ছোট গল্পঃ হাত বাড়ালেই বন্ধু

                   হাত বাড়ালেই বন্ধু

                                                                অনুপম কাঞ্জিলাল

সারাদিন থানা ও নিজস্ব সোর্স ধরে ধরে চেক করার পরেও বড় কোনও ক্রাইম কিংবা ইনসিডেন্টের খবর না মেলায় বেশ স্বস্তি বোধ করে অরিন্দম। এমনিতেই আজ সন্ধ্যের পর সে নিজেই অফিস থেকে কেটে পড়বে ঠিক করে রেখেছে। তার ওপর আবার আজ শনিবার হওয়ায় জুনিয়র বেশ কয়েকজন রিপোর্টার দীর্ঘ দু’মাস নির্বাচন পর্বে একটানা কাজ করে ছুটি পেয়েছে।

আজ বড় কোনও ঘটনা ঘটলে তাকেই যে কভারেজের জন্য ছুটতে হবে তা বেশ বুঝতে পেরেছিল অরিন্দম, তাই সকাল থেকেই মনে মনে চাইছিল যেন বড় কোনও ক্রাইম বা ইনসিডেন্ট না ঘটে। এখন বিকেল শেষ হয়ে আসছে, সল্টলেকের এসডিএফ বিল্ডিং-এর অফিস চত্বর ছেড়ে একটু রাস্তায় হেঁটে আসতে ইচ্ছা হল অরিন্দমের। এক সহকর্মীকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল রাস্তায়।

সল্টলেকের সেক্টর ফাইভের এই এলাকাটা কয়েক বছর আগেও অন্য রকম ছিল। তখনও অনেক ফাঁকা জায়গা ছিল এলাকা জুড়ে, এখন সর্বত্রই তৈরি হতে থাকা বিল্ডিং, এমন কি সীমানা ধরে যে ভেড়িগুলো এখনও থেকে গেছে তার পাড়গুলো ঢালাই করে তৈরি করা হয়েছে একাধিক ফুডপার্ক। এলাকাটাকে দেখতে এখন অনেক চৌখস হলেও সেই প্রথম এখানে এসে যে একরকম গ্রাম্য সজীবতার ছোঁয়া মিলত এখন তা আর মেলে না বলেই অরিন্দমের অনুভূতি। এখন এই এলাকার সর্বত্র কর্পোরেট নিয়মানুবর্তিতা। হয়তো সেই কর্পোরেট নিয়মের চাপেই এই এলাকায় এখন পড়ন্ত বিকেলে নিতান্ত আটপৌরে রীতিতে তৈরি হওয়া আলুর-চপ মুড়ি পাওয়া ক্রমশ দুষ্কর হয়ে উঠেছে।

এখন এখানে চিকেন মোমো, চাউ, স্যান্ডুইচের রমরমা, আলুর চপ পাওয়া গেলেও তা রীতিমিতো সফিসটিকেটেড ওয়েতে তৈরি হয়, সঙ্গে উনুন জ্বালিয়ে বড় কড়াইতে ফেলে একের পর এক আলুর চপ বেগুনি বানানোর সেই পরিচিত দৃশ্য এখানে এখন দেখাই যায় না। এখানেও সেই একই রাজনীতির খেলা অলক্ষ্যে চলছেই। রাজনীতির দাদা-দিদিদের মোটা অংকের ভেট দিয়ে ফুডপার্ক ও অফিস সংলগ্ন অঞ্চলের দখল নিয়েছে মাল-দার সব ব্যবসায়ীরা। হারিয়ে গিয়েছে পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে চপ বেচতে আসা সাধারণ গরিব ঘরের বৌ-ঝিরা।

-কী গো অরিন্দমদা, রাস্তায় পায়চারি করতে নিয়ে এসে এমন গম্ভীর মুখ করে কী ভাবতে শুরু করলে বল তো?

অরিন্দমের ভাবনার ঘোর ভাঙে, সহকর্মী সুজিতের প্রশ্নে। একটু লাজুক হেসে অরিন্দম বলে, আসলে কী জানিস, এই এসডিএফ বিল্ডিং থেকে আমাদের অফিস যখন শুরু হয়েছিল তখন থেকে এখন পর্যন্ত এখানকার পরিবেশের কী কী বদল হয়েছে, চারিদিকটা দেখে একবার বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করছিলাম। দেখতে দেখতে কতকিছু পাল্টে গেল।

অরিন্দমের কথার মধ্যেই সুজিত বলতে থাকে – হ্যাঁ তা তো অনেক কিছুই পাল্টে গেছে, আমি প্রথম এখানে এসে যা দেখেছি, তার সবকিছুই এখন পাল্টে গেছে, আর তাছাড়া ভাব না, এখন আমরা চব্বিশ ঘন্টার নিউজ চ্যানেলের খবর যে ফরম্যাটে করি, আগে কি তেমন হত!

-এটা তুই একেবারে ঠিক বলেছিস। এখন খবরের নামে সময় ভরাতে ঘন্টার পর ঘন্টা যে লাইভ আলোচনা চলে তার সঙ্গে খবরের যোগ কতটুকু?

-তবে তুমি একটা কথা ভাবো অরিন্দমদা, এই চ্যানেলগুলো চব্বিশ ঘন্টার হওয়ায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুকে কিন্তু তুলে আনার সুযোগ ছিল এবং সেগুলো খবরের দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, তবে সে দিকটা নিয়ে কেউ ভাবছে না, শুধুই সস্তা চটকদারি বিষয়ের মধ্যেই আটকে থাকতে চাইছে সবাই, খারাপ লাগে জানো!

-সত্যি বলছিস? সুজিতের দিকে একটু তাকিয়ে থেকে তীক্ষ্ণ স্বরে জানতে চায় অরিন্দম।

-মানে সত্যি বলব না কেন!- একটু ঘাবড়ে গিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করে সুজিত।

-না আসলে কি জানিস তোদের মতো যারা এখন সাংবাদিকতায় আসছে বিশেষ করে ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকতায়, তারা কেউই এসব নিয়ে ভাবে না, তাদের ক্যামেরা দিয়ে পাঠানো হয়, তারা ক্যামেরাম্যানকে বলে ছবি তোলে আর কার কার বাইট লাগবে জেনে নিয়ে সেগুলো নিয়ে আসে, ব্যাস তাদের সাংবাদিকতা সেখানেই শেষ। এরা কিছু জানতে চায় না, শিখতে চায় না, তাই তোর ভালো লাগাটা একটু ব্যতিক্রম। অরিন্দমের দিকে একটু তাকিয়ে সুজিত আবার বলে, তুমি শুধু জুনিয়ারদের আগ্রহহীনতাকে দায়ী করছ, কিন্তু ভাবো তো এই সময় কোনও একজন সাংবাদিকও কি আছেন, যে বা যারা দায়বদ্ধ সাংবাদিকতার দৃষ্টান্ত রাখতে পারছে, যাদের দেখে নতুনরা অনুপ্রেরণা পাবে, সাংবাদিকতার দায়বদ্ধতা অনুভব করবে।

সুজিতের কথায় একটু থমকে যায় অরিন্দম। মনে মনে ভাবে সুজিত খুব সঠিক জায়গাটাতেই ধরেছে, আজকের সাংবাদিকতায় যে মেরুদণ্ডহীনতা, যে শাসক আনুগত্য, যে ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গি সেই সামগ্রিক পরিসরটাকে এড়িয়ে শুধু নতুন প্রজন্মকে দায়ী করটা বোধহয় তাদের প্রতি কিছুটা অবিচারই।

অরিন্দমকে চুপ করে থাকতে দেখে সুজিত বলে-আমি কিন্তু সিনিয়রদের কোনও কটাক্ষ করতে চাইনি অরিন্দমদা, আমি শুধু বাস্তবটা বুঝতে চাইছিলাম।

না না, তুই এক্কেবারে ঠিক বলেছিস, আমি সেটাই ভাবছিলাম, আমার ব্যাপারটাই দেখ না, ক্রাইম ইনসিডেন্টের গভীরে যে নানামুখী ঘটনার অভিঘাত, আমার তো মনে হয় খবরের গুরুত্ব সেখানেই, অথচ সেখানে ঢোকার আগ্রহ নেই কারোর।

কথা বলতে বলতে বিরক্তি ফুটে ওঠে অরিন্দমের চোখে মুখে। একটু থেমে আবার বলতে থাকে, তুই জানিস এ রাজ্যের প্রত্যন্ত গ্রামের একটা ছেলে ঝাড়খণ্ডের জেলে পচছে গত আটমাস ধরে, তার একটাই অপরাধ, তার নামের সঙ্গে এক মাওবাদী নেতার নামের মিল আছে।

সে কী গো, সে ঝাড়খণ্ডে গেল কীভাবে? জানতে চায় সুজিত।

আসলে কাজ খুঁজতে এক বন্ধুর সঙ্গে ঝাড়খণ্ডে যায়, সেখানেই একদিন অপরিচিত মুখ বলে পুলিশের জেরার মুখে পড়ে নাম বলতেই পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে যায়, সে নাকি মাওবাদী নেতা, প্রায় ৫০টি ধারায় তার নামে কেস দেওয়া হয়েছে। পরিবারের খাওয়া জোটে না, সেই ছেলেটা নাকি রাষ্ট্রের পক্ষে বিপজ্জনক। ছেলেটার বাবা-মা এখানে-ওখানে ছুটে বেড়াচ্ছে কোথাও কোনও সুরাহা মিলছে না। এ রাজ্যের সরকারের কোনও হেলদোল নেই, একটা নিরপরাধ ছেলে শুধুমাত্র কোনও এক মাওবাদী নেতার নামের সঙ্গে নিজের নামের মিল থাকায় দিনের পর দিন জেল খাটছে। অথচ সংবাদমাধ্যম বিষয়টাকে গুরুত্ব দিতে রাজি নয়।

তোমার কাছে এ বিষয়ে যাবতীয় নথি আছে? সুজিত জানতে চায়।

শুধু নথি নয়, এ রাজ্যের পুলিশের বেশ কিছু আধিকারিক ব্যাপারটা মেনেও নিয়েছে, তারা জানিয়েছে আসল মাওবাদী নেতা যে ধরা পড়েননি, সে খবরও পুলিশ মহলে আছে।

তবু কিছু করা যাচ্ছে না?

না যাচ্ছে না, পাছে সত্যিটা ধরা পড়লে পুলিশের অপদার্থতা সামনে চলে আসে তাই। আমাদের চ্যানেলেও বার বার বলে খবরটা করানো গেল না। বড় বাবুদের ভয়, ওসব নিয়ে খবর করলে সমস্যা হতে পারে।

সমস্যা! কী সমস্যা! সুজিতের চোখে মুখে বিস্ময়।

সমস্যা সরকারি আনুগত্য লাভে, বিজ্ঞাপন পেতে সমস্যা, নানা সমস্যার কথা ভেবে এতবড় একটা সত্যি চেপে যেতে চাইছে সবাই। এর পরেও আমরা সংবাদ, সাংবাদিকতার দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারি কি? সত্যি কথা বলেছিস তুই সুজিত, আমরাই আসলে পরাজয়কে মেনে নিয়েছি, সাংবাদিকতা ন’টা-পাঁচটার কেরানির চাকরি বলেই প্রতিষ্ঠা করেছি, আমাদের কোনও নৈতিক অধিকারই নেই নতুনদের নিয়ে কোনও প্রশ্ন তোলার।

কথার শেষ দিকে অরিন্দমের গলায় যেন বিধ্বস্ত ভাব ফুটে ওঠে… বেশ কুন্ঠিত হয়ে পড়ে সুজিত। ভাবে আলোচনাটা এদিকে না টানলেই ভাল হত। পরিবেশটা হালকা করতে সুজিত বলে, আসলে তুমি একা কী-ই বা করতে পারো বলো, সামাজিক অবক্ষয়কে কী ব্যক্তিমানুষ প্রতিরোধ করতে পারে!

হ্যাঁ মেনেই তো নিচ্ছি, মেনে না নিলে কী এভাবে এতদিন চাকরি করে যেতে পারতাম। প্রসঙ্গ পাল্টে হঠাত্ অরিন্দম বলে, অনেক সমাজভাবনার কথা হল, মাথা ভারী হয়ে গেছে, এবার চা বল, চা খেয়ে আজ তাড়াতাড়ি কেটে পড়ার ইচ্ছা আছে।

অরিন্দম আর সুজিত এরপর চা নিয়ে নলবন ফুডপার্ক সংলগ্ন এলাকার এক বেঞ্চে বসে, আয়েস করে চায়ে চুমুক দিয়েছে, এমন সময় অরিন্দমের ফোন বেজে ওঠে – আরে তুমি কোথায়? চিফ রিপোর্টার সুজয়ের ফোন।

একটু চা খেতে বেরিয়েছি, কেন গো কী হল আবার? অরিন্দমের মনে অফিসে আটকে যাওয়ার আশঙ্কা।

তোমার একজন ভিজিটর এসেছেন, রিসেপসন থেকে তোমার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন ভদ্রলোক কী যেন… প্রশান্ত ভাদুড়ি নাম বলল, চলে এস তাড়াতাড়ি।

ফোন কেটে দিয়ে অরিন্দম ভাবে প্রশান্ত ভাদুড়ি মানে সেই লোকটা নিজের এলাকায় যাকে সবাই হাত বাড়ালেই বন্ধু বলে চেনে। এক অদ্ভুত মানুষ নানা বিষয়ে আগ্রহ।

এলাকার জলে আর্সেনিকের প্রকোপ, পুরকর্তারা খেয়াল করছেন না, ইনি বেরিয়ে পড়লেন জনসচেতনতা বাড়াতে। কোনও এক গরিব পরিবারকে উচ্ছেদ করে তাদের জমিতে প্রোমোটার থাবা বসাতে চাইছে, উনি মিডিয়াকে ডেকে নেতাদের কাছে, মন্ত্রীদের কাছে চিঠি লিখে জানাতে লাগলেন, এটা অন্যায়, এটা অবিচার।

এরকম একটা সমাজসেবার বিষয়কে ধরেই বেশ কয়েক বছর আগে ভদ্রলোকের সঙ্গে পরিচয় অরিন্দমের। দু-একটা খবর করেও দিয়েছে অরিন্দম। তবে ভদ্রলোক নানা বিষয়ে একের পর এক যোগাযোগ করতে থাকায় একসময় ওঁকে এড়িয়েই যেতে হয়েছে। সবচেয়ে সমস্যা ওঁকে বোঝানো যায় না, মিডিয়াতে বিশেষ করে ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে ভিস্যুয়াল ছাড়া খবর করা সমস্যা, প্রবন্ধ লেখার ঢঙে এখানে খবর হয় না। ভদ্রলোক বুঝতে চান না, তাঁর মতে, এ তো সামাজিক সমস্যা, মিডিয়া যদি সেই খবর তুলে না ধরে, তাহলে মানুষ কোথায় যাবে! মিডিয়ার ভেতরকার সমস্যা তো আর ওঁকে বলা যায় না। বেশ কয়েক মাস ফোন করেন নি ভদ্রলোক। আজ একেবারে অফিসে চলে এল! একটু তাড়াতাড়ি বেরোনোর আছে, অনিন্দিতাকে বলা আছে আজ একসঙ্গে বাইরে ডিনার সেরে ফিরবে। এখন এই ভদ্রলোক যদি কথা বলতে শুরু করেন তো আর শেষ হবার নয়। কীভাবে এঁকে তাড়াতাড়ি কাটিয়ে দেওয়া যায়, মনে মনে তা ভাবতে শুরু করল অরিন্দম। একটা বিরক্তির ভঙ্গি চোখে মুখে ফুটে উঠতে শুরু করল অরিন্দমের।

কী হল অরিন্দমদা ফোনে কোনও গুরুতর খবর এল নাকি, কথা বন্ধ হয়ে গম্ভীর হয়ে গেলে।

সুজিতের প্রশ্নে অরিন্দম বলে – না রে এক ভদ্রলোক দেখা করতে এসেছেন, চল যাই ঢুকে পড়ি।

অফিসে ঢোকার মুহূর্তে সুজিত বলে, তেমন মনে হলে তুমি আমাকে ভিড়িয়ে দিয়ে কেটে পড়তে পার, আমার এখন কোনও অ্যাসাইমেন্ট নেই। আমি তোমার হয়ে কিছুটা সময় আলাপ করে নেব না হয়।

এটা ভাল বলেছিস যদি বেশি সময় নেয়, তোকেই ভিড়িয়ে দিয়ে কেটে পড়ব, দেখা যাক কী বলে!

রিসেপসন টেবিলে বসে থাকা প্রশান্ত ভাদুড়িকে দেখে প্রথমটায় চিনতেই পারেনি অরিন্দম, একেবারে ভেঙে পড়া চেহারা, এক মুখ দাড়ি সঙ্গে ২৬-২৭ বছরের একটা মেয়েকে নিয়ে বসে থাকা বৃদ্ধ লোকটাই যে প্রশান্ত ভাদুড়ি, তা উনি নিজে না বললে বুঝতেই পারত না অরিন্দম।

নমস্কার অরিন্দমবাবু, আপনার জন্যই অপেক্ষা করছি, ভাল আছেন তো?

ভাল করে দেখে চিনতে পারে অরিন্দম, হ্যাঁ, কিন্তু আপনার চেহারা এত খারাপ হয়ে গেছে কেন?

ওই আর কী? বলে একটু ম্লান হেসে প্রশান্ত ভাদুড়ি অন্য প্রসঙ্গে ঢুকে পড়তে চান। পাশে বসা মেয়েটিকে দেখিয়ে বলেন, ওর নাম মালতি, ওর বর কয়েকমাস আগে একটা অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেছে, ওর বাড়ি বাগুইহাটির রঘুনাথপুরে, একটা ছোট্ট বাচ্চা নিয়ে থাকে। ওর জায়গাটার ওপর নজর পড়েছে স্থানীয় এক প্রোমোটারের। ওকে উঠে যেতে বলছে অথচ পাওনা দেবে না। ওদের অভিযোগ ওই জমির কোনও বৈধ কাগজপত্র নেই। আসলে জমিটা পুরনো, কাগজপত্র কার কাছে আছে ও জানে না, তবু যতটুকু সম্ভব জোগাড় করেছে, খোঁজ করছে যাবতীয় কাগজ কার কাছে আছে তাও, কিন্তু ওরা প্রতিদিন ভয় দেখাচ্ছে, শাসাচ্ছে। অসহায় একটা মেয়ে ছোট্ট বাচ্চা নিয়ে কোথায় যাবে। আপনারা যদি বিষয়টা একটু মিডিয়াতে আনেন। রীতিমতো আকুতি ঝরে পড়ে প্রশান্ত বাবুর গলায়। অরিন্দম বুঝতে পারে, জমির কাগজপত্র নেই অসহায় এক মহিলা, একেবারে সুযোগ বুঝে কোপ মারতে চাইছে জমি দালালরা। এতক্ষণে কথা বলে মেয়েটি, দাদা আমাকে বাঁচান, কোথায় যাব বলুন, কী করব?

অরিন্দম জানে এক্ষেত্রে জমি দালালরা সবচেয়ে আগে স্থানীয় থানাকে পয়সা দিয়ে কব্জা করে নেয়, তবু জিজ্ঞাসা করে, আপনি স্থানীয় থানায় জানিয়েছেন?

মেয়েটি কাঁদতে থাকে বলে, বারবার বলেছি ওরা কিছু করছে না। বলছে ঝামেলা না করে উঠে যেতে। কোথায় যাব বলুন দাদা?

তাত্ক্ষণিক কোনও উত্তর খুঁজে পায়না অরিন্দম, বুঝতে পারে মেয়েটিকে বড় কঠিন লড়াই লড়তে হবে। ক্ষমতাবানরা সব একদিকে, মেয়েটি অন্যদিকে। অরিন্দম তবু মেয়েটিকে সান্তনা দিতে বলে, ঠিক আছে আমি ওখানকার পুলিশের বড়বাবুদের সঙ্গে কথা বলব, আপনার নাম ঠিকানা সব রেখে যান।

প্রশান্ত ভাদুড়ি বলতে থাকেন, শুধু কথা বললেই হবে না, একদিন একটা ক্যামেরা আর রিপোর্টার পাঠিয়ে যদি একটু খবর করেন তাহলে বিষয়টা একটু নজরে আসে।

অরিন্দম বোঝাতে চায়, সে চেষ্টা করবে কিন্তু খবরের ক্ষেত্রে কার কোথায় কী কী যোগাযোগ আছে কেউ জানে না, এই সব প্রোমোটারদের সঙ্গে রাজনীতির দাদাদের যোগ, রাজনীতির দাদাদের সঙ্গে আবার চ্যানেলের বড়কর্তাদের যোগ, সবটাই তো ক্ষমতার খেলা। তবু সে চেষ্টা করবে, প্রতিশ্রুতি দেয় অরিন্দম।

প্রশান্তবাবু মেয়েটাকে উদ্দেশ্য করে বলে, শোন মালতি, এই দাদার ফোন নম্বর রেখে দিস উনি সাহায্য করবেন, আমি জানি উনি ভাল মানুষ চেষ্টা করবেন তোকে সাহায্য করতে।

লজ্জিত অরিন্দম বলে, না না ভাল মানুষ, খারাপ মানুষের বিষয় নয়, আসলে আমাদের ক্ষমতা তো খুব সীমিত।

অরিন্দমকে থামিয়ে প্রশান্তবাবু বলতে থাকেন, মিডিয়ার একটা দায়িত্ব আছে, সাংবাদিকদের কাজ আর পাঁচটা কাজের চেয়ে আলাদা। এখানে মানুষের জন্য কিছু করতে হয়, ভাবতে হয়।

অরিন্দম বলে, আপনি জানেন না, মিডিয়ার এখন অনেক দুর্বলতা। মিডিয়া চাইলেই সবকিছু করতে পারে না…

অরিন্দম আর কিছু বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু অরিন্দমকে থামিয়ে প্রশান্তবাবু বলে, আমি জানি সেসব, কিন্তু তবু যাবতীয় দুর্বলতা সত্ত্বেও আপনাদের মত কিছু মানুষ মিডিয়াতে আছেন, যারা একটু অন্যরকম করে ভাববেন কাজ করতে চেষ্টা করবেন, সবটা পারবেন না, কিছুটা পারবেন সেটাও অনেক।

অরিন্দমকে রীতিমতো অবাক করে দিয়ে প্রশান্ত ভাদুড়ি বলে যেতে থাকেন, আমি জানি অরিন্দমবাবু আপনি আমার দেওয়া খবরগুলো করতে পারবেন না বলে আমাকে মাঝে মধ্যে এড়িয়ে গেছেন, কিন্তু অনেকের মধ্যে আপনিও তো বেশ কিছু খবর করেও দিয়েছেন। আমার এলাকার ওই জলাজমিটা বেআইনিভাবে ভরাট হচ্ছিল, আপনি সেই খবরটা করায় সেটা আটকেছে। ওই যে নাগেরবাজার এলাকার বৃদ্ধা স্বামীর পেনশন পাচ্ছিলেন না, সেটাও আপনি খবর করার ঠিক হয়েছে। সব হয় না, কিছু হয়, তাই বা কম কী, বলুন।

প্রশান্ত ভাদুড়ির কথায় অরিন্দম যেন ভরসা পায়। মনে হয় তাহলে তার সাংবাদিকতার এখনও কিছু মানে আছে, একে বারে অর্থহীন চাকরি সে করছে না, কিছু সময় আগে সুজিতের সঙ্গে কথা বলতে বলতে মন যেরকম ভারি হয়ে উঠেছিল, এখন যেন কিছুটা হালকা লাগছে। মনে মনে প্রশান্তবাবুকে ধন্যবাদ দেয় অরিন্দম। মনে হয় সত্যিই লোকটা হাত বাড়ালেই বন্ধুর মতো। 

কৃতজ্ঞতার বশে অরিন্দম বলে, দেখব আমি দেখব কতটা কী করতে পারি!

প্রশান্তবাবু উঠে দাঁড়িয়ে অরিন্দমের হাত দুটো ধরে বলে, একটু দেখবেন মেয়েটাকে, বড় অসহায়, কেউ নেই ওর। তারপর গলা নামিয়ে বলতে থাকেন, এরপর আমিই তো আর থাকব না।

অরিন্দম বলে, কেন আপনি থাকবেন না কেন? আপনি তো হাত বাড়ালেই বন্ধু, সব সময় সবার সঙ্গে থাকেন, থাকবেন।

ম্লান হেসে হাতের কাগজপত্র গুছিয়ে নিয়ে প্রশান্তবাবু মেয়েটিকে বলে, চল্ এবার আমরা এগোই। মেয়েটিকে একটু এগিয়ে যেতে বলে প্রশান্তবাবু অরিন্দমকে বলে, চলি নমস্কার অরিন্দমবাবু। আমি হয়ত আর কোনওদিন আসব না, আসলে আপনার হেঁয়ালি মনে হতে পারে। তবে এটাই সত্যি, আমি মৃত্যুপথযাত্রী। প্যানক্রিয়াসে ক্যানসার, লাস্ট স্টেজ। দু’একদিনের মধ্যেই একটি সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়ে যাব। ডাক্তার জবাব দিয়ে দিয়েছে।ততক্ষণে ভদ্রলোক হাটতে শুরু করে দিয়েছে, অরিন্দমও তাঁর সাথে হেঁটে অফিস থেকে বেরিয়ে এসেছে। মেয়েটি কিছুটা আগে এগিয়ে গেছে। প্রশান্তবাবু তখনও বলে চলেছেন, বিশ্বাস হচ্ছে না, আসলে আমি এই তো চারপাশের ঘটনা নিয়ে, মি়ডিয়াকে খবর করতে ব্যস্ত হই, তা থেকে অনেকের ধারণা, আমি লোকটা প্রচারমুখী, টিভিতে মুখ দেখাতে খুব ভালবাসি, ওই যে আপনাদের ভাষায় ‘বাইট’ দেওয়ার খুব শখ, আসলে কিন্তু আমি মানুষের জন্য কিছু করতে চেয়েছি, তাদের পাশে থাকতে চেয়েছি। এই দেখুন অরিন্দমবাবু ডাক্তারের রিপোর্ট কিংবা আমার মৃত্যু পরোয়ানাও বলতে পারেন বলে একটা কাগজ অরিন্দমের সামনে খুলে ধরে প্রশান্ত ভাদুড়ি।

অরিন্দমের গোটা শরীর তখন অবশ হয়ে গেছে নিজের চোখকেও যেন বিশ্বাস হয় না, একটা মানুষ মৃত্যুর কয়েকদিনের তফাতে দাঁড়িয়ে অন্যের জন্য এমনটা করতে পারে। এই আজকের দিনেও। অরিন্দমের ভাবনার ঘোর কাটিয়ে প্রশান্তবাবু বলে ওঠেন, মালতিকে একটু দেখবেন আমার পরেও এমন মানুষ থাকবে পৃথিবীতে যারা অন্যের জন্য বাঁচে।

কথা বলতে বলতেই যেন মুহূর্তে অদৃশ্য হয়ে গেল প্রশান্ত ভাদুড়ি, অরিন্দম দেখে, হাঁটতে হাঁটতে সে রাস্তায় চলে এসেছে, সামনের একটা বাসে উঠে গেছেন প্রশান্তবাবু আর সেই মেয়েটা। বাসটা ক্রমেই চোখের আড়ালে চলে যাচ্ছে অরিন্দম হাত বাড়িয়েও আর বন্ধুর ছোঁয়া পায় না। এমন সময় মোবাইল বেজে ওঠে, অরিন্দম দেখে অনিন্দিতা, বলে, আসছি।

অনিন্দিতাকে দেওয়া কথা রেখে অফিস থেকে সময়মতো বেরিয়ে বাইরে একসঙ্গে ডিনার করলেও, অরিন্দমের চেতনা জুড়ে এখন শুধুই বন্ধু হারানোর আশঙ্কা, সেই আশঙ্কা থেকে অরিন্দম ভাবতে থাকে হাত বাড়ানোর বন্ধুর পর কি সত্যিই আর কেউ থাকবে যে অন্যের জন্য বাঁচবে।