ছোট গল্পঃ বিজয়া – অনুপম কাঞ্জিলাল

                                            বিজয়া- অনুপম কাঞ্জিলাল

প্রথমটায় শ্যামলেন্দুর মনে হয়েছিল, হয়তো তার চোখের ভুল, কিন্তু ক্রমশ দূরত্ব কমিয়ে কাছে এগিয়ে এসে মনে হতে থাকে, না ভুল নয়, সামনের হেঁটে চলা লোকটা অমিতাভই। সময়ের ব্যবধানে শরীরে মাঝবয়েসের ছাপ, চুল পাতলা হয়ে যাওয়া শরীর স্ফীত হওয়া সবই আছে, কিন্তু অমিতাভর সেই উজ্জ্বল চোখ, যা দেখে কলেজের বন্ধুরা প্রায় সবাই বলতো, ওর চোখের তারাতেই আছে মেধার ঘোষণা। সেই সময় একটু আধটু ঈর্ষা যে হত না, তাও নয়, কিন্তু তবু শ্যামলেন্দুদের না মেনে কোনও উপায় ছিল না, অমিতাভই ওদের মধ্যে সবচেয়ে মেধাবী। পাশ থেকে হাঁটতে হাঁটতে সেই চোখের ঝলক পড়তে চেষ্টা করলো শ্যামলেন্দু বার কয়েক, কিন্তু নিশ্চিত হতে পারল না, ক্রমেই একরাশ দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ঘিরে ধরতে থাকল তাকে। এক একটা মুহূর্ত সরে যাচ্ছে, সামনের লোকটা একটু পরেই হারিয়ে যাবে, যদি সত্যিই অমিতামভ হয়, এতদিন পরে দেখেও কথা না বলার জন্য তীব্র আপশোস থেকে যাবে, সেই কতদিন আগেকার কত স্মৃতি, কত ঘটনা, একটু একটু করে ফ্ল্যাশ ব্যাক হয়ে শ্যামলেন্দুর সামনে এসে দাঁড়ায়। কলেজের সেই উত্তাল দিন, অমিতাভর বাড়িতে দিনের পর দিন ওদের হুল্লোড়-আড্ডা, অমিতাভর মা-বাবা, ওদের বাড়ির কাজের লোক অসীম কাকা, সবাই যেন সময়ের ব্যবধান সরিয়ে সামনে এসে দাঁড়াতে থাকে। এই মুহূর্তে শ্যামলেন্দু যেন কলেজস্ট্রিট চত্বরের বঙ্কিম চ্যাটার্জি স্ট্রিট ছাড়িয়ে অনেক দূর চলে গেছে, সেখানে একে একে ভেসে ওঠে কত পুরানো মুখ, কত ভাবনা তর্ক-বিতর্কের টুকরো কোলাজ, কালের শ্যাওলা লেগে যা ক্রমেই অস্পষ্ট হয়ে গেছে।

হঠাত্ই গাড়ির তীব্র হর্নের শব্দে হকচকিয়ে যায় শ্যামলেন্দু, ‘দেখে চলুন দাদা’-গাড়ির চালক বিরক্তি উগরে দেয়। সরি, বলে শ্যামলেন্দু আবার এগিয়ে চলে, তার চোখ এখনও তারা করছে সামনের ওই লোকটাকে, যে অমিতাভ হতেও পারে আবার নাও পারে। শ্যামলেন্দু দেখে সামনের লোকটাকে তাড়া করে সে কলেজস্ট্রিট চত্বর ঘুরে ক্রমেই এগিয়ে যাচ্ছে মেডিকেল কলেজের দিকে। কী করবে, ডাকবে অমিতাভর নাম ধরে- যদি অমিতাভ না হয়। বেশ, না হলে সরি বলবে, তাহলে ডাকাই যাক। শ্যামলেন্দু ডাকতে যাবে এমন সময় সামনেনর লোকটার মোবাইল বেজে ওঠে। মোবাইল বের করে কথা শুরু করে লোকটা, শ্যামলেন্দু কান পাতে- হ্যাঁ অসীমদাদা বল, হ্যাঁ আমি দেখছি যত তাড়াতাড়ি পারি ফিরছি…শ্যামলেন্দুর কোনও কথা কানে ঢোকেনি, শুধু অসীমদা উচ্চরণেই সব সংশয় সন্দেহের অবসান। এতক্ষণ যে লোকটাকে সে অমিতাভ বলে ভাবছিল, সে অমিতাভই। এরপর সময় নষ্ট না করে শ্যামলেন্দু সামনের লোকটার পিঠে হাত রেখে বলে, ‘চিনতে পারছিস?’

পকেটের মোবাইলটা ঢোকাতে ঢোকাতে শ্যামলেন্দুর ওপর বিস্ময়ভরা দৃষ্টি মেলে অমিতাভ কয়েক মুহূর্তের মধ্যে অস্ফুট উচ্চারণ করে, ‘শ্যামু, তুই শ্যামু।’

বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে তারা। কতদিন কত বছর পেছনে সরে যায়। উজ্জ্বল আবেগ শ্যামলেন্দুকে অভিমানী করে তোলে, ‘তুই কলকাতায় ফিরেছিস অথচ একবারও যোগাযোগ করিসনি আমাদের কারোর সঙ্গে। একবারও জানাসনি। আমার তো আজ এখানে আসার কথাই নয়, মেয়ের একটা বইয়ের খোঁজে এসেছি। দূর থেকে দেখে মনে হল যেন তুই, কতটা রাস্তা হেঁটে এলাম এক রাশ সংশয় নিয়ে।’

অমিতাভ শ্যামলেন্দুর কথা রেশ ধরে বলে, আমারও তাই মনে হচ্ছেল কেউ যেন আমাকে অনুসরণ করে হেঁটে আসছে।

অমিতাভ হঠাত্ই জিজ্ঞাসা করে, আচ্ছা তুই তো আমাকে সরাসরি জিজ্ঞাসা করতে পারতিস আমি যদি অমিতাভ না হতাম জানিয়ে দিতাম। এত সংশয় বয়ে হেঁটে আসার তো কোনও দরকার ছিল না।

শ্যামলেন্দু আমতা আমতা করে বলে, ‘আসলে নিশ্চিত হতে একটু সময় তো লাগবেই।’

এই কথার রেশ ধরেই খোঁচা দেয় অমিতাভ, ‘তার মানে তোর সেই পুরানো অভ্যাস এখনও যায়নি। শতকরা একশো ভাগ নিশ্চিত না হয়ে কোনও বিষয়ে ঝাঁপাতে নেই। আর এই করতে গিয়ে সোমা, অর্পিতা, সায়ন্তি সবাই একে একে তোকে ছেড়ে অন্যত্র পাড়ি জমালো।’

অমিতাভর কথায় দু’জনেই হেসে উঠল। কতদিন আগেকার কলেজের দিনগুলো আবার সামনে এসে ছায়া ফেলল। হাসতে হাসতে দু’জনের চোখেই ধরা দিল অদ্ভুত বিষাদ, জীবন থেকে অনেকগুলো দিনের ঝরে যাওয়ার বিষাদ। প্রসঙ্গ এড়িয়ে শ্যামলেন্দু জানতে চায়- ‘তুই কতদিনের জন্য এসেছিস? পরিবার নিয়ে এসেছিস তো?’

একটু চুপ থেকে অমিতাভ বলে, ‘আছি এখন কিছুদিন। কিন্তু আজ খুব তাড়া আছে রে, ফিরতে হবে। তুই বরং তোর মোবাইল নম্বর দে, তোর বাড়ির নম্বর এখনও আমাদের ডায়েরিতে লেখা আছে দেখেছি মোবাইল নম্বরটাও থাক। আমি যোগাযোগ করে নেব।’

শ্যামলেন্দু নম্বর দিতে দিতে বলে, ‘দেখেছিস কলেজ স্কোয়ারে পুজোর প্যান্ডেল হচ্ছে। মনে আছে তোর, আমরা পুজোর সময় কীরকম হৈ হুল্লোড় করতাম।

অমিতাভ গম্ভীরভাবে বলে, হ্যাঁ মনে আছে, সব মনে আছে। ভুলতে চাইলেই তো আর সব ভোলা যায় না।

শ্যামলেন্দুর খুব ইচ্ছা করছিল অমিতাভর সঙ্গে কোথাও এক জায়গায় বসে একটু চা খায়, আর কিছুক্ষণ গল্প করে কিন্তু অমিতাভ জানায় মেডিকেল কলেজের এক ডাক্তারের সঙ্গে জরুরি অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে। এখন আর সময় দিতে পারবে না। পরে যোগাযোগ করে নেবে। এরপর শ্যামলেন্দু আর বাড়তি কথা জিজ্ঞাসা করেনি। আসলে জিজ্ঞাসা করতে ইচ্ছা হয়নি। মনে আছে মেধাবী বিদেশে প্রতিষ্ঠিত বন্ধু হয়ত তার মতো এক সাধারণ ছেলেকে আর বেশি সময় দিতে চাইছে না। তাই অমিতাভ যখন আজ আর সময় নেই রে, পরে যোগাযোগ করে নেব বলে হনহনিযে মেডিকেল কলেজের দিকে এগিয়ে যেতে থাকল, তখন শ্যামলেন্দুর মনের মধ্যে কিছু সময় আগে পুরানো বন্ধুকে ফিরে পাওয়ার আনন্দ উচ্ছ্বাসটা কীরকম তেতো বিষাদে বদলে গেল। সে শুধু নিষ্পলক দৃষ্টি মেলে অমিতাভর চলে যাওয়াটা দেখে যেতে লাগল। মনে মনে ভাবতে থাকল কতগুলো বছর পেরিয়ে আবার ওরা মুখোমুখি হয়েছিল। কতকিছু জানার ছিল, কিন্তু এই তাগিদটা কি শুধু তার একার! অমিতাভার দিক থেকে কোনও তাগিদ হলনা কেন তার সম্পর্কে কোনও খোঁজ খবর নেওয়ার? হতে পারে সে খুব সাধারণ আর ওরা সব অসাধারণ, তাই ওদের এসব তাগিদ তাড়িত করে না। শরতের আকাশ জুড়ে তখন কালো মেঘ টিপ টিপ বৃষ্টি ঝড়তে শুরু করেছে। শ্যামলেন্দু ভাবে, হয়ত তার সাধারণ বোধশক্তিকে দুয়ো দিচ্ছে প্রকৃতিও। তা না হলে পুরনো বন্ধুকে ফিরে পেতে নিজের কাজ ছেড়ে সে এতটা সময় ব্যয় করবে কেন!

বাড়িতে ফিরেও ভাবনার ঘোর থেকে বেরুতে পারছিল না শ্যামলেন্দু। মলিকে ঘটনাটা বলাতে ও বলে, ‘এতগুলো বছর কেটে গেছে, মানুষ তো বদলাতেই পারে। তবে কি জানো, আমার ভালো লাগছে তোমার বন্ধু মায়ের কাছে ফিরেছে বলে। তোমার মনে আছে, সেই বৃদ্ধ মহিলা কীভাবে তোমাকে বার বার ফোর করে অমিতাভকে একবার বাড়িতে আসার অনুরোধ করতে বলতেন। সত্যিই মাতৃত্বের টান ক’জনই বা বোঝে?

শ্যামলেন্দুর এতক্ষণে মনে পড়ে ইস্ মাসিমা কেমন আছে, সেকথাটাও জানা হল না। মাসিমা-মেসোমসাই কি অসহায়তায় মধ্যে দিন কাটাতেন। একমাত্র সন্তান বিদেশে প্রতিষ্ঠিত, অথচ বাবা-মাযের খোঁজ নেওয়ার ফুরসত নেই। উন্নতি আর উন্নতি আর প্রতিষ্ঠার দৌড়ে ছুটে চলেছে ছেলে। শ্যামলেন্দুর মনে আছে সেই সময় সে ছাড়াও কলেজের অনেক বন্ধুকেই ফোন করতেন মাসিমা। বলতেন, অমিতাভকে বল না একবার আসতে। আমরা ওকে একটু দেখতে চাই। বন্ধুরা অনেকেই চেষ্টা করেছিল অমিতাভর ফোন নম্বর জোগাড়া করে তা মা-বাবার আর্তির কথা বলতে। কিন্তু অমিতাভ গুরুত্ব দেয়নি। সময়ের ব্যবধানে এক সময় নিজেদের নিঃসঙ্গতাকে ভবিতব্য বলেই মেনে নিতে শিখেছিলেন সেই বৃদ্ধ-বৃদ্ধা। শ্যামলেন্দুরাও যে যার সাংসারিক কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। অমিতাভর বৃদ্ধ মা-বাবা যারা একসময় তাদেরই বাড়িতে অমিতাভর বন্ধু-বান্ধবদের একটানা আড্ডা-হৈ হুল্লোড়কে প্রশ্রয় দিয়ে গেছে ঘন্টার পর ঘন্টা, বাড়ির কাজের লোক অসীমদাদাকে দিয়ে একদল আড্ডাপ্রিয় অল্পবয়সীদের জন্য নানা খাবার তৈরি করে খাইয়েছে। সময় এগিয়ে যেতেই সেই প্রৌঢ় মানুষগুলোকে ভুলে গেছে শ্যামলেন্দুরা সবাই। কেমন করে তাদের দিন কাটে, আদৌ কাটে কিনা, কেউ খবর রাখেনি। শ্যামলেন্দুর মনে পড়ে একটা সময় সে নিজেই খুব আতঙ্কে থাকত, মনে হত এই বুঝি আবার অমিতাভ মায়ের ফোন আসবে, অমিতাভকে একটু বুঝিয়ে ফিরিয়ে আনার অনুরোধ করবে। তারপর কবে থেকে সেরকম ফোন আসা বন্ধ হয়ে গেল, এখন আর মনে করতে পারে না শ্যামলেন্দু। একটার পর একটা ভাবনার বৃত্তে ঢুকে পড়তে থাকা শ্যামলেন্দুর একটা সময় মনে হয়, শুধু অমিতাভকে দোষ দিয়ে লাভ নেই, সবাই আসবে নিজের নিজের নির্দিষ্ট অভিমুখেই ছুটে চলেছে। যারা নেহাত সাধারণ তাদের চেয়ে এগিয়ে তাদের গতিটা হয়ত বেশিই। সেই জন্যই অমিতাভর নাগাল পায়নি সে। নিজেকে প্রবোধ দেয় শ্যামলেন্দু। রাতের নিস্তব্ধতায় তবু বেজেই চলে এক গভীর বিষাদের সুর।

শ্যামলেন্দু তার পুরনো বন্ধুদের অনেককেই, তাদের কলেজ জীবনের হিরো অমিতাভর ফিরে আসার খবরটা জানিয়েছে। তারা সকলেই অবাক হয়েছে এই ভেবে যে ফিরে এসে সে একবারও পুরানো কোনও বন্ধুর সঙ্গেই যোগাযোগ করেনি। একমাত্র কাবেরীই বলেছে, ‘না অবাক হইনি, ও তো এরকমই। এমএসসি পাস করে একদিন কর্পূরের মতো উধাও হয়ে গেল। এতগুলো বছর যখন কোনও যোগাযোগ রাখেনি, এখনই বা রাখবে কেন’?

শ্যামলেন্দু কাবেরীর কথার তীব্র অভিমান টের পায় তবু বলে, ‘আসলে আমরাও তো ব্যস্ত হয়ে গেছি, তাই না বল। তা না হলে আমরাই বা মাসিমা-মেসোমশাইয়ের খোঁজ কতবার নিয়েছি, কবেই বা দাঁড়িয়েছি ওদের নিঃসঙ্গতার পাশে’!

কাবেরী কথা বাড়ায়নি। শ্যামলেন্দু তবু টের পেয়েছিল ফোনের অপর প্রান্তে থাকা কাবেরীর বেদনা ভরা দীর্ঘশ্বাস, কতদিন অপেক্ষায় ছিল…একদিন হয়ত অমিতাভ ওকে ফোন করবে, কাজের ব্যস্ততা সেরে ফিরে এসে ওর প্রেমের স্বীকৃতি দেবে। কিন্তু যখন শুনলো অমিতাভ বিদেশি মেয়ে বিয়ে করেছে, তখন কাবেরী নিজের মতো করে জীবন সাজাতে ব্যস্ত হল। পুরানো স্মৃতি কাবেরীকেই বেশি জ্বালায়, জানে শ্যামলেন্দু। তাই ওর বেদনাকে বেশি করে না খুঁচিয়ে ফোনের লাইন কেটে দেয় সে। সেদিনের পর অমিতাভ ফোন করেনি, শ্যামলেন্দুও আগ বাড়িয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করেনি।

এরই মধ্যে পুজোর রঙ লেগেছে গোটা শহরে। একটু একটু করে উত্সবের উন্মাদনায় মাতার প্রস্তুতি নিচ্ছে কলকাতা শহর। এই উন্মাদনা উদ্দীপনার বহরটা এই বয়সে এসে আর নিতে পারেনা শ্যামলেন্দু। এই কটা দিন তাই সে একটু বেড়াতে চলে যায় শহর ছেড়ে দূরে স্ব-পরিবারে। পুজোর কেনাকাটা বেড়াতে যাওয়ার প্রস্তুতি এসবের মধ্যে শ্যামলেন্দুর কাছে অমিতাভর ব্যাপারটা যখন একটু একটু ঝাপসা হয়ে আসছে সেরকমই একটা সময় একদিন রাতে অমিতাভর ফোন আসে। নম্বরটা সেভ করা ছিল না শ্যামলেন্দুর, তাই প্রথমটা বুঝতে পারেনি। অমিতাভ ফোন করে কোনওরকম ভনিতা না করে সরাসরি বলে, ‘সেদিন  হয়ত তোকে সময় দিতে পারিনি বলে তুই কষ্ট পেয়েছিস। আসলে এত ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে না…’

অমিতাভ আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল থামিয়ে দিয়ে শ্যামলেন্দু বলে, ‘না রে কষ্ট-দুঃখ পাইনি। আমি জানি, সাধারণ-অসাধারণের ফারাক আছে। তোরা অসাধারণ তাই আমরা তোদের নাগাল পাব না। এটা তো সেই কলেজ জীবনেই নির্ধারিত হয়ে গেছে, তাই না?’

অমিতাভ শান্ত ভাবে বলে, ‘তুই রেগে আছিস, বলব রে তোকে সব বলব’ হঠাত্ই কথা আটকে যায় অমিতাভর। মনে হয় কোনও কষ্ট চাপা দিচ্ছে।

তখনই মনটা নরম হয় শ্যামলেন্দুর। জানতে চায়, ‘বল না, কী বলবি বল। যদি কোনও না বলা কথা থাকে বল।’

চাপা গলায় অমিতাভ বলে, ‘বলবো তোকেই বলব, কিন্তু এখনও ব্যস্ততা কাটেনি, আসলে কী জানিস এসেই মাতৃবন্দনায় ব্যস্ত হয়ে গেছি।’

অমিতাভর মাতৃবন্দনার কথায় উচ্ছাস ঝরে পড়ে শ্যামলেন্দুর কন্ঠে, ‘তার মানে তুই বাড়িতে পুজো করছিস, সেই আগের মত হুল্লোড়-আড্ডা, আর আমাদের একবারও বললি না।’

অমিতাভ বলে, ‘ওই আর কী।’

শ্যামলেন্দু সুর আরও চড়িয়ে বলে, ওই আর কী মানে কী রে, তুই যদি কটা দিন আগে ফোন করতিস আমি এবার পুজোর ছুটিতে যাওয়া ক্যানসেল করে তোর বাড়িতে চলে যেতাম…’ শ্যামলেন্দু বলেই চলে, শোন আমি নবমীর রাতে ফিরে আসছি, তুই যদি বলিস আমি বিজয়ার দিন তোর বাড়িতে যেতে পারি।’

অমিতাভ শান্তভাবে বলে, ‘বেশ তুই ঘুরে আয়, আমি তোকে ফোন করে নিচ্ছি।’

শ্যামলেন্দু উত্তেজিত হয়ে বলে, ‘ফোন করে নিচ্ছি মানেটা কী? আমি যাচ্ছি বিজয়ার দিন মাসিসা-মেসোমশাইকে বলে রাখবি’ কথাটা বলেই শ্যামলেন্দুর মনে হয়, জানা হয়নি তো ওঁরা এখন কেমন আছেন। শ্যামলেন্দু জিজ্ঞাসা করার আগেই অমিতাভ বলে, ‘তোর মনে হয় মা-বাবা এখনও কিছু শোনার মত অবস্থায় আছে।’

অমিতাভর প্রশ্নে রীতিমত ধাক্কা খায় শ্যামলেন্দু। কথা হারিয়ে ফেলে মনে করার চেষ্টা করে কতদিন কত বছর ওদের কোনও খবর নেওয়া হয়নি। শ্যামলেন্দুর নীরবতা ভেঙে অমিতাভই বলে, তুই আসলে ওরা খুশিই হবে বুঝলি।

অমিতাভর এই কথায় একটু স্বস্তি পায় শ্যামলেন্দু। এটা বুঝে যে দু’জনেই এখনও বেঁচে আছে। শ্যামলেন্দু জিঞ্জাসা করে কেমন আছেন ওঁরা?

অমিতাভ একটু চুপ করে থেকে গম্ভীর হয়ে বলে, ‘আছে একরকম।’ এরপর প্রসঙ্গ পাল্টে বলে, ‘তুই ছুটির দিনগুলো ভালো করে কাটাস।’

শ্যামলেন্দু বলে, ‘একটা সময় তোর বাড়িতে কত সময় কাটিয়েছি আমরা। তারপর তুই হঠাত্ ভ্যানিস হয়ে গেলি। বিদেশে উন্নতির সিঁড়ি বেয়ে উঠতে থাকলি, আমরাও যে যার মতো করে আমাদের সাধারণ জীবন-যাপনের বৃত্ত তৈরি করে নিলাম। আর আমাদের চারপাশের বয়স্ক মানুষগুলো সেই বৃত্তের বাইরে চলে যেতে থাকল। আমরা কেউই খেয়াল করলাম না।’ এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলতে পেরে শ্যামলেন্দু অনুভব করে নিজের ভিতরটা হলকা লাগছে।

অমিতাভ শুনছিল শ্যামলেন্দুর কথা। শ্যামলেন্দু থামার পর সে বলে, আসলে কী জানিস, সব কিছুই মূল্য দিয়ে অর্জন করতে হয়। আমি যেমন এখন- ‘বলতে গিয়ে থেমে যায় অমিতাভ। বলে ওঠে, থাক ওসব কথা, তুই ঘুরে আয় তারপর একদিন কথা হবে কেমন।’

শ্যামলেন্দু বলে, ‘তাই হবে। কিন্তু তুই মাতৃবন্দনায় মেতে উঠেছিস ভেবে ভাল লাগছে। এতদিন বিদেশে থেকেও এই ইচ্ছেটা বজায় রাখতে পেরেছিস এটাই আনন্দ, আমি শেষ দিন যোগ দিচ্ছি তোর সঙ্গে।’

অমিতাভ কেমন যেন চমকে ওঠা গলায় বলে, ‘কী বললি শেষ দিন যোগ দিচ্ছি,!’

শ্যামলেন্দু নির্বিকার ভঙ্গিতে বলে, ‘হ্যাঁ তাই তো, বিজায়া মানে তো মাতৃবন্দনার শেষ দিন।’

অমিতাভ কেমন হতাশ গলায় বলতে থাকে, ‘ও তাই তো বটে। বেশ তাই আসিস। আজ তবে রাখি।’ বলেই ফোনটা কেটে দিল অমিতাভ।

শ্যামলেন্দু হকচকিয়ে গেল। বিদেশে প্রতিষ্ঠিত প্রচুর অর্থ রোজগেরে একজন মানুষ এতটা বিমর্ষ হতাশ কেন। ওকে দেখে সেদিনও খুব সুখী বলে মনে হয় নি। আজও যেভাবে ফোনটা রেখে দিল কেমন যেন একটা যন্ত্রণা-দুঃখ বয়ে বেড়াচ্ছে বলে মনে হল। সব বলবে বলে কী বলতে চাইল, মনটা কেমন আনচান করতে শুরু করলো শ্যামলেন্দুর।

পুজোর উচ্ছ্বাস উদ্দীপনা থেকে নিজেদের একান্ত দূরত্বে রেখে কয়েকটা দিন কাটিয়ে নবমীর বিকেলে নিজের বাড়িতে ফিরে এল শ্যামলেন্দু। সে না চাইলেও মেয়ের জন্য তাকে এখানে ফিরতেই হয় নবমীর রাতে। বন্ধুদের সঙ্গে একটু ঘুরতে যায় মেয়ে। শ্যামলেন্দুরা এই ছাড়টা ওকে দেয়। নিজেও পাড়ার প্যান্ডেলে গিয়ে বসে। আজ মন্ডপ থেকে তাড়াতাড়ি বাড়ি চলে আসে। বারবার মনে হয় অমিতাভ ফোন করতে পারে, যদিও সে ঠিক করে নিয়েছে ফোন না করলেও কাল সে অমিতাভর বাড়িতে যাবে। পুরনো স্মৃতি, পুরনো দিনগুলোকে একটু ফিরে দেখার তাগিদ মনটাকে ব্যাকুল করছে বুঝতে পারে শ্যামলেন্দু। চারপাশের ঢাকের আওয়াজ আলোর রোশনাই ছাড়িয়ে শ্যামলেন্দু পিছিয়ে যেতে চায় অনেক-অনেকটা পথ। বারান্দার চেয়ারে বসে মাথা হেলিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে শ্যামলেন্দু। মলির ডাকে যখন ঘুম ভাঙে, তখন রাত অনেকটা পেরিয়ে গেছে। রাতের খাওয়ার সময়েই মলিকে জানায় কাল সকালে সে অমিতাভর বাড়ি যাচ্ছে।

মলি বলে, ‘কিন্তু তোমার বন্ধু তো ফোন করল না। ওর বাড়িতে পুজো আর তুমি যেচে চলে যাচ্ছো, কী জানি বাবা।’ মলির গলায় বিরক্তি।

শ্যামলেন্দু বলে, ‘সেদিনই বলে দিয়েছিল তো, আবার কী ফোন করবে।’

মলির বিরক্তি চাপা দিল বটে, তবে মনে মনে শ্যামলেন্দুও ভেবেছিল আজ অমিতাভ একটা ফোন করবে। বিছানায় শুয়ে লম্বা জার্নির ক্লান্তি শ্যামলেন্দুর ঘুমকে গাঢ় করে তুলল। মাঝরাতে মলির ধাক্কায় ঘুম ভাঙল – ‘আরে কী কুম্ভকর্ণের মতো ঘুমোচ্ছো? তোমার মোবাইলটা যে বেজে চলেছে।’

শ্যামলেন্দু দেখে অমিতাভর ফোন। কিন্তু এত রাতে কেন। ফোন ধরতেই অমিতাভ জানায়, ‘কাল তুই আসছিস তো?’

শ্যামলেন্দু বলে, এতক্ষণে তোর জানার সময় হল, আমি ভাবছিলাম কখন তুই ফোন করবি। আর এই মাঝরাতে ঘুম থেকে তুলে-‘শ্যামলেন্দুর কথা শেষ করার আগেই অমিতাভ বলে, ‘সরি রে, আসলে ওই যে বললাম মাতৃ আরাধনা। এইমাত্র শেষ হল তো তাই মনে হল তোকে একবার মনে করিয়ে দিই’। কেমন বিষাদ যন্ত্রণাময় ভঙ্গিতে কথা বলছে অমিতাভ।

শ্যামলেন্দু বলে, ‘এত কষ্ট পাবার কী আছে, বিজয়া পড়েছে তো আবার সামনের বছর মা আসবেন।’

এই কথার কেমন ব্যঙ্গার্থক একটা হাসির ধ্বনি উঠল অমিতাভর স্বরে, তারপর অদ্ভুত ভঙ্গিতে কেটে কেটে উচ্চারণ করল, ‘সব আগমনিতে সবার মা আসেন না রে শ্যামু।’

শ্যামলেন্দু কথাটার মানে বুঝতে পারল না, এর মধ্যে অমিতাভ বলল, ‘কাল সকাল সকাল চলে আসিস, মাকে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।’

শ্যামলেন্দু বলে, ‘পুরনো আর কোনও বন্ধুকে বলেছিস খুব মজা হবে আর কেউ থাকলে।’

অমিতাভ একটু চুপ করে থেকে বলে, ‘বিজয়া মজা করার দিন নয় রে, তুই আয়, বুঝতে পারবি।’ বলেই ফোনটা রেখে দিল অমিতাভ।

কেমন যেন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল শ্যামলেন্দু, কেমন হেঁয়ালি করে কথা বলছে ছেলেটা…

পরের দিন শ্যামলেন্দু যখন অমিতাভর বাড়িতে পৌঁছাল তখন বাইরে একটা বড় খাট এনে রাখা হয়েছে। ফুল দিয়ে সাজানো হচ্ছে সেই খাট। অমিতাভর দক্ষিণ কলকাতার পুরনো ঘরানার বনেদি বাড়িতে ওদের অনেক আত্মীয়-স্বজন উপস্থিত। শ্যামলেন্দুর যেন কেমন বোকা বনে যাওয়ার অবস্থা। অমিতাভ শ্যামলেন্দুকে দেখে এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরল। বলল, ‘মা কাল মাঝরাতেই চলে গেলেন। চেষ্টা করেছিলাম জানিস, নামী ডাক্তার, দামি ওষুধ, কিন্তু দেরি হয়ে গেছিল। আরও আগে যদি লড়াই শুরু করা যেত…’ বলতে বলতে চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে আসে অমিতাভর। সামলে নিয়ে বলে আয় অসিতদাদা তোর কথা খুব বলে। আয় দেখা করিয়ে দিই। অসিতদাও এখন একেবারেই অথর্ব। কোনওরকমে চলাফেরা করে। তবে স্মৃতিশক্তিটা এখনও প্রখর। কথা বলতে বলতে অমিতাভ শ্যামলেন্দুকে নিয়ে আসে অসিতদাদার কাছে।

শ্যামলেন্দুকে জড়িয়ে ধরে অসিতদাদা বলতে থাকে, ‘তোমরা কত আসতে তো শ্যামুদাদা। বৌদিমণি কতবার তোমাদের কথা জিজ্ঞাসা করত। দাদাবাবু খুব চেষ্টা করেছে শেষবেলায় এসে। কিন্তু কিছুই হল না বলতে বলতে কাঁদতে থাকে অসিতদাদা।

ভেতরে ভেতরে কেমন অস্বস্তি হতে থাকে শ্যামলেন্দুর। এরই মধ্যে স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলা অমিতাভর বাবাকেও দেখে এল শ্যামলেন্দু। এই বাড়ি এখানকার ঘরের সঙ্গে শ্যামলেন্দুর কলেজ জীবনের কত স্মৃতি। কিন্তু আজকের বাস্তবময়তা বড় কর্কশ, তেতো।

আয়োজন সম্পূর্ণ হতে হতে দুপুর গড়িয়ে গেল, তারপর শ্মশান যাত্রা। সবকিছু মিটতে অমিতাভ শ্যামলেন্দুকে ডেকে একটা ফাঁকা জায়গায় বসে, শ্যামলেন্দু বলে, তুই আমাকে বলতে পারতিস মাসিমাকে নিয়ে এরকম একা লড়াই করছিস!’

অমিতাভ বলে, ‘আসলে আমার সাফল্যের শরিক করিনি তোদের, এই কঠিন সময়ে তোদের সাহায্য কী করে চাই বল তো?’

শ্যামলেন্দু জানতে চায়, ‘তোর পরিবারের কেউ আসেনি?’

অমিতাভ বলে, ‘দু’বার বিচ্ছেদ হয়েছে। প্রথম পক্ষের একটা মেয়ে আছে। ওরা সবাই নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত।’ এরপর একটু চুপ করে থেকে অমিতাভ বলতে থাকে, ‘মা বারবার বলতো, সাধারণ হতে, আর আমি চাইতাম অন্যদের চেয়ে আলাদা হতে, একেবারে ব্যতিক্রমী। কিন্তু তা যে মানুষকে এভাবে একা করে দেয়, নিঃস্ব করে দেয় বুঝতে পারিনি। কতদিন মা-বাবাকে দেখতে আসিনি, ব্যস্ত আর ব্যস্ত। মা বলত, এত ছুটিস না, ক্লান্ত হয়ে পড়বি। আমি ভাবতাম না ছুটলে এগিয়ে যাব কীভাবে?’

শ্যামলেন্দু জিজ্ঞাসা করে, ‘মাসিমা বুঝেছিল যে তুই ফিরে এসেছিস?’

‘হ্যাঁ, তা বুঝতে পেরেছিল, কথা বলতে পারত না তখন শরীর জুড়ে ছড়িয়ে পরেছে মারণব্যাধি। তবে চোখের দৃষ্টি বলে দিত আমাকে চিনতে পারছে।’ হঠাত্ই অমিতাভ জানতে চায় আচ্ছা শ্যামু আমি যদি সাধারণ হতাম সবার মতো, মা-বাবা কাবেরীকে নিয়ে সাধারণ জীবন কাটাতাম এই দেশে এই শহরে তাহলে তো জীবন অন্যরকম হত, তাই না বল!’

শ্যামলেন্দু কোনও উত্তর দিতে পারে না, ভাবে এ কোনও অমিতাভ! যার সাফল্যে ওরা ঈর্ষা বোধ করত, যার উন্নতির গল্প শুনিয়ে ওর বান্ধবীরা তাদের স্বামীদের কটাক্ষ করত, সেই অমিতাভই চূড়ান্তভাবে হেরে বসে রয়েছে। সর্বক্ষণ শরীর জুড়ে বয়ে বেড়াচ্ছে বিজয়ার বিষাদ। শ্মশানের এক প্রান্ত থেকে দেখা যায় দূরে গঙ্গার ঘাটে প্রতিমা বিসর্জন দিয়ে ফিরে যাচ্ছে অনেকে, ঢাকের তালে বিসর্জনের বাদ্যি।

আচমকাই অমিতাভ হাত ধরে শ্যামলেন্দু বলে ওঠে, ‘তুই শিখবি অমিত?’

বিস্ময়ভরা চোখে অমিতাভ জানতে চায়, ‘কী?’

‘সাধারণ হওয়া’ শ্যামলেন্দুর চোখে তখন অদ্ভুত প্রত্যয় বলে, ‘আমি তোকে শেখাব সাধারণ হওয়া। সকলের সঙ্গে মিশে থাকা, আড়ালে থাকা, আবডালে থাকা।’

শ্যামলেন্দুর কথার আবেগ ক্রমশ গ্রাস করে অমিতাভকে, বলে, ‘সত্যিই শেখাবি তো? আমি নতুন করে শিখতে চাই, সাধারণ হওয়া, অনেকের সঙ্গে মিশে থাকা।’

শ্যামলেন্দু বলে, ‘এ বিষয়ে আমার চেয়ে ভাল শিক্ষক কেউ নেই রে। আমি তোকে শেখাব দূরে ওই যে দেখছিস প্রতিমা বিসর্জন দিয়ে সবাই ফিরে যাচ্ছে, ওরা কাল থেকে আবার আগমনির প্রস্তুতি নেবে তোকেও আমি নতুন করে আগমনির প্রস্তুতি শেখাব।’

 

অমিতাভ শক্ত করে চেপে ধরে শ্যামলেন্দুর দুটো হাত। দূরে বিসর্জনের বাদ্যি যেন ক্রমশ অন্য ছন্দ খুঁজে পেতে চায়।

-০-