রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর অসুখের গভীরে না গেলে তার নিরাময় অসম্ভব

রাজ্যের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের গাফিলতি নিয়ে প্রচার ও বিতর্ক দীর্ঘ দিন ধরেই চলে আসছে।সম্প্রতি সেই বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী তথা স্বাস্থ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কিছু মন্তব্য। তিনি মূলত স্বাস্থ্য পরিষেবার যাবতীয় ত্রুটির জন্য হালপাতাল কর্তৃপক্ষ ও ডাক্তারদেরই কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে চেয়েছেন।এ রাজ্যে এখন যেহেতু এক ব্যক্তির শাসন চলছে,গণতন্ত্রের মোড়কে নির্মম দলতন্ত্রই যেহেতু এ রাজ্যের ভাগ্য নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করছে,তাই যাবতীয় মিডিয়াতেও ঢালাও প্রচার ডাক্তারবাবুরাই স্বাস্থ্যপরিষেবার এই বেহাল দশার জন্য মূলত দায়ী।এইসব মিডিয়ার একতরফা প্রচারে ডাক্তার ও রোগীর সম্পর্ক এখন পরস্পর যেন শত্রুতায় পর্যবসিত হয়ে গেছে,ভেঙে যেতে বসেছে পারস্পরিক বিশ্বাস আস্থা।এরকম পরিস্থিতি স্বাস্থ্য পরিষেবাকে আর দূর্বল করে দিচ্ছে,করে তুলছে উদ্বেগজনক।শুধুমাত্র ডাক্তারদের ভিলেন বানিয়ে যারা প্রচার চালাচ্ছে,তাদের কাছে আমরা জানতে চাইতে পারি রাজ্যের সরকারি হাসপাতালগুলির পরিকাঠামো কেন সেই স্তরে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হলনা এতদিনেও যে খানে সাধারণ মানুষ ভরসা করে সরকারী হাসপাতালে যেতে পারে। কেন এ রাজ্যে রোগী ও ডাক্তারের অনুপাত ১ঃ১৭৫০,এই অনুপাত নিয়ে যথার্থ স্বাস্থ্য পরিষেবা দেওয়া আদৌ সম্ভব বুঝি?কেন দেশ ও রাজ্য সরকার স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দিনে দিনে কমিয়ে দেয়? মূলধারার মিডিয়াগুলি তা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে ভুলে যায়।এরা প্রশ্ন তোলে না কেন এ রাজ্যের মন্ত্রী আমলারা অসুস্থ হলেই বড় কোন বেসরকারী নার্সিং হোমে ভর্তি হন? কেন তাঁদের মোটা অংকের স্বাস্থ্যবিল সরকারকে মেটাতে হয়?কেন সাধারণ মানুষকে নিজের চিকিত্সার জন্য সর্বস্ব খুঁইয়ে ফেলতে হয়? কেন স্বাস্থ্য পরিষেবাকে সবার জন্য বিনা খরচে করার ব্যবস্থা করতে চায় না সরকার? মুখ্যমন্ত্রী বেসরকারী নার্সিং হোমের ব্যবসা নিয়ে তোপ দাগেন অথচ সর্বস্তরে স্বাস্থ্যপরিষেবাকে বিনা খরচে করার তাগিদ দেখান না কেন? তাহলেই তো সব সমস্যার সমাধান হতে পারতো।আসলে কেউ সমস্যার গভীরতাকে বুঝতে চান না,এড়িয়ে যেতে চান,মানুষকে বোকা বানাতে চান।মুখ্যমন্ত্রী বিভিন্ন জনসভায় বার বার বলছেন তাঁরা নাকি একাধিক সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল তৈরি করেছেন, মিডিয়া খোঁজ করে না কেন,সেই সব সুপার স্পেশাল হাসপাতালের হাল কিরকম,সেখানে কোন পরিকাঠামো আদৌ তৈরি হয়েছে কিনা?এ রাজ্যে মূল ধারার যাবতীয় মিডিয়া এখন কার্যত সরকারি মুখপাত্রে পরিণতি হয়েছে তাই সরকারি ভাষ্যই এখন মিডিয়ার ভাষ্য হয়ে উঠছে।সমস্যার গভীরে আলো ফেলার তাগিদ নেই কারোর,সমস্যার হেতুকে আড়াল করতে তৈরি করা হচ্ছে নানা কৌশল।সেই কৌশলের অংশ হিসেবেই স্বাস্থ্য পরিষেবার সীমাবদ্ধতার যাবতীয় দায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও ডাক্তারদের উপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। একথা অনস্বীকার্য  বেসরকারি হাসপাতালগুলো স্বাস্থ্যকে পরিষেবার বদলে আলু-পটলের মত পণ্য হিসাবেই দেখে। ফলে তাদের লক্ষ্য মুনাফা , আরো মুনাফা। দুঃখের হলেও এর অংশীদার চিকিত্সকদের একটা অংশও। কিন্তু এই অবস্থা হল কী করে। বাম সরকারের আমল থেকে ধাপে ধাপে সরকারি হাসপাতালগুলোর পরিকাঠামোকে পঙ্গু করে দিয়ে, স্বাস্থ্য কর্মী , নার্স ও চিকিত্সক নিয়োগে বাড়তি মনোযোগ না দিয়ে রোগীদের ঠেলে দেওয়া হতে থাকে বেসরকারি নার্সিংহোমগুলোতে। যার ফল আজ প্রতিদিন রোগীর পরিবার ভোগ করছেন। এই পরিস্থিতিতে সাধারণ নাগরিকদেরই আর সচেতন হতে হবে। সরকার ও  মিডিয়ার একপেশে অবস্থানের বিরুদ্ধে  সজাগ হতে হবে। দাবি তুলতে হবে বিনা খরচে স্বাস্থ্য পরিষেবা সবাইকে দেওয়ার।এ রাজ্যে বেশ কিছু ডাক্তার আছেন যাঁরা মনে করেন স্বাস্থ্য পরিষেবাকে পণ্য ভাবনা থেকে মুক্ত করতে না পারলে সর্বস্তরে স্বাস্থ্য পরিষেবা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব নয়,রোগী ডাক্তার সম্পর্কের অবনতি ঘটিয়ে সাধারণ নাগরিকদের থেকে এইসব ডাক্তারবাবুদের বিচ্ছিন্ন করার চক্রান্ত শুরু হয়েছে কিনা সেটাও ভেবে দেখার সময় এসেছে।সরকার ও বড় মিডিয়ার যোগসাজস এ রাজ্যের সাধারণ নাগরিকদের ব্যয়বহুল স্বাস্থ্য পরিষেবা থেকে মুক্তি দেবার দাবিকে ভেস্তে দেওয়ার চক্রান্তে লিপ্ত কিনা তা নিয়েও বোধহয় ভাবার সময় এসে গেছে।এ রাজ্যের ডাক্তারদের একটি সংগঠন ডক্টরস ফোরাম ইতিমধ্যেই কলকাতা হাইকোর্টে মামালা দায়ের করে সব বিষয়ে যে ভাবে ডাক্তারদের ভিলেন বানানোর চেষ্টা চলছে তার প্রতিকার দাবি করেছে,ডাক্তারদের নিরাপত্তার দাবিও তোলা হয়েছে।তবে শুধুমাত্র আদালতের বিচার নয়,দরকার মানুষের সচেতনতা,তার উপর ভর করেই সরকার ও বড় মুনাফাবাজ মিডিয়ার চক্রান্ত থামানো যেতে পারে।

,