গল্পঃ উদ্বাস্তু–অনুপম কা়ঞ্জিলাল

একটানা বেশ কয়েক ঘন্টা পরীক্ষার খাতা দেখতে দেখতে রমেশের মাথাটা টিপটিপ করতে থাকে,একটা বিরক্তিও যেন জমতে থাকে  মনের ভতরে। বাংলা অনার্সের ছাত্র-ছাত্রী সব অথচ পরীক্ষার খতায় লেখার কি ছিরি। সাহিত্য বিষয়ে বোধ গভীরতা দুরে  থাক  সামান্য আগ্রহটুকুও যেন  উধাও,যেন একের পর এক কিছ শব্দ সাজিয়ে বসিয়ে দিতে পারলেই হল। আজকের প্রজন্মের ছন্ন ছারা দশাটাই যেন  পরীক্ষার খতায় ফুটে উঠতে দেখে রমেশ। কিন্তু পরক্ষণেই আবার ভাবে এভাবে কী একটা গোটা প্রজন্মকে অপরাধের কাঠগড়ায়  দাঁড় করিয়ে দেওয়াটা ঠিক,তারাই বা কী দিতে পেরেছে রাখতে পেরেছে আজকের প্রজন্মের জন্য। চারদিকে বিশ্বাসহীনতা আর  স্বপ্নহীনতার  মধ্যেই তো আজকের প্রজন্মের পথ চলা তাই ওদের দোষ দিয়েই বা কী লাভ। ভাবতে গিয়ে রমেশের ভেতরটা ভারি হয়ে ওঠে। তখনই খতা গুটিয়ে রেখে বাইরে একটু পায়চারী করে আসার জন্য সিগারেটের প্যাকেট আর লাইটারটা নিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে  দাঁড়ায় রমেশ।। উঠে দাঁড়ানো মাত্রই বড় দেওয়াল ঘড়িটায় চোখ আটকে যায় রাত ১১টা বাজতে চললপ্রায়, উঠে যেতে যেতে  পাশের টেবিলে পরাশোনায় ব্যস্ত মেয়েকে লক্ষ্য করে বলতে থাকে -কী রে মিলি তোর মা কী রাতে আমাদের না খাইয়ে রাখবে বলে  ঠিক করেছে ।সঙ্গে সঙ্গে পাশের ঘর থেকে রমলার তেতে ওঠা গলা শোনা গেল- হ্যাঁ,একটা দিন না খেয়ে থাকলে এটুকু অন্তত বুঝবে যে একটা লোকের পক্ষে সংসারের যাবতীয় ঝক্কি সামলানো সম্ভব নয়। বাপরে সেই সকাল থেকে শুরু হয়,মেয়ের কলেজ যাওয়া ওনার কলেজ যাওয়া,এটা সেটা আর পারি না বাপু। বলতে বলতে রমলা একেবারে রমেশের মুখোমুখি এসে দাঁড়ায়। –কেন রামুর মা তো আছে,সে তো তোমাকে সাহায্য করবে বলেই,রমেশ কথা শেষ করার আগেই রমলা তাকে থামিয়ে দেয়।-থাক তার কথা আর বলো না,উনি তো কাজের লোক নয়,একেবারে উদ্ভিদ বিশেষজ্ঞ।এ বাড়িতে তাকে আনা হয়েছে যেন গাছের পরিচর্যার জন্য।শুধু অমুক গাছটাকতদিনে ফল দেবে,তমুক গাছটার বয়স কত হল, কোন গাছটাতে সকালে লা জল দিতে হয়,কোনটাতে সন্ধ্যের আগে তাই নিয়ে ব্যস্ত।তারপর রাত হতেই শরীর জুরে ক্লান্তি,দাওয়ার এক কোণে ঘুমিয়ে পড়ে।দেখনা গিয়ে কেমন অসাড় হয়ে ঘুমোচ্ছে। এখন রমলাকে এ বিষয়ে কিছু বলতে গেলে সে আর তেতে উঠবে বুঝে রমেশ পাশ কাটিয়ে বারান্দার দিকে যেতে যেতে বলল-মিলি তুই বরং এখন খাবার দিতে মাকে একটু সাহায্য কর,আমি সিগারেট টেনে মাথাটা একটু হালকা করে আসি, তারপর দেখছি কি ভাবে তোর মাকে এই একা একা সব ঝক্কি বহন থেকে মুক্তি দেওয়া যায়।কিন্তু রমলা এই কথায় আর তেতেওঠে-হয়েছে খুব হয়েছে আমার জন্য আর দরদ না দেখালেও চলবে,সমস্যা যখন আমার তখন তার সমাধানের কথাও আমিই ভাবব।বলতে বলতে নিজের কাজে মন দেয় রমলা। বারান্দা থেকে সিগারেট টানতে টানতে রমেশ সিঁড়ি বেয়ে ছাদে উঠে আসে,রাজারহাট নিউটাউনের এই জায়গাটাতে এখনও অনেক ফাঁকা জমি পড়ে আছে,জমির চেহারা দেখলেই বোঝা যায় এক সময় এখানে চাষ হত। এখন সেই জমির উপরই কংক্রিটের জঙ্গল তৈরির আয়োজন চলছে।দিগন্ত বিস্ত্রৃত ফাঁকা চাষের জমির দিকে নির্মীয়মান কংক্রিটের জঙ্গলের ক্রমশ এগিয়ে আসা দেখতে দেখতে রমেশের মনে হয় শহর যেন হাত পা ছড়িয়ে গ্রামকে ক্রমেই গ্রাস করে নিচ্ছে।। এক সময় কারা যেন গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরার রাজনৈতিক শ্লোগান তুনেছিল,বাস্তবে হচ্ছে ঠিক তার উল্টো।শহরের দখলদারিতে হারিয়ে যাচ্ছে  গ্রাম,পালাচ্ছে গ্রামের মানুষ। কোথায় পালাচ্ছে, পালিয়ে কেমন থাকছে,এসবের কোন হিসেব না দিয়েই উন্নয়নের গল্প শোনানো হচ্ছে,শুনছেও সবাই। রমেশ ভবার চেষ্টা করে এরকম উন্নয়নের শরিক সে নিজেও কী নয়। রাজারহাট নিউটাউনের প্রাণ কেন্দ্রে এই যে কয়েক কাঠা জমির উপর তার বাড়ি,কে বলতে পারে এই জমিও কোন গ্রামের মানুষের কাছ থেকে কেড়ে নোওয়া জমি নয়।কোন আবাসনে না থেকে এই ফাঁকা জমি পেতে বাড়তি খরচ করলেও,এটা কোনদিন কারোর বসত ছিল না এমন নিশ্চয়তা কে দিতে পারে ।একরকম ভার মন নিয়েই নিচে নামে রমেশ। রাতে খাবার টেবিলে বসে রমেশ প্রস্তাব দেয় —আচ্ছা আর একটা কাজের লোক নিলেই তো হয় ।–আর রামুর মায়ের কি হবে ,রমলা জানতে চায়।-না রামুর মাও থাকুক,আর একজন  না হয় ভারী কাজগুলো করে দিল।-আচ্ছা তার মানে রামুর মাকে গাছ গবেষনার জন্য পুরো সময় দেওয়া গেল,এই না হলে বিবেকবাণ অধ্যাপক,রমলার গলায় শ্লেষ। রমেশ শান্তভাবে বলে ,রামুর মাকে তুমি কিন্তু প্রথমে রাখার জন্য ব্যস্ত হয়েছিলে,আমি বরং বলেছিলাম ওনার যা বয়স পারবে কিনা তুমি কিন্তু তখন আমার কোন কথাই শুনতে চাওনি।এখন হটাত করে না বলে দেওয়াটা মোটেও ভাল দেখায় না।–সে তখন এখানে প্রথম এসেছি,কাজের লোক পাব কিনা জানতাম না তাই ও যখন যেচে কাজ করতে চাইলো আমি আর ফেরাই নি,তাছাড়া তখন কি জানতাম ও বাড়ির চেয়ে গাছের দিকেই বেশি নজর দেবে।। একটানা কথাগুলো বলে রমলা একটু নিচু স্বরে বলতে থাকে ,টাকা আমাদের এতো বেশি হয় নি যে একসঙ্গে দুটো কাজের লোক রাখব। ওর  বিষয়টা আমিই ভাববো,তুমি শুধু তোমার বিবেকের রাশটা একটু টেনে রেখ।।রমেশ গম্ভীর হয়ে বলে না না এমন কিছু করো না যাতে মানুষটা কষ্ট পায়,এমনিতেই এখন আমরা মানুষকে সুখ দিতে পারি না যণ্ত্রনা দেওয়াটা বাড়াবাড়ি। রমলা জানে এখন এটা নিয়ে কথা না বাড়ানই ভাল রমেশকে সে তো এই বিবাহিত জীবলের ২৫টা বছর ধরে সে দেখছে,কোথায় যেন একটা হাহাকার বয়ে বেড়ায় মানুষটা।কাউকে কষ্ট পেতে দেখলে নিজের ভতরের হাহাকারটাই যেন শুনতে পায়।রমলা পরিবেশটা হালকা করতে বলে -কোন চিন্তা নেই তোমার আমি রামুর মা কে বুঝিয়ে সুজিয়েই সব করবো।রমেশ বলে -তাহলেই ভাল।রমেশ বলে-তাহলেই ভাল। রাতের বিছানায় শুয়ে শুয়ে রমেশ কেবলই ভাবতে থাকে রামুর মায়ের অদ্ভুত আচরণের কথা।মনে আছে বছর দুই আগে এখানে বাড়ি করে তারা যখন প্রথম এসেছিল ,রামুর মা কে মাঝে মধ্যেই তাদের বাড়ির আশেপাশে ঘোরাঘুরি করতে দেখতো। একদিন রমলাই ডেকে ঘরে নিয়ে আসে তাকে,রামুর মা নিজেই বলেছিল,এ বাড়িতে সে কাজ করতে চায়,একটা কাজের খোঁজেই সে এখানে মাঝে মধ্যেই আসে। রমলার তখন  আল্হাদ আর ধরে না,নতুন জায়গায় এসে এমনিতেই কাজের লোক পাওয়ার সমস্যা,তার উপর কে কত মাসোয়ারা চাইবে তা নিয়েও রমলার যথেষ্ট দুশ্চিন্তা কাজ করতো,তাই রামুর মা যখন মাস মাইনে নিয়ে যা মনে হয় দেবেন বলে জনায় রমলা তখন ওকে কাজে নিতে একেবারে ব্যস্ত হয়ে পরে।রমেশের অবশ্য রামুর মায়ের বয়স দেখে মনে হয়েছিল,ওঁর পক্ষে কি সণ্ভব,তবে রমলা কোন আপত্তি শুনতে চায় নি।তবে রামুর মায়ের একটা প্রস্তাবে রমলাও একটু থমকে গেছিল,রামুর মায়ের প্রস্তাব ছিল রাজার হাট ছাড়িয়ে অনেকটা দুরে মহিষবাথান নামে একটা জায়গয় যেখানে রামুর মায়ের ছেলে বৌ এর সংসার সেখানে সে রোজ যাবে না,সপ্তাহে এক আধদিন যাবে,বাকি দিন গুলোতে তাকে এ বাড়িতেই থাকতে দিতে হবে।এই প্রস্তাবে রমলা থমকে গেলেও রমেশ বলেছিল এই বয়সে ওঁর পক্ষে রোজ যাতায়াত করা সম্ভবই নয়,তাই ওঁকে রাখতে চাইলে থাকার ব্যবস্থা করতে হবে। এর পর থেকে রামুর মা এখানেই থাকে।মাঝে মধ্যে বাড়িতে যায় আবার ফিরে আসে।কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্যের ঘরের কাজের চেয়ে রামুর মায়ের গাছের দিকেই লক্ষ বেশি।। এমন কী কোন গাছটার কত বয়স তাও মাঝে মধ্যে বলে দেয়। কোন কোন সময় রমেশ জানতে চেয়েছে কী করে জনলে যে গাছটার এত বয়স।রামুর মা অদ্ভুদ হাসি ঠোঁটের কোণে ফুটিয়ে জবাব দিয়েছে-ওদের সঙ্গে যে আমার নাড়ীর যোগ গো দাদাবলাবু।অবাক লেগেছে রমেশের,রামুর মা কে কেমন যেন এক রহস্য ময় চরিত্র বলে মনে হয়েছে তার। অবশ্য এটা সত্যিই যে রমেশ এখানে বাড়ি করার আগে থেকেই গাছগুলো আছে,দরকার না হওয়ায় গাছগুলো কাটে নি তারা,বরং গাছগাছালিতে ঘেরা থাকায় বাড়িটার আলাদা একটা সৌন্দর্যরএসেছে।রমলাকেও খুব একটা দোষ দিতে পারে না রমেশ,বিয়ের পর বাবা মা বেঁচে থাকাকালীন সময়ে চার ভাইয়ের একান্নবর্তী পরিবারে রমলাও তো কম খাটেনি,এখন না হয় সবাই আলাদা আলাদা বাড়ি করে রয়েছে।তা ছাড়ি ইদানিং হাঁটুর ব্যথাটাও ওকে বেশ ভোগাচ্ছে,ভাল করে হাঁটতেই পারে না।তবে সব কিছু ছাপিয়ে রামুর মায়ের জন্য একটা আশঙ্কা রমেশের বুকের মধ্যে ঘোরাফেরা করতে থাকে।সেই আশঙ্কা নিয়েই একসময় ঘুমিয়ে পড়ে রমেশ। বেশ কিছুদিন রামুর মা প্রসঙ্গে আর কোন কথা তোলেনি রমলা,মনে মনে স্বস্তি পায় রমেশ,ভাবে যক ব্যপার তা হলে কিছু দিনের জন্য হলেও মিটেছে।কলেজ থেকে ফিরে আজ বেশ হাল্কা মেজাজে সন্ধের তারা গুনতে গুনতে ছাদে এসে বসে রমেশ।চাদ থেকে চারপাশের দৃশ্য দেখতে দেখতে কেমন যেন ঘোর লাগা দশা হয় তার।,রমেশ দেখেছে এই একা ুএকা ছাদে এসে বসলেই সাত পাঁচ ভাবনা তার মাথায় চেপে বসতে চায়।আসলে রাজারহাট নিউটাউনের এই জায়গাটা থেকেই যেন গ্রামের হেরে যাওয়াটা বেশী করে চোখে পড়ে,উদ্বাস্তু মানুলষের ছবি ভেসে ওঠে চোখের সামনে।একদল মানুষের জীবন যাপন কে তছনছ করে দেওয়ার বিনিময়ে অর্জিত উন্নয়নের চেহারাটা ভেতরে ভেতরে আঘাত করতে থাকে রমেশকে।কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের মানবিক সংবেদনশীল হওয়ার পরামর্শ দেওয়াটাও কেমন যেন মেকি বানানো বলে মনে হয় তার। রমেশ ভাবতে থাকে তার মেয়ে মিলি কী কোনদিন ভাববে এই রাজারহাট থেকে কত মানুষ উচ্ছেদ হয়ে গেল,খোথায় হারিয়ে গেল তারা তা নিয়ে কী মিলিরা কোনদিন চিন্তা করবে।আজকের প্রজন্ম শুধু উন্ন.নের গল্প শুনবে,উন্নয়নের অন্ধকারে ওদের চোখ কোনদিন পড়বে  না। ওরা জানতেই পারবে না উদ্বস্তু হওয়ার যন্ত্রনা। ভাবতে ভাবতে রমেশের গোটা চেতনা ছেয়ে যায় বিষাদে।এমন সময় রামর মা চা নিয়ে ছাদে আসে,চায়ের কাপটা রামুর মেয়ের হাত থেকে নিয়ে রমেশ তার কাছেই জানতে চায় -আচ্ছা এই সব এলাকাতে এতযে মানুষ থাকতো তারা সব কোথায় গেল তুমি বলতে পার।–হারিয়ে গেছে গো দাদাবাবু চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেছে তাদের আর কোনদিন খুঁজে পাওয়া যাবে ন। ঐ যে বড় বড় বিল্ডিংগুলো দেখছো ও গুলো এক একটা রাক্ষস ওগুলো গিলে খেয়েছে মানুষকে,কত মানুষ যে হারিয়ে গেছে তার হিসেব কেউ জানে না।–রামুর মা তখন এক অন্য মানুষ তার গলায় এক অদ্ভুদ রহস্য। রামুর মা কে থামিয়ে রমশ বলে –ঠিক আছে তুমি এখন গিয়ে একটু বৌদি কে সাহায্য কর।রামুর মা একটু চুপ থেকে গম্ভীর গলায় বলে একটা কথা ছিল দাদাবাবু। –বেশ তো বল না। –রামুর মা বলতে থাকে,-বৌদিমণি বলছিল তোমাদের সংসারে নাকি টাকা পয়সার খুব টানাটানি যাচ্ছে,দাদাবাবু আমার মাইনে নিয়ে তোমাদের ভাবতে হবে না,যখন পারবে তখন দেবে বঝলে।এই বয়সে টাকা দিয়ে আমি কিইবা করবো। অবাক হয়ে রমশ জানতে চায় তোমাকে তোমার মাইনে নিয়ে বৌদি কিছু বলেছে,–হাঁ বলছিল তো রামুর মা এ মাসে টাকাটা একটু কমিয়ে দেবো সংসারের অবস্থা…রামুর মাকে কথা শেষ করতে না দিয়ে রমেশ বলে -ঠিক আছে তুমি যাও।রমেশ বুঝতে পারে রামুর মা কে বাতিল করার এটাই তবে টোটকা রমলার।। নিজের ভেতরে আবার একটা হাহাকারের শব্দ শুনতে পায় রমেশ। রাতের বিছানায় শুয়ে রমলাই কথাটা তোলো,জান এ মাসে রামুর মাকে একশো টাকা কমিয়ে দেবো বলেছি,ভেবেছিলাম তা হলে ও অন্য কোথাও কাজ দেখে নওয়ার কথা বলবে।কিন্তু কী আশ্চর্য জান টাকা নিয়ে ওর যেন কোন হেলদোলই নেই বলে সে তোমার যা মনে হয় একটা দিও।–এবার বুঝলে তো তোমার ঐ টোটকায় কাজ হবে না ।রমেশের গলায় শ্লেয। -হাঁ তাই তো দেখছি,কী করা যায় বলো তো। একটু চুপ করে থেকে রমেশ বলে –একটা কাজ কর ওঁকে পরিষ্কার করে সব বলে দাও,বল ওকে দিয়ে তোমার কাজ হচ্ছে না তুমি অন্য কাজের লোক রাখবে,ওকে একটু বেশী টাকা পয়সা দিয়ে ছুটি দিয়ে দাও।এসব ধানাই-পানাই কর না।ওকে যখন রাখবে না ঠিকই করে ফেলেছ,তখন সে়টা সোজাসুজি বলাই ভাল,কোন ভনিতা কর না।–হাঁ এবার তাই করবো,বেশ ঝাঁঝালো গলায় কথাটা বলে ,আর কথা না বাড়িয়ে পাশ ফিরে শোয় রমলা।রমেশ বুঝতে পারে এ বাড়িতে রামুর মায়ের দিন শেষ। পরের দিন যখন রমেশ কলেজ থেকে ুফিরেছে রামুর মা তখন একেবারে আর্তনাদ করতে করতে রমেশের পায়ের কাছে এসে পড়ে–“‘দাদাবাবুগো আমাকে তাড়িয়ে দিও না ,আমাকে এ বাড়ি থেকে যেতে বলো না দাদাবাবু ,এ ভিটেটা একসময় আমারই ছিল গো,ওরা কেড়ে নিল আমার ভিটে,আমার হাতে লাগানো গাছগলো,বললো শহর হবে উন্নতি হবে,আমি ওদের সঙ্গে পারিনি গো দাদাবাবু ।এই ভিটেতেই আমার নাড়ির যোগ,নাড়ির টান কী পয়সা দিয়ে কেনা যায়,তুমি তো অনেক লেখাপড়া জান গো দাদাবাবু  তমিই বল না কেনা যায়”।রামুর মায়ের আর্তনাদ শুনে স্তব্ধ হয়ে যায় রমেশ।রামুর মায়ের আর্তনাদর মধ্যে রমেশ যেন শুনতে পায়,তার মায়ের আর্তনাদেরই প্রতিধ্বনি। সেই অনক বছর আগে দমদম কলোনির ছোট্ট ঘরে বসে ময়ের সেই বিলাপ,ওরে ওপার বাংলায় আমার সেই বড় বড় দাওয়াওলা ঘর,আমার অতগুলো ফলন্তগাছ,সব ছেড়ে  চলে আসতে হল ওরা আমার সব কেড়ে একেবারে ভিখেরি করে ছেড়ে দিল। রমেশ ভাবতে থাকে এখন তো আর দেশ ভাগ নেই,দাঙ্গা নেই,তবু কেন থামে না উদ্বাস্তু মানুষের আর্তনাদ,কেন তবু চলতেই থাকে উদ্বাস্তুদের স্রোত।ভাবতে ভাবতে ধীর পায়ে র মেশ ঘরের ভেতর  ঢুকতে থাকে,তার পেছনে তখনও ধাওয়া করে আসছে রামুর মায়ের আর্তনাদ–”দাদাবাবুগো আমাকে ভিটে ছাড়া করো না”।