ভাসান কার্নিভাল ও কিছু প্রশ্ন

গত কয়েক বছর ধরে এ রাজ্যে দুর্গাপুজোর ভাসান কার্নিভাল শুরু হয়েছে। একেবারে সরাসরি রাজ্য সরকারের উদ্যোগে। সরকারি অর্থে রেড রোড সাজিয়ে,বড় বড় পুজোর শোভাযাত্রা দেখানোর এই আয়োজনের প্রধান উদ্যোক্তা আমাদের মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং।পুজোর শোভাযাত্রার সঙ্গে সঙ্গে রাজ্য সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পের ঢালাও প্রচারও যে এই কার্নিভাল আয়োজনের অন্যতম লক্ষ্য তাও বুঝতে অসুবিধা হয় না কারোর। আর এই সূত্র ধরেই আমরা কিছু প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন তুলতে চাইছি। পুজোর মতো একটা ধর্মীয় বিষয়ে সরকার এভাবে যুক্ত হয়ে পড়তে পারে কি? সংবিধান তো প্রশাসন তথা রাষ্ট্রকে যে কোন ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান থেকে দুরত্ব বজায় রাখারই নির্দেশ দিয়েছে-তাহলে? দোহাই কেউ এ কথা বলবেন না যে দুর্গাপুজো বাঙালির উতসব,এসব যুক্তি আমরা অনেক শুনেছি,তার যোগ্য জবাবও আমাদের জানা আছে,সেই বিতর্ক আর তুলতে চাইছি না,শুধু এটুকুই আবারও বলবো দুর্গা পুজো একটি সর্বৈব হিন্দু ধর্মীয় পার্বণ,কোন মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ তাতে সামিল হলেও সেটা হিন্দু আচারই থাকে,এমনকি মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম পুজোর প্রধান কর্মকর্তা হলেও তার মাত্রার কোন বদল হয় না।হিন্দুরা তাদের আচার ধর্ম পালন করবেন,আনন্দে সম্মিলিত হবেন,তাতে অন্য ধর্মের মানুষকেও সামিল করবেন তাতে কোন আপত্তি নেই। কিন্তু আমরা প্রশ্ন তুলছি কেন সরকারি অর্থে পুজোর কার্নিভাল হবে তা নিয়ে,কেন সরকারি কর্তা ব্যক্তিরা পুজোর মধ্যে নিজেদের জড়িয়ে ফেলেন তা নিয়ে। সূত্রের খবর পাওয়া বেশ কয়েক কোটি টাকা এই ভাসান কার্নিভালের জন্য ব্যয় করা হয়েছে। আমাদের জিজ্ঞাস্য কেন এই টাকা পুজোর এই উম্মাদনায় ব্যয় না করে রাজ্য জুড়ে বন্যা দুর্গতদের দেওয়া হল না? কেন দেওয়া হল না বা হয় না পাহাড়ের বন্ধ চা বাগানের অনাহার ক্লীষ্ট মানুষজনদের? অনেকেই জানেন না পুজোর হুল্লোর আর মত্ততায় মানুষকে মাতিয়ে রাখতে যে সরকার এত সক্রিয় সেই সরকারই যুব বিশ্বকাপ ফুটবল প্রতিযোগিতার আয়োজন করতে শহর সাজানোর অজুহাতে কোন বিকল্প ব্যবস্থা না করেই,বেলেঘাটা,বিধাননগর জুড়ে নির্বিচারে ঝুপড়ি ও হকার উচ্ছেদ করেছে। কাজ আর ঘর হারিয়ে কয়েক হাজার মানুষ এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন। কোনটা বেশি দরকার ছিল,সরকারি অর্থে ভাসান কার্নিভাল নাকি সেই অর্থে উচ্ছেদ হওয়া মনুষের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা! মঙ্গলবার যখন সরকারি উদ্যোগে রেড রোডে ভাসান কার্নিভাল চলছে তখন গোটা শহর যানযটে অচল হয়ে পড়ে,ঘন্টার পর ঘন্টা বাসে ট্রামে আটকে থাকতে বাধ্য হন সাধারণ যাত্রী।অসুস্থ মানুষজনকে হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়ার মতো রাস্তাটুকুও পাওয়া যায় নি,এমন মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা অনেকেরই।কোন সরকার,প্রশাসন এভাবে ঘন্টার পর ঘন্টা শহর অবরুদ্ধ করে রাখতে পারে?এ রাজ্যে কোন মিডিয়াতে এসব প্রশ্ন আর তোলা হচ্ছে না,যে সব মিডিয়া কোন মছিল বা অধিকার আদায়ের দাবিতে একদিনের ধর্মঘট হলেও আ্যম্বুলেন্স না যেতে পারা বা কর্ম সংস্কৃতি নষ্টের জিগির তুলতে ব্যস্ত হয়ে ওঠে,তারাও ভারি আশ্চর্যজনকভাবে পুজোর এই উন্মাদনায় দিনের পর দিন যাবতীয় নাগরিক পরিষেবা বন্ধ থাকলেও প্রশ্ন তোলে না,এই ধারাবাহিক সরকারি ছুটিতে রাজ্যের কর্ম সংস্কৃতিতে যেন কোন ছেদ পড়ে না বলেই তাদের ধারনা।

আসলে সবাই সবার হিসেব মেনে কাজ করে যাচ্ছে,সরকার,শাসকদল,বড় মিডিয়া,বড় বড় কর্পোরেট সংস্থাগুলো,সবার মধ্যে একটা বোঝাপড়া তৈরি হয়েছে,নিজেদের লাভ ক্ষতির হিসেব ছাড়া এরা অন্যকিছু দেখে না দেখছে না।সমাজ-মানুষ তাদের প্রতি দায়বদ্ধতা কোন কিছুই আর অগ্রাধিকার পাচ্ছে না।সরকারও তাই ভুলে যায় তার ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতিশ্রুতির কথা,তাই তো মুখ্যমন্ত্রী কখোন ইদের নামাজ পড়েন,মৌলবিদের মাসোয়ারার ঘোষণা করে সংখ্যালঘু ভোট ব্যঙ্ক অটুট রাখতে চান। আবার অন্যদিকে নিজেকে সবচেয়ে বড় হিন্দু ঘোষণা করে প্রকাশ্য জনসভায় হিন্দু মন্ত্র উচ্চারণ করে এবং দুর্গাপুজোর ভাসান কার্নিভালের সরকারি আয়োজন করে হিন্দু ভোটারদেরও আশ্বাস দেন আমি তোমাদেরই লোক বলে।কর্পোরেট সংস্থাগুলি ব্যবসায় সরকারের সহায়তার কথা ভেবে সরকারের সঙ্গে জুড়ে থাকে,বড় মিডিয়াগুলো বিজ্ঞাপনের ধান্দায় সরকারের দ্বিচারীতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা ভুলে যায়,আর বঙ্গভূষন বা বঙ্গবিভূষণ প্রাপ্তির লালসায় সব দেখেও নীরব থাকেন তৃণভোজী তথাকথিত বিশিষ্টজীবী সম্প্রদায়।সত্যিই এ ধরণির গভীর অসুখ এখন!অন্ধরাই তো এখানে বেশি চোখে দেখে,তবে প্রশ্নগুলো তবু থাকবে,থাকবে,একসময় আগুন হয়ে জ্বলবে,আগুন হয়ে পোড়াবে!!!