সারনুষ ও মারু—অভিনব গুপ্ত

বটতলা কাফের আড্ডায় আচমকাই ভিটামিন এমন একটা প্রসঙ্গ টেনে আনলো যে আমরা অবাক না  হয়ে পারলাম না।-শ্রমিক কর্মচারীদের বকেয়া ডিএ দেওয়া নিয়ে আমাদের মাননীয়া প্রশাসনিক প্রধান সম্প্রতি যে মন্তব্য করেছেন,সেটা উল্লেখ করে ভিটামিন বলে,এটা একেবারে সামন্ততান্ত্রীক মানসিকতার প্রকাশ,আসলে এখানে গণতন্ত্রের মোড়কে সামন্ততন্ত্র ও ধণতন্ত্রই যে থেকে গেছে সেটাই আবার প্রমাণ হল।ভিটামিনের কথার পো ধরতে কখোনই ছাড়ে না উচ্চিংড়ে,সে বলে-ব্যাপারটা বুঝতে হবে,আমিতো বার বার বলি রাষ্ট্রীয় কাঠামো ধণতান্ত্রীক হলে শ্রমিকশোষন ও শ্রমিক কর্মচারীদের দাস ভাবাটা ঘটতেই থাকবে।সরকারি কর্মীদেরও প্রশাসনের শীর্ষ কর্তা দাস বলেই মনে করবে ও এরকম মন্তব্য করে যাবে।-ভিটামিন ও উচ্চিংড়ের কথা শুনে মুখ টিপে হাসতে হাসতে হর্ণেট বলে-তোদের বোধহয় পেট গরম হয়েছে,চা না তোদের ডাবের জল খাওয়া উচিত।-ভিটামিন অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করে এ কথা বলছিস কেন?হর্ণেটও আবাক হওয়ার মুখভঙ্গি করে বলতে থাকে-আসলে রোজ যারা সামন্ত প্রভুর দাসত্বের জোয়াল টানে তারাই যদি সামন্তবাদ দাসত্ব এসবের বিরুদ্ধে গলা তোলে কেমন যেন মনে হয় বদহজম হয়েছে।ইঙ্গিতটা বুঝতে পেরে ভিটামিন রাগত স্বরে বলে ওঠে-এটাই তোর দোয,পরিপ্রেক্ষিত না বুঝে যাকে তাকে সামন্ত প্রভু,দাস বলে দিস।সঙ্গে সঙ্গে উচ্চিংড়েও বলে ওঠে -ব্যাপারটা মোটেও ইয়ার্কি ঠাট্টার নয়,গতকাল কান্তিদা কার্ল মার্কসের কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো সম্পর্কে বলতে গিয়ে ধণতান্ত্রীক রাষ্ট্রের চরিত্র ও তার শোষণ প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করছিলেন,তিনি বলছিলেন–থাক বাবা থাক বলে হর্ণেট চুপ করিয়ে দেয় উচ্চিংড়ে কে,তোদের ঐ কান্তিদার ব্যাখ্যা শুনে আর কাজ নেই তোরা না মানলেও সকলেই তো জানে তোদের মনিব ঔ কান্তিদা লোকটা বামকূলের এক ভন্ড ব্রক্ষচারী,বাম সংস্কৃতির প্রসারের নামে আখেঁর গোছানোর এক দক্ষ করিগড়।আলোচনাটা ক্রমশ অন্যদিকে চলে যাচ্ছে দেখে আমি জানতে চাই–চাকরী আর চাকরের সম্পর্কটা কিরকম?হর্ণেট বলে-চাকরী আর চাকর বিষয়টা একে অপরের পরিপূরক,আবার চাকরী আর শোষণের গলায় গলায় দস্তি।শোষণ সব চাকরীতেই আছে,সরকারি চাকরীতে একটু  কম আর বেসরকারি চাকরীতে বেশি।-সরল আচমকাই একটা সরল প্রশ্ন রাখল-এখানে কুকুর বলার মানেটা কি?হর্ণেট বলে-আমরা কুকুর বলে তাদেরই গালাগাল দিই যারা বংশবদ,কুকুর শব্দটা সবসময় নেতীবাচক অর্থ বহন নাও করতে পারে,এই শব্দটার অর্থ বিশ্বস্ত,অনুগত।একসময় রাজা মহারাজারা তাদের প্রজা বা ভৃত্যকে অনুগত বা বিশ্বস্ত হলে পুরস্কার দিতেন।এখন গণতান্ত্রীক ব্যবস্থায় সরকার তার কর্মীদের কাছ থেকেও একইরকম আনুগত্য ও বিশ্বস্ততা দাবি করছে।সেই সূত্র ধরেই বোধহয় কুকুর শব্দটা এসে গেছে।এতক্ষনে গুগুল বলে ওঠে–মেগাস্থিনিস,মার্কোপোলো প্রমুখ পর্যটকদের বিবরণে এদেশের এক উপজাতির কথা পাওয়া যায়,যাদের মথাটা কুকুরের মতো আর শরীরটা মানুষের।তারা আদৌ বর্বর বা অসভ্য ছিল না,তারা পাহাড়ে থাকতো,নানারকন আওয়াজ করে মনের ভাব আদান প্রদান করতো,এরা চাষআবাদ জানতো না মূলত পশু শিকার ছিল এদের জীবিকা।খ্রিষ্টপূর্ব ৫০০ অব্দে এরা ছিল বলে জানা যায়।হর্ণেট বলে তার মানে মানুষ আর সারমেয় এদের সংমিশ্রন,আমাদের সমাজেও এমন লোকের দেখা মেলে,যারা কুকুরের মতোই প্রভু ভক্ত,অনুগত,বিশ্বাসী,তবে বিবর্তনের ধারায় এদের মুখটা এখন মানুষের মতো হয়ে গেছে।বাংলায় এদের অনায়াসেই বলা যায় সারনুষ।সরল আবার জিজ্ঞাসা করে -আমি একটা জিনিস কিছুতেই বুঝতে পারছি না,ঘেউ ঘেউ করবেন না,অথচ মন দিয়ে কাজ করে যান,ভাল কাজ করলে ছুটি মিলবে,এসবের মধ্যে মিলটা কোথায়,কিংবা এসবের মানেটাই বা কি!-হর্ণেট এবার বলে,সবকিছুর মানে বুঝতে পারবি,একটা গল্প বলি শোন,দুই বন্ধুতে ঝগড়া লেগেছে কার বাবা কত বড় ডাক্তার তা নিয়ে,একবন্ধু বললে-ঠাকুমা হাসপাতালে মারা গেছে,বাবা তখন কনফারেন্সে বাইরে,খবর পাঠানো হল বাবা এয়ারপোর্ট থেকে সরাসরি শ্মশানে।এসে বললেন কিছু হয় নি,তারপর ব্যাগ থেকে সিরিঞ্জ বার করে ইঞ্জেকশন দিতেই ঠাকুমা মরার খাট থেকে উঠে দিব্যি পায়ে হেঁটে বাড়ি চলে এলেন।দ্বিতীয় বন্ধু বললো-বুঝেছি তোর বাবা মেডিসিন স্পেশালিস্ট,আমার বাবা কিন্তু অপারেশন মাস্টার,একদিন শিয়ালদা সাউথ সেকশনে একটা গরু কাটা পড়ে,গোরুর সামনের দিকটা একেবারে থেঁতলে যায়,আবার সেদিনই বালিগঞ্জ থেকে শিয়ালদার ট্রেনে উঠতে গিয়ে একজন সরকারি কর্মচারী ট্রেন থেকে পড়ে গিয়ে কোমড় হারায়,বাবা তখন গাড়িতে লেবেল ক্রশিং এ দাঁড়িয়ে।বাবা লোকটার মুখ আর ধরের সঙ্গে গরুটার কোমড়ের অংশ জুড়ে সেলাই করে একটা ই়্ঞ্জেকশন পুস করতেই হয়ে গেল।প্রথম বন্ধু জিজ্ঞাসা করলো কি হয়ে গেল,লোকটা বেঁচে গেল?দ্বিতীয় বন্ধু বললো শুধু বাঁচা,একেবারে রোজ দশটা পাঁচটা চাকরী করা ছাড়াও সকালে বিকেলে মোট পাঁচ কিলো দুধও দিতে শুরু করলো।আর এর ফলে নতুন এক প্রজাতি জন্ম নিল মানুষ আর গরুর সংমিশ্রনে,যার নাম মারু।আমরা সকলে একসাথে হেসে উঠলাম।ভিটামিন আর উচ্চিংড়ে বলে ওঠে -যত্তোসব বোগাস।হর্ণেট বলে -বোগাস নয় রে,তোদের ঐ মনিব,বামকূলের ভন্ড ব্রক্ষচারীর চেয়ে এই গল্পের মধ্য দিয়ে সমাজটাকে আর ভালভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব,গল্পের ঠাকুমাকে বাঁচিয়ে রাখার অর্থ ধণতান্ত্রীক কাঠামোটাকে টিঁকিয়ে রাখা,লোকটাকে বাঁচানোর মানে এই ব্যবস্থায় শোষণকে কায়েম রাখা,আজকের ব্যবস্থায় শোষণ বাড়ছে,শ্রম নেওয়া হবে আবার তাকে দুইয়ে দুধও বার করা হবে,শুনেছি তোদের মনিবও নাকি বলে তার সংস্থায় জুতো সেলাই থেকে চন্ডিপাঠ সব করতে হবে,তবেই ভেবে দেখ গল্পটা কেমন অর্থবহ।আর প্রশাসনের মাথায় যারা বিরাজ করছেন তারাও ভাবছেন তাদের যারা কর্মী সবাই তাদের ক্রিতদাস বা মারু।হর্ণেট একটু থেমে ভিটামিন আর উচ্চিংড়ে কে বলে -তোদের মনিব,থুড়ি কান্তিদা কার্ল মার্কসের যে কিছুই বোঝেন নি সেটা বোঝা যায় যে সংস্থা, উনি তৈরি করেছেন তার কার্যক্রম দেখেই আসলে ঐ বিশ্ববরেণ্য মানুষটার নাম আর পদবীর আদ্যক্ষর নিয়ে তৈরি তোদের কান্তিদার সংস্থা,কামা অরগানাইজেশন,যার কাজই হল কামিয়ে যাওয়া,আর তোরা দুটো হচ্ছিস একই সঙ্গে সারনুষ আর মারু,দশটা পাঁচটা চাকরীও করছিস আবার দুধও দিচ্ছ্স,কুকুরের আনুগত্যে বকাঝকা হজম করছিস,আর জাবরও কাটছিস মনের সুখে।বলতে বলতে চলে গেল হর্ণেট।আমরা দেখলাম মুখটা কেমন পাংসে মেরে গেছে ভিটামিন আর উচ্চিংড়ের।