বধূহত্যা ও অপাপবিদ্ধ সমাজ—–নিত্যানন্দ ঘোষ

কলকাতা মহানগর সংলগ্ন এলাকায় পরপর বধূহত্যার ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগের।শ্রাবন্তী মিত্রের আত্মহনন তো বধূহত্যারই নামান্তর।তিনি বিবাহ পরবর্তী জীবনে উচ্চশিক্ষায় নিজেকে শিক্ষিত করতে চেয়েছিলেন।বাংলা সাহিত্যে স্নতকোত্তর পাঠের পর আরও পড়াশোনা করতে ছেয়েছিনেন,শ্বশুর বাড়ি থেকেই।তাই নিয়েই অশান্তি। শ্রাবন্তীর শ্বশুর-শ্বাশুড়ি চেয়েছিলেন,ঘরের বৌ,লেখাপড়া না করে গৃহকাজে ব্যস্ত থাক,গৃহকর্ম নিপুণা বৌমাই তাদের কাম্য ছিল।শ্রাবন্তীর বাড়ির লোকজনদের ডেকে এনে তারা সোনারপুরে সালিশি সভাও বসিয়েছিলেন।শ্রবন্তীর বাড়ির লোকজনকে চাপ দেওয়া হয়,যাতে তারা তাদের মেয়েকে আর পড়াশোনার দরকার নেই বলে বোঝান।আর এই ঘটনার অভিঘাত সহ্য করতে না পেরে আত্মগ্লানিতে ২৫ বছরের শ্রাবন্তী আত্মহননকেই শ্রেয় বলে বিবেচনা করেন।গত অক্টোবরেই পড়াশোনাকে কেন্দ্র অশান্তির জেরে রহস্য মৃত্যু হয়,যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী মিতা দাসের।ওই একই সময়েই বিষড়ার পায়েল পাল তার পাঁচ মসের কন্যা সন্তানকে রেখে আত্মহত্যা করেন।অশোকনগরের কল্যানগড় এলাকার ডাকবিভাগের কর্মী প্রীতম নাগের সঙ্গে পরিচয় হয় অশোকনগরেরই শেরপুর এলাকার তুলি নাগের।তাদের বিয়ে হয়,তারপর গোয়াতে বেড়াতে নিয়ে গিয়ে তুলিকে খুন করে প্রীতম।খবরের কাগজে প্রতিদিন এরকম খবর শিরোনামে উঠে আসছে।এভাবেই এভাবেই এগিয়ে চলেছে আমাদের অপাপবিদ্ধ সমাজ

সারা পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে পরের পর এই বধূ হত্যা,বধূর আত্মহননের ঘটনা ঘটেই চলেছে।আর ধারাবাহিক এই ঘটনাপরম্পরা প্রমাণ করে.সাওত্রও পুরুষতন্ত্রের নিগড়ে বাধাঁ আমাদের তথাকথিত সমাজব্যবস্থায় আজও কোন পরিবর্তন ঘটেনি।আমরা এখনও মধ্য যুগেই পড়ে আছি।দেশে আইন আছে,সংবিধান আছে,প্রশাসন আছে,সেগুলির প্রায়োগিক দিক থেকে দেখলে দেখা যায় যে নারী স্বাধীনতার বিষয়টি পুরোপুরি উপেক্ষিত।রাজনৈতিক নেতারা,বিশেষ করে শাসক দলের,মুখে নারী প্রগতির কথা বলেন,নারীদের অর্ধেক আকাশের অংশিদার হওয়ার কথা বলেন,কার্যক্ষেত্রে তার উল্টোটাই করেন।এদেশের স্বাধীনতার ৭০ বছর পার করেও সামাজিক মননের কোন বদল আসেনি।উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে বধূ হত্যা,গার্হস্থ্য হিংসা,যৌন নিপীড়ন,কন্যা ভ্রুণ হত্যা,ডাইনি অপবাদে মৃত্যু,পণের দাবিতে বধূ হত্যা,বিপরীত লিঙ্গের প্রতি(স্ত্রী,তৃতীয়)নিপীড়নও চুড়ান্ত অবহেলা।শ্বশুর বাড়ির লোকেরাই বধূ হত্যার ঘটনার জন্য বেশী দায়ী,কখোন আবার স্বামী প্রধান দোষী।কোন সময় আবার পুরুষটি নীরব থেকে বধূ নির্যাতনে সায় দেয়।অনেক শিক্ষিত পরিবার এখনও মনে করে কন্যা সন্তান জন্ম দেওয়া পাপ।এই মনসিকতা তথাকথিত শিক্ষিত অশিক্ষিত সমাজের পুরুষতান্ত্রীকতায় বিশ্বাসী সকল মানুষের মধ্যেই আছে।

কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের আওতাধীন জাতীয় সংকলন ব্যুরোর সর্বশেষ রিপোর্টে প্রকাশ পেয়েছে,বধূ হত্যা ও গার্হস্থ হিংসায় এ রাজ্য ২০১৩-২০১৫ পর্যন্ত প্রথমস্থানে রয়েছে।অথচ পশ্চিমবঙ্গে গার্হ্যস্থ প্রতিরোধ আইন লাঘু হয়েছে ২০০৫ সালে।কেন আইন থাকা সত্ত্বেও গার্হস্থ্য হিংসার বৃদ্ধি হতে থাকে।বলা হয় মানুষ এখন অনেক সচেতন তাই ঘটনার পরেই অপরাধের নথিবদ্ধকরণ হয়ে যায়।তাই যদি হয় তাহলে অপাধীরা শাস্তি পায় না কেন?কারণটা অনেকেরই জানা,অপরাধীরা থাকে শাসক দলেরই ছত্রছায়ায়।অপরাধ করেও তারা মন্ত্রী,নেতা,পুলিশের সাহায্য নিয়ে পার পেয়ে যান।তাই বাড়তেই থাকে অপরাধ প্রবণতা।নারী মুক্তির লড়াই জোরদার হবে পুরুষতন্ত্রের মূলে কুঠারাঘাত করতে পারলে।পুরুষতন্ত্র,সামন্ততন্ত্রের সঙ্গে রকমারি কুসংস্কারের গাটবন্ধন নারী নির্যাতনকে গতি দেয়।তাই তৈরি করতে হবে সেই সচেতনতা যা এই গাটবন্ধন থেকে সমাজকে রক্ষা করতে পারবে,মুক্ত বিজ্ঞান চেতনার আলোর উদ্ভাস ছড়িয়ে দেবে সমাজের সর্বস্তরে।সেটাই হবে নারী নির্যাতন প্রতিরোধের সত্যিকারের প্রতিষেধক।