‘পরিবর্তন’ পত্রিকার লড়াইয়ের কাহিনী- জানাচ্ছেন ABP এর এক ‘ছাঁটাই’ কর্মী

0
82

বিরাশি থেকে পরিবর্তনে লিখলেও পচাশিতে আমি চাকরি পাই তৎকালীন সম্পাদক ও আরেক প্রাক্তন আনন্দবাজারের সাংবাদিক পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের সৌজন্যে। ছিলেন তাঁর আর এক পুরোন সহকর্মী প্রয়াত নিশীথ দে। প্রবীণ-নবীনে মিলিয়ে সব কটি কাগজে আরও অনেক নামী-অনামী সাংবাদিক-লেখক, গুণী ও বড় মনের মানুষরা ছিলেন। অন্য কর্তারা আমায় পছন্দ করলেও সম্ভবত পার্থবাবুর রিক্রুট হওয়ার কারণে চিত্তবাবু (খেলার আসরের সম্পাদক প্রতিষ্ঠানের মালিক অশোক চৌধুরীর ঘনিষ্ঠতম সহযোগী) ও এক উপ-সম্পাদক আমার প্রতি বিদ্বিষ্ট ছিলেন। সাংবাদিক-অসাংবাদিকদের সমবেত উদ্যোগে আবপ গোষ্ঠীর সাময়িকীগুলির সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছিল ইত্যাদি।  আমি যোগ দেওয়ার আগে থেকেই ‘সুপ্রভাত’ নামে একটি দৈনিক পত্রিকা প্রকাশের তোড়জোড় চলছিল। তার কাজেও আমাকে জুড়ে দেওয়া হয়। বিভিন্ন কাগজ থেকে বহু প্রবীণ- নবীন সাংবাদিক সুপ্রভাতে যোগ দেন।
কিন্তু দৈনিকটি জন্মাবার আগেই কার্যত তার মৃত্যুঘন্টা বেজে গিয়েছিল ইন্দিরা গান্ধীর হত্যাকান্ড এবং রাজীব গান্ধীর জমানায় প্রণব মুখোপাধ্যায়ের নির্বাসনের কারণে। যতদূর জানি ইন্দিরা-আনুগত্যকে শিরোধার্য করে মূলত প্রণববাবুর আশীর্বাদ ও মস্কোর প্রযুক্তি-সাহায্য নিয়ে কাগজটি বেরোনোর ব্যবস্থা হচ্ছিল। দেশের রাজনীতিতে বিপুল পালাবদলের জেরে গোটা প্রতিষ্ঠানটির ভাগ্যবিপর্যয়ের দিন দেওয়ালের লিখন পড়তে চাননি মালিক অশোকবাবু। সম্ভবত রাজনৈতিক বা আমলা মহলে যোগাযোগ ঘটিয়ে চিত্তবাবুর মতো পরামর্শদাতারা বিপত্তারণ হয়ে উঠবেন এই আশায় বা আশ্বাসে। ইতিমধ্যে পার্থবাবুকে চলে যেতে বাধ্য করে চিত্তবাবুই তখন সর্বেসর্বা এবং সুপ্রভাতের সম্ভাব্য কার্যকরী সম্পাদক।
দৈনিক প্রকল্পের গর্ভপাত ঘটে গেলেও তার জন্য বিপুল অর্থব্যয় হতে থাকায় চালু কাগজগুলির রসদে টান পড়তে থাকে। গল্পকথার কালিদাসীয় মুর্খামির অনুকরণে যে ডালে বসা সেই ডালই কাটার ব্যবস্থায় মাইনেকড়ি অনিয়মিত হতে থাকে। সংকট সামাল দিতে কর্মী ছাঁটাই, মাইনে কাটা ইত্যাদির কথা চারিয়ে যাওয়ায় কর্মী মহলে উৎকণ্ঠা ঘনিয়ে ওঠে। যথারীতি ম্যানেজমেন্টের রোষের ভয়ে প্রকাশ্যে মুখ না খুললেও ইতিউতি আলোচনা বাড়ে। আমাদের কোনও ইউনিয়ন ছিল না। সংকটের গভীরতা নিয়ে কর্তৃপক্ষের তরফে কোনও বয়ান না আসায় শ তিনেক কর্মীর ক্ষোভ ধূমায়িত হতে থাকে এবং তা কর্তাদের কানে পৌঁছয়। চিত্তবাবু কয়েকজনকে ডেকে নানা রকম স্তোকবাক্য শোনাতে থাকেন। এর মধ্যে প্রধান আশ্বাস ছিলঃ ব্লাডিভস্টকে বরফ জমায় রাশিয়ার জাহাজ আসতে পারছে না। নইলে আমাদের ছাপাখানার জন্য মস্কোর মেশিন এল বলে। মস্কোর নামে এই মস্করা কর্মী মহলে ছড়িয়ে যায়। শীতকাল গেলেও বরফ আর গলে না। ফলে বিক্ষোভ বাড়ে। আর তা দমাতে কর্তারা একটি সভা ডাকেন এবং আমাকে পান্ডা ঠাউরে ছাঁটাইয়ের উদ্যোগ নেন। চাকরি যাবার আগে আমি সভায় বলার অনুমতি চাই।
আমার বক্তব্য তখন যা ছিল এখনও আনন্দবাজারের ক্ষেত্রেও একই আছে। নির্যাসঃ প্রতিষ্ঠানের সংকট আমাদেরও সংকট। কিন্তু এর জন্য দায়ী কর্তাদের অবিমৃশ্যকারিতা, বাস্তববোধহীনতা, অতি উচ্চাকাঙ্খা ও স্তাবক-পরিবৃত জো-হুজুরি সংস্কৃতি। এর দায় কর্মীদের উপর চাপানো অনৈতিক। সংকটের গভীরতা নিয়ে আমাদের সঙ্গে খোলাখুলি আলোচনা করলে আমরা নিজেদের মধ্যে কথা বলে আপৎকালীন দায়ভাগ নিতে রাজি। কিন্তু ছাঁটাই বা ভয় দেখানো চলবে না। যতদূর মনে পড়ে, শেষে বলেছিলামঃ আমি চলে গেলে যদি প্রতিষ্ঠান বাঁচে, এখনই চলে যাব। আমাকে সমর্থন জানিয়ে নবম দশমের সহকর্মী দেবীদাস আচার্য বলেঃ যা হবে সকলের ভাগ্যে সমান হবে। নিজেদের স্বার্থরক্ষা এবং প্রতিষ্ঠান বাঁচাতে লড়তে হলে আমরা এক সাথে লড়ব। আমাকে শাস্তি দিলে সেও তার ভাগ নিতে তৈরি। (ভাগ্যচক্রে আজ আমরা দুজনেই আনন্দবাজার গোষ্ঠী থেকে ‘পদত্যাগী’, আসলে ছাঁটাই।)
হাওয়া ঘুরে গেল। জ্বালামুখ খুলে যাওয়ায় একের পর এক সহকর্মীর ক্ষোভ উগলে ওঠে। অশোকবাবু, চিত্তবাবুরা প্রমাদ গোনেন। তাঁরা সভা ছেড়ে চলে যান। ভয়মুক্তি আর সংকটের রাহুগ্রাস ঘিরে প্রবল অনিশ্চয়তার মধ্যে কিছুদিন পরে জন্ম নেয় ইত্যাদি প্রকাশনী এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন। সুপ্রভাতের জন্য আসা সাংবাদিকদের সঙ্গে পুরোনদের ঝগড়া বাঁধিয়ে দেওয়ার চেষ্টা আমরা প্রতিহত করি। বসুমতী থেকে আসা প্রবীণ সাংবাদিক বিমল নন্দী সভাপতি হন। আমি সম্পাদক ও দেবী যুগ্ম সম্পাদক। কমিটিতে সাংবাদিক- অসাংবাদিক সকল বিভাগের প্রতিনিধি।
পরবর্তী কালে ম্যানেজমেণ্টের কিছু নথিপত্র আমাদের হস্তগত হয়। তার একটিতে ছিল সুপ্রভাত প্রথম প্রকাশের দিন বিপুল অর্থব্যয়ে দেশজুড়ে অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা। গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেলের অসাধারণ নিদর্শন সেই পরিকল্পনায় ছিল কলকাতা, দিল্লিতে তো বটেই, দেশের আরও কয়েকটি বড় শহরে একদিনে ধারাবাহিক ‘লঞ্চিং পার্টি’ হবে। অশোকবাবু ও তাঁর প্রধান সহযোগীরা পালা করে উড়ে বেরিয়ে সেই সব পার্টি আলো করবেন।  পিয়ারলেসের এজেন্ট সংগঠনের নেতা ও তখনও পর্যন্ত সফল ব্যবসায়ী অশোকবাবুকে এমন মগডালে তুলে মই কাড়ার ব্যবস্থা কে বা কারা করেছিল ?
যত দিন গেছে সংকট বেড়েছে। শিরে সংক্রান্তি অবস্থায় ম্যানেজমেন্টকে দোষারোপের বদলে কাগজগুলোকে বাঁচানোর লড়াই আমাদের কাছে প্রধান হয়ে ওঠে। জানতাম কাগজ বাঁচলে আমরা বাঁচব।

ইউনিয়ন গঠনের পর মাইনের দাবীর সঙ্গে সংকটমুক্তিতে কর্মীদের সঙ্গে আলোচনার দাবীতে আন্দোলনে স্লোগান উঠেছে। একবার ঘেরাও হয়েছে। সে রাতে মালিক সহ কর্তাদের আমাদের গণরান্নার ডিমভাত অফার করেছি, ওষুধ জুগিয়েছি। কাউকে ব্যক্তিগত অপমান করিনি, শারীরিক আঘাতের প্রশ্নই ওঠে না। আমাদের মনে হচ্ছিল অশোকবাবু হয়ত চালু কাগজগুলো চালাতে চান। তবে তাঁর রাহুমুক্তি দরকার। খবর পেয়ে পুলিশ এসেছে। আমাদের ব্যবহার ও ভূমিকার জেরে পুলিশ কর্মীরাও জবরদস্তি করেননি। আমরা ঘেরাও তুলে নিয়েছি।
তবু কিছুদিন পর মালিকপক্ষ প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়। তা খোলার দাবীতে আমরা পূর্ণদাস রোডে মালিকের বাড়ির সামনে তাঁবু ফেলে ধরণা শুরু করি। নকশালদের সংগঠন বলে সরকারি ভাবে পুলিশ দিয়ে আমাদের তুলে দেওয়ার চেষ্টা হলেও তৎকালীন স্থানীয় বিধায়ক ও প্রবীণ সিপিএম নেতা শচীন সেনের হস্তক্ষেপে আমরা রেহাই পাই। মাস খানেক ধরণার পর শ্রম দফতরের মধ্যস্থতায় কাগজ খোলার প্রতিশ্রুতি পেয়ে আমরা ফিরে যাই। অশোকবাবু কাগজ- কালির জোগান দিলে আমাদের উদ্যোগেই পরিবর্তনের পুজো সংখ্যা তড়িঘড়ি বেরোয়।
এরপর থেকে আমাদের সঙ্গে মালিকের সম্পর্কটা দাঁড়ায় এরকমঃ উনি টাকার জোগান দিলে আমরা অনিয়মিতভাবে হলেও কাগজগুলো বের করার ব্যবস্থা করেছি। সম্পাদকমণ্ডলীতে বা অন্য বিভাগীয় কমিটিতে পুরোন কর্তাদের সঙ্গে সদস্যদের মনোনীত প্রতিনিধিরা। স্টোরি প্ল্যানিং থেকে অ্যাসাইনমেন্ট ভাগাভাগি তারাই করেছেন। জোগান মতো দফাওয়ারি মাইনে নিয়েছি। যাদের সবচেয়ে বেশি দরকার তাঁদের আগে দেওয়া হয়েছে। ইউনিয়নের নেতারা পরে নেবেন এটাই ছিল দস্তুর।
টাকা নেই কিন্তু মানবসম্পদ আছে এই পরিস্থিতিতে আমরা ‘সাব স্টাফ’ বা বেয়ারা- পিওন তথা চা-জল জোগান ইত্যাদি কাজের জন্য নিযুক্ত সহকর্মীদের পুরোন কাজ বাতিল করে তাঁদের ব্যক্তিগত দক্ষতা ও আগ্রহ মতো লেখালেখি, প্রুফ দেখা, ইলাস্ট্রেশন, পাতা বানানো থেকে বিজ্ঞাপন এবং সার্কুলেশন সংক্রান্ত কাজের দায়িত্ব দিয়েছি। একারণে আমাকে ‘বামুন-কায়েত-নমঃশুদ্র’ একাকার করে দেওয়ার অপরাধে সহকর্মীদের একাংশের সমালোচনা ও বাধার মুখে পড়তে হয়েছে। কিন্তু তথাকথিত নিম্ন সারির সহকর্মীদের মধ্যে থেকে কয়েক জন তাঁদের নতুন ভূমিকায় উৎসাহ ও দক্ষতা দুইই দেখিয়েছিলেন। এই বর্গের কর্মীরা ছিলেন আমাদের অন্যতম প্রধান শক্তি। হিন্দি পরিবর্তনের কথা বলতে ভুলে গিয়েছি। হিন্দির কর্মী বন্ধুরা ইউনিয়নের এবং আমার গভীর বন্ধু হয়ে ওঠেন।
যে কোনও বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া হত কার্যকরী কমিটি ও সাধারণ সভা ডেকে। এত বেশি সভা ডাকতাম যে সহকর্মীরা অনেক সময় বিরক্ত হয়ে যেতেন। কেউ কেউ অতি গণতন্ত্রের দায়ে ফেলতেন। 
ঘুরে দাঁড়াতে অশোকবাবু নানা সময়ে নানা আশ্বাস দিয়েছেন। কিন্তু তিনি বা তাঁর পরামর্শদাতারা ইউনিয়নকে সঙ্গে নিয়ে সংকটের সমাধান খুঁজতে চেয়েছেন এমন নয়। হয়তো ইগোয় বেঁধেছে বা নানা রাজনৈতিক ডিল বা ব্যবসায়িক রহস্য ফাঁস হওয়ার আশংকা ছিল। কিন্তু উনি ফাইনান্সিয়ার ধরে এনেছেন আর আমরা হাঁকিয়ে দিয়েছি এমনটা মোটেও ঘটেনি।
সময় যত গেছে তত মালিকের আশা ছেড়ে আমরা কখনো ব্যক্তি উদ্যোগে কখনো ইউনিয়নগত ভাবে রসদ জোগাড়ের জন্য সরকারি-বেসরকারি নানা দরজায় ঘুরেছি। পুরনো ঋণ বাবদে বকেয়া পাওনা আদায়ে ব্যাঙ্কগুলি তখন ছেঁকে ধরেছে। কর্মীদের কথা মনে রেখে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য কিছু সময় এবং নতুন কিছু সঞ্জীবনীর ব্যবস্থা করতে ব্যাঙ্ক কর্তাদের কাছে দরবার করেছি। খিদিরপুরে কোম্পানি বা অশোকবাবুর ব্যক্তিগত জমি বেঁচে বা বন্ধক রেখে টাকা জোগাড়ের চেষ্টা হয়েছে। মৌলালিতে কোম্পানির অফসেট প্রেসের জন্য বাইরের ছাপাছাপির কাজ জোগাড় শুধু নয়, পুরোন ছাপার প্লেট বেঁচে টাকা তোলার ব্যবস্থাও বাদ যায়নি। মনে পড়ছে ইউনিয়নের এক বন্ধুর যোগাযোগে পিয়ারলেসের কর্ণধার এস কে রায়ের কাছেও যাই। কেউ কেউ আম্বানি সাম্রাজ্যেও যোগাযোগের চেষ্টা করছিলেন। কেউ হাত উপুড় করেনি।
কোনও রাজনৈতিক ছুৎমার্গ না রেখে সমস্ত প্রভাবশালী রাজনৈতিক দল, নেতা-মন্ত্রীর কাছে গিয়েছি। কংগ্রেস নেতা প্রিয়রঞ্জন দাসমুন্সি, সম্ভবত তৎকালীন কেন্দ্রীয় বানিজ্য প্রতিমন্ত্রী, চাঁদনী বাজারের পেছন দিকে প্রিন্সেপ স্ট্রিটে ইত্যাদির অফিসেও আসেন। আমাদের অস্তিত্বের লড়াইতে সঙ্গে থাকার প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু ঐ পর্যন্তই। স্থানীয় বিধায়ক- সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছেও গেছি। আগের লোকসভা নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ইন্দ্রপতন ঘটালেও তিনি তখনও ক্ষমতার বৃত্তে নেই। তাঁর কাছে আমরা গিয়েছিলাম বলে মনে পড়ে না।
ক্ষমতাসীন বামকুলাধিপতিদের কাছে পৌঁছনোর চেষ্টা ছিল। জ্যোতি বসু পর্যন্ত যেতে পারিনি। তবে আলিমুদ্দিনে বসে তৎকালীন সংস্কৃতি মন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য তাঁর স্বকীয় মার্ক্সবাদী বীক্ষা শুনিয়েছিলেনঃ একচেটিয়া পুঁজিবাদের নিয়মে বড় কাগজ বাঁচবে আর ছোট কাগজ মরবে এটাই স্বাভাবিক। অনিল বিশ্বাস ও বিমান বসু তুলনায় সহানুভুতিশীল ছিলেন। কিন্তু কাজের কাজ কিছু হয়নি।
বসুমতীর দায় নিয়ে সরকার তখন হিমশিম। আমরা সরকারি অধিগ্রহণ চাইনি। চেয়েছিলাম সরকারি ছাপাছাপির কাজ, বিজ্ঞাপন এবং রসদ জোগাড়ে সাহায্য। সঞ্চয়িতা-উত্তর বাংলায় তখন কোনও সারদা বা সুদীপ্ত সেন ছিল না। থাকলে বাঁচার তাগিদে হয়তো তাদের কাছেও যেতাম। শেষের দিকে অন্যান্য রুগ্ন-বন্ধ কাগজ—সত্যযুগ, ভারতকথা এবং সংকটাপন্ন যুগান্তর-অমৃতবাজারের সাংবাদিক- অসাংবাদিকদের জোট বেঁধে রাজ্যের মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রির সংকট নিয়ে জনমত গড়ার চেষ্টা করেছি। আলাদা করে ইত্যাদিতে এবং সম্মিলিত ভাবে সংকটাপন্নরা মিলে নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের সব সম্পদ মিলিয়ে সাংবাদিক- অসাংবাদিকদের সমবায় গড়ে এগোন যায় কিনা তাও ভেবেছি। 
 
অনেক পরে আবপ-র পুলিশ রিপোর্টার হিসেবে লালবাজারে অশোক বাবুকে কোনো এক প্রমোটারি সংস্থার প্রতারণা সংক্রান্ত মামলায় ধৃত অবস্থায় দেখি। এক সময়ের স্মিতমুখ, মিতবাক, সাফল্যের আত্মবিশ্বাসে উজ্জল মানুষটির পরিণতি দেখে খারাপ লাগায় তাঁর সামনে যাইনি। তাঁর এই পরিণতির জন্য তিনি নিশ্চয়ই দায়ী। কিন্ত তাঁর এককালের স্তাবকেরাও কি দায়ী নন?
হ্যাঁ শেষ করার আগে একটা স্বীকারোক্তি। সেই সময়ের বন্ধুমহলে ঠারেঠোরে একটা অনুযোগ- অভিমান ছিল। পরে সেটা কারও কারও অভিযোগ হয়ে উঠেছে মনে হচ্ছে। সেটা হল আমি দু বছর পর ইউনিয়নের সম্পাদক পদ ছেড়ে দিই এবং নিজেকে গুটিয়ে নিই। লাগাতার নেতৃত্ব আঁকড়ে থাকার আগ্রহ আমার ছিল না। আমি নেতা হয়েছিলাম পাকে চক্রে। দেবীও পদ ছাড়ে। নতুন সম্পাদক ও যুগ্ম সম্পাদক, যত দূর মনে পড়ে, প্রভাত ঘোষ এবং রতন চক্রবর্তী। তাঁদের কাজে আমি সহায়তা করিনি এমনটা মনে পড়ে না। এক সময় ইত্যাদি ছেড়ে দিই।
আমার আগে অনেকেই চলে যান। আমি তাঁদের দোষ দিইনি। প্রথম থেকেই সুবিধাবাদীদের কথা আলাদা। সুড়ঙ্গের শেষে আলো দেখতে না পেয়ে লড়াকু অনেকেও একে একে অন্য জায়গায় চাকরি পেয়ে বা ব্যবসায় সরে যান। আমিও অবসন্ন ও হতাশ হয়ে পড়েছিলাম। এ আমার কাছে গভীর লজ্জার।
কিন্তু কেরিয়ারের তাড়নায় পালিয়ে যাইনি। নিজের সঙ্গে বা সিস্টেমের সঙ্গে আপোষ করে মাঝরাস্তায় হাঁটতে শুরু করিনি। ভরা যৌবনের দিনে লড়াইয়ের দিনে অন্য অনেকের মতো আমিও কিছু হারিয়েছিলাম। তাতে খেদ ছিল না। হতাশ হয়েছিলাম সমূহ সংকটের মধ্যে আমাদের কর্মীদের মধ্যবিত্ত অংশের মধ্যে সংকীর্ণতা ও ইতরামি দেখে। উদাহরণস্বরূপ, বাইলাইনে কার নাম বারো পয়েন্টে, কার নাম চোদ্দ পয়েন্টে তাই নিয়ে গোলযোগ। এছাড়া নিদারুণ অনটনের সংসারে নিত্য একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ। শেষ পর্বে অশোক বাবু খোকন ঘোষ নামে এক জনকে ক্ষমতায় বসান। ইউনিয়ন জায়গা হারাচ্ছিল। আমি বুঝতে পারছিলাম নতুন পথে হাঁটতে না পারলে অরয়েলিয় পশুখামারের চেয়ে মর্মান্তিক পরিণতি অপেক্ষা করছে।
প্রায় অসম্ভবের সাধনা হলেও আমার কাছে তেমন পথ ছিল সাংবাদিক- অসাংবাদিকদের সমবায় যা ম্লানমুখ, আশাহীন মানুষগুলোকে ভিক্ষাজীবী, দয়াপ্রার্থীর বদলে স্বাভিমানী, স্বনির্ভর মেধাশ্রমিকে পরিণত করবে, লড়াইয়ের প্রথম দিনকার বন্ধুতা ফিরিয়ে আনবে। পথ বেঁধে দেবে বন্ধনহীন গ্রন্থি। কিন্তু আমার ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা এই ইউটোপিয়ার পথে হাঁটতে চান নি।
এমন নয় আমি অনেক ইউটোপিয়ার ডিশটোপিয়ায় পরিণত হওয়া সম্পর্কে চোখে ঠুলি এঁটে ছিলাম। কিন্তু বন্ধ কারখানার গেটে ছেঁড়া ঝান্ডার তলায় তাস পিটিয়ে সময় কাটানো অনশনবন্দি শ্রমিকদের নিদারুণ ভবিতব্যের বদলে সমবায়িক স্পর্ধা এবং সমবেত বাঁচার দুরাকাঙ্খা আমাকে হাতছানি দিচ্ছিল। অভিজ্ঞতাজারিত অনেক দ্বিধা- দ্বন্দ্ব সত্ত্বেও। আমার এই স্বপ্নই আমাকে পরে কাণোরিয়ায় টেনে যায়, কিন্তু অন্য কাহিনী।
ইউনিয়ন ছেড়ে , ইত্যাদি ছেড়ে আমি চাকরির সন্ধানে বেরোইনি। ঠাই নিয়েছিলাম জাতীয় গ্রন্থাগারে। মানুষের ইতিহাসে, বিশেষত ধনবাদী সমাজে ব্যক্তি মানুষের মানসিক ‘ড্রাইভ’ আর যূথচেতনার টানাপোড়েন, ভালোমন্দ নিয়ে নানা প্রশ্নের উত্তর খুঁজছিলাম মনোবিজ্ঞান-সমাজতত্বের বইতে। প্রভাত যেত আমাকে ফেরাতে। কোনও স্নেহকাতর সিনিয়র চিঠি পাঠাতেন। আমি ক্ষমা চাইতাম আমার মধ্যবিত্ত দোলাচল নিয়ে। কিন্তু ফিরতে পারিনি। ভাঙ্গা মন নিয়ে শেষ পর্যন্ত আটশ টাকার চাকরি খুইয়ে টেলিগ্রাফে সাতশ টাকার রিটেনারশিপ জোগাড় করি। শুরু হয় আমার আবপ পর্ব।

বিদ্রঃ আনন্দবাজারে গণছাঁটাইয়ের প্রতিবাদে লেখক সরব হওয়ায়  সাংবাদিক সুরবেক বিশ্বাস লিখেছেন তিরিশ বছর আগে একটি প্রতিষ্ঠান নাকি লেখকের ‘বিপ্লবীর জালিগিরি’-র কারণে ডুবে গিয়েছিল। । সেই বক্তব্যকে খণ্ডন করতেই  ফেসবুকে দুটি পোস্ট করেন শ্রীরায় ।  লেখকের অনুমোদ নিয়ে সেই দুটো পোস্টকে  সম্পাদনা করে এই লেখা।

লেখক  টেলিগ্রাফের ‘পদত্যাগী’, আসলে ছাঁটাই কর্মী,