সিমেন্টর চৌবাচ্চা হয়ে শোভা পাবে না তো পূর্ব কলকাতা জলভূমি? বিভাস ভট্টাচার্য্য

 উন্নয়ন বনাম জলাভূমির দ্বৈরথে আজ উন্নয়নই এগিয়ে৷ জলাভূমি বুঝি দুয়োরানি. উন্নয়নের নামে তাকে বার বার জায়গা ছেড়ে দিতে হয়৷ গণিতশাস্ত্র মতে এই সম্পর্ক ব্যাখ্যায় তারা একে অপরের ব্যাস্তানুপাতিক, একজনের বৃদ্ধিতে অপরজনের হ্রাস অবসম্ভাবি৷ সে কারণেই বুঝি কলকাতার একমাত্র বৃহত্ জলাভূমি, পূর্ব কলকাতা জলাভূমি ‘রামসর সাইট’  হওয়া সত্ত্বেও তাকে পড়তে হয় রাজরোষে৷ তারই জন্য তৈরী হওয়া কমিটির চেয়ারম্যান ঘোষণা করেন, পূর্ব কলকাতা জলাভূমির চরিত্র বদল করে সেখানে উন্নয়ন মূলক কর্মসূচী নেওয়া হবে৷ আনা হয় নতুন বিল ‘দ্য ইস্ট কলকাতা ওয়েটল্যান্ড কনভার্সন অ্যান্ড অ্যামেন্ডমেন্ট বিল 2017’৷ কমিটির চেয়ারম্যান তথা মেয়র, মন্ত্রী শোভন চট্টপাধ্যায়ের মতে, সাধারণ মানুষের কাছে এর গুরুত্ব খুবই সামান্য৷ যখন কিনা পরিসংখ্যান বলছে, এই জলাভূমি সংলগ্ন 32টি গ্রামের প্রায় একলক্ষ মানুষ এর উপর প্রত্যক্ষভাবে নির্ভরশীল৷ আর পরোক্ষে বোধহয় সংখ্যাটা কোটির অনেক উপরে৷ কলকাতার সব্জী বাজারের 40 থেকে 50 শতাংশ সব্জীর যোগানদার পূর্ব কলকাতা জলাভূমি৷ এই জলাভূমির উচ্চফলনশীল জলাশয়গুলি বছরে 13 হাজার টন মাছ ও 55 হাজার টন শাক-সব্জী সরবরাহ করে৷ যার জন্যই কলকাতা আজও সবচেয়ে সস্তার শহর৷ আর সেই উত্পাদনশীলতা স্থিতিশীল রাখতে জলাশয়গুলির ওপর নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত প্রয়োজন৷ প্রয়োজন মানুষের স্বার্থেই৷

বিগত কয়েক বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে কৃষি উত্পাদনে শীর্ষে অবস্থানকারী জেলা হল বর্ধমান, যার অন্যতম কারণ নিয়ন্ত্রিত সেচ ব্যবস্থা৷ উক্ত ব্যবস্থা অনুসারে গরমকালে ভূ-গর্ভস্থ জল সেচের প্রয়োজনে ব্যবহার করা হয়৷ তার জন্য প্রয়োজন জলস্তরকে নিয়ন্ত্রণে রাখা৷ জলাভূমিগুলি সে কাজে সাহায্য করে থাকে৷ গাঙ্গেয় অঞ্চলের জেলাগুলির মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক জলাভূমি রয়েছে এখানেই৷ এর সংখ্যা ৬৩১ টি ৷ এই জলাভূমিগুলি আবার দু’টি শ্রেনীতে বিভক্ত – ‘ক’ শ্রেনীভুক্ত এবং ‘খ’ শ্রেনীভুক্ত৷ ১৯২৭ সালের বণ ও প্রকৃতি আইন অনুসারে বণদপ্তর ‘ক’ শ্রেনীভুক্ত জলাভূমিগুলির রক্ষক৷ আর ‘খ’ শ্রেনীভুক্ত জলাভূমিগুলি বণ দপ্তরের আওতাধীন নয়, অধিকাংশই ব্যক্তি মালিকানাধীন নয়ত অভিভাবক হীন৷ এক সমীক্ষায় দেখা গেছে পশ্চিমবঙ্গের জলাভূমিগুলির মধ্যে ৮৫শতাংশই বিপন্ন৷ অর্থাত্ পরিসংখ্যান তত্ত্বে সর্বোচ্চ স্থানে থাকা পশ্চিমবঙ্গের ১.৪৭ লক্ষ হেক্টর জলাভূমি আজ বিপন্ন৷

 

জলভূমি কি – ১৯৭১ সালের ‘রামসর সাইট’ সম্মেলনে জলাভূমির একটি সর্বজন গ্রাহ্য সংঙ্গা নিরুপণ করা হয়৷ সেই সংঙ্গা অনুসারে জলা বা স্যাঁতস্যাঁতে, প্রাকৃতিক বা কৃত্রিম, স্থায়ী বা অস্থায়ী, যেখানে জল স্থির বা প্রবাহমানা পরিস্কার, নোংরা বা নোনতা – জলাভূমি হিসেবে পরিচিত৷ সমুদ্রের ধারের লবনাক্ত পুকুর বা ডোবাও এর অন্তর্ভুক্ত৷ পরিশেষে জলের গভীরতা যেখানে ছয় মিটারের বেশি নয় তাই জলাভূমি হিসেবে স্বীকৃত৷ এই সংঙ্গা অনুসারে আমেদাবাদের ‘স্পেস অ্যাপ্লিকেশন সেন্টার’ ২০১১ সালে সারা দেশের ২০১৫০৩টি জলাভূমিকে স্বীকৃতি প্রদান করে৷ সংস্থাটির মতে ভারতে প্রায় ৭৫৭.০৬ হাজার জলাভূমি রয়েছে, যার পরিমাণ ভারতবর্ষের সমগ্র ভৌগলিক ক্ষেত্রের ৪.৭ শতাংশ৷ এই শতাংশের হিসাব প্রতিমুহূর্তেই কমে আসছে৷ জমি দখল, পুনর্বাসন, নগরায়ণ, গৃহ তথা পুরসভা ও পঞ্চায়েতের বর্জ্য বহন, অতিরিক্ত মত্স্য আহরণ এর নেপথ্য কারণ৷ বাঁধ ও ব্যারেজ নির্মাণের মধ্যে দিয়ে আমরা একের পর এক নদীকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছি৷

এটা আজ প্রমাণিত, একটি বাঁধের আয়ু ৩০-৪০ বছর৷ তার মানে ৩০-৪০ বছর পর বাঁধ ধ্বংস হয়ে যায় না৷ নদীটাই মরে যায়৷ এই ভাবেই আমরা একের পর এক নদী মৃত্যুর কারণ হচ্ছি৷ হারিয়ে যাচ্ছে বাস্তুতন্ত্রের এক একটি প্রজাতি৷ পরিবেশ বিজ্ঞানের দাবি প্রতি ২০ মিনিটে বাস্তুতন্ত্রের একটি করে প্রজাতি হ্রাস পাচ্ছে৷ নিঃস্ব হচ্ছে প্রকৃতি – পরিবেশ৷

ফিরে আসা যাক পূর্ব কলকাতা জলাভূমির কথায়৷ এই কলকাতার বর্জ্য বহনকারী জলাভূমির জল পানযোগ্য শুদ্ধ৷ দীর্ঘ সময় ধরে সূর্যালোকের তলায় থাকার জন্য অতিবেগুনী রশ্মির প্রভাবে তা বিশুদ্ধতা অর্জন করে৷ সেই প্রমাণ দিতেই পরিবেশবিদ ডাঃ ধ্রুবজ্যোতি বাবু প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর সামনে তা পান করে দেখিয়ে ছিলেন৷ এছাড়াও এই জলাভূমির রয়েছে কার্বন বিশোষণ ক্ষমতা৷ এত বিস্ময়কর পরিবেশবান্ধব জলাশয় হওয়া স্বত্ত্বেও আজ সে অবহেলার শিকার৷ অস্তিত্ব রক্ষার জন্য তাকে সংগ্রাম করতে হচ্ছে৷ সাধারণ মানুষ তার দিকে ঘুরেও তাকায় না৷ তবে কি সত্যিই কি অর্থনীতির কাছে পরাজিত হবে পরিবেশ! রাস্তার ধারে ধারে বিরাট বৃক্ষ শ্রেনির মতন অদৃশ্য হবে সে৷ কিংবা ভিআইপি রোডের ধারে গাছের পরিবর্তে ঘাসের পার্কে টবের সারির পাশে সিমেন্টর চৌবাচ্চা হয়ে শোভা পাবে বিখ্যাত পূর্ব কলকাতা জলভূমি!

,