ছোট গল্পঃ দৈবগর্ভ- অনুপম কাঞ্জিলাল

                         দৈবগর্ভ

                                              অনুপম কাঞ্জিলাল       

ব্যপারটা টের পেতে সবিতার মনে আছে, ভয়ই পেয়েছিল সে। ভয় পেয়ে মাকেই বলেছিল কথাটা। শুনে নিমেষেই মায়ের গোটা মুখটা কেমন ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছিল। কী এক অদ্ভুত দৃষ্টি মেলে সবিতার গোটা শরীরটা জরিপ করতে করতে এক সময় বিড় বিড় করে উঠেছিল মা, ‘বলিস কী রে!গা বমি বমি ভাব বুকের ডগায় ব্যাথা?’ তারপর তুমুল উত্কন্ঠা ভরা গলায় জিজ্ঞাসা করে, ‘হ্যাঁ রে তোর মাসে…’

কথাটা শেষ করতে পারেনি, মাকে থামিয়ে দিয়েছিল সবিতা, ‘হিসেব তো আর রাখ না, বয়স চল্লিশ ছাড়িয়েছে অনেকদিন, ওসব বছর খানেক ধরেই আর মাসের নিয়ম মেনে হয় না।’

এর পরেই মায়ের গলায় সবিতা শুনেছিল উত্কন্ঠা উদ্বেগের সেই অমোঘ প্রকাশ – এই বয়েসে আবার মুখ পোড়ালি না তো হতভাগী!

আর কী আশ্চর্য এই কথার সূত্রেই সবিতার মনে আছে, তার গোটা শরীর জুড়ে অদ্ভুত আনন্দের শিহরণ বয়ে গিয়েছিল। মা অবশ্য ছাড়েনি। সবিতাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিল। গ্রাম থেকে কয়েক ক্রোশ দূরে এক ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়ে নিশ্চিত হয়েছিল।

সেদিন রাতে, সবিতাদের এই ছোট্ট ঘরটা, যেখানে দীর্ঘদিন দু’টো ভাঙা-চোরা মানুষের, তার-সুর ছন্দহীন জীবন-যাপনের একঘেয়েমি ছাড়া কিছু ছিল না, সেদিন রাতে এই ঘরটাই তেতে উঠেছিল, অন্যরকম এক তর্ক-যুদ্ধে।

–   বল্ এ পাপ কোথা থেকে জোটালি?

–   মায়ের ঝাঁঝালো প্রশ্নে, সবিতা নির্বিকার ভঙ্গিতে জবাব দিয়েছিল, – ‘জানি না!’

–   ‘জানি না মানে, ন্যাকামি করছিস?’ মায়ের গলা আরও তেতে উঠেছিল, তার পর সবিতার উত্তরের অপেক্ষা না করেই সরাসরি নিদান হেঁকেছিল, ‘সময় থাকতে থাকতে ও পাপ বিদায় করার ব্যবস্থা কর।’

–   সবিতা এইরকম শান্ত অথচ দৃঢ়ভঙ্গিতে বলেছিল, ‘না।’

–   ‘না মানে,’ রীতিমত ভেঙে পড়ে মায়ের গলা।

–   ‘না মানে না, না মানে যে আসছে তাকে আমি রাখব।’

–   ‘তুই কি পাগল হলি সবি!’ মায়ের গলা তখন আর্তনাদের মত শোনায়।

–   সবিতা একই রকম শান্ত গলায় বলে যেতে থাকে – ‘পাগল হব কেন, আমি তো আসলে একটা স্বপ্ন দেখতে চাইছি। আচ্ছা ভাব তো মা, তুমি তো আর চিরদিন থাকবে না, আর আমার বিয়েও কোনোদিন হবে না। তাই কেউ যদি আসে, সে আমার নিজের যাকে নিয়ে আমি বাঁচতে পারি, স্বপ্ন দেখতে পারি।’

–   ‘কিন্তু সমাজ, সমাজ তাকে মানবে কেন?’

–   ‘আমি ও তো মানুষ, আর সমাজের কথা বলছ, সমাজ কি কোনওদিন আমাদের মেনেছে মা। একবার ভাবো তো, আমাদের পরিবারের একমাত্র রোজগেরে মানুষ, বাবার শরীরটা যখন ওই জুটের কলে জড়িয়ে গেল, আমি তখন সবে ক্লাস নাইন। সেদিন বাবার মিলের কর্মী থেকে পাড়ার লোকজনদের কত সান্ত্বনা, কত প্রতিশ্রুতি, কিন্তু সময় ঘুরতেই সবাই যে যার নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত। তোমার একটা হাতটানা সেলাই মেশিনকে সম্বল করে কীভাবে আমরা পেরিয়ে এলাম এতগুলো বছর, কীভাবে এত লেখাপড়া শিখলাম, কেউ কখনও খোঁজ নিতে এসেছে, জানতে চেয়েছে?’ সবিতা যেন তখন এক ঘোর লাগা মানুষ। ঘোরের মধ্যে সে বলে যেতে থাকে, ‘আসলে কী জান, আমাদের এই ঘরটা যেমন আমরাও তেমনই, খুব ছোট, এত ছোট যে সমাজ এখানে ঢুকতেই পারে না।’

–   হয়তো কথা গুলোর মানে বুঝতে না পেরে চুপ করে গেছিল মা।

–   দিনের গায়ে নতুন দিন লেগে গড়িয়ে যেতে থাকে সময়। সবিতা দেখে, আসন্ন এক বিপদের আশঙ্কা বুকে চেপে মা কেমন গুম মেরে যাচ্ছে। মায়ের জন্য মায়া হয় সবিতার। সংসার ঠেলতেই যাকে একটু একটু করে ক্ষয়ে যেতে হচ্ছে, প্রচলিত রীতি-নীতির বাইরে যে কোন ভাবনাই তার কাছে মহাউপদ্রব বলে মনে হবে, তাতে আর আশ্চর্য কী!

তবু নিজের সিদ্ধান্ত অবিচল থাকে সবিতা। সে কী করতে যাচ্ছে, কেন করতে যাচ্ছে, তা এখনও সবিতার নিজের কাছেই খুব পরিষ্কার নয়। তবু সে অনুভব করতে পারে, তার অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িয়ে আর একটা অস্তিত্ব, যেখানে কোনও মিথ্যা নেই, পাপ নেই, নেই কোনও কৃত্রিমতা। সবিতা ভাবে, মাটি আর মেয়েমানুষে কোথায় যেন খুব মিল। কোথা থেকে একখন্ড বীজ এসে পড়ল মাটির ওপর, মাটি তার সমস্ত সত্ত্বার অজান্তে ধারণ করল সেই বীজ আর তাতেই একসময় প্রাণের কোলাহল। এখানে সমাজ, তার রীতি-নীতির হাত পৌঁছয় না, পৌঁছানো উচিত নয়। মনে মনে একরকম একটা ভাবনা কে একগুঁয়ের মত আঁকড়ে ধরতে চায় সবিতা।

–   এতদিনে পাড়াতে একটু একটু করে চাউর হয়েছে খবরটা। একে আধবুড়ি শরীর তার উপর বিয়ে হয়নি, অথচ পেটে বাচ্চা এসেছে, তাই নষ্ট মেয়ের গন্ধ শুঁকতে, উত্সুক হয়ে উঠে অনেকেই।

এতদিন সবিতার আলাদা কোনও অস্তিত্ব ছিল না। কিন্তু এখন রাস্তা ঘাটে সবিতাকে দেখলে, অদ্ভুতভাবে তাকায়। লোকজন কী সব চাপা আলোচনা করে। খারাপ লাগে না সবিতার, আধবুড়ি শরীর নিয়ে বাড়ি বাড়ি পড়িয়ে বেরানো ছাড়াও সে পারে অন্যরকম কিছু করে ফেলতে, তাকে নিয়েও লোকজনদের আলোচনা করতে হয়, ভেবে অন্য রকম একটা তৃপ্তি পায় সবিতা।

এদিকে প্রাইভেট টিউশনিগুলো একের পর এক হাতছাড়া হতে থাকে। সবাই তাদের ছেলেমেয়েদের অন্য টিউটর দেখে নিতে শুরু করে। সোজাসুজি সবিতাকে অবশ্য কেউ কিছু বলে না। এক এক বাড়িতে এক এক রকম ভণিতা। কেউ বলে, এ মাসটা একটু অসুবিধা আপনাকে পরে খবর দেওয়া হবে। কোনও কোনও বাড়ির অভিভাবক আবার জানায় এবার তো ক্লাস টেন হল, তাই ভাবছি, ভাল একটা সায়েন্সে-র টিচার রাখব। এসব শুনে মনে মনে হাসে সবিতা, আর ভাবে নষ্ট মেয়ের গন্ধটা তাড়াতাড়ি ছড়ায়।

আজ রবিবার, রবিবার এমনিতেই একটু দেরিতে বিছানা ছাড়ে সবিতা, তার উপর আজ সকালে ঘুমের মধ্যে, একটা সুন্দর স্বপ্ন দেখেছে… দেখছিল সে আবার তার ছোটবেলায় ফিরে গেছে। বাবা তাকে হাঁটুতে চড়িয়ে দোল দিতে দিতে গান ধরেছে – ‘দোল দোল দুলুনি, রাঙা মাথায় চিরুনি, বর আসবে এক্ষুনি, নিয়ে যাবে তক্ষুনি’। ছোট্ট সবিতা দোল খেতে খেতে ভাবে, বর বস্তুটা কেমন, আর সে যেখানে নিয়ে যাবে সেই জগত্টাই বা কেমন!

এমন সময় মায়ের ঝাঁকুনিতে ঘুম ভেঙে যায় সবিতার ‘সবি এই সবি ওঠ না, ওরা তোর সঙ্গে একটু কথা বলতে এসেছে।’

‘ওরা মানে কারা?’ ঘুম জড়ানো গলাতেই জিজ্ঞাসা করে সবিতা।

‘ওই রমলারা’।

সবিতা বুঝতে পারে এটা মায়েরই কাজ, কোনও উপায় না দেখে শেষ পর্যন্ত ওদের ডাকিয়ে এনেছে। ওরা মানে, রমলা, শান্তা, মায়া, মঞ্জু। ওরা নারী সংগঠন করে, রাজনৈতিক প্রভাব প্রতিপত্তি আছে এলাকায়। সেই প্রতিপত্তির জোরে কেউ স্কুলে, কেউ গ্রামপঞ্চায়েতে এক একটা চাকরি বাগিয়ে ফেলেছে। এঁরা গ্রামের মেয়েদের স্বঘোষিত অভিভাবক।

সবিতা মা কে বলে, ‘তুমি ওদের একটু বসতে বলো, আমি বিছানাটা গুছিয়ে আসছি।’

বিছানা গোছাতে গোছাতেই ওরা কী বলতে পারে, আর সে তার কী উত্তর দেবে, তার একটা খসড়া মনে মনে সাজিয়ে ফেলে।

ঘর থেকে বেড়িয়ে দাওয়ায় পা রাখতেই সবিতার সঙ্গে চোখাচুখি হয় ওদের। সবিতাদের ঘরের দাওয়ায় মাদুরে গা ঘেঁষাঘেষি করে বসে ওরা, আজ মঞ্জু নেই ওদের সঙ্গে।

শান্তাই প্রথম কথা বলে, ‘এসো সবিতা, আমরা তোমার সঙ্গে একটু কথা বলি, তোমার জীবনে যে দুর্ঘটনা ঘটেছে, সে ব্যাপারে আমাদের সব খুলে বল তো, দেখি আমরা তোমার জন্য কী করতে পারি।’

ওদের মুখোমুখি বসতে বসতে সবিতা বলল, ‘দুর্ঘটনা! কই আমার জীবনে কোনও দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে তা আমারা জানা নেই।’

এবার রমলা বলে ওঠে, ‘শোন সবিতা, তোমার মা আমাদের সব বলেছেন, এখন তুমি যদি গোটা বিষয়টা আমাদের খুলে বল তাহলে আমরা তোমাকে সাহায্য করতে পারি।’

সবিতা শান্ত গলায় বলে, ‘মা আমার জন্য তোমাদের কাছে কীরকম সাহায্যের প্রত্যাশায় ছুটে গিয়েছে আমি জানি না, কিন্তু বিশ্বাস কর আমার কোনও রকম সাহায্যের দরকার নেই।’

এতক্ষণ চুপ করে থাকা মায়া এবার বলে উঠে, ‘সমাজের এতদিনকার চলে আসা নিয়ম হঠাত্ কেউ ইচ্ছে করলেই একা একা ভেঙে ফেলতে পারে না সবিতা।’

আমি তো কিছুই ভাঙতে চাইছি না মায়াদি, আমি শুধু একটা সত্যকে আমার নিজের মত করে মেনে নিতে চাইছি। আর সমাজের কথা বলছ, সত্যি কি আমরা সমাজের কেউ মায়াদি?

‘এ কথা কেন বলছ?’

‘রাজনীতি কর আর একথা বুঝতে পারছ না মায়াদি? আমি না হয় কুত্সিত তাই বর জোটেনি, কিন্তু অনেক কষ্ট করেও আমি তো এমএ পাসটা করেছিলাম। একটা চাকরি তো আমার হতে পারত। এই যে রমলাদি এখন যে স্কুলে পড়ায় আমি আর ও একই দিনে ওই স্কুলে চাকরির ইন্টারভিউ দিতে গিয়েছিলাম, শুধু আমি নয় এই অঞ্চলের অনেকেই কিন্তু জানে, ওর চাকরিটা হয়ে গিয়েছিল কারণ…’

‘একথা এখন তুলছ কেন? এখন যা নিয়ে কথা বলতে এসেছি সেটা নিয়ে কথা বল’ – বলে মায়া থামিয়ে দেয় সবিতাকে।

সবিতা বলে, ‘আসলে সমাজের কথা তুললে তো, তাই বললাম।’

‘তুমি আমাদের যেটা সত্যি সেটা খুলে বল।’

শান্তার কথায় একটু গম্ভীর হয়ে সবিতা বলতে থাকে, ‘আসলে কী জান, সত্যিটা বললে তোমরা কেউই বিশ্বাস করতে পারবে না, আমি জানি শুধু তোমরা কেন, কেউ-ই বিশ্বাস করবে না।’

‘বিশ্বাস করব না কেন, আমরা তো সত্যিটা জানতেই এসেছি।’ ওরা তিনজনই প্রায় একসঙ্গে বলে ওঠে।

‘বিশ্বাস করবে’?

হ্যাঁ নিশ্চয়ই করব, তুমি বল।’

‘যদি বলি আমার এই ঘটনার জন্য কেউ দায়ী নয়, যদি বলি এটা একেবারে দেবতার দান, দৈবগর্ভ, তোমরা বিশ্বাস করবে?’

নিমেষেই তিনজনে একেবারে চুপ হয়ে যায়, পরস্পর চোখ চাওয়া চায়ি করতে থাকে।

সবিতা বলে, ‘কী হল বিশ্বাস করতে পারলে না তো?’

রমলা উত্তর দেয়, ‘আজকের এই বিজ্ঞানের যুগে এসব কেউ বিশ্বাস করতে পারে?’

তীর্যক এক চিলতে হাসি ফুটে ওঠে সবিতার ঠোটের কোনায়, ‘বল কী গো, এই বিজ্ঞানের যুগে হাতে ইয়া বড় বড় পাথরের আংটি পরে গ্রহের ফের কাটানোতে লোকের বিশ্বাস আছে, রকমারি বাবাজীদের হাত যশে লোকের এত বিশ্বাস, এমন কী পাথরের গণেশ দুধ শুষে নিচ্ছে বলে, শহুরে বাবুরা বিশ্বাস পর্যন্ত করে ফেলছে, আর দৈবগর্ভ লোকে বিশ্বাস করবে না। আর তা ছাড়া কেউ বিশ্বাস না করলেই বা আমার কী, আমার বিশ্বাস আমার কাছে।’

‘তাহলে তুমি আমাদের সঙ্গে কোনও সহযোগিতা করবে না?’ মায়ার গলায় হতাশা, একটু হেসে বলে, ‘বেশ যদি কখনও মনে হয় আমাদের সাহায্যের দরকার, বলো আমরা আছি,’ বলতে বলতে ওরা তিনজনেই একে একে উঠে দাঁড়ায়।

সবিতা চুপ করে বসে থেকে ওদের চলে যাওয়াটা দেখতে থাকে অপলক।

পড়ন্ত বিকেলে বাড়ির রোয়াকে বসে, সবিতা দেখতে থাকে, দিনের আলো সরিয়ে একটু একটু করে আকাশের দখল নিচ্ছে অন্ধকার। আর ক্রমে ঘনিয়ে আসা সেই অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে সবিতার চোখের সামনে ভেসে উঠতে থাকে, সেদিনকার সেই খণ্ড খণ্ড দৃশ্য।

সেদিন দুপুর থেকেই আকাশের মুখ ভার ছিল, মেঘ জমেছিল, বিকেলের আকাশে ছিল ঝড় ওঠার নিশ্চিত পূর্বাভাস।

বড় রাস্তা পেরিয়ে পড়াতে গেছিল সবিতা। ছাত্রীর মা বলেছিল, ‘আজ আকাশের অবস্থা ভাল নয়, তুমি বরং তাড়াতাড়ি বাড়ি চলে যাও সবিতা।’

উঠে পড়েছিল সবিতা, ফেরার সময় বড় রাস্তা পেরিয়ে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরার তাড়ায়, যা সচরাচর করেনা তাই করেছিল। আমবাগানের নির্জন রাস্তাটা ধরেছিল। মাঝ রাস্তা খানেক আসতেই মনে আছে, দু’জন কে দেখেছিল, তাদের পা টলছিল, মাতাল ছিল নিশ্চয়।

তারপর সবিতার সঙ্গে তাদের দূরত্ব ক্রমশ কমে আসতে থাকে, এক সময় মাথায় একটা আঘাত, ব্যাস তার পর আর কিছু তার মনে নেই।

শুধু মনে আছে জ্ঞান ফেরার পর তার মনে হয়েছিল, সে যেন শূণ্যে ভেসে রয়েছে, তার হাত নেই, দেহ নেই, কেবল মুন্ডুখানা আছে। যেন একটা আজগুবি স্বপ্ন যা মাঝেমাঝেই হানা দেয় সবিতার ঘুমের মধ্যে। তার পর স্বপ্ন যেমন হয়, একটু একটু করে সে খুঁজে পায় তার হাত, পিঠের নিচের শক্ত মাটি, আর উরুসন্ধিস্থল খুঁজে পেতেই, সেখানেই অনুভব করে তীব্র যন্ত্রণা।

কী লাভ হত এসব বলে, কে, কীই বা করতে পারত, তারচেয়ে মাঝের এই ঘটনাটা বাদ দিয়ে এটাকে দৈবগর্ভ বলে মেনে নিলে সবার স্বস্তি আসতে পারে, অন্তত সমাজ নামক বস্তুটার কাছে, এটা স্বস্তি তো বটেই। সবিতা এভাবেই সমাজের জন্য এক অভিনব স্বস্তির কাহিনি সাজায়। রাতের বিছানায় শুয়ে, সবিতা আবার বুঝতে চাইল, তার অবস্থান, সে কী সত্যি সমাজকে স্বস্তি দিতে চাইছে নাকি সমাজের নিয়মকে ভাঙতে চাইছে, সে কি বিদ্রোহ করতে চাইছে, এভাবে একা একা কি বিদ্রোহ করা যায়? এতদিনের জীবন-যাপনে সে তো জেনে গিয়েছে ক্ষমতা ভয় পায় শুধু পাল্টা ক্ষমতাকে, পাল্টা ক্ষমতা তৈরির সাধ্য তো তার নেই, তাহলে কেন কিসের জোরে সে একটা প্রচলিত রীতির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে চাইছে, কেন, কেন? আর তখনই সবিতা অনুভব করে তার ভিতর থেকেই একটা উত্তর পাচ্ছে, সে আসলে প্রত্যাখান করতে চাইছে, সমাজের নিয়ম সে বদলাতে পারবে না, কিন্তু নিজের মতো করে বাতিল তো করতে পারে, একবার না তো বলতে পারে। আর এই বাতিল করার স্পর্ধা, এই না বলতে পারার সাহসটাই সেই মূহূর্তে নিজের অস্তিত্বও আত্মমর্যাদার একমাত্র অবলম্বন বলে মনে হয়।

 

ভাবনার ক্লান্তি একসময় ঘুম হয়ে নেমে আসে শরীরে। মাঝরাতে হঠাত্ ঘুম ভেঙে যায়, কার যেন স্পর্শ অনুভব করে, দেখে মা তার মাথায় হাত বুলোচ্ছে। সবিতার মনে পড়ে, এই ক’টা মাস মা তার সঙ্গে ভাল করে কথা বলেনি , চরম আবেশে মা কে দু’হাতে জড়িয়ে ধরে… মা নিচু স্বরে বলে, ‘চল্ না সবি আমরা এখান থেকে অন্য কোথাও চলে যাই।’

মায়ের কথায় হঠাত্ই শরত্চন্দ্রের গফুর-আমিনাকে মনে পড়ে। গফুরও তো কোনও এক রাতে মেয়ে আমিনার হাত ধরে পরিচিত গ্রাম ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছিল। কিন্তু তার পর কেমন ছিল গফুর-আমিনারা? নতুন ঠিকানা খুঁজে বাঁচতে পেরেছিল কি? এতগুলো বছর পেরিয়ে এসে, গফুর-আমিনাদের জীবন-সমস্যা থেকে, তার নিজের জীবনের সমস্যার ফারাক কতটা ভাবার চেষ্টা করে সবিতা।

মা আবার বলে, ‘কিছু বললি না যে?’

‘না মা আমরা অন্য কোথাও যাব না। আমরা এখানেই থাকব, এখানেই বাঁচব।’

 

‘কিন্তু পারব তো?’

‘হ্যাঁ, তুমি দেখো পারব, ঠিক পারব, আমরা আমাদের নিয়ম আমাদের রীতি নিয়েই বাঁচব।’ সবিতার গলায় তখন এক অচেনা তেজ।

সবিতা অনুভব করে এই কথার পরই, তার মায়ের শীর্ণ আঙুলগুলো আরও দৃঢ় হয়ে তার মাথায় বসে যাচ্ছে, ভরসা খুঁজছে।

সবিতা বুঝে যায়, প্রচলিত রীতি-নীতিকে বাতিল করার যে কাহিনি সে একা একা তৈরি করেছে, মাও ঢুকে পড়ল সে কাহিনির বৃত্তে, এতদিনে।

আর তখনই তাদের ঘরের খোলা জানালা দিয়ে সবিতা দৃষ্টি ছড়িয়ে দেয় সুদূর আকাশে। তন্ন তন্ন করে খুঁজতে থাকে তেমন একটা উজ্জ্বল নক্ষত্র, যেমন নক্ষত্র দেখে মা মেরি নিশ্চিত হয়েছিল যিশু আসবে বলে।