ওরা তো ছেঁড়া জুতো পায়ে বাজারের পোকা কাটা জিনিসের কেনা বেচা করে

ওঁরা সবাই এখন লাশ,ওরা মুর্শিদাবাদের দৌলতাবাদে বাসের যাত্রী হয়ে উঠে বসেছিল,চালকের অসর্কতায় সেতু ভেঙে জলের নীচে তলিয়ে যেতেযেতে ওরাও কী অনুভব করেনি বেঁচে থাকার তীব্র আকাঙ্কা,ওঁদেরও কী মনে হয় নি এ পৃথিবীর আলো বাতাস উজ্ঞতাকে আর একটু উপভোগ করতে পারলে বেশ হতো!কেন এত তাড়াতাড়ি সব কিছু ছেড়ে ওদের চলে যেতে হোল,কেন এত উন্নয়ন,এত অগ্রগতির প্রচারের দামামার মধ্যেও,জেলায় কোন বিপর্যয় মেকাবিলার পরিকাঠামো তৈরি করা হয় নি,কেন পাওয়া গেল না একটা অত্যাধুনিক ক্রেণ যা দিয়ে ডুবে যাওয়া বাসটাকে দ্রুত তুলে আনা যেত?কেন টোলট্যাক্স আদায় করা সেতুতেও যান চলাচল নিয়ন্ত্রণের জন্য পুলিশি তদারকির ব্যবস্থা থাকবে না?কিংবা ধরা যাক শনিবারের বার বেলায় চিংড়িঘাটা সংলগ্ন বাইপাসে যে সদ্য কৈশর পেরুনো দুটি ছেলে বাসের তলায় পিষে গেল,তাদের পক্ষেই বা প্রশ্ন উঠবে না কেন,যান নিয়ন্ত্রণ মানে কী শুধু মাত্র ফাইন আদায় করা,যাত্রীদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা নয় কেন?শহর তথা রাজ্য জুড়ে সাধারণ মানুষের রোজকার অভিজ্ঞতা হল,পুলিশ প্রশাসন শুধু মাত্র ফাইন আদায় করতেই ব্যস্ত,ফাইন দিয়ে আইন ভাঙাটাই এ রাজ্যে দস্তুর।নিয়ম মেনে রুট অনুযায়ী অটো না যেতে চাইলে,অযৌক্তিক ভাড়া চাইলে,ট্যাক্সি অবিরাম যাত্রী নিতে অস্বীকার করলে,বাস জায়গামতো দাঁড়িয়ে যাত্রী না তুললে সাধারণ মানুষের পক্ষে পুলিশকে এগিয়ে আসতে দেখা যায় না,এভাবেই রাজ্য প্রশাসন অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে,এদের কাছে সাধারণ মানুষের জীবনের কোন দাম নেই,তাদের নিরাপত্তার ভাবনাও এদের মধ্যে কাজ করে না।একজন মন্ত্রী নেতা বা প্রশাসনিক কর্তাব্যক্তির জীবলের নিরাপত্তা দিতে এরা যতোটা ব্যস্ত থাকে ততটাই উদাসীন,তাচ্ছিল্য এদের সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে।আসলে বোধহয় সমাজের একেবারে শীর্ষমহল থেকে সর্বস্তরে এই ভাবনাটাকে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে যে সাধারণ মানুষ নেহাতই ফালতু,কবি জীবনানন্দের ভাষায় বললে এঁরা জীবনের ইতরশ্রেণীর লোক,ছেঁড়া জুতো পায়ে বাজারের পোকা কাঁটা জিনিসের কেনা কাটা করে।এঁরা শুধু মিটিং ভরাবে,ভোট দেবে আর মিথ্যে প্রতিশ্রুতি শুনে হাততালিতে আকাশ-বাতাস মুখরিত করে তুলবে,এরাই বাসে,ট্রামে, ট্রাকে বিপজ্জনকভাবে ঝুলতে ঝুলতে যাতায়াত করবে,আর সময়ে সময়ে বেঘোরে মরবে।এদের জন্য কেন বিক্ষোভ,কেন রাস্তা অবরোধ,কেন গাড়ি জ্বালানো,কেন পুলিশকে ইঁট মারা?তাই আমাদের বীরপুঙ্গব পুলিশ বাহিনী ঠিকই করেছে বাসের তলায় পিষে যাওয়া ছেলেটির বাবাকে বেদম লাঠি পেটা করে,ছেলে মরেছে তো কী হয়েছে,বাপু তোমার ছেলে কী কোন মন্ত্রীর ছেলে,নাকী মুখ্যমন্ত্রীর ভাইপো যে  তাকে নিয়ে এতো আদিখ্যেতা?তাছাড়া এ রাজ্যের সরকার তো এরকম মৃত্যুর জন্য টাকা দেয়,দৌলতাবদের মৃতদের জন্য পাঁচ লাখ করে দেওয়া হবে বলা হয়েছে না,তবে সাধারণ এক পাতি জীবন তার জন্য পাঁচ লাখ কী কম কথা হোল!এরকম বিক্ষোভ হামলা আমাদের মুখ্যমন্ত্রীর একদম পছন্দ নয়,আমাদের রাজ্য এখন শুধু বাংলা নয়,বিশ্ব বাংলা তাই এরকম হটকারিতা বিশ্বের কাছে আমাদের মাথা হেঁট করে দেয়,মনে রাখতে হবে আমাদের মুখ্যমন্ত্রী নিজেই ঘোষণা করেছেন তিনি হলেন সবচেয়ে বেশী মানবিক,তাই তাঁর কথায় আস্থা রেখে আমাদেরও রাজ্য জুড়ে বন্যা পরিস্থিতির মধ্যে ইলিশ উতসবে মেতে উঠে,কিংবা দৌলতাবাদে একদল মানুষ যখন জলের তলায় খাবি খাচ্ছে তখন আমাদের খাদ্য মেলায় হাজির থেকে মানবিকতার পরিচয় তুলে ধরতে হবে।প্রতিদিন জীবন-মৃত্যুর সীমানা ধরে হেঁটে চালা সাধারণ মানুষ নেতা নেত্রীদের বাণী শুনবে,ছবি দেখবে,আর বেঘোরে মরতে থাকবে-ছেঁড়া জুতো পায় এঁরা কতদিন আর বাজারের পোকা কাঁটা জিনিসের কেনা বেঁচা করবে?কোনদিন কি আসবে না সেই মণিষী,বিকেলের পড়ন্ত সূর্যের রশ্মিতে যাঁর এই ছোট ছোট প্রাণগুলোকে সুন্দর বলে মনে হবে,যাঁর পরশে এই সব ছোট ছেট প্রাণ প্রতিবাদের আগুন হয়ে জ্বলে উঠবে,যে আগুনে থাকবে নতুন সম্ভাবনার বার্তা।হয়তো আসবে হয়তো…….