এনজিও ওয়ালা—অভিনব গুপ্ত

বটতলা কাফেতে জমিয়ে আড্ডা চলছে।আচমকাই হর্ণেটের মোবাইলে একটা ফোন এলো।সব কথা বোঝা যাচ্ছে না শুধু হর্ণেটের হুঁ হুঁ আওয়াজ শুনতে পারছি আমরা,শুনলাম হর্ণেট ফোনে কাউকে জিজ্ঞাসা করছে -আপকো মেরা কনট্যাক্ট নাম্বার কাঁহাসে মিলা?অন্য প্রান্ত থেকে কী উত্তর মিলল,তা আমরা শুনতে না পেলেও,হর্ণেট যেভাবে ফোনটা কেটে দিল তাতে বোঝা গেল,ও খুব ক্ষেপে গেছে।খানিকবাদে আবারও ফোনটা টনটনিয়ে উঠতে,হর্ণেট একেবারে রেগে ওঠা গলায় বলে ওঠে-স্যরি,ডোন্ট ডিস্টার্ব মি এগেইন!হর্ণেটকে এভাবে রেগে যেতে সাধারণত আমরা দেখি না,তাই বেশ কৌতুহল নিয়েই ওর দিকে সবাই তাকিয়ে রইলাম,ও নিজেই বলতে শুরু করল-মাইরি এসব এনজিওগুলোর জ্বালায় আর টেঁকা যাচ্ছে না।আমি বললাম তা যা বলেছিস,একটা গল্প ফাঁদবে,কাঁদুনি গাইবে,তারপরেই ডোনেশন চেয়ে বিরক্ত করা শুরু করবে।আবার লোভ দেখাবে ইনকামট্যাক্স ছাড়ের।আরে বাবা আমি কোথাও সাহা্য্যের হাত বাড়িয়ে দিতে চাইলে ছাড় ছাড়াই দেবো,লোভে পড়ে কেউ কোন উপকার করে নাকি কোনদিন!–হর্ণেট বলল-আসলে ব্যপারটা হল এই দান ধ্যান বিষয়টাও ব্যবসা,আর ব্যবসা যেমন ক্রেতা ও বিক্রেতার পারস্পরিক সুবিধা প্রাপ্তিতে ভর করে বাড়তে থাকে,এই দান ধ্যানের ব্যবসাটাকেও তেমনি পারস্পপরিক সুবিধা দিয়ে বাড়িয়ে তোলার চেষ্টা চলছে।তবে মনে রাখবি এই ব্যবসার বাড়বাড়ন্ত কিন্ত সব অসাধারণ মানুষজনদের নিয়ে সাধারণ মানুষের এখানে খুব একটা ভূমিকা নেই।-আমরা জানতে চাই ব্যপারটা কী রকম?হর্ণেট বলে শোন -আমরা হলাম সাধারণ মানুষ,আমাদের লক্ষ লক্ষ টাকা নেই তা রক্ষা করার চিন্তাও নেই।আমরা সামান্য দান ধ্যান করলেও তা করি নিজেদের আন্তরের টানে,তাতে সমাজ সেবার ব্যবসা জমবে না,সমাজ সেবার ব্যবসা জমবে তাদের দিয়ে যারা অগুনতি টাকা করেছে নানা ফন্দি ফিঁকির করে আর তা রক্ষা করতে নানা উপায় হাতরে বেড়াচ্ছে।এঁরা হল সব অসাধার মানুষ যারা দান ধ্যানের ব্যবসাকে তেজী করে তুলছে দেশে দেশে।-সেটা কিরকম?হর্ণেট বলতে থাকে-যেমন ধর বছরের পর বছর ধরে নানা প্রভাব প্রতিপত্তি,নানা যোগাযোগকে ব্যবহার করে আইন ফাঁকি দিয়ে,লোক ঠকিয়ে,সরকারি সম্পদ চুরি করে কোটি কোটি টাকা,ঘরে তোলা হল,এবার সমস্যা সেই টাকা রাখবে কিভাবে?হিসেব দিতে হবে তো!তাই অনেক ভেবে দেশে দেশে আমদানি করা হয়েছে রকমারি সব দান ধ্যানের সংগঠন।এখানে টাকা দান করলে আয়করের ছাড় মিলবে,মানে হিসেবের গরমিল করতে সুবিধা হবে,অন্যদেকে যদি এইসব সংগঠনের মাতব্বর হিসেবে এই অসাধারণ মানুষেরা নিজেদের লোকজনকেই ঢুকিয়ে দিতে পারেন তাহলে তো ঘুর পথে সবটাকাটাই নিজেদের কাছেই ফিরে আসবে তাই না!-অবাক হয়ে সরল বলল–তার মানে পৃথিবী জোড়া সব এন জি ও গুলোর পেছনের গল্প হল এটা,তাই বলতে চাইছিস কি তুই?হর্ণেট চোখ দুটোকে বড় করে বলে -আমি বলছি না যুক্তি তাই বলছে,ভেবে দেখ পৃথিবী থেকে বিদ্রোহ প্রতিবাদ,বিপ্লব বিক্ষোভগুলোকে চাপা দিতে এই সংগঠনগুলো কেমন নিরুচ্চারে কাজ করে যাচ্ছে।আর শোন অনেক জায়গাতেই,এই এনজিও বা নন গভারমেন্ট অরগানাইজেসনগুলোকে স্পনসর করে সরকার মানে রাষ্ট্র।কেন?–সরলের সরল জিজ্ঞাসায়,হর্ণেট বলে কারণ ব্যবস্থাপনা বা রাষ্ট্রের অপকর্মগুলোকে পর্দা চাপিয়ে সবচেয়ে ভাল আড়াল করতে পারবে এরা তাই।আমি জিজ্ঞাসা করি -তাহলে তুই বল,এইযে মঠ,মন্দির,মসজিদ,চার্চ এগুলোর সঙ্গে এনজিও জুড়ে যাচ্ছে কিভাবে?হর্ণেট বলে -ব্যবসা বাড়ানোর লক্ষ্যে,মানুষের বিশ্বাসকে নিয়েই তো সবচেয়ে ভাল ব্যবসা হতে পারে তাই এসব জায়গায় এনজিওর টাকা ঢুকছে।আর ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোও তাদের ভাবনায় যুগোপযোগী পরিবর্তন ঘটিয়েছে।বিগ্রহ বা মন্দিরের জন্য অর্থ তো আসবেই মানুষের সেবার কথা বললে অর্থের যোগান আরও বাড়বে।প্রশাসন এ বিষয়ে মদত দেয় সহযোগিতা করে,কারণ দরিদ্র মানুষের বিদ্রোহের আগুনকে চাপা দিয়ে এইসব এনজিও সংগঠনগুলো তাদের অসহায় আনুগত্য প্রত্যাশী করে তোলে।-কথার মাঝে গুগুল বলে ওঠে আমি তোদের এ বিষয়ে কিছু তথ্য শুনিয়ে রাখি শোন–আমাদের দেশের লোকসংখ্যা ১২৫ কোটি,আর এনজিওর সংখ্যা ৩১ লক্ষ,মানে এদেশের মোট জনসংখ্যার এক চতুর্থাংশ এনজিও।এই সংখ্যাটা আমাদের দেশের যাবতীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দ্বিগুন,এদেশের যতো পুলিশ কর্মী আছে তারও দ্বিগুন।অধিকাংশ এনজিওই সরকারের কাছে বার্ষিক আয় ব্যয়ের হিসেব দাখিল করে না।৩১মার্চ ২০০১২ সরকারি তথ্য অনুসারে ৪৩৫২৭টি সংস্থা আমেরিকা,ব্রিটেন,জার্মানি,নেদারল্যান্ড,ইত্যাদি দেশ থেকে অনুদান পায়ে আসছে নিয়মিত।এদের মধ্যে আবার তিনহাজারের মতো সংস্থা আছে যাদের সম্মিলিত বিদেশি অনুদান প্রাপ্তির পরিমান বাইশ হাজার কোটি টাকা। আমরা সবাই গুগুলের কথা শুনে অবাক হয়ে যাই।সরল আবার জানতে চায়-আচ্ছা আমাদের অনেকের কনট্যাক্ট নম্বর এনজিওরা পায় কী ভাবে?-গুগুল বলে -এটা এমন কোন কঠিন কাজ নয়,এইধরনের সংস্থা ডাটাবেস তৈরির জন্য কর্মচারী রাখে,তারা নানা সূত্র থেকে তথ্য ও ফোন নম্বর যোগার করে

এবার আমি জানতে চাই-আচ্ছা আমাদের ভিটামিন আর উচ্চিংড়ে যে সংস্থায় কাজ করে,সেখানকার মনিবটিও তো শুনি বিদেশ থেকে টাকা আনে প্রগতিশীল সাহিত্য সংস্কৃতির প্রসারের জন্য,এও কি এনজিও,তাই যদি হয় তাহলে সমাজ বদল,শোষণ,সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী এসব নিয়ে কথা বলে কি ভাবে,পত্রিকাই বা প্রকাশ করে কি ভাবে?–আমার প্রশ্ন শুনে চোখ গোল করে মৃদু হাসে হর্ণেট,তারপর বলে –জানতাম তুই এই প্রশ্নটা করবি,তবে শোন -আসল লড়াই চাপা দিতে নকল লড়াইয়ের আমদানি করাটা অনেকদিনের রীতি,আর আজ সেটা একেবারে শিল্পের পর্যায়ে পৌঁছে গেছে।ভিটামিনদের মনিব লোকটা এনজিওই করে,তবে ওরটার চরিত্র আলাদা। শিল্প সংস্কৃতির নামে ও বিদেশ থেকে টাকা আনে,লোকটির চরিত্র এক কথায় বললে থ্রি ইন ওয়ান,মানে মুখে প্রগতিবাদী,মানসিকতায় সামন্ত,আর কাজে বেনিয়া।ও বিপ্লব,প্রগতি, বিদ্রোহের কোন সক্রিয় উদ্যোগে থাকবে না,শুধু বাণী বিতরণ করবে,আর এটাই ওকে করতে বলা হয়েছে,রাষ্ট্রকর্তা ও পুঁজি কর্তাদের এটাই নির্দেশ ওর প্রতি।হর্ণেট বলে যেতে থাকে-এই লোকটার অতীতটা জানিস,শোন,লোকটা একসময় সত্তরের দশককে মুক্তির দশকে বদলে দেওয়ার লড়াইতে ছিল কিছুদিন,জেলেও গেছিল,জেলে গিয়েই মুক্তির ভাবনা চটকে যায়,দশচক্রে ভগবানের ভূত হওয়ার মতো এও পাল্লায় পড়ে বাম আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ে,জেলে গিয়ে , মুচলেখা দিয়ে জেল থেকে বেড়িয়ে সোজা বিদেশ।মেধা বা যোগ্যতা তেমন কিছু ছিল না,শুধু রাজনীতি করাটাকে পুঁজি করে আঁখের গুছিয়েছে।দ্বিভাষিক পত্রিকা করে বিদেশ থেকে টাকা কামায়,সংস্কৃতির উন্নয়নে বিদেশে এরকম কিছু ফান্ড থাকে সেটা ও বাগিয়েছে।আর প্রগতিপন্থী পত্রিকার কথা বলছিস,ওর পত্রিকাটা দেখেছিস,পাঁচ মিশেলি,বিপ্লব যেন এখনও থমকে আছে উনবিংশ শতাব্দির সূচনা পর্বে,আর এখনও কার্ল মার্কসের জীবনী পাঠের চর্বিত চর্বন।শিশুদের কথা বলার প্রথম পর্যায় যেমন আঁড় ভাঙে না,ভিটামিনের মনিবটিরও লেখার আঁড় ভাঙে নি।কতগুলো অপাঠ্য শিশুসুলভ লেখাকে বিপ্লবী লেখার মোড়ক দিয়ে প্রকাশ করে।এরকম আকাট নিরেট এবং একই সঙ্গে ধান্দাবাজকে প্রগতিবাদী সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী বলে প্রচার করলে সাম্রজ্যবাদ,পুঁজিবাদ নিরাপদে থাকে,নিরুদ্বেগে থাকে তাই এদের হাতে তুলে দেওয়া হয় প্রগতিবাদী এনজিও চালানোর দায়িত্ব।সরল বলে কিন্তু ভিউটামিন আর উচ্চিংরে যে বলে,ওরাও নাকি বিপ্লবী,মার্কসবাদী।হর্ণেট বলে ওদের কথা ছাড় মার্কস বা বিপ্লব কোনটাই ওদের হজম হয় নি,তাই বদহজমের ঢেকুর তোলে।শুধু বাতেলা আর বাতেলা।এই কথার মধ্যেই দেখা গেল হন্ত দন্ত হয়ে আসছে ভিটামিন আর উচ্চিংড়ে,চকোলেট চুষতে চুষতে।এসে আমাদের প্রত্যেককে একটা করে চকোলেট দিল ওরা।চকোলেটের রাংতা খুলতে খুলতে হর্ণেট জিজ্ঞাসা করল–তোর মনিব বিদেশ থেকে আনলো বুঝি!-ভিটামিন বলে -মনিব বলিশ না কান্তিদা বল।উচ্চংড়ে বলে -দাদা কাল বিদেশ থেকে ফিরেছেন,কিছু প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে।হর্ণেট বলে-তা কী প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেল রে,বিপ্লব করার নাকি সাম্রাজ্যবাদ ঘোচানোর?আমি জিজ্ঞাসা করি -তা বিপ্লব বা সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়তে কত টাকার ফান্ড আসছে রে? ভিটামিন আর উচ্চিংড়ে দুজনেই আমাদের প্রশ্নবাণে কেমন থতমত খেয়ে যায়,আমতা আমতা করতে করতে উচ্চিংড়ে বলে ব্যাপারটা বুঝতে হবে।হর্ণেট বলে আমরা বুঝে গেছি,তোরা আসলে negotiable gainful organisation এর চাকরামি করিস,বাংলা করলে বলতে হয় বিনিময় ভিত্তিক লাভজনক সংস্থার চাকর।তবে বিপ্লব আর বিদ্রোহ বিষয়গুলোকে লাভজনক সংস্থার আওতাভুক্ত করার জন্য তোর মনিবের লাভের গুড়ে তোরাও ভাগ বসাতে পারবি বলেই মনে হয়।বলতে বলতেই ফেরার জন্য উঠে দাঁড়ায় হর্ণেট,যেতে যেতে মুখের মধ্যে আর একটা চকোলেট পুরে বলে ওঠে,তোদের মনিবকে বলিস,চকলেটটা কিন্তু সত্যিই আন্তর্জাতিক মানের,আন্তর্জাতিক মানের পত্রিকা প্রকাশ করতে না পারলেও,আন্তর্জাতিক মানের চকোলেট আমদানিতে তোদের মনিবের কোন জুরি নেই!

,