ছোট গল্পঃ প্রথম দুঃখ- স্বপ্না সেনগুপ্ত

                                

ছোড়দা ও-পাড়া থেকে না খেলেই ফিরে এলো। তখনও সূর্য ডোবেনি। ওর ফিরে আসার মধ্যে একটা অস্থিরতা ছিল। গোস্বামীদের মাঠ থেকে আমিও এর পিছন-পিছন বাড়ি ফিরে এলাম। ঘরে গিয়ে দেখি, ও মার কাছে দাঁড়িয়ে অঝোরে কাঁদছে আর বলছে, “হিজরাপাড়ায় কেন এলে বলো মা, ও-পাড়ার ছেলেরা আমায় বলেছে তোকে খেলতে নেব না, তুই হিজরাপাড়ায় থাকিস। এ-পাড়া থেকে ফিরে চলো মা, আমরা আবার পুপাদের বাড়িতে চলে যাই।” মা  অসহায়ের মত চুপ করে বসে ছিল।

এ-পাড়ায় আসা থেকেই নানা গণ্ডগোল শুরু হয়েছে। কিন্তু এ-পাড়া, এ-বাড়ি আমার বেশ ভালো লাগে। পুপাদের বাড়িটা ছিল কেমন খাঁচার মতো। ওই খাঁচা টুকুর মধ্যেই সব-পায়খানা, বাথরুম, দুটো শোওয়ার ঘর, বারান্দা, রান্নাঘর। উপরে পুপারা নীচে আমরা। ওরা আমাদের বাড়িওয়ালা। আমার বাবা মানুষটা ছিলেন ভারি অদ্ভুত। কারণে-অকারণে চাকরী ছেড়ে আমার মাকে দুঃখের সমুদ্রে ভাসাতেন। পুপাদের বাড়িতে যখন ছিলাম, বাবা তখন আসামের দিকে কোনও চা-বাগানে কাজ করত। বেশ স্বচ্ছল অবস্থা আমাদের। কাকা তখন সদ্য বিয়ে করেছে। বাবা চাকরি ছাড়ল। কাকার পক্ষে বিয়াল্লিশ টাকায় বাড়িভাড়া চালানো সম্ভব ছিল না বলে আমরা এ-পাড়ায় এলাম। এখানে দুটো ঘর, আঠাশ টাকা ভাড়া-বাথরুম, পায়খানা বাড়িওয়ালাদের সঙ্গে। পুপাদের বাড়ি আর দু-নম্বর বস্তির এই বাড়ির মাঝে শুধু গোস্বামীদের মাঠ। তবু আমরা এখানে এসে ছোটলোক হিসাবে চিহ্নিত হয়ে গেলাম। ও-পাড়ার কেউ আমাদের বাড়ি বিশেষ আসে না। আমার কাকিমা খুবই বুদ্ধিমতী আর চাপা। এ-বাড়ি থেকে চলে যাওয়ার জন্য কাকার উপরে চাপ সৃষ্টি করছে, কিন্তু বাইরের আচরণে তার কোনও প্রকাশ নেই। কাকা ঘর দেখে এল জন্মেজয় রোডে। বেড়ার বাড়ি, মেঝে পাকা, দশটাকা ভাড়া। মা এ-বাড়ি ছেড়ে যেতে রাজি হল না। কাকিমাকে নিয়ে কাকা চলে গেল। আমাদের সংসারের জিনিস ভাগ হয়ে গেল, মা ফিরেও দেখল না। কেবল কাঁদল। দু-তিনদিন মুখে কোনও খাবার তুলতে পারল না।তারপর কাকা-কাকিমার ব্যাপারে মোহমুক্ত হয়ে বেনেদাদুর বটবৃক্ষের ছায়ায় আমাদের নিয়ে সংসার পাতল।

ভাগ্যিস মা জন্মেজয় রোডের বাড়ি যেতে রাজি হয়নি, আমি ওখানে গেলে ভয়েই মরে যেতাম। জন্মেজয় রোডের ওপারে আইডি হসপিটাল। রাস্তার উপর পার্শিবাগানের ভুতেদের আড্ডাখানা, আর, কে না জানে জন্মেজয় রোড যেখানে খালের ধারে মিশেছে তার ওপারে হাড়কল। বাচ্চাদের হাড় দিয়ে সেখানে চিরুনি তৈরি হয়। ছোট বাচ্চা পেলেই ওরা ধরে নিয়ে গিয়ে খাঁচায় বন্দি করে রাখে। আমি কিছুতেই ভাবতে পারি না, কাকিমা এত সুন্দর বাড়ি ছেড়ে ওখানে চলে গেল কেন?  সন্ধ্যে হলেও সেখানে শেয়াল ডাকে!

আমাদের দু-নম্বর বাড়িটা বেশ সুন্দর। বেশ দুর্গোর মতো দেখতে। এ-পাড়ায় এই বাড়িটা সবচেয়ে সুন্দর দেখতে। রাস্তা থেকে চারসিঁড়ি উপরে বাড়ির ভিত। এ-পাড়ায় সকলের কলই রাস্তার ধারে। জল তো আসে সেই টালা ট্যাঙ্ক থেকে, তাই উচু ভিতের বাড়িতে জল উঠতে চায় না। আমাদের বাড়ির ভিতরে বাথরুম-পায়খানায় জলের লাইন আছে, কিন্তু জল ওই পর্যন্ত পৌছয় না। তাই বেনেদাদুর বাড়ি রাস্তা থেকে চার-সিঁড়ি উপরে উঠে আর সেই সিঁড়ির ডানধারে গর্ত কেটে চার-সিঁড়ি পাতালে নেমে আমাদের স্নানের জায়গা। বেনেদাদুর বাড়িতে অনেক লোক, তাই আমাদের এই পাতাল-স্নানঘরে এক বিশাল চৌবাচ্চা করা ছিল। বাড়ির লোকের স্নানের জল ওই চৌবাচ্চায় ধরা থাকত। আর-একটা কল ছিল ওই স্নানঘরের ভিতর, সেখান থেকে রান্না-খাওয়ার জল নেওয়া হত। কলের নর্দমা মাটির তলা দিয়ে গিয়ে মিশেছে পুকুরের সঙ্গে। বর্ষাকালে যখন পুকুর টইটুম্বর হয়ে যেত, তখন আমাদের বাথরুমের মেঝেতে তৈরি হত একটা ছোট্ট পুকুর। আবার জল নেমে গেলেই সুন্দর শান-বাঁধানো কলঘর। এ-পাড়ার সকলের কলই রাস্তার ধারে গর্ত কেটে নীচে নামানো।সঙ্গতি অনুসারে কার বাঁধানো কারও কাঁচা। কিন্তু আমাদের মত পাতাল স্নানঘর কারও নেই। বিশাল একটা উঠোনের চারিদিক ঘিরে শোয়ার ঘর আর রান্নাঘর।পায়খানা ছিল বাড়ির একদম পিছন দিকে। সেখানে বেশ-খানিকটা বাগান মত ছিল। দুটো শিউলিগাছ, টগর, বেল, কলাবতীফুল, পেয়ারা আর কুলগাছ। কচুগাছ ছিল অনেক গুলো, তার গোড়ায় বাড়ির সব ছাই জমা করা হত। আমাদের বাড়ির পশ্চিমপাড়ে দুই-মানুষ-সমান উচু পাঁচিল। সেই পাঁচিল ভেদ করে হিজরাদের চিত্কার ভেসে আসত মাঝে মাঝে। অবিশ্রান্ত গালাগাল করত ওরা। কথাগুলি খারাপ এটা বুঝতাম, কিন্তু মানে বুঝতাম না।

গোস্বামীদের মাঠ থেকে ফিরে যেতে খুকু বলল, “কীরে, তোর দাদা ও-পাড়ায় খেলতে গেল না।” ও হাসছিল বিচ্ছিরি করে। আমি বললাম, “নারে, আমরা তো এখন হিজরাপাড়ায় চলে এসেছি।” খুকু আমার থেকে একটু বড়, জানে অনেক বেশি। কিন্তু, সব বলতে চায় না। বলে, তুই বুঝবি না। কিন্তু, আজ আমি ওকে চেপে ধরলাম, “হাসছিস কেন?” ও বলল, “কে তোকে বলেছে এটা হিজরাপাড়া?” আমি বললাম, “সবাই বলে। ও-পাড়ার কেউ এখন আমাদের সঙ্গে মেশে না।” তারপর খুকু যে-কথাটা বলল, সেটা আমি সুবাসীর বাড়ির ঢেউ খেলানো টিনে লেখা আছে দেখেছি। কিন্তু মানেটা বুঝতে পারিনি। আজ বুঝলাম, এ-পাড়ায় যে-মেয়েরা থাকে তাদের বলে খারাপমেয়ে। তাদের কাজ হল বাবু বসানো। খুকু বলল, “এরা সব হল খারাপ মেয়ে। আর আমাদের এই বাড়িগুলো হল গৃহস্থবাড়ি। ওদের সব বাড়িতে সন্ধ্যে হলে খারাপ লোক আসে।”

আমি বললাম, “ওরা কী খারাপ কাজ করে?” খুকু বলল, “ওরা বাবু বসায়।” ব্যাপারটা পরিষ্কার হতে সময় লেগেছিল। আমি নিজের মত করে জেনেছিলাম। ওরা পয়সা নিয়ে অন্য লোকের সঙ্গে বড়-বউ খেলে। ওদের বেশ্যা বলে।

ধীরে ধীরে আমরা এ পাড়ায় অভ্যস্ত হয়ে গেলাম। আমাদের বাড়ির পাশে মহারানির বাড়িটা সন্দেশওয়ালারা কিনে নিল। আমাদের সমস্যা অনেক কমে গেল। আমাদের পাড়ায় আর মাত্র দুটো খারাপ বাড়ি রইল। তারা একদম পাড়ার বাইরের দিকে। একটা সুবাসীর আর অন্যটা চারুর।

অভাবের তাড়নায় আমাদের সংসার ধীরে ধীরে ছোট হতে লাগল। আমার উপরের দুই দিদিকে নিয়ে গেল মামারা। সঙ্গীহারা হয়ে আমি খুব কাঁদলাম বেনেদাদুর বড় উঠোনে গড়িয়ে-গড়িয়ে। আমার ছোটপিসি আমায় খুব ভালবাসত। নিঃসন্তান সেই পিসির কাছে আমাকে পাঠিয়ে দেওয়ার ইচ্ছা ছিল মায়ের। কিন্তু, পিসেমশাই পরের ঝামেলা কাঁধে নিতে রাজি হচ্ছিল না। পিসি আমাদের বাড়িতে এলেই মা বলত, “টুলুগো, তোমারে মিনতি করি, শ্বেতাটারে তুমি লইয়্যা যাও। সারাদিন বস্তির মধ্যে ঘুইরা বেড়ায়, আমি প্যাট ভইরা খাইতে দিতে পারি না। ভদ্রলোকের মাইয়া বইল্যা চিনন যায় না।”

আমার এপাড়া ছেড়ে চলে যাওয়ার ইচ্ছা এতটুকুও নেই। একটা বড় পুকুরের আধখানা জুড়ে এপাড়া। পুকুরের অপরপাড়াটা গিয়ে পড়েছে খালধারের রাস্তায়। ওদিকে বসতি নেই, কেবল কারখানা। দুপুরবেলা মা ঘুমিয়ে পড়লে আমি বেরিয়ে পড়ি। এখানে বাধা-নিষেধ একেবারে নেই। দুপুরবেলা কোনও বাড়ির দরজা বন্ধ হয় না। রাতের বেলাও কেউ কেউ খুলে রাখে। কোনও বাড়িতেই পড়াশোনার পাট বিশেষ ছিল বলে মনে পড়ে না। স্কুলে যেতে হয় তাই যাওয়া। সব বাড়িতে আলাদা আলাদা গন্ধ আর আলাদা ব্যস্ততা ও গুঞ্জন। ঠিক যেন মৌমাছির চাক। বিরাট কিংবা সরু একফালি উঠোনকে ঘিরে মানুষের বসতি। পুরুষমানুষরা কেউ মিস্ত্রি, কেউ চায়ের দোকান চালায়, কেউ বিড়ির দোকান চালায়, কল সারাই করে, মাছ, আলু অথবা চালের কারবার করে। বউদের পরিচয়ও সেই হিসাবে আলুওলার বউ, বিড়িওয়ালার বউ, দর্জির বউ, কলওয়ালার বউ। দুপুরবেলা মহিলাদের মধ্যে নানা ব্যস্ততা। সকলেই কোনও না কোনও শিল্পের সঙ্গে জড়িত। কেউ কাঠের ফ্রেমে দেশলাই-কাঠি সাজায়, কেউ গুলি তৈরি করে, কেউ দেশলাই কিংবা কাগজের বাক্স বানায়, কেউ ঠোঙা তৈরি করে।

আমাদের পাড়ায় যে-দুটো খারাপ বাড়ি ছিল, তাদের খাবার তৈরি হত গলির মোড়ে নান্টুর দোকানে। একটা অলিখিত বিধিনিষেধ ছিল বোধহয়, যে জন্য সাধারণ গৃহস্থরা নান্টুর দোকান থেকে চা কিংবা ডালপুরি কিনত না। পরে অবশ্য সে-নিষেধ অনেক শিথিল হয়ে গিয়েছিল।

চারু আর সুবাসীর বাড়ির মাঝখানে ছোট মাঠের মতো একটু জায়গা, সেখানে গর্ত করে ওদের জন্য কল করা ছিল। পাড়ার কেউ সেই কল থেকে জল নিতে যেত না। ওরাও কখনও আমাদের পাড়ার ভিতরে জল নিতে আসত না। পুকুরেও ওদের বাড়িদুটোর জন্য আলাদা ঘাট বাঁধানো ছিল। ওদের ঘাটের পাশেই ছিল বেনেদাদুর ঘাট। কিন্তু, আমাদের বাড়ির কেউ পুকুরে যেত না।

এই ঘাটেই আমি প্রথম দেখি আনারকলিকে। আনারকলি এই অঞ্চলের বিস্ময়। এত রূপ সহজে চোখে পড়ে না। ছিপছিপে গড়ন, একমাথা লম্বা কালো চুল। দারুণ ফর্সা গায়ের রং। যখন সেজেগুজে বেরিয়ে যেত হাতে বটুয়া নিয়ে, তখন ওকে বড়জোর একটা কলেজের মেয়ের মতো দেখাত। পিছনে ওর লম্বা বিনুনি দুলত, আমি অবাক হয়ে ওর চলার দিকে তাকিয়ে থাকতাম। আমার ভাললাগার একজন ছিল আনারকলি। কিন্তু ওদের সঙ্গে কথা বলা বারণ ছিল। খেলতে খেলতে কেউ কখনও ওদের বাড়িতে ঢুকে পড়লেই অন্যরা চেঁচাত, না ভাই, হবে না, হবে না। ও চারুর বাড়িতে ঢুকেছে। আশ্চর্য, আমাদের মায়ের চেয়ে বয়েসে বড় একজনকে নাম ধরে বলতাম অক্লেশে। কী সুন্দর শাড়ি পরত চারু! সাদা রং-এর দারুণ সুন্দর চওড়া-পাড়। দেখতে এবং মেজাজে একটু জমিদারি ভাব। ওদের বাবুরা সব এ-অঞ্চলের জমিদার। একদিন চোর চোর খেলার সময় কার তাড়া খেয়ে আমি চারুর বাড়ি ঢুকে পড়েছি- ওমা, দেখি, চারু শুধুমাত্র দু-খানা গামছা পরে উঠোন ধোয়াচ্ছে। শনিবার চারু পুজো করত। ওদের বাড়ির বাইরে একটা তুলসিমঞ্চ ছিল, ওখানে চারু রোজ প্রদীপ জ্বালাত, শাঁখ বাজাত সন্ধ্যেবেলা- আর শনিবার সন্ধ্যেবেলা বারের পুজো হত, অন্যদের মত বাতাসা দিয়ে নয়, গুজিয়া দিয়ে। শনিবার বিকেলে খেলার পর আমরা সবাই ভিড় করতাম চারুর বাড়ির তুলসিমঞ্চের সামনে। পুজো হলে চারুর দেয়া প্রসাদ খেয়ে বাড়ি ফিরতাম পুকুরের জলে হাত-পা ধুয়ে। কেউ কোনওদিন বকেনি তার জন্য। বোধহয় প্রসাদে কেনও দোষ হয় না। ওখানেই একদিন আনারকলি আমায় আদর করল, মাথায় হাত বুলিয়ে আলতোভাবে জড়িয়ে ধরে। কেমন একটা লাগছিল, বুঝতে পারিনি, বেশ্যা-মেয়ে ছুয়ে দিলে দোষ হয় কিনা। বলি-বলি করেও কথাটা মাকে বলতে পারিনি।

আমাদের পাড়ায় মা-মাসিদের আড্ডায় আনারকলিকে নিয়ে খুব আলোচনা হত। এ-পাড়ার কোনও মহিলা ঘড়ি পরা বা রেডিও বাজানোর কথা ভাবতেই পারে না। একমাত্র আনারকলির ও-দুটোই ছিল। আনারকলির সেজেগুজে বেরিয়ে যাওয়ার রাস্তাটা আমাদের পাড়ার ভিতর দিয়েই একটু আড়াল করা ছিল। সে কারণে পাড়ার মহিলাদের ঘড়ি দেখানোর জন্য আনারকলি নাকি একদিন স্নান করতে এসেছিল ঘড়িসুদ্ধ হাত উপরে তুলে ডুব দিয়ে স্নান করেছিল। এ-ঘটনা আমার নিজের চোখে দেখা নয়। কিন্তু আনারকলির ঘড়ি আমি দেখেছি, সোনালি-চেন-দিয়ে-বাঁধা এক পরম বিস্ময়।

আমার দারুণ কৌতুহল ছিল বাড়িদুটো নিয়ে। চারুর বাড়ির পাকা দেওয়াল, কিন্তু টালির চাল। আর সুবাসীর টিনের বাড়ি, সামনে বেশ খানিকটা ফাঁকা জায়গা। উঠোনের পশ্চিম কোনোয় একটা মহানিমগাছ, তার ছায়া পড়ত সুবাসীর বাড়ির চালে। সবচেয়ে অবাক লাগত এদের পুরুষ সঙ্গীদের দেখে। শিক্ষিত সম্ভ্রান্ত সুদর্শন চেহারা, অথচ এদের নিয়ে পড়ে থাকে। পুকুরে পশ্চিমপাড়ে চারু আর সুবাসীর বাড়ি আর পূবপাড়ে গোস্বামীদের তিনতলা বিরাট বাড়ি। ওরা এই অঞ্চলের বড়লোক ছিল একসময়। বাড়ি সেই সাক্ষ্য বহন করে। সন্ধ্যাদিদিমণি ওই বাড়ির বউ- গরিব ছেলেমেয়েদের জন্য স্কুল খুলেছিল বাড়িতে। অত বড় বাড়িতে থেকেও সন্ধ্যাদিদিমণি নিজে খুবই গরিব। সারাদিন স্কুল চালান আর বাকি সময়টুকু ঘুরে ঘুরে অল্প টাকার টিউশনি করে। আর সন্ধ্যাদিদিমণির স্বামী সুবাসীর কাছে পড়ে থাকে দিনরাত। সন্ধ্যাদিদিমণি মাথা নিচু করে চুলে সূক্ষ্ম সিঁদুরের রেখা নিয়ে আমাদের পুকুরপাড় দিয়ে হেঁটে চলে যান-আমি নিশ্চিত জানি, ওঁর স্বামী তখন সুবাসীর বাড়ির বিছানায় শুয়ে আছে। সন্ধ্যাদিদিমণি কি সুবাসীর কাছে হোরে? কিন্তু, আনারকলির কোনো পুরুষসঙ্গীকে কেউ কোনওদিন দ্যাখেনি। সবাই বলত, আনারকলি বড়-বড় হোটেলে ভাড়া খাটে।

এ পাড়ায় সব বাড়িতেই দুপুরবেলা মেয়েরা ব্যস্ত থাকে নানাধরণের কুটিরশিল্প নিয়ে। তারই মধ্যে একটু আড়াল-আবডাল তৈরি করে আমাদের ছোটদের ছিল পুতুলখেলা আর যাত্রা করার আসর। খুকুদের বাড়িতে কয়েকজন উড়িষ্যাবাসী শ্রমিক থাকত। তারা সকালবেলায় দরজায় তালা লাগিয়ে কাজে চলে যেত। দুপুরবেলা তাদের ফাঁকা বারান্দা ছিল আমাদের খেলার জায়গা। যাত্রার আসর এক একদিন খুব জমে যেত। আমি কোনওদিন যাত্রা দেখিনি, কারণ ভদ্রলোকের মেয়েরা নাকি যাত্রার আসরে যায় না, কিন্তু ওদের থেকে শুনে শুনে আমার অনেককিছু মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল।

যে দিন খেলার সঙ্গী কাউকে পেতাম না, সে-দিন বেনেদাদুর বাড়ির রকে বসে পুতুল খেলতাম একা-একা। এইরকম একটা দিনে আনারকলি আমায় ডাকল। চুপি-চুপি। আমি একটু অবাক হয়ে আমার পুতুল বাক্স হাস্নুহানাগাছের নীচে লুকিয়ে রেখে পায়ে পায়ে চারিদিক দেখে শুনশান দুপুরে সুবাসীর বাড়ির মহানিমগাছকে সাক্ষী রেখে একদৌড়ে ঢুকে গেলাম চারুর বাড়িতে। আনারকলি আমার দুটো হাত ধরে নিয়ে বসাল ওর ঘরের জানালায়। আমাদের এপাড়ায় সবচেয়ে সুন্দর বাড়ি হল বেনেদাদুর আর চারুর। কিন্তু চারুর বাড়ি আমাদের বাড়ি থেকে অনেক বেশি ঝকঝকে-তকতকে। দরজা সমান জানালা দিয়ে পুকুরের টলটলে জল আর দক্ষিণের বাগানের ফুলের সমারোহ আনারকলির ঘরকে দান করেছে স্বর্গীয় সৌন্দর্য। ওদের বাড়ির একফালি বাগান আমাদের পাড়ার গর্বের বস্তু। সারা পাড়া থেকে দেখা যেত বাগানটা, কিন্তু পুকুর দিয়ে পরিখা কাটা বলে কেউ একটা ফুলও চুরি করতে পারত না। গ্রীষ্মকালে সারাবাগান জুড়ে ফুটত খালি বেলফুল। সারা পাড়া সুবাসিত হয়ে উঠত। সত্যিকারের একটা মল্লিকাবন। আমি জানালা দিয়ে দেখছিলাম পুকুরের জল।

আমার মুগ্ধতাকে ছিন্ন করে আনারকলি প্রশ্ন করল, “রাগ করলে তোমায় ডাকলাম বলে?” আমি বললাম, “তোমাদের বাড়িতে ঢুকেছি জানলে মা মারবে।” আনারকলি আমার হাতে দুটো লজেন্স দিল। দুধের স্বাদে-ভরপুর এই লজেন্স আমাদের ভাগ্যে খুব কমই জোটে। আনারকলির ঘরে উঁচু করে পাতা পালঙ্ক। ধবধবে সাদা বিছানা। ঝালর দেওয়া, এমব্রয়ডারি-করা ঢাকা-পরানো বালিশ-বিছানা যেন সাজিয়ে রাখার জিনিস। একপাশে সুতো-দিয়ে-বোনা দারুণ সুন্দর একটা হাতপাখা। ঘরের দেওয়ালে একটা বাঁধানো ছবি, একটা মেয়ে স্নান করে ফিরছে। তার পরনে একটা সাদাশাড়ি, আর সেই ভেজাশাড়ি ভেদ করে মেয়েটির কমলালেবুর মত গায়ের রঙের অনেকটাই দেখা যাচ্ছে। আর একটা মূর্তি চিনামাটির, সিন্দুকের উপর রাখা। একটি মেয়ে তার বসন খুলছে না পরছে বুঝতে পারিনি। আনারকলি জিজ্ঞেস করল, “তোমার নাম কী?” আমি বললাম, “শ্বেতা”- বলেই একছুটে পালিয়ে এলাম বাড়িতে।

শুরু হল আমার গোপন জীবন। দুপুরে মা ঘুমোলে সারা পাড়া বেরিয়ে বেড়ানো। নামই হয়ে গেল পাড়া-টুলানি মেয়ে। পুতুলখেলা, যাত্রা-যাত্রাখেলা আর মাঝে মাঝে আনারকলির ডাক। সমস্যায় পড়েছিলাম ওর দেওয়া উপহারগুলো নিয়ে। ও দিয়েছিল চুলের ফিতে, রঙিন ক্লিপ, আর একটা টিনের খেলনা-এক সৈনিক বসে আছে চাকা-লাগানো কামানোর উপর। পিছনটা চেপে দিলেই কামান চলতে শুরু করে। কামানটা ছিল আনারকলির মতই আমার গোপন সঙ্গী। কাউকে দেখাইনি। লুকিয়েছিলাম কয়লার ড্রামের পিছনে।

এমন সময় একদিন পিসি আর পিসেমশাই এলো আমাদের বাড়িতে। পিশেমশাই বদলি হয়েছে হরিপালে। নতুন জায়গায় পিসির একাকিত্ব কাটাতে আমাকে যেতে হবে সেখানে। একছুটে বেরিয়ে গেলাম, সারা পাড়ায় বন্ধুদের জানিয়ে এলাম, বেড়াতে যাচ্ছি হরিপাল, অনেক দূর। সেই প্রথম ট্রেনে চড়া। হাওড়া স্টেশন দেখা। কেমন করে হরিপালে এসে পৌঁছলাম, সে এক স্বপ্ন। ভোর হতে-না-হতেই এক নতুন স্বর্গ আমায় হাতছানি দিয়ে ডাকল। এত সুন্দর পৃথিবী, এত সবুজের সমারোহ। গাছে গাছে পাখির ডাক আর ছায়াঘেরা সুন্দর সুন্দর বাড়ি।

এ গ্রামের মেয়ে ঊর্মিলা আর বন্দনা আলাপ করতে এল আমার সঙ্গে। ওরা আমায় এত ভালবেসেছিল, যেন আমি একটা বিশেষ কেউ। পিসির অনুমতি নিয়ে ওদের সঙ্গে গেলাম ওদের স্কুল দেখতে। পিচ-বাঁধানো রাস্তা দিয়ে অনেক দূর গিয়ে ওদের স্কুল। দু-ধারে ঘন গাছগাছালি, পাখির ডাক। ঊর্মিলা বলল, আর দু-দিন বাদে চড়কের মেলা। তোমায় নিয়ে যাব মেলায়। বিকেলবেলায় পিসির সঙ্গে গেলাম পিসিদের বাড়ির কাছেই একটা বাড়িতে। সে-বাড়ির মেয়ের নাম মুন্নি। আমরা যখন গেলাম, তখন মুন্নি বারান্দায় দড়ির দোলনায় দুলছিল। কে-একজন বউ মতো আমায় দেখে বলল, “ওমা, এ যে মুন্নির যমজ বোন গো!” তখন ওদের বাড়ির সবাই আমাকে আর মুন্নিকে পাশাপাশি দাঁড় করিয়ে দেখল, অনেকটাই আমার মত দেখতে। মুন্নি কিন্তু আমার সঙ্গে ভাব করতে চাইল না। ওদের বাড়ির উঠোনে একটা ছোট আমগাছে অজস্র আম ধরেছে। আর বাগানে অনেক ফুলগাছ। ওটা মুন্নির মামার বাড়ি। মুন্নির বাবা হাসপাতালে আর মা কলকাতায় চাকরি করে। আমি মুন্নির মামাদের বাগানে একা-একা ঘুরে বেড়ালাম। তখন সন্ধ্যে হয়ে এল।

চড়কের দিন বিকালে ঊর্মিলা আর বন্দনা এল আমায় মেলায় নিয়ে যাওয়ার জন্য, কিন্তু পিসি যেতে দিল না। ওরা চলে গেল ওই দূরের রাস্তা দিয়ে ওদের কাজের লোকের সঙ্গে।

বিকেল থেকেই এ-গ্রাম আমার কাছে মিথ্যে হতে শুরু করল। কলকাতায় নিজের পাড়ায় আমি কত নিরাপদ ছিলাম, বুঝতে শুরু করলাম। প্রাইমারি স্কুলের মাঠে গাজনের সন্যাসীদের লম্ফঝম্ফের জন্য মাচা বাঁধা শুরু হয়েছে। আমি কলকাতায় এ-সব জিনিস কখনও দেখিনি, তাই আমার উত্সাহের অন্ত ছিল না। স্কুলের বারান্দায় পিসি গ্রামের সব মহিলাদের সঙ্গে বসে ছিল, অন্যদিকে পুরুষমানুষ আর মাঝারিগোছের ছেলেরা। আমরা ছোট ছেলেমেয়েরা খেলছিলাম। কয়েকটা বদছেলে আমাদের খুব বিরক্ত করছিল। আমি বড় ছেলেদের কাছে নালিশ করতে গিয়েছি, “দ্যাখো না দাদা, ওরা আমাদের খেলতে দিচ্ছে না।” একটা ছেলেকে আমি মুন্নিদের বাড়িতে দেখেছি, বোধহয় মুন্নির মামা, আমার শরীরের যে-অংশে মাতৃত্বের চিহ্ন প্রকাশ পাবে, সেখানে হাত দিয়ে বলল, “তোমার এ জায়গায় কী উঠবে গো?” আমার শরীর তখন সবে জানান দিচ্ছে যে আমি মেয়ে। এমন অপমানের কথা আমি ভাবতেই পারি না। এ-গ্রাম একমুহূর্তে আমার কাছে মিথ্যে হয়ে গেল। আমাদের পাড়ায় এ-রকম বেয়াদপি কেউ করলে তাকে বিজয়দা লাইটপোস্টের সঙ্গে বেঁধে পেটায়। এরা এরকম অদ্ভুত আচরণ কেন করল। অন্য ছেলেগুলো হি-হি করে হাসল। আমি ফিরে এসে পিসির পিছনে চুপ করে বসে পড়লাম। মন বলছিল এ-পাড়ায় নালিশ করা যাবে না। অনেক রাতে পিসির সঙ্গে বাড়ি ফিরলাম। কেমন হয়েছিল চড়ক, মনে নেই। বাড়ির জন্য মায়ের জন্য আমার সমস্ত মন হু হু করে উঠল।

পরদিন ভোরবেলা ফুলের সাজি হাতে মুন্নিদের বাড়িতে গেছি ফুল তুলতে। হঠাত্ দেখি আনারকলি আসছে উঠোন দিয়ে। হলুদ-কালো ডুরে-শাড়ি মায়ের মত করে পরা। কপালে সিঁন্দুর। আমার চিনতে একটুও ভুল হয়নি। আমি আহ্লাদে আটখানা হয়ে ফুলের সাজি রেখে আনারকলিকে জড়িয়ে ধরে বললাম, “আনারকলি, তুমি এখানে?” কে জানে কেন ওদের বাড়িসুদ্ধ সবাই ভীষণ রেগে গিয়ে আমায় দুর-দুর করে তেড়ে এল। ভয়ে একছুটে বাড়ি ফিরে এলাম। একটু বেলায় আনারকলির মেয়ে পুকুরঘাটে দাঁড়িয়ে চিত্কার করে বলে গেল আমি নাকি ঝিয়ের মেয়ে। মুন্নির দিদা এসে পিসিকে ফিসফিস করে কী-সব বলে গেল। পিসি বলল, “শুভ্রাকে আনারকলি বললি কেন।” আমি বললাম, “ওকে আনারকলির মত দেখতে তাই” পিসি বলল, “তোকে ভূতে পেয়েছে নাকি! ও কলকাতায় অফিসে কাজ করে।” আমি চুপ করে রইলাম। বুঝতে পারলাম, ভুল করেছি ভয়ানক, নিতান্তই অজান্তে শিশুমনের সরলতায় সাপের লেজে পা দেওয়ার মত আমি আনারকলির অন্নসংস্থানে হস্তক্ষেপ করেছিলাম। তাই ক্রুদ্ধ সর্পিনীর দৃষ্টি আনারকলির চোখ থেকে মুছে নিল স্নেহ।

বিকেলবেলা ঊর্মিলা আর বন্দনা এল। বলল, “কাল মেলা থেকে ফিরতে অনেক রাত হয়ে গেল। দ্যাখো, তোমার জন্য পুতুল এনেছি মেলা থেকে। একটা লাল পোড়ামাটির পুতুল।” এতক্ষণ বাদে আমার দু-চোখের জল আর বাধা মানল না। ঊর্মিলা বলল, “তুমি মুন্নির কথায় কিছু মনে করো না, ও খুব বাজে মেয়ে। সবার সঙ্গে ঝগড়া করে বেড়ায়।”

আমি পিসির বুকে মাথা গুঁজে দিয়ে বলে উঠলাম, “পিসি আমি মায়ের কাছে যাব, আমাকে মার কাছে নিয়ে চলো।”

পরদিন সকালে গ্রাম ছেড়ে চলে যাওয়ার সময় মনে মনে আনারকলিকে বললাম, আনারকলি তুমি শুধু শুধু আমার উপর রাগ করলে, আমি কিন্তু কাউকে বলিনি, তুমি বাবু বসাও!