খোল নলচে পাল্টে ফেলা যাচ্ছে না রেলের। অথচ বাড়তি আর্থিক বোঝা নিতে নারাজ সরকার। ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে পর্যাক্রমে রেলের বিভিন্ন নন কোর অংশের বেসরকারিকরণ। যার পোশাকি নাম প্রাইভেট- পাবলিক পার্টনারশিপ বা পিপিপি মডেল। কিন্তু কী ভাবে আগামী দিনে চলবে ভারতীয় রেল ? তার একটা ছবি ফুটে উছেছে রেল সংস্কারের জন্য বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ বিবেক দেব রায়ের নেতৃত্বে গঠিত ৮ সদস্যের কমিটির অন্তর্বর্তী সুপারিশে। যার মূল কথা রেলে আরো বেশি করে বেসরকারিকরণ।
৩২৩ পাতার এই রিপোর্টে নানা কিছু আছে। যার মূল স্পিরিট হল বেসরকারি কোম্পানিকে রেলে আরো বেশি করে ডাকা। রেলের বেসরকারিকরণ করতে চাইছেন না বলে জানিয়েছে এই রিপোর্ট। তবে যাত্রী ট্রেন ও মালগাড়ি উভয় ভারতীয় রেলের পাশাপাশি বেসরকারি কোম্পনিগুলিকে দিয়ে চালানোর কথা বলেছে সুপারিশে। ভাড়ার ক্ষেত্রে সরকারি নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে বাজারেরে উপর ছাড়তে সুপারিশ করেছে কমিটি। থাইল্যান্ডে কীভাবে ক্ষতিতে চলা কিছু ট্রেন রুট বেসরকারি হাতে দেওয়ার ফলে লাভ হয়েছে তার উদাহরণ দেওয়া হয়েছে রিপোর্টে। আর সুপারিশ করা হয়েছে রাজধানী ও শতাব্দীর মত ট্রেনকে বাত্সরিক ফির বিনিময় বেসরকারি সংস্থার হাতে তুলে দেওয়ার! অসাধারণ !
লোকাল ট্রেন চালাবার ক্ষেত্রে রাজ্য সরকারগুলির সঙ্গে যৌথ কোম্পানি তৈরি করার প্রস্তাব করেছে এই কমিটি। ভাড়া ঠিক করবে রাজ্য
সরকার গুলি। যেহেতু এইভাড়ায় ভরতুকি দিতে হবে কিছুটা। তাই ভাড়ার ৫০ শতাংশ রাজ্য সরকার ও বাকি ৫০ শতাংশ কেন্দ্রকে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে যতদিন না পর্যন্ত এই ব্যবস্থা চালু হচ্ছে ততদিন ভাড়া বাজারের উপর ছাড়ার কথা বলেছে কমিটি।
কমিটির মতে রাজ্যে নতুন কোন প্রকল্প শুরু করতে হলে তার ব্যয়ের একটা অংশ সংশ্লিষ্ট রাজ্যকে বহন করতে হবে।
কীভাবে ভারতীয় রেলে বেসরকারি সংস্থাকে আসার জন্য উত্সাহী করা হবে তার উদাহরণ দিতে গিয়ে যা বলা হয়েছে তাতে প্রায় বাদ নেই কিছুই। বেসরকারি কোম্পনিরা ট্রেন কিনে চালান থেকে শুরু করে, বিভিন্ন পরিষেবা প্রদান, রেলের বিভিন্ন ট্রেন বেসরকারি সংস্থাকে লিজে দেওয়া , রেলের কোম্পানিগুলিতে বেসরকারি অংশগ্রহণ ইত্যাদি ইত্যাদি। আর এই সব করার জন্য টেলিকম রেগুলেটরি অথোরিটির মত একটি রেল নিয়ন্ত্রক সংস্থা গড়ার কথা বলা হয়েছে প্রস্তাবে। আসলে সব ক্ষেত্রেই সরকারের ভূমিকাকে ছেঁটে ফেলতে
চেয়েছে কমিটি।
রেলের বিভিন্ন কারখানাগুলিকে এখন একটি সরকারি কোম্পানিতে পরিণত করতে বলা হয়েছে রিপোর্টে। সেখানে বেসরকারি
অংশগ্রহণের সুযোগ রাখতে বলা হয়েছে। পরে প্রয়োজন হলে কারখানাগুলির বিলগ্নীকরণ করা যেতে পারে বলে মনে করে কমিটি।
যাত্রী স্বাচ্ছন্দের বিষয় যেমন টিকিট বুকিং, পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা, ট্রেনের মধ্যেকার পরিষেবা ইত্যাদির নির্দিষ্ট মাণ ঘোষণা করতে হবে রেলকে। কমিটি মনে করে প্ল্যটফর্মের পানীয় জলের ব্যবস্থাও তুলে দেওয়া উচিত বেসরকারি সংস্থার হাতে। কমিটির সুপারিশ টিকিটে ভরতুকি শুধুমাত্র বিপিএল ভুক্ত পরিবারদেরই পাওয়া উচিত। তাও আবার গ্যাসের মত ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে।
কমিটির সুপারিশ হল রেলকে ধাপে ধাপে রেলের মূল বিষয় নয় এমন জায়গাগুলো থেকে সরে আসতে হবে। যার মধ্যে রয়েছে আরপিএফের পরিবর্তে বেসরকারি নিরাপত্তা রক্ষী নিয়োগের উপর জোর দেওয়া। রেলের ১২৫টি হাসপাতাল তুলে দিয়ে রেলকর্মীদের
বিমার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া। রেলের স্কুলগুলিকে কেন্দ্রীয় বিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত করে রেল কর্মীর সন্তানদের বেসরকারি স্কুলে পড়ায় ভরতুকি প্রদান ইত্যাদি। জিআরপি রাখতে যে খরচ হয় তার ৫০ শতাংশ এখন রেল দেয় রাজ্যগুলিকে। ক্রমে সেই টাকা দেওয়ার
পদ্ধতি বন্ধ করতে বলা হয়েছে।
বিবেক দেব রায় কমিটি যে সুপারিশ করেছে তার মূল কথা হল ধাপে ধাপে রেলের মূলত বেসরকারিকরণ। তিনি অবশ্য তা অস্বীকার
করেছেন। তার মতে বেসরকারিকরণ নয়, উদারীকরণ করা হোক রেলকে। রিপোর্টে ট্রেন চালানোর জন্য বেসরকারি কোম্পানিগুলি ডাকা হোক বলা হলেও যা বলা নেই, তবে যা স্পষ্ট, তা হল ক্ষতি হয় এমন রুটগুলিই শুধুমাত্র চালাক রেল। রেল পরিচালনায় সরকার
শুধুমাত্র নীতি ঠিক করে দিক বাকিটা দেখুক ‘রেল কোম্পানি’। এবং ক্রমে ক্রমে রেল বাজেটটাই তুলে দিতে বলেছে বিবেক দেবরায় কমিটি। বেশ কয়েক বছর ধরে রেলের আর্থিক অবস্থা বেহাল হওয়ায় বিনিয়োগের দরকার হয়ে পড়েছে। আর সেই বিনিয়োগ টানতেই কমিটির দাওয়াই বেসরকারিকরণ। কিন্তু বেসরকারিকরণ হলেই কি দক্ষতা বৃদ্ধি পায়। তাহলে এদেশে কিং ফিশার এয়ার লাইন ফেল মারল কেন? কেন আমেরিকায় আর্থিক সংস্থাগুলো ফেল মারায় সরকারকে বেল আউট প্যাকেজ ঘোষণা করতে হল? কেন সরকারি সংস্থা বিএসএনএল ক্ষতিতে চললেও কেরল অংশে মুনাফা হয়? আসলে কোন কিছুর পরিচালনার জন্য জবাবদিহি অত্যন্ত জরুরি। সরকারি প্রতিষ্ঠান বা সংস্থার ক্ষেত্রে সেটাই থাকে না। রেলমানে মন্ত্রী , শাসকদল বা ডিআরএমের সম্পত্তি। ফলে কোন দায়বদ্ধতার প্রশ্ন নেই।

রেল শুধু মুনাফা করার জায়গা নয়। সামাজিক দায়ব্ধতার অংশটাও অনেকটা বড়। অন্যদিকে বেসরকারি পুঁজির মূল লক্ষ্যই মুনাফা। তাই বুলেট ট্রেন চলুক বেসরকারি পুঁজিতে। কিন্তু ভারতীয় রেলের ঘাটতি মেটাতে টাকা আসবে যদি সরকার করপোরেটদের ছাড় দেওয়া বন্ধ করে তাহলে। দেশে বা বিদেশে কালো টাকা উদ্ধারে জোর দিক সরকার। বিশিষ্ট সাংবাদিক পি সাইনাথ বিভিন্ন কেন্দ্রীয় বাজেটে পেশ করা তথ্য থেকে দেখিয়েছেন ২০০৫-৬ থেকে ২০১৩-১৪ সাল পর্যন্ত করপোরেটদের দেওয়া কর ছাড়ের অঙ্কটা ৩৬.৫ লক্ষ কোটি টাকা। কোন এক বছরেই করপোরেটদের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রায় ৫লক্ষ কোটি টাকার বেশি কর ছাড় দেওয়া হয়। তাছাড়া কয়লা কেলেঙ্কারির পর নতুন করে কয়লা ব্লক নিলামে যে বিপুল টাকা উঠছে সেই টাকা বাজেট ঘাটতি না মিটিয়ে রেলের সম্পদ সৃষ্টিতে বিনিয়োগ করতে পারে সরকার।
রেলে এখুনি প্রয়োজন সর্বস্তরে জবাবদিহি চালু করা। নির্দিষ্ট দায়িত্ব পালন না করলে জবাব চাওয়ার সংস্কৃতি শুরু হোক। এক্ষেত্রে শুধু কর্মীরাই নন, এর আওতায় আনা হোক ডিআরএমদেরও। ডিআরএমদের ‘জমিদারি’ বন্ধ করতে পদক্ষেপ নিতে হবে সরকারকে। রেলে দুর্নীতিকে কীভাবে কমান যায় তা নিয়ে দরকার জরুরি পদক্ষেপ। একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। মেট্রোম্যান বলে পরিচিত ই শ্রীধরন জানিয়েছেন রেল যদি কেন্দ্রীয়ভাবে জিনিসপত্র কেনা বন্ধ করে তাহলে কার্টেলাইজেশন বন্ধ হবে । ফলে রেলের বছরে বাঁচবে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। এরকম নানা পদ্ধতি নিলে রেলের বাঁচবে হাজার হাজার কোটি টাকা। মাথাভাড়ি প্রশাসনকে কমিয়ে , যারা কাজ না করে বসে বসে বেতন নেয় সেরকম লোকদের ছেঁটে ফেলে নির্দিষ্ট টাইম টেবিল অনুযায়ী ট্রেন চালান হোক। যাত্রী স্বাচ্ছন্দের পাশাপাশি রেলের নিরাপত্তার দিকে দেওয়া হোক বাড়তি নজর। মনে রাখতে হবে রেল কোন নেতা মন্ত্রীর সম্পদ নয়, এটা জাতীয় সম্পদ । রেলকে বেসরকারি হাতে তুলে দেওয়া মানেই তার সমস্যার সমাধান নয়। বিষয়টি নিয়ে চর্চা হোক। কোন অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে যেন ভারতীয় রেল তথা জনতার ভবিষ্যত্ নির্ধারিত না হয়।