উজ্জ্বল সম্মান–অভিনব গুপ্ত

দিন আড্ডায় পৌঁছুতে আমার খানিক দেরি হয়ে গিয়েছিল।যখন হাজির হলাম তখন সরলের কথাটা কানে এলো–কথায় আছে না ম্যান প্রপোজেস গড ডিসপোজেস,এটাও অনেকটা সেরকমই।হর্ণেট সে কথার রেশ ধরে হাসতে হাসতে বলে-এটা হক কথা,কিন্তু কি জানিস,মানুষের ভবনা চিন্তা এক থাকলেও,ভগবান পান্টায়,বলতে পারিস সে ব্যাটা আদ্যোপান্ত গিরগিটি।নিজের কাজ হাসিল করতে রঙ পাল্টাতেই থাকে।আর বর প্রদান,মানে গ্যাস দেওয়া তো তাঁর প্রধান বৈযিষ্ট্য।

ভিটামিন আপত্তি জানায়।অলক দাস সংক্ষেপে এডিকে আমরা ভিটামিন বলেই ডাকি।বামপন্থী ঘরানার মানুষ হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করতে ভিটামিন ভগবানকে শুধু অস্বীকারই করে না,ভগবান নামটা মুখেও আনতে চায় না,এ হেন ভিটামিন অবশ্য অবস্থার ফেরে এক সামন্ত মানসিকতায় চলা মনিবের দাসত্ব করে চলে সারাদিন,তবে বটতলা কাফের এই আড্ডাতে আসলেই তাঁর বামপন্থী বিপ্লবী চেতনা চাগার দেয়,তার প্রভাবে এদিনও ভিটামিন তাঁর বামপন্থী জ্ঞানের ভান্ডার একেবারে উপুর করে দেয়–আসলে সমস্ত ব্যাপারটাই কার্য-কারণের সঙ্গে যুক্ত।যখন আমরা প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়ে কোন কাজে অসফল হই,তখন ভগবানের কথা বলে সান্ত্বনা খুঁজি।মনে রাখতে হবে মানুষকে পরিবেশ বা পরিস্থিতির দাস  বানাতে এটাও রাষ্ট্রের একটা চক্রান্ত।ভিটামিনের এই কথার রেশ ধরে ফুট কাটে সরল-তা তুমি যখন তোমার মনিবের দাসত্ব কর,তখন এই চক্রান্তের কথা মনে থাকে না কেন?ভিটামিনের কানে খোঁচাটা আদৌ ঢুকলো বলে মনে হল না।ভিটামিনের স্বভাব এরকমই,যখন সে বলে তখন সে অন্যের কথা শোনে না,অন্যকে বলতেও দেয় না।তাই সে বলেই চলে লেনিন তাঁর কি করা উচিত বইতে থার্ড চ্যাপটারে এর বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেছেন।লেনিনের বইটার নাম শুনলেও আমরা অনেকেই বইটা পড়ি নি ফলে ভিটামিনের কথায় কেউই আর তর্ক বাড়াই না।এরই মধ্যে ভিটামিনের কথায় সায় দিয়ে মথা ঝাকাতে ঝাকাতে বাসুদেব চক্রবর্তী বলতে থাকে-ব্যাপারটা বুঝতে হবে।

বাসুদেবও নিজেকে বামপন্থী বলে দাবি করে,তবে নিজের ব্রাক্ষণত্বকে আড়লে আবডালে নিজের কাজ কর্মের মধ্যে বজায় রাখে,পৈতেধারী বামুনরা যেমন অলেক সময় পৈতে লুকিয়ে প্রগতিশীলতার ভান করে বাসুদেব অনেকটা সেরকম।ওর গোটা নামটাই তিনটে পদবীর যোগফল,অনেকটা মাথা বুক আর লেজের সমষ্টিতে গড়া পতঙ্গের মতো। তার উপর আবার মাঝে মধ্যে যুক্তির খেই হারিয়ে আলোচনার গতি ধারাকে পাল্টে দেওয়ার চেষ্টা করে।তাই ওকে আমরা প্রায় সকলে   উচ্চিংড়ে বলে ডাকি।-উচ্চংড়ে বলল–মানুষই ভগবানের স্রষ্টা।কথাটা আমাদের কাছে কেমন যেন ভূতের মুখে রাম নামের মতো শোনায়,আমরা একটু অবাক হই।হর্ণেট বলে ওঠে -এতদিনে একটা কেজো কথা বলেছিস।খুশি হয়ে উচ্চিংড়ে আর কিছু বলতে যাচ্ছিল,হর্ণেট থামিয়ে দেয়।–মুখে রহস্যময় হাসি ফুটিয়ে হর্ণেট জিজ্ঞাসা করে–ভগবানের আয়ু কতদিনের বল তো?আমরা সবাই চুপ আছি দেখে হর্ণেট নিজেই উত্তর দেয়–গণতান্ত্রীক পরিকাঠামোয় খুব বেশী হলে পাঁচ বছর।তবে নতুন ভগবান না পাওয়া গেলে আয়ুটা সাধারণত পাঁচের গুণিতকে বাড়তে থাকে।-আমরা সমস্বরে বলে উঠি-তুই কি ভোটের কথা বলছিস হর্ণেট?হর্ণেট আমাদের কথার উত্তর না দিয়ে বলে যেতে থাকে-ভগবান হোক বা ভগবানের চ্যালা চামুন্ডা,আগে ভাগেই জানিয়ে দেয় নতুন ভগবানের পরিকল্পনাটা কি!-তুই ইলেকশন ম্যানিফেস্টোর কথা বলছিস?-হর্ণেট এবারও কোন উত্তর না দিয়ে বলে ষেতে থাকল–রাষ্ট্রের সম্পদ বাড়াতে ভগবানের এবার যে সব পরিকল্পনা ছিল তার মধ্যে একটা হল উজ্জ্বল যোজনা।রান্নার গ্যাসের উপর থেকে ভরতুকি তুলে দেওয়ার প্রস্তাব।গোটা দেশ একেবারে হৈ হৈ করে উঠলো।ভগবান দেখলো এ ভাবে ভরতুকি বিষয়টাকে এক কোপে বলি দেওয়া যাবে না।বরং গণতান্ত্রীক দেশে আড়াই পেঁচে ভরতুকি ভ্যানিশ করলে আর যাই হোক এত চিল্লা মিল্লি হবেনা।তাই প্রথমেই বাদ দেওয়া হল দশ লাখি সম্প্রদায়কে।এরপর হল ভরতুকির টাকা দেওয়া হবে ব্যাঙ্ক একাউন্টে।পরে তার সঙ্গে যুক্ত হল আধার কার্ড,মানে গ্যাস গ্রাহকের আয়ের হদিস জেনে নিল পেট্রোলিয়াম মন্ত্রক।তূণের আসল তীরটা ভগবান  তখনও নিক্ষেপ করলেন না।আচমকাই ভগবানের চোখে জল দেখা গেল। কারণ নাকি দেশের বহু গরীব গুর্বো মহিলা আছেন যারা কাঠের উনুনে রান্না করেন,তাই এদের কষ্টে,বিগলিত করুণা জাহ্নবী হয়ে ভগবান বেহালায় বেদনার সুর তুললেন।আবেদন করলেন দেশের সহৃদয় মানুষের কাছে তারা যদি তাদের ভরতুকি ছেড়ে দেন তাহলে সেই টাকায় গরীব মা বোনদের ঘরে গ্যাসের সিলিন্ডার ঢুকতে পারে।অনেকেই এই আবেদনে সারা দিলেন,গ্যাস দেওয়া হল গরীব পরিবারে,এবার ভগবানের মনে হল ,গ্যাসের যাবতীয় ভরতুকি তুলে নেওয়াই শ্রেয়,তবে একবারে করা যাচ্ছে না,কারণ ভক্তরা ক্ষেপে গেলে পুজো দেবে না,তাই ধাপে ধাপে ভরতুকি তোলা হবে।এখন অবশ্য প্রতিমাসে ৪টাকা করে দাম বাডান হয়েছে।গ্যাস দেওয়ার কি অপার মহিমা বুঝতে পারছিস!ভগবান সব পারে রে।–উচ্চিংড়ে বলে –ব্যাপারটা বুঝতে হবে।–তুই বোজ ভিটামিনকে নিয়ে আমি চললাম,বলে হর্ণেট চলে গেল সে।

আমাজনে কেনাকাটি করতে ক্লিক করুন উপরে

,