বৈঠক- অভিনব গুপ্ত

সাপ্তাহিক বৈঠকে তখনও কেউ হাজির হয়নি।ছুটির দিনের সকালবেলায় পাড়ার নরুর চায়ের দোকানে একটা জম্পেশ আড্ডা বসে আমাদের।দোকান ঘরের ছোট্ট খুপরির মধ্যে আমরা বসি না,কারণ গোটা দোকানটা দখল করে রাখলে নরুর ব্যবসার ক্ষতি,তাই আমরা দোকান লাগোয়া বিশাল বটের বাঁধানো চাতালে আড্ডা বসাই।নরেন্দ্র বা নরেন কিংবা নরুর দোকানকে কেন্দ্র করে আসর বসলেও আমরা বটের চাতালকে প্রাধান্য দিয়েই বলে থাকি বটতলা কাফে। দেখতে দেখতে আর দু তিনজন এসে পড়ল। তবে আসরের যিনি মধ্যমনি সেই হরেণ তখনও হর্ণ বাজাতে বাজাতে আসেন নি। নাম টা সেকেলে হলেও বিচার বিবেচনা ও বিশ্লেষণে হরেণ এক্কেবারে ঝাক্কাস।ওর কথার হুলের জন্য ওকে আমরা হর্ণেট বলেই ডাকি। কী ব্যাপার বল তো চিতু,হর্ণেটের এখনও পাত্তা নেই।কথাটা আমাকে উদ্দেশ্য করে বলা,আমার চিত্রাংশু নামটা চিতুতে ঠেকেছে আড্ডার বন্ধুদের সৌজন্যে।অবশ্য সবারই এরকম নাম পাল্টেছে।প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার দরকার হল না,কারণ যাকে নিয়ে আলোচনা সেই হর্ণেটকে আমরা সবাই উপস্থিত হতে দেখলাম।আমরা সকলেই উদগ্রীব,কিন্তু হর্ণেট গুন গুন করে কি একটা গান গাইছে।বাংলা গান সুরটাও চেনা কিন্তু মনে করতে পারছি না আমরা কেউই।কাজেই সকলেই প্রায় এক সঙ্গেই জিজ্ঞাসা করে বসলাম -কি গান গাইছিস?–আরে হেমন্তের সুরে প্রতিমার গান।হর্ণেট নিরুত্তাপ ভঙ্গিতে জবাব দিল।আমাদের ধন্দ তখনও যায়নি–কোন গানটা?-আঁধার আমার ভাল লাগে।তারা দিয়ে সাজিয়ো না আমার আকাশ।–তা হঠাত্ এ গান কেন?-দ্যাখ!কিছুদিন ধরে কেন্দ্র আধার আধার করে পাগলা করে দিচ্ছে সবাইকে।আমাদের রাজ্য প্রথমে গোঁ ধরে বসেছিল-তানা শাহি নেহি চলেগা বলে,এখন অবশ্য চুপ মেরে গেছে,বুঝেছে বোধহয় আঁধার বিনে গতি নাই।কিন্তু দ্যাখ, কবে বাংলার গীতিকার এই আধার নিয়ে গান লিখে গেছেন,শিল্পী গান গেয়েছেন,গানটা হিটও করেছিল।–তবে ওটাতে তো চন্দ্রবিন্দু আছে!-জানি।চন্দ্রবিন্দু তো মরে গেলে লাগে,এখন মরতে গেলেও আধার লাগবে,এটা যে হওয়া উচিত সেটাই তো গানে কায়দা করে বলা আছে রে।–বুঝলাম,কিন্তু পরের লাইন?-ওই তারার কথা বলছিস তো,এখানে তারা অর্থে আদার আইডেনটিটি,মানে রেশন কার্ড,ভোটার কার্ড,প্যান কার্ড,এইসব আর কি।-আমরা বললাম তোর যেমন কথা,যে সময় গানটা লেখা হয়েছে রেশন কার্ড ছিল বাকিগুলো ছিলো?-ভোটের কার্ড ছিল তবে অন্য তারিকায়।কবিরা সত্য দ্রষ্ট্রা,ভবিষ্যত দ্রষ্ট্রাও,কত আগে ব্যাপারটা ভেবেছে বল তো!এখন সব ক্ষেত্রেই আধার মাস্ট,মরার ব্যাপারটা বাদ ছিল এখন সেটাকেও যুক্ত করা হল।–তবে মৃত্যুর বিষয়টা না থাকলেও জিন্দাকালীন আধার কিন্তু আমাদের দেশে অনেক কাল ধরেই প্রচলিত আছে।হর্ণেটের এই কথায় আবার অন্য হুল বেরুতে চলেছে বুঝে,আমরা জানতে চাইলাম -সেটা আবার কী রকম?–শ্রীম পড়ে দেখিস ঠাকুর সবাইকে দীক্ষে দেন নি,যাঁদের আধার আছে তাদেরই শুধু দিয়েছেন।যত বিশাল মাপের মানুষই হোন না কেন,সবার মধ্যে আধার থাকে না,কেশবচন্দ্র সেন,বিনয়কৃষ্ণ গোস্বামী এঁরা কেউই তো দীক্ষে পান নি ঠাকুরের কাছে,যে পাবার সেই পেয়েছে।শুধু ঠাকুরই বা বলি কেন ঠাকুকের জন্মের বহু আগে থেকেই এই আধার কনসেপ্টটা ছিল।তবে ঐ আধার আর এই আধারে সামান্য ফারাক আছে।শুধু আমাদের দেশে নয় সব দেশে সব যুগেই আধার ছিল।এর জন্য অবশ্য কোন কার্ড সরকারি তরফে দেওয়া হয়নি,যা হয়েছে সবই বেসরকারি তরফে,এনজিওর মাধ্যমে।–বুঝলাম কিন্তু এই মরার সঙ্গে আধারের যোগটা তো অনেকটা মরার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো।–তা বলতে পারিস।তবে মরলে পরে তো ঝক্কি পোয়াতে হয়,অন্যদের তো হয় না তাই হলো।ডাক্তাররা আধার ছাড়া ডেথ সার্টিফিকেট লিখতে পারবেন না,পোড়াতে গেলে,কবর দিতে গেলেও আধার লাগবে,নইলে বেওয়ারিশ লাশের সঙ্গে রাখতে হবে ওয়ারিশ লাশকে।যা কিছু বৈষম্য এক মূহুর্তে দুর হয়ে যাবে,আহা এটা তো একটা ইতিবাচক দিক,এমন সাম্যের কথা মার্কস সাহেবের মাথাতেও আসেনি।তবে কী জানিস সমস্যা বেঁধেছে মৃত্যু পরবর্তী জগতে,স্বর্গ-নরক,বেহেস্ত,হেভেন হেলের ইনফ্রাস্ট্রাকচার তো আমাদের দেশের মতোই শৈশব দশাতেই পরে আছে,তাই সেখানে কাকে কী ভাবে জায়গা দেওয়া হবে বলা মুশকিল। হঠাত্ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে হর্ণেট বলে উঠে -আজ এখানেই ইতি টানছি, বাকিটা পরদিন বলবো।

আমাজনে কেনাকাটি করতে ক্লিক করুন উপরে

,