গল্পঃ গোপন- স্বপ্না সেনগুপ্ত

 

                                             গোপন

                                          স্বপ্না সেনগুপ্ত

 

রাত সাড়ে-ন-টার পর শ্যামল দ্বিধাগ্রস্ত হাতে গেটটা খোলে। আওয়াজ শুনেই দোতলা থেকে বড়দা বলে, “হালুম আইলি নাকি?”

উত্তর দিতে দিতে একরাশ লজ্জা শ্যামলকে গ্রাস করে। সদ্য বাবা হওয়ার অনুভূতিতে আচ্ছন্ন শ্যামল  কোনওক্রমে উত্তর দেয়, “হ্যাঁ বড়দা।”

“মাইয়ার নাম রাখিস লোপামুদ্রা, হাসপাতাল থিকা আওনের পথে মানিব্যাগটা পকেটমারি হইছে।”

বড়দার কথায় শ্যামল হাসে। এমনি মজাদার তার বড়দা, সবকিছুতেই হাস্যরস মেশাতে পারে অনায়াসে।

“কত টাকা ছিল?” জানতে চায় শ্যামল।

বড়দা বলে, “বেশি না। একশো টাকার নোট একটা, আর গোটা চল্লিশ টাকা, তবু মুদ্রা লোপ পাইল তো!… ছাড়ব কবে বউমারে হাসপাতাল থিকা?”

“পরশু”- উত্তর দিতে দিতে শ্যামল হাসতে-হাসতে উঠোন থেকে ঘরের ভিতরে ঢুকে নীলরঙের জিনসের ব্যাগটা অভ্যাসমতো দেওয়ালের হুকে ঝুলিয়ে দেয়। শক্তপোক্ত ব্যাগটা শ্যামলের সব সময়ের সঙ্গী। চিত্রকরের প্রয়োজনীয় জিনিসগুলি ওতে মজুত থাকে। একটা বহু পুরনো চেন-লাগানো কাপড়ের ব্যাগে নানারকম পেনসিল, পেন অনেকগুলি প্রিয় কলম, সেফটিপিন, এমনকী সুচসুতো পর্যন্ত। আজ ব্যাগটা একটু বেশি ভারী ছিল। কাল বাদে পরশু মধুরা ছাড়া পাবে হাসপাতাল থেকে। ওর কিছু টুকিটাকি জিনিস আর তিনমাস ধরে ওদের দু-জনের প্রণয়োপখ্যান লেখা তিনটে ডাইরি।

ঠাকরুন অভ্যাসমতো একগ্লাস জল আর দুটো নাড়ু নিয়ে এসে দাঁড়ায় নীরবে। শ্যামলের জল খাওয়া হলে জানতে চায়, “ভাল আছে বউমা?” শ্যামল মাথা নেড়ে মধুরার সুস্থতার খবর জানায়। ঠাকরুন তার আজন্মসঙ্গী। বালিকাবয়স থেকেই আছেন এ-বাড়িতে। সম্পর্কে তিনি এ-বাড়ির কর্তার অর্থাত্ শ্যামলের বাবার পিসিমা। শক্তপোক্ত সুঠাম চেহারার এই বালবিধবার নিষ্ঠার কাছে বার্ধক্য যেন সেলাম ঠুকে দূর দাঁড়িয়ে আছে। শ্যামলের সংসার-তরীর তিনি কাণ্ডারি।

খাওয়া-দাওয়ার পর শ্যামল ভেবেছিল, ডাইরিগুলো নিয়ে একটু বসবে। কিন্তু ক্লান্তি আর টেনশন তাকে বিছানায় টেনে নেয়। অথচ শোয়ার সঙ্গে-সঙ্গেই যে ঘুম এল, এমন নয়। অতিরিক্ত পরিশ্রম আর উত্তেজনা মাথায় চড়ে বসেছে। নানা কথা ভাবতে-ভাবতে মধুরার উপর অভিমানি হয়ে ওঠে শ্যামল। আজ তার কন্যার মা মধুরা, অথচ শ্যামল যখন বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিল তখন পাক্কা ছয়মাস তাকে অপেক্ষা করিয়েছিল। হতাশায় আর টেনশনে শ্যামল তখন প্রায় পৌছে যেতে বসেছিল ব্যর্থতার নরকে। বিএসসি পাসের পর পিজি-তে নার্সিং ট্রেনিং নিয়ে ও তখন ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজে চাকরিতে যোগ দিয়েছে। ইরার সঙ্গে একদিন নাটকের দলে এসেছিল। এমন তো কত মেয়েই কতজনের সঙ্গে আসে। কিন্তু ওর মতো শিক্ষিত, নম্র অথচ দীপ্ত আর কাউকে কখনও লাগেনি শ্যামলের।

বিয়ের পর একদিন জানতে চায় মধুরার কাছে, “ আমায় এত দিন অপেক্ষা করিয়ে রাখলে কেন?”

মধুরা রহস্যময়ীর গলায় প্রথমে বলে, “অন্য প্রেমিকের প্রতিক্ষায় ছিলাম।”

পরে একটু থেমে আবার বলে,“বেকার ছেলেকে বিয়ে করার আগে ভাবতে হবে না একটু?”

শ্যামল অবাক হওয়ার ভান করে, “আমি বেকার, চারটে আঁকার স্কুলে ড্রইং শেখাই! রবিবার সকালে ঘর-ভর্তি ছাত্র। হ্যাঁ, বলতে পারে, মাসে দু-হাজার টাকার বেশি রোজগার করতে পারি না। কিন্তু, গুরু, ভেবে দ্যাখো, তোমার মত সরকারি চাকরিরতারা যদি আমার মত ব্যর্থ চিত্রকর আর বিপ্লবী নাট্যকর্মীকে স্পনসর না-করে, তবে তো পৃথিবী রসালতে যেতে বেশিদিন লাগবে না।”

শ্যামলরা চার ভাই। শ্যামলের ছোটভাই কমল আমেরিকায়। মেজদা কানপুরে। বেহালায় বেশ বড়সড় বাড়িতে উপরে বড়দা আর নিচে ঠাকরুনের পরিপাটি সংসার শ্যামল আর মধুরাকে নিয়ে।

কে জানে কেন, ঠাকরুনের মতো অসাধারণ মহিলাকেও মানিয়ে নিতে পারেনি বড়বউদি। অথচ, ঠাকরুন এ বাড়ির কারো দায় নয়। বাবার রেখে যাওয়া টাকা আর কমলের পাঠানো মাসোহারা নিয়ে ঠাকরুন বেশ ধনী মহিলা। এ বাড়িতে বউদের বিরুদ্ধে আঙ্গুল তোলার মত কুত্সিত মনোভাব কারও নেই। তাই কেউ কখনও বড়বউদির বিরুদ্ধে কোনও অনুযোগ করেনি।

শ্যামলকে অবাক করে দিয়ে অতি সহজেই মধুরা এ বাড়ির সকলকে আপন করে নেয় নার্সের কঠিন দায়িত্বের চাকরির পাশাপাশি। মাইনের প্রায় সবটাই মাসের প্রথমে ঠাকরুনের হাতে তুলে দিয়ে খালাস। বড়বউদির মত জটিল মনের মানুষও ওর সরলতার কাছে হার মানে।

বাড়ির পিছনদিকে পাঁচকাঠার একটা প্লট শ্যামলের কাকার। চাকরি-সূত্রে তিনি দিল্লির অধিবাসী। কমল কাকার থেকে জায়গা টুকু কিনে নেয়। বড় নিশ্চিত বোধ করে শ্যামল। অন্য-কেউ ঘাড়ের উপরে এসে বাড়ি করবে এমন সম্ভাবনা রইল না। কয়েকটা অযত্নে বর্ধিত গাছ আগেই ছিল। মধুরার সেবা যত্নে তরতাজা হয়ে ওঠে। কতরকম গাছ লাগায় মধুরা-হাসনুহানা, দোলনচাঁপা, শিউলি, টগর, যুঁই, বেল, অশোক। কাকার বাড়ির গায়েই একটা ডোবা-মত জায়গা। জলাজমি বিক্রির আইনসংগত বাধায় টিকে আছে। তার ধার ঘেঁষে একটা বিরাট শিরিষ গাছ। পাড়ার ক্লাবের ছেলেরা বনসৃজন প্রকল্পে তার সঙ্গে লাগিয়েছে পলাশ, কৃষ্ণচূড়া, শিমুল, মেহগিনি।

মধুরার কাণ্ড দেখে ঠাকরুন চিত্কার করে রান্নাঘর থেকে, “কি করছিস, ও বউ, বাড়িটাকে জঞ্জাল বানাবি নাকি?”

পাশের জলাজমিটার জন্য বাঁচোয়া গাছগুলি রোদ পায়। গাছেদের নামকরণ করে মধুরা। লতানো বেল ফুলের গাছে মনোরম গ্রীষ্মের সন্ধ্যায় থোকা-থোকা ফুল ফোটে বাগান আলো করে। মধুরা গাছটার নাম দেয় ‘বনজ্যোত্স্না’।

শ্যামল অবাক হয়ে বলে, “এত সুন্দর নাম!”

মধুরা বলে, “কিছুই পড়াশোনা করনি দেখছি, নামটা মহাকবি কালিদাসের থেকে চুরি-করা।”

শ্যামলের আজন্ম-সঙ্গী বকুলগাছের নাম হয় ‘মৃণালিনী’। ওটা শ্যামলের মৃত মায়ের নাম। শ্যামল মায়া বড় মায়া ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে মধুরার দিকে।

মধুরা বলে, “গাছেরা তো আসলে ঠাকরুন, মা অথবা বউদি। তাই না?”

“মা তো বুঝলাম, কিন্তু গাছ কি করে বউদি হবে, তা তো বুঝি না।”

শ্যামলের অজ্ঞতায় অবাক হয় মধুরা, বলে “ওমা, তুমি রবীন্দ্রনাথের শ্যামা পড়নি- হৃদয় ব্যথিল মোর অতি মৃদু গুঞ্জরিত সুরে – ও যে দূরে, ও যে বহু দূরে। যত দূরে শিরিষের শাখা, যেথা হতে ধীরে ক্ষীণ গন্ধ নেমে আসে প্রাণের গভীরে।”

শ্যামল মুগ্ধ হয়ে মধুরার স্পষ্টকণ্ঠের রবীন্দ্র-আবৃত্তি শোনে। মধুরা বলে “এই হল রবীন্দ্রনাথের মেজ বউঠানের কথা। নারীর রূপ পুরুষের হৃদয়ে এমন ফুলের গন্ধের মতই ছেয়ে থাকে।”

শ্যামল বলে আমার জীবনেও তিন-নারীর গন্ধ। আমার ঠাকরুন, আমার প্রয়সী আর কন্যা।”

মধুরা আশ্চর্য হয়ে বলে, “ওমা কন্যা এল কোথা থেকে?”

কাপড় সরিয়ে মধুরার জঠরে একটা চুম্বন এঁকে দিয়ে শ্যামল বলে, “আসেনি এখনও, কিন্তু এইখানে আসবে।”

মধুরা খুব লজ্জা পায়। আধুনিক মেয়েদের থেকে এইখানেই মধুরা আলাদা। এক-এক সময় বাড়াবাড়ি মনে হয় শ্যামলের। পাশের ঘরে ঠাকরুন আছে বলে একান্ত দাম্পত্যে কখনও আলো জ্বালতে পারে না শ্যামল। একদিন মধুরাকে ভোলাতে শ্যামল বলে, “আচ্ছা ছোট্ট একটা মোমবাতি জ্বালি, রোমান্টিক আলোয় আমাদের মিলন হবে।”

রাজি হয় না মধুরা, বলে, “না না ঠাকরুন ঠিক টের পাবে।”

বড় রাগ হয় শ্যামলের। তারপর একদিন থই-থই করা বৈশাখী জ্যোত্স্না জানালা দিয়ে ডাকাতের মতো ঘরে ঢুকে ভাসিয়ে দেয় শ্যামলের বিছানা। চাঁদের নরম আলোয় নরম মধুরাকে সেদিন যেন সম্পূর্ণ করে পেল শ্যামল।

ইউরিন-রিপোর্ট যখন পজেটিভ এল, তখন খুশির সঙ্গে মধুরা বলে, “কাছা-খোলা মানুষ।” শ্যামল হাসে সার্থক হাসি।

অশোক, কৃষ্ণচূড়া, যুঁই, মল্লিকার দিন শেষ হয়ে আসে বর্ষাকাল। বাগান সুগন্ধে আমোদিত হয়ে ওঠে কামিনীফুলের গন্ধে। দোলনচাঁপা, হাসনুহানাফুলের গন্ধে চারিদিক ম-ম করে। বড়দা পিছনের দরজা দিয়ে বাগানে যাওয়ার ইটের রাস্তা তৈরি করে দিয়েছে। জল যাতে না দাঁড়ায় তার জন্য দু-পাশ ঢালু করা। রাতে ডিউটি থাকলে মধুরা সকালবেলাটা বাগানে কাটায়। আর সন্ধ্যেবেলায় যদি কোনোদিন বাড়িতে থাকে, তবে বাগানে গিয়েই বসে থাকে। একদিন শ্যামলকে টানতে-টানতে নিয়ে যায় ঠাকরুনের তুলসিমঞ্চের কাছে। তুলসিগাছের পাতা এত বড় হয়, না-দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন।

“আলুর খোসা আর ফেলে দেওয়া চায়ের পাতা পচিয়ে যদি তুমি সার করে গাছের গোড়ায় দাও, তবে গাছের বাড়বাড়ন্ত হবে, তোমার সঙ্গে কথা বলবে। চা-পাতায় চিনি দেওয়া চলবে না, তবে গাছের গোড়ায় পিপড়ে হবে, পাতাগুলি কত বড় হয়েছে দ্যাখো।” মধুরা কলকল করতেই থাকে। চিত্কার করে বলে, “ও ঠাকরুন, দ্যাখো, তুলসিপাতায় চন্দন দিয়ে তুমি তোমার নারায়ণের পুরো নাম লিখতে পারবে।”

রান্নাঘর থেকে ঠাকরুন জবাব দেয়, “হ্যারে মা, ঠিকই বলেছিস, তোর হাতে জাদু আছে।”

জাদু সত্যিই আছে মধুরার মধ্যে। ধীরে ধীরে সকলেই ওর বশীভূত হয়ে পড়ে। গাছের মত সুন্দর হয়ে ওঠে শ্যামলদের বাড়ির চারপাশটা মধুরার অনুপম লক্ষ্মীশ্রীতে।

একদিন বর্ষণ-মুখরিত রাতে শ্যামল মধুরাকে আবেগমথিত কন্ঠে, জিজ্ঞাস করে, কী নাম হবে আমাদের মেয়ের।”

“ওমা, মেয়েই হবে, এ-কথা কে বলল তোমায়?” মধুরা বলে।

দৃঢ়কন্ঠে শ্যামল বলে, “মেয়েই হবে, বলো না, কী নাম রাখব?”

“কেন হালুমের মেয়ে হুলুম।” জবাব দেয় মধুরা।

শ্যামল ব্যথা পায়। অভিমান-ভরা কন্ঠে বলে, “হালুম নামটা তোমার পছন্দ নয়, না?”

মধুরা আবার নিজেকে রহস্যময়ী করে শ্যামলকে জড়িয়ে ধরে বলে, “ওমা, তা কেন? হালুম তো সুন্দর নাম। কেমন বাঘ-বাঘ গন্ধ।” তারপর শ্যামলের বুকে মুখ রেখে প্রাণভরে তার গায়ের গন্ধের সঙ্গে একাত্ম হয়।

পিছন-দরজা দিয়ে বাগানে যাওয়ার পথটা বেশ পিছল হয়ে উঠেছিল বর্ষার জলে। সকলের বারণ সত্ত্বেও বারবার বাগানে যেতে গিয়ে আগস্ট মাসের মাঝামাঝি মধুরা পিছলে পড়ে গেল বাগানে। শ্যামল তখন নাটকের দল নিয়ে বর্ধমানে। খবর পেয়ে হাসপাতালে যখন পৌছল, তখন দু-বাড়ির আত্মীয়স্বজন মধুরার সহকর্মীদের ভিড়ে ওর কেবিনে তিলধারনের জায়গা না থাকলেও শ্যামলের ঢোকার জায়গার অভাব ছিল। মধুরার বন্ধু স্ত্রীরোগ-বিশেষজ্ঞ পি কে নন্দী শ্যামলকে বললেন, ওর বেডরেস্ট দরকার, বাড়িতে থাকলে কারও কথা শুনবে না। ঘর আর বাগান করতে গিয়ে আবার বিপদ বাধাবে। থাক এই তিন মাস হাসপাতালে।”

শ্যামলের মাথায় হাত, “তিন মাস।”

বিকেলে শ্যামল হাসপাতালে একান্তে পায় না মধুরাকে। ওর সহকর্মীরা, এ-বাড়ি,ও বাড়ির কেউ-না-কেউ হাজির হয়ে যেত শ্যামলের আগেই। মধুরার কড়া শাসনে ছ-টার পর শ্যামল এক-মিনিটও থাকতে পারে না হাসপাতালে। তিতিবিরক্ত শ্যামল চারটে ডায়রির ব্যবস্থা করে। মধুরা ঠিক বুঝতে পারে শ্যামলের অভিসন্ধি। বলে, “একদম খারাপ কথা লিখবে না, কথা দাও।”

শ্যামল বলে, “তুমিও শুধু তোমার গাছেদের কথা জানতে চাইবে না। তারা ভাল আছে, বহাল তবিয়তে আছে।”

বেশ জমে উঠেছিল তাদের ডাইরি প্রেম। প্রথম দিন মধুরাকে হাসপাতালে রেখে আসতে কষ্ট হয়েছিল। আর আজ এই সুন্দর প্রেমপর্বের সমাপ্তির জন্য একটু ব্যথা আর কন্যাপ্রাপ্তির আনন্দে উত্ফুল্ল শ্যামল সারারাত ধরে তার এগারো মাসের দাম্পত্য কাটাছেঁড়া করে ভোরের হিমেল হাওয়ায় ঘুমিয়ে পড়ে।

সকাল হয় পাড়া-প্রতিবেশী আর বড়দার চিত্কারে। দরজা খুলে বাইরে এসে শোনে, কাল রাতে আঁকশি চোর এসেছিল। এই এক উত্পাত্ বেহালার প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলিতে। যেদিন যে পাড়ায় আঁকশি চোর ঢোকে, সেদিন লোকের আলনা আর দেওয়ালে টাঙানো জিনিসপত্র উধাও করে দেয়। পালেদের বাড়ির কর্তাগিন্নির বিছানা থেকে নিপুনভাবে মশারি সরিয়ে নিয়ে গিয়েছে ট্রানজিস্টার রেডিও।

বউদি বারবার চোরের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন, “দ্যাখো, গলার দু-ভরির হারটা ভাগ্যিস নেয়নি, যা নিপুণ হাত এই চোরের। হারটা আঁকশি দিয়ে টেনে নিলে আমি কি টের পেতাম, বলো?”

হঠাত্ই শ্যামলের বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত্ করে ওঠে, “আমার ঝোলাব্যাগ?” ব্যাগটাকে যথাস্থানে যথারীতি পাওয়া যায় না। হায়-হায় করে ওঠে শ্যামলের মন ডাইরিগুলোর জন্য।

বড়দা রাগ করে বলে, “চেচাস ক্যান পাগলের মতো। ভাল কইরা খুঁইজ্যা দ্যাক আরও দামি কিছু গ্যাছে কি না।”

শ্যামল বাড়ির এদিক-ওদিক বাগান-বারান্দা আনাচ-কানাচ খুঁজে বেড়ায় ডাইরিগুলোর জন্য। শ্যামলের অবস্থা দেখে বড়দা বলেন, আছিল কী তার ডাইরিগুলোর মইধ্যে? কোনও গুপ্তধনের সন্ধান নাকি?”

মধুরা ফিরে আসে হাসপাতাল থেকে। এসেই ছুট লাগায় বাগানে। ধীরেসুস্থে ডাইরি চুরি যাওয়ার কথা প্রকাশ করে শ্যামল।

মধুরা বলে, “আপদ গিয়েছে, যা-সব অসভ্য-অসভ্য কথা লিখেছিলে তুমি।”

দু-দিন বাদে আবার ঘুম ভাঙে বড়দার চেঁচামেচিতে। শ্যামল বাইরে এসে দ্যাখে, বড়দার হাতে অতিপরিচিত ডাইরিগুলো। কে-যেন রেখে গিয়েছে তাদের বারান্দায়। আনন্দে অধীর হয়ে ওঠে শ্যামল।

বড়দা বলে, “বেশ রসিক চোর কইতে হইব, চোরের এত রসবোধ জীবনে দেখি নাই।”

ডাইরিগুলো হাতে পেয়ে কেমন যেন উন্মনা হয়ে যায় মধুরা। লজ্জায় রাঙা হয়ে বলে, “এমা, ছি-ছি, বড়দা নিশ্চয়ই চোখ বুলিয়েছেন ডাইরিগুলোতে।”

“কখনই না, আমার দাদারা অমন লোকই নয়।” দৃঢ়তার সঙ্গে বলে শ্যামল।

তবু লজ্জায় থর থর কেঁপে ওঠে মধুরা। ভাদ্রের ভরানদীর মতো পরিপূর্ণ মধুরার শরীরে মাতৃত্বের অপরূপ প্রকাশ। শ্যামল মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে।

“ছি-ছি, কী সব বাজে কথা লিখেছিলে তুমি, চোরটাও নিশ্চয়ই পড়েছে। নইলে ফেরত দিল কেন?”

দু-হাতে শ্যামলের বুকের উপর ছোট ছোট কিল মারতে থাকে ও। দেওয়ালের হুক থেকে নতুন কেনা নীলরঙের জিনসের ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে যেতে-যেতে শ্যামল বলে, “কখনও শুনেছ, চোরেরা কালিদাস কিংবা রবীন্দ্রনাথ পড়ে?”

মধুরার সামনে হাঁ করে দাঁড়ায় বিরাট এক ভবিষ্যত্। নবজাতিকাকে মানুষ করে তোলার চিন্তা, আধ-বেকার আর পুরো বাউন্ডুলে স্বামী একটা নীল জিনসের ঝোলার মধ্যে যে তার প্রয়োজনের সবটুকু ঢুকিয়ে দিতে পারে, তার চিন্তা, আর অদৃশ্য চোরের দুটি গোপন চোখের চিন্তা। মনে হয়, আশেপাশেই কোথাও আছে। ঢুকে পড়েছে মধুরার শোবার ঘরে। দোকানে-বাজারে কিছু কিনতে গেলেও কেবল মনে হয়, হাসি হাসি মুখের দুটি চোখ তাকে কেবলই অনুসরণ করে চলেছে। নিশিকুটুম্বকে নিয়ে এ-বিষম জ্বালার কথা বুঝিয়ে বলতেও পারে না শ্যামলকে। কারণ তিন নারীকে আপন করে পাওয়ার সার্থকতায় শ্যামল আবার বাউন্ডুলে চিত্রকর আর পাগল নাট্যকর্মী বনে গিয়েছে।