হাতি মেরে সাথী——-অভিনব গুপ্ত

বটতলা কাফেতে আমরা বসে গল্প জমিয়েছি,অথচ হর্ণেটের দেখা নেই।আচমকাই দেখি সে ব্যাটা যেন কোন একটা গানের সুর ভাঁজতে ভাঁজতে আসছে।কাছে আসতে বুঝলাম কিশোরকুমারের এক অনবদ্য গান–হাতি মেরে সাথি ছবির সেই চল চল মেরে সাথি  ও মেরে হাতি গাইতে গাইতে আসছে হর্ণেট বাবাজি!–জিজ্ঞাসা করলাম, কিরে এত পুরনো দিনের গান গাইছিস সকালবেলায়?-হর্ণেট উত্তর দেয়-ভাবছিলাম বনের হাতিকে পোষ মানিয়ে মানুষ তাকে দিয়ে কি পরিশ্রমের কাজই না করিয়ে নিয়েছে যুগ যুগ ধরে।গুগুল বলে ওঠে-সবচেয়ে আশ্চর্য ঘটনা হল হাতি মেরে সাথি রিলিজ করেছিল আন্তর্জাতিক শ্রমদিবসের দিন,১৯৭১ সালে।-ভিটামিন সেই কথার সূত্র ধরে বলে ওঠে-ঐ দিন এরকম একটা ছবি রিলিজ হওয়ার অর্থ হল শ্রমজীবী মানুষের শ্রম থেকে মুক্তি নয়,শ্রম থেকে বিচ্যুতি,ভারতে সত্তরের দশক থেকেই শুরু হয়েছে মানুষের বদলে যন্ত্রের ব্যবহার।মানুষকে ব্রাত্য করে যন্ত্রের ব্যবহার শুরু হলে সমাজে প্রাথমিকভাবে কি ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে সে বিষয়ে লেলিন তাঁর রাষ্ট্র ও বিপ্লব বইতে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন।-হর্ণেট জিজ্ঞেস করল-লেনিন ব্যাখ্যা দিয়েছেন তো বুঝলাম,কিন্তু আজকের পৃথিবীতে যে ভাবে মানব শক্তিতে এড়িয়ে যন্ত্রের ব্যবহার হচ্ছে,তাতে শ্রেণী বৈষম্যের ব্যবধানটাই দিকে দিকে চওড়া হচ্ছে না কি?-উচ্চিংড়ে বলল-ব্যাপারটা বুঝতে হবে।সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্র তার শোষণের অভিমুখ পাল্টায়,নিজের ক্ষমতাকে কায়েম রাখতে।এটা কোথায় যেন পড়েছি।আইদার স্ট্যালিন অথবা মাওয়ের কোন লেখায়,এই ভিটামিন বল না,বলে ভিটামিনের দিকে ইঙ্গিত করে।ভিটামিনও গম্ভির মুখে ভাবতে থাকে।আলোচনাটা ভিটামিন আর উচ্চিংড়ের হাতে ছেড়ে দিলে তা যে কয়েক পাতার মুখস্ত বিদ্যাতেই আটকে যাবে বুঝে হর্ণেট বলে ওঠে–ওসব অর্থনীতি,সমজনীতির বই পড়া জ্ঞানের কথা বাদ দিয়ে,এবার বলতো বাবা!হাতি ক রকম?- কেন দু রকম,এশিয়ার আর আফ্রিকার হাতি,উচ্চিংড়ে বলার আগেই সরল উত্তর দেয়।সরলের উত্তরের রেশ ধরে গুগুল বলে -এটা কি জানিস রঙের দিক থেকেও হাতিকে দুভাগে ভাগ করা যায়,কালো আর সাদা।যদিও সাহেবদের মতো সাদা নয় খানিকটা পিঙ্কিস আর লালচে খয়েরি।বর্তমান থাইল্যান্ডে এরকম কিছু হাতি এখনও দেখা যায়।সাদা হাতি বরাবরই সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে এসেছে,একই সঙ্গে সাদা হাতি ঐতিহ্য ও সমৃদ্ধির প্রতীক বলেও চিহ্নিত।শুধু এদেশের পুরাণেই নয় সব দেশের পুরাণেই যেখানে হাতির প্রসঙ্গ এসেছে সেখানে সাদা হাতিকে আলাদা মর্যাদা দেওয়া হয়েছে।জাতকের গল্পতে পাওয়া যায় গৌতম বুদ্ধও সাদা হাতি হয়ে জন্মেছিলেন।ভিটামিন আর চুপ থাকতে পারল না,বলে উঠল–সব বোগাস।হাতি হল রাজতন্ত্রের প্রতীক,গণতন্ত্রের নয়,সমাজতন্ত্রের তো নয়ই।-হর্ণেট হাসতে হাসতে বলে-কালো হাতি শ্রমজীবী,তবে সফেদ বা সাদা হাতি শুধুই দর্শনধারী,আর আমাদের গণতন্ত্রে সফেদ হাতিদেরই রমরমা।তারাই এই গণতন্ত্রের ধারক ও বাহক।সরল বলে -কিন্তু তপন সিংহের ১৯৭৮ সালের সফেদ হাতি তো সেরকম নয়।অবশ্য ওটা শিশু ও কিশোরদের জন্য তৈরি ছবি ছিল।

আমরা সকলেই তখন হর্ণেটের কথা শোনার জন্য উদগ্রীব।হর্ণেট বলতে শুরু করে—এই বৃহত্তম গণতান্ত্রীক রাষ্ট্রে বর্তমানে ২৯টি রাজ্য আর ৭টি কেন্দ্র শাসিত অঞ্চল আছে।কেন্দ্র শাসিত অঞ্চলগুলির মধ্যে আবার দিল্লি ও পন্ডিচেরির আলাদা বিধানসভা আছে।আবার অন্ধ্র,বিহার,জন্মু ও কাশ্মীর,কর্ণাটক,মহারাষ্ট্র,তেলেঙ্গানা আর উত্তরপ্রদেশ এই সব কটি রাজ্যের আবার বিধানসভার পাশাপাশি বিধানপরিষদও আছে।২৯টা রাজ্য ও ২টো কেন্দ্র শাসিত রাজ্যের বিধানসভার মোট সদস্য সংখ্যা ৪০২৯,সাতটা বিধানপরিষদের মোট সদস্য সংখ্যা৪৬২।কেন্দ্রে দুটো আইনসভা,যার একটি সংসদ,তার সদস্য ৫৪৫জন,অন্যটি রাজ্যসভা,যার সদস্য ২৪৫।গোটা দেশে মোট নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের  সংখ্যা সাড়ে পাঁচ হাজারের সামান্য কম-সংখ্যাটা হল ৫৪৬১।এদের ভরণ পোষণের দায়িত্ব ভারতের সাধারণ নাগরিকদের যাদের ৭০ ভাগই দারিদ্র সীমার নীচে থাকেন।আর এটা তো জানিস হাতিরা খায় বেশী বেশী!ভিটামিন জানতে চায় এ তথ্য দিয়ে তুই কি প্রমাণ করতে চাইছিস?সরল বলে –এত জ্ঞানের গপ্প শোনাস এটা বুঝতে পারছিস না,আরে এরাই হল এদেশের সাদা হাতি।হর্ণেট বলে -একদম তাই।মানুষের প্রতিনিধি হওয়ার নামে এরা যা আয় করে তা অকল্পনীয়,টাকার পাহাড় বানায় একএকজন।মনে রাখিস শুধু মাসোয়ারা আর সরকারি পেনশনের কথাই বললাম,এর বাইরে রাজনীতির ক্ষমতাকে ব্যবহার করে যা কামায় তা তো বাদ দিলাম।অবসরকালীন ভাতা হিসেবে যে টাকা ও সুযোগ সুবিধা এরা পাবে তা শুনলে পিলে চমকে যাবে।এই সাদা হাতি তাড়ানোর লড়াইটা বই পড়া বুদ্ধি দিয়ে হবে না রে ভিটামিন,বলে একটা শ্লেষাত্মক হাসি হাসে হর্ণেট।তাদেরকে লক্ষ্য করে একটা তাচ্ছিল্য মানসিকতা প্রকাশ পাচ্ছে বুঝে উচ্চিংড়ে বলতে থাকে–আসলে ব্যপারটা বুঝতে হবে,এর জন্যই দরকার রাষ্ট্রের বদল,আমাদের দরকার একসঙ্গে শ্রেণী সংগ্রাম-উচ্চেংড়েকে আর কথা বাড়াতে না দিয়ে হর্ণেট বলে ওঠে–থাম বাপু ঢের হয়েছে,তুই বাপু এক দিকে হারানো কাজ ফিরে পেতে তোর সামন্ত বাবুর পায়ে ধরে ক্ষমা ভিক্ষা করবি আর অন্য দিকে দুনিয়া পাল্টাতে শ্রেণী সংগ্রামের ফাঁকা বুলি কবচাবি এটা চলে না।হর্ণেটের কথায় চুপসে যায় উচ্চিংড়ে,যেন বাক্য হারিয়ে ফেলেছে।হর্ণেট বলে চলে–মুখে মারিতং জগত,কাজে কিছু নয়,তোদের মতো লোকদের ভাবনা আর বুকনি শুধু চায়ের কাপেই আটকে থাকে,তোরা আছিস বলেই দেশ জুড়ে সাদা হাতিদের এতো দাপট।হর্ণেট চলে যাওয়ার উদ্যোগ নিচ্ছে দেখে আমি তড়িঘড়ি জিজ্ঞাসা করি-আচ্ছা একটা কথা তোকে জিজ্ঞাসা করি হর্ণেট,সমাজে কথা ও কাজে বিপরীতমুখী অবস্থান নেওয়া এতো অসংখ্য মানুষ ছড়িয়ে আছে জানলে মার্কস সাহেব কি শ্রেণী সংগ্রামের ইতিহাসটা অন্য ভাবে ব্যখ্যা করতেন?প্রশ্নের কোন উত্তর না দিয়ে মৃদু হেসে চলে গেল হর্ণেট।পাশ ফিরে দেখি উচ্চিংড়ে আর ভাটামিনের মুখটা কেমন থমথমে।আমিও বাড়ির দিকে পা বাড়াই।