ডেঙ্গির সাতকাহন—অভিনব গুপ্ত

আমাদের রোববারের আড্ডাটা বেশ কিছু সময় ধরে চলছে,তবে আজ সরলের দেখা নেই।মোবাইলে ধরার চেষ্টা হয়েছে তবে বার বার ওর মোবাইল থেকে জানানো হয়েছে হয় মোবাইল বন্ধ আছে নয়তো পরিষেবা সীমার বাইরে।আমরা সবাই কম বেশী চিন্তা মগ্ন হয়ে পড়লাম।যে হারে রাজ্যে ডেঙ্গি থুড়ি অজানা জ্বরের প্রকোপ বাড়ছে তাতে চিন্তা হবারই কথা।আমাদের এই ভাবনার ঘোর কাটিয়ে আচমকাই ঘেমে নেয়ে একেবারে একসার হয়ে সরল এসে হাজির,আমাদের সমবেত প্রশ্নের উত্তরে সরল বলল,আর বলিস না সকালে উঠে এক ভদ্রলোকের বাড়িতে গেছিলাম,সেই নিউটাউনে।আমার একটা কাজের ব্যাপারে ভদ্রলোক নিজেই দেখা করতে বলেছিলেন।আজ কাগজ পত্র নিয়ে যেতে বললেন,সাতসকালে চলে গেলাম,ওমা গিয়ে শুনি সে পাবলিক অফিসের কাজে নাকি বাইরে গেছেন,দিন চারেক পর ফিরবেন।ভাল একটা কাজের আশা ছিল এখন মনে   হচ্ছে পুরো কেসটাই জন্ডিস হয়ে গেল।-হর্ণেট বলল,জন্ডিস নারে হয়েছে ডেঙ্গি।-মানে,সরল জানতে চায়,সেই সঙ্গে আমরাও।–হর্ণেট নির্বিকার চিত্তে বলতে থাকে এই সময় বাবা,ডেঙ্গিতে আক্রান্ত সে পাবলিক,তুই কাজের জন্য অন্য লোকের পাত্তা লাগা।চাপা পড়ে গেল সরলের সমস্যা,আমরা সকলে এডিসের লার্ভা খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম।-ভিটামিন বলে উঠল-রাজ্য জুড়ে ডেঙ্গিতে আক্রান্ত হচ্ছে হাজার হাজার মানুষ,হাসপাতাল গুলো রোগীতে ভরে যাচ্ছে,রোজ চার পাঁচজন করে মারা যাচ্ছে।-হর্ণেট বলে আবার তোর সেই ছদ্ম সমাজ সচেতন সাজার ভান শুরু করলি তো,আচ্ছা তবে বল এদের মধ্যে কতজন ডেঙ্গিতে মারা গেছে,রিপোর্ট তো বলছে অধিকাংশ মৃত্যুই হয়েছে মল্টি অরগ্যান ফেইলইয়োরের কারণে।সব দোয এডিসের উপর চাপালে তো চলবে না ভাই।-হর্ণেটেটের কথায় আমরা সবাই অবাক হয়ে যাই।উচ্চিংড়ে বলে–তুই তো মনে হচ্ছে আগের দিনের রায় সাহেব হবার তালে আছিস,সেভাবেই সরকারের পো ধরে কথা বলছিস,আরে এখন আর রাজ ভক্তদের কোন উপাধি জোটে না,আর বঙ্গভূষণও তোর কপালে জুটবে না।- হর্ণেট উচ্চিংড়ের কটাক্ষের কোন উত্তর দেয় না।সরল বলল- যাই বলিসভাই ডেঙ্গি এ রাজ্যে এপিডেমিক।–সরকারি হাসপাতালে মাত্র তের চোদ্দজন মারা গেছে,সেঞ্চুরি হল না এর মধ্যে কি ভাবে ডেঙ্গি মহামারি হল বুঝতে পারছি না।আমাদের মনে হল হর্ণেটের কথা বার্তা কেমন পাল্টে গেছে,আমিও প্রতিবাদ করে বললাম-আর বেসরকারি হাসপাতাল গুলোতে মৃত্যু হচ্ছে সে গুলো বাদ যাবে কোন যুক্তিতে?-হর্ণেট বলে -আরে বাবা সে গুলো ডিঙ্গি কিনা জানতে হবে,তাছাড়া পুজোয় বেড়াতে গিয়ে বাইরে থেকে যদি কেউ ডিঙ্গির উপদ্রোপ নিয়ে আসে তার দায় রাজ্য সরকারের কেন,এবার সময় মতো বৃষ্টি বিদায় নিলো না কেন,বার বার নিম্নচাপ কেন হবে ?বুঝতে হবে রাজ্যের উন্নয়নকে প্রতিহত করতে কেন্দ্রের কোন চক্রান্ত আছে কি না,এটাও হতে পারে প্রকৃতি এ রাজ্যের সঙ্গে কোন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত,তা না হলে ভাব,যে রাজ্যে একজনের অনুপ্রেরণা ছাড়া কিছু হয় না সে রাজ্যে মশককূল তাঁর অনুপ্রেরণা ছাড়াই বংশ বিস্তার করে চলেছে,তাই এটা চক্রান্ত ছাড়া কিছু নয়।–আমরা এতক্ষনে বুঝলাম হর্ণেট হোয়ালি করছিল।আচ্ছা ফিউলেক্স কামড়ালে ফাইলেরিয়া,আ্যানোফিলিস কামড়ালে ম্যালেরিয়া কিন্তু এডিসে ডেঙ্গি কেন,এর সঙ্গে ডিঙ্গার কোন সম্পর্ক আছে কী?–সরল জানতে চায়।গুগুল এবার মুখ খোলে-১৮২৮ সালে প্রথম ডেঙ্গু নামটি ব্যবহৃত হয়,এর ঠিক দশ বছর আগে বিশিষ্ট জার্মান পতঙ্গবিদ জোহান উইলিহাম মিজেন এডিস মশাকে শনাক্ত করেন।এই প্রকার মশা প্রথমে পৃথিবীর অতিরিক্ত গরম এলাকা ও সাধারণত গরম এলাকায় দেখা যেত,এখন এটা পৃথিবীর সর্বত্র দেখা যায়।গত কয়েক বছরে পৃথিবীর ১০০টি দেশে ডেঙ্গি মহামারি আকার নিয়েছে।এই রোগের প্রধান উপসর্গ শরীরে যন্ত্রণা।অপদেবতার প্রভাবে এই রোগ হয় বলে পৃথিবীর কোন কোন অঞ্চলের মানুষ মনে করতেন আফ্রিকার এক উপজাতি সম্প্রদায় যাদের ভাষা বান্টু বলে পরিচিত,তারাই ডেঙ্গিকে চলতি প্রবাদে কা ডিঙ্গা পোপো বলে অভিহিত করতো বলে শোনা যায়-এই প্রবাদের অর্থ হল অপদেবতার প্রকোপে রোগাক্রান্ত হওয়া,এখানের এই ডিঙ্গা থেকেই ডেঙ্গি কথাটা এসেছে   বলেও শোনা যায়।আর মনে রাখতে হবে দাস ব্যবসার প্রসার ঘটাতে গিয়েই কিন্তু ইউরোপের দেশগুলো পূর্ব আফ্রিকার পরিচিত অসুখগুলো গোটা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিয়েছে।-গুগুলের শেষ কথাটা একেবারে লুফে নিয়ে হর্ণেট বলে ওঠে তাহলেই বোঝ,যদি ব্যবসা বাড়াতে গিয়ে রোগ ছড়িয়ে দেওয়া যায় তাহলে এ রাজ্যের উন্নয়নের জোয়ার আটকাতে ডেঙ্গি ছড়িয়ে দেওয়াই বা কী এমন কঠিন!হর্ণেট উঠার জন্য তৈরি হতে আমরা জিজ্ঞাসা করি,চললি?-হর্ণেট ঠোটের কোণে রহস্যময় হাসি ফুটিয়ে বলে-হাঁ রে চক্রান্তের শিকড়টা খুঁজে পেলেই সরকারকে জানাবো,একটা বঙ্গভূষণ তো পেযেও যেতে পারি।তারপর আচমকাই ভিটামিন আর উচ্চিংড়েকে লক্ষ্য করে বলে ওঠে তোরা খুঁজে পেলেও বলিস,ভাবিস না বঙ্গভূষণ পেলে তোদেরও ভাগ দেবো,আমরা সবাই জানি মুখে তোমরা যতোই বিপ্লবী ভান দেখাও ভাগ পেলে বাপু তোমরা সব করতে পারো,এমনকি সরকারের দালালিও।বলেই চলে যায় হর্ণেট,গুম মেরে যায় ভিটামিন আর উচ্চিংড়ে।