ভাগ : কাজী ফয়জল নাসের

         
এই সময়টা প্রত্যেক বছর সাউথ সিটি সেজে ওঠে। দশ বছরের মানিক জানে ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার’-এর জন্যেই এত আলো, এত জাঁকজমক। সে জানে এই সময়টা অনেক অনেক রাত পর্যন্ত তাকে কাজ করতে হবে। কাজ মানে বাবুদের গাড়ির আশেপাশে ঘোরা, জামা-কাপড় ধরে টান দিয়ে একটু সহানুভূতি আদায় করে দু-দশ টাকা কামানো। কিন্তু সেখানেও প্রতিযোগিতার বাজার। তার মত আরও গোটা বারোজন এই এলাকায় ঘোরে। তার থেকে ছোটরাও যেমন আছে, তার থেকে বছর পাঁচেকের বড় পিন্টু আর জামিলও আছে। তবে পিন্টু বা জামিল শুধু ভিক্ষাই করে না, সুযোগ পেলে গাড়ির জানালা দিয়ে এটা ওটা টেনে নেওয়া, অনেক রাত্তিরে মদ্যপ বেহুঁশ কাউকে পেলে তার ঘড়ি, চেইন, পার্স বের করে নেওয়া, এইসব কাজেও হাত পাকিয়ে ফেলেছে।
 
আজ শীতটা বেশ জাঁকিয়ে নেমেছে। এই সন্ধ্যে রাত্তিরেই মানিকের থুতনির নিচেটা কাঁপতে শুরু করেছে। এই সময়েই একটা গাড়ি পার্কিং থেকে বেরিয়ে এসে দাঁড়াল। একটা বাচ্চা মেয়ে দুই হাত দিয়ে একটা তুলোর ভাল্লুক জাপটে ধরে গাড়িতে উঠে গেল। মানিক জানে, এগুলোকে বলে টেডি। সে বড়লোকদের আরও বেশ কিছু খেলনার নাম জানে। মোটা মোটা বাচ্চাগুলোর আহ্লাদি গলার আবদার শুনে শুনে অনেক কথাই শিখে নিয়েছে সে। হঠাৎ গাড়ির দরজা লাগানোর শব্দে সম্বিত ফিরে আসে তার। একলাফে গাড়ির কাছে গিয়ে জানালার কাঁচে হাত ঠুকতে থাকে। কোন ভ্রূক্ষেপ না করেই গাড়িটা পিক আপ তুলে বেরিয়ে গেল। আফসোশ করতে থাকে মানিক। ইস্, ওই টেডি দেখতে গিয়ে তার একটা খদ্দের গেল। সে সরে আসে রাস্তা থেকে। পিছন থেকে সিকিউরিটির লোকটা তাড়া দিতে আসে। সিগন্যালে আটকানো গাড়ির ফাঁক গলে উল্টোদিকের ফুটপাথে চলে যায় সে। নাহ্, টেডির থেকে অনেক বেশি দরকার একটু ওম। রাত বাড়তে থাকে। দু-একটা করে দোকানের শাটার ততক্ষণে নামতে শুরু করেছে।
 
মানিকের গায়ে একটা আধছেঁড়া সোয়েটার। লম্বায় প্রায় হাঁটু অব্দি নেমে এসেছে। পরনে একটা নীল রঙা ইস্কুলের প্যান্ট। মা যে বাড়িতে কাজে যায়, তাদের ছেলের প্যান্ট। কদিন আগে ই.ডি.এফ.-এর সামনের রাস্তায় নীলুর সাথে রেস করতে গিয়ে পড়ে গিয়ে হাঁটুর কাছটা ছিঁড়েছে। বেশ খানিকটা নুনছালও উঠে গেছিল, কিন্তু রক্ত বেরনোর জ্বালার থেকেও প্যান্ট ছিঁড়ে যাওয়ায় তার বেশি জ্বালা করছিল। বড়লোক বাড়ির ছেলেদের ইস্কুলের প্যান্টগুলো, বাদ দেওয়া হলেও বেশ নতুন থাকে। মা অবশ্য এখনও দেখেনি। দেখলে কি বলবে কে জানে।
 
মায়ের কথায় মনে পড়ল এবার বাড়ি যাওয়া দরকার। এই শীতকালটা সে ঘরের মেঝেতে শুতে পায়। তক্তপোষে মায়ের পাশে মাঝে মাঝে শোওয়ার ইচ্ছে হলেও উপায় নেই। বছরখানেক আগে একবার রাতে ঘুমের ঘোরে চৌকিতে উঠে মাকে জড়িয়ে শুতে গিয়েছিল। ঘুম ভেঙেছিল কানা শম্ভুর এক লাথি খেয়ে। ঘরের কোনায় ছিটকে গিয়েছিল ছোট্ট শরীরটা। ব্যথায় ককিয়ে উঠেছিল সে। প্রায় দম বন্ধ হয়ে এসেছিল। মা এসে বুকে জাপটে ধরায় মায়ের পিঠে-মাথায় বেহিসেবি কিল-চড় এসে পড়ছিল, সঙ্গে অকথ্য ভাষায় খিস্তি। মানিক সেদিন প্রথম তার বাপের চেহারাটা মনে মনে ভাবার চেষ্টা করেছিল।
 
বাপ যখন মারা যায়, তখনও তার জ্ঞান সেভাবে হয়নি। শুধু মনে পড়ে, তার বাপ তাকে কোলে করে ঢাকুরিয়া ব্রীজের নীচে নিয়ে যেত গরম জিলিপি খাওয়াতে। বাপের চেহারা ভালো মনে পড়ে না। কিন্তু বাপের আদরটুকু মনে পরে। বাপকে হারালেও মায়ের কাছে বেশ কয়েক বছর সে বাপের অভাব টের পায়নি। কিন্তু যেদিন প্রথম মা এই কানা শম্ভুকে ঘরে নিয়ে আসে, আর বলে যে এবার থেকে সে তাদের সাথেই থাকবে, সেদিন থেকেই যেন মানিকের জীবন কোথাও থেমে গেছে। এই রুটিন চক্রে অভ্যস্ত হয়ে ওঠার শুরু সেদিন থেকেই।
 
হাত দুটোকে দুই বগলে চেপে ধরে বাড়ির পথে পা বাড়ায় মানিক। যত ঠান্ডা তার নাক আর কানে এসে আছড়ে পড়ে। গাল হাঁ করলে ধোঁয়া বের হতে থাকে। এই সময় তার কাঁধে হাত রাখে জামিল “খেয়েছিস কিছু?”
 
এই জামিলকে খুব ভাল লাগে মানিকের। কদিন আগে বাড়ি বাড়ি ঘুরে কোত্থেকে এই জ্যাকেটটা জোগাড় করেছে। মাঝে মাঝে দু-পা ফাঁক করে দাঁড়িয়ে যখন জ্যাকেটের চেইনটা টেনে নামায় আর বন্ধ করে, সালমান খানের কথা মনে পড়ে মানিকের। সেকথা সে জামিলকে বলেওছে আগে। জামিল নিজেও সেটা উপভোগ করে।
 
“নাহ্…খাইনি কিছু। দেখি বাড়ি গিয়ে” উত্তর দেয় মানিক।
– “এতক্ষণে তো কানা গাণ্ডুটা ফিরে এসেছে। সে থাকলে তোর মা তোকে থোরাই খেতে দিতে পারবে?”
– “কি জানি…দেখি গিয়ে”।
– “থাক আজ ঘরে যেতে হবে না। আমার সাথে চ’। আজ ভালো কামাই হয়েছে। আমার সাথেই খেয়ে নিবি চ’। তারপর দুজনে মিলে স্টেশানের প্লাটফর্মে শুয়ে পড়ব”।
 
মানিকের মুখচোখ ঝলমল করে উঠল। হঠাৎ যেন পেটের মধ্যে খিদের মোচড় টের পেল। জামিল তাকে মাঝে মধ্যেই এরকম খাওয়ায়। আর লেক গার্ডেন্স প্লাটফর্মে খোকাদার চায়ের দোকানে জামিলের কাঁথা আর বস্তা রাখা আছে। আগেও বেশ কয়েকবার জামিলের সাথে রাত কাটিয়েছে সে। ঘরের চার দেয়ালে আঁটা মেঝের চেয়েও তার চারদিক খোলা প্লাটফর্মে শুতে অনেক আনন্দ।
দুজনে হাঁটতে হাঁটতে প্রায় লর্ডস-এর মোড়ের কাছে চলে এসেছে। ইতিমধ্যে পিন্টুকেও জুটিয়ে নিয়েছে জামিল। গলফ-গ্রীনের রাস্তায় ঢোকার মুখে অনেকগুলো দোকান। জামিল রুটি আর তড়কা খাওয়ালো। খিদের চোটে ওইটুকু পেটেও মানিক চারটে রুটি চালান করে দিল। জামিল ওর খাওয়া দেখছিল আর পিন্টুর দিকে চেয়ে মিট মিট করে হাসছিল। খেয়ে দেয়ে দুজনে হাঁটা লাগাল স্টেশানের দিকে আর পিন্টু চলে গেল সেলিমপুরের দিকে। মানিকদের বস্তিতেই থাকে সে।
 
প্লাস্টিকের বস্তার থেকে চটের বস্তায় শুলে বেশ ওম ধরে, সেটা জামিলের সাথে শুয়ে আগেও উপলব্ধি করেছে। আর দুজনে একটাই কাঁথার তলায় শুলে জামিলকে আরও নিজের বলে মনে হয় তার। ক্লান্ত মানিক জামিলের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা শুনতে শুনতে কখন যেন ঘুমে ঢলে যায়, জামিলও টের পায়না। যখন বুঝতে পারে, বোকার মত নিজের মনে অল্প হেসে মানিককে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়ে সেও।
 
ঘুম ভাঙে খোকাদার ডাকে। এখানে ঘুমনোর এই এক মুস্কিল। ফার্স্ট ট্রেন বজবজের দিকে যাবে চারটের একটু আগে। তারও আগে খোকাদা দোকান গোছাতে লাগে। ফার্স্ট ট্রেনের বেশ কিছু বাঁধা খরিদ্দার চা খাবে তার কাছে। উঠে পড়ে দুজনেই। বস্তাগুলো আর কাঁথাটা পাট করে গুছিয়ে ঢুকিয়ে দেয় খোকাদার চা-স্টলের নীচে। খোকাদা স্টোভ জ্বালালে দুজনেই তাদের ছোট ছোট হাতের তালুগুলো মেলে ধরে সামান্য উত্তাপের জন্যে। চারিদিক এখনও অন্ধকার। ঘন কুয়াশার চাদরে ঢেকে আছে রেললাইন আর তার ওপাশের রবীন্দ্র সরোবর। মাঝে মাঝে মানিক হাতদুটোকে নাকের ওপর চেপে ধরে। হাতে হাল্কা কেরোসিনের গন্ধ টের পায়। এমন সময় হঠাৎ প্লাটফর্মের বাইরে লেভেল-ক্রসিং-এর দিক থেকে কে যেন জামিলের নাম ধরে চেঁচিয়ে ওঠে। “পিন্টুর গলা না” – আপন মনে বিড়বিড় করে ওঠে জামিল। “কি রে…” বলে চিৎকার করে ওঠে সেও। প্লাটফর্মে শরীর কুঁকড়ে শুয়ে থাকা দুটো কুকুরও আচমকা এই চিৎকার শুনে গলা ছেড়ে ডেকে ওঠে। মুহূর্তে প্লাটফর্ম চত্বর যেন জেগে ওঠে। এরই মধ্যে বালিগঞ্জের দিক থেকে বজবজ লোকাল এসে পড়ে। ট্রেনের আলো পিছনে রেখে পিন্টু ছুটে আসে প্লাটফর্মের ওপর দিয়ে। সঙ্গে চিৎকার করতে থাকে, “আবে মানকে…তোর কানা শম্ভু শালা মরে গেছে”।
 
যোধপুরের ফুটে একজন ক্যালেন্ডার বিক্রি করে। দেয়ালে টাঙানো একটা ক্যালেন্ডারে সে দেখেছে একজন দাড়িওয়ালা লোকের ছবি, মাথার পিছেনে গোল আলো ছিটকে বেরোচ্ছে। লোকটার নাম নাকি যীশু। মানিক তাকিয়ে দেখল, পিন্টুর মুখটা কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। তার মাথার পিছন দিয়ে ফার্স্ট বজবজ লোকালের আলো ঠিকরে বেরোচ্ছে। দূর থেকে ছুটে আসা পিন্টুকে তখন তার যীশু বলেই মনে হচ্ছিল।
 
পিন্টুর কাছে জানতে পারল, কাল রাতে যাদবপুরের দিক থেকে মাল খেয়ে বাড়ি ফেরার পথে ট্রাকের তলায় চাপা পড়েছিল কানা শম্ভু। ঠেকের লোকজন চিনতে পেরে বাড়ি এসে খবর দেয়। পুলিশ লাশ নিয়ে গেছে।
 
তিনজনে মিলে রেললাইন ধরে হাঁটতে থাকে। কুয়াশার চাদর আস্তে আস্তে সরে যাচ্ছে। ভোরের আলোয় শিশির ভেজা পাথরের মধ্যে দিয়ে রেললাইন গুলো চকচক করছে। আর মানিক মনে মনে ভাবতে থাকে, আজ থেকে তার মা আবার তার একার, একেবারেই নিজস্ব।