করপোরেট হাসপাতালে বিলিংয়ের কারসাজিঃ উত্তান বন্দ্যোপাধ্যায়

ধরুন খাবারের মেনুতে লেখা আছে অমুক পদের দাম ৪০০ টাকা। সেটি খেয়ে বিল মেটানোর সময় আপনাকে বলা হল, কাটাচামচ ব্যবহারের মূল্য ২৫ টাকা। আপনি এসিতে ছিলেন তার ভাড়া ২০০ টাকা, আপনাকে যে ছেলেটি সার্ভ করেছে তার চার্জ ১৫০ টাকা। আপনি একবার ওয়াশরুমে গেছেন তার জন্য মূলা ১০০ টাকা। টিস্যু পেপার ব্যবহার করেছেন তার মূল্য ৫০ টাকা টাকা – সর্বমোট দাঁড়াল ৮৭৫ টাকা। এইটা পে করুন, নয়তো গলায় পাইপ ঢুকিয়ে যা খেয়েছেন সব বের করে নেব। এই হল কর্পোরেট হাসপাতালের বিল ব্যবস্থা। এর বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলা এবং প্রতিরোধ গড়ে তোলাটা জরুরি ছিল। যদিও সেই প্রতিবাদের হাতল আবার এক দাদাবাজির খপ্পরে পড়তে চলেছে।পলিটিক্যাল দাদারা নিগোশিয়েট করিয়ে দেবেন।
কর্পোরেট হাসপাতাল গুলো কীভাবে বিলিং করে? 
যা রেট ওরা বলে সেটা অন্যান্য জায়গা থেকে বেশী তো বটেই,  কিন্তু তাদের সেই রেট থেকেও তারা এটা ওটা দেখিয়ে আরো অনেক বেশী বিলিং করে চুরিটা করে। ওষুধের ক্ষেত্রেও তা করে। একটা উদাহরণ দিলেই বুঝতে পারবেন। ধরা যাক, মেরোপেনেম – একটা ইন্জেক্টেবেল এ্যন্টিবায়োটিক যার দাম লেখা আছে ধরো প্রতিটি ইন্জেক্শনএ ৩২০০ টাকা।  ১০ টা দিতে হবে তো অন্তত । এই ৩২০০ টাকার ওষুধটা ডিস্ট্রিবিউটরের কাছ থেকে রিটেলার পায় ৮০০ টাকায়। রিটেল আবার কম্পিটিশনের খাতিরে ওটা বাজারে যে যতটা পারে কমিয়ে বিক্রী করে।ধরা ধরা যাক ‘ধন্বন্তরি’ এটা বেচে ২৪০০ টাকায়,  ব্লুপ্রিন্ট বেচে ২৩০০ টাকায়। আবার সরকারি হাসপাতালের কিছু ভাল ডাক্তারবাবু আছেন যারা সটান ডিস্ট্রিবিউটরের কাছে রোগীর বাড়ির লোককে পাঠিয়ে দেন রোগীর সুরাহার জন্যে মাত্র per ampoule ১১০০   টাকায় পাওয়া যায়। ডিস্ট্রিবিউটর ওষুধটা সরাসরি হাসপাতালের(সরকারি ) ওয়ার্ডে রোগীর নামে পাঠিয়ে দেয়।  কর্পোরেট হাসপাতালে ইনডোর পেশেন্টদের ক্ষেত্রে অনেক সময় কী হয়?  তারা ৮০০ টাকায় কেনা ইনজেকশনটা কে প্রতিটির ক্ষেত্রে ৩৩০০ টাকাই নেয় যেটা এমআরপি লেখা আছে বা ছিল। তাহলে কতো মুনাফা হলো?  ১০ টা ইনজেকশনের এর জন্যে?  এর পরেও রোগীকে হয়তো দেওয়া হলো বা রোগীকে দেওয়া গেলো মাত্র ২টো বা ৩ টে,  তাতেই সে অনেকটাই সুস্থ হলেন বা সুস্থ আর হলেন না,  মারা গেলেন। ফলে ৭ টা বা ৮ টা ইনজেককশন সরাসরি বেআইনি পথে রিসাইকেলড হয়ে ফার্মাসিতে চলে যায়। কতটা চুরি হলো?  হয়তো ৫০০০%. এই ভাবেই শয়ে শয়ে কেস আমি জানতাম যে অতি চিকিৎসা বা ফলে উল্টে রোগী আরো খারাপ হয়ে গেছে,  কিছু কিছু ক্ষেত্রে মারাও গেছে।  এ ব্যাপারে আমার একটা স্টাডি আছে। সেটা হলো,  যার টাকা পয়সা আছে,  যে খরচা করতে পারে বা যার মেডিক্লেইম আছে বা যে অফিস থেকে ট্রিটমেন্ট ফ্রি পায় (কর্পোরেট পেশেন্ট) তাদের চিকিৎসা বিভ্রাট হবার সম্ভাবনা বেশী।
মেডিক্যাল সায়েন্সে বেশ কিছু ডিসিশন আছে যেটা করা বা না করাটা অনেকটাই ডাক্তারের বিচারের উপর বর্তায়। তার জন্য দার্শনিকভাবে মেডিক্যাল সায়েন্স কে অনেকেই  inexact science বলেন। এই postulation এ চুরি ডাকাতি করার চান্সও বেশী থাকে যারা অসৎ। সেটা কিরকম?  আরেকটা উদাহরণ দিই? ধরুন কার্ডিওলজিতে দুটো অসুখ আছে – sick sinus সিন্ড্রোম আর একটা বান্ডেল ব্র্যান্চ ব্লক। বইতে লেখা আছে যে এদের চিকিৎসায় পেসিং করতে হবে (অর্থাৎ পেসমেকার লাগবে)। একই রোগীকে আমি তিন চার জায়গায় বহু ক্ষেত্রেই ডাক্তার দেখালাম ধরুন । দেখা গেলো সরকারি ডাক্তার রা বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই রোগীর অন্যান্য কোন অসুবিধা বা লক্ষণ পজিটিভ কিছু না পেলে (ধরুন ১ সেকেন্ডের জন্যে সিনকোপ্ বা হটাৎ চোখে মুখে অন্ধকার দেখা বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়া) তারা wait করেন,  রোগীকে পেসমেকার দেন না আপাতত। কিন্তু কর্পোরেটের হাতে প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রেসক্রিপশন হলো পেসমেকার লাগাও। চ্যালেঞ্জ করা যাবে না কারণ বইতে লেখা আছে। আসলে আমি কর্পোরেট সেক্টারের কালচারটা বোঝাবার চেষ্টা করছি। সরকারি ক্ষেত্রে চিকিৎসার মূল মন্ত্র হলো আপনি অসুস্থ হবেন না – তার জন্য ৩ টায়ার চিকিৎসা ব্যাবস্থা আছে – প্রাইমারি,  সেকেন্ডারি,  টার্শিয়ারি।(তার মানে এটা বলছি না সরকারি হাসপাতালগুলো দারুণ, দারুণ আর দারুণ। আমি দর্শন টা বোঝানোর চেষ্টা করছি)আর কর্পোরেট ক্ষেত্রে ঘরানা হলো আপনি দয়া করে অসুস্থ হোন- এক ছাদের তলায় সব পাবেন।
আসলে হিডন কস্ট রাখা যাবে না,  কমিশন খেলা বন্ধ করতে হবে,  তবেই কিছুটা উন্নতি সম্ভব। ক্লিনিক্যাল এস্টাবলিশমেন্ট এ্যক্ট আর মেডিকেল কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়া (এথিক্স,  এটিকেট,  প্রফেশনাল কন্ডাক্ট) রেগুলেশনকে ধরে ধরে অনেক কঠোরভাবে শাস্তির ব্যাবস্থা করতে হবে।
লেখক স্বাস্থ্য আন্দোলনের কর্মী