সিপিএমের ‘ছিঃপিএমে’ পরিণত হওয়াটাই স্বাভাবিক ছিল

পশ্চিমবঙ্গের পর ত্রিপুরাতে বাম শাসনের অবসান ঘটলো। আড়াই দশকের সিপিএম শাসনের অবসান ঘটল। এদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে সিপিএম কেন ক্রমেই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ছে,তার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে কেউ কেউ বলতে শুরু করেছেন,পুরনো বামপন্থী মতাদর্শ আজকের দিনে অচল। সিপিএমের মতো বামপন্থী দলগুলো সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তাদের নীতি আদর্শের পরিবর্তন ঘটাতে না পেরে সেকেলে পুরনো তত্ত্বকথার খাঁচায় নিজেদের আটকে রেখে অস্তিত্বকেই বিপন্ন করে তুলছে। এঁদের মতে এদেশে বামপন্থীদের দেউটি একে একে নিভতে বসেছে,সময়ের সঙ্গে না মেলা,বাতিল হয়ে যাওয়া এক মতাদর্শকে আঁকরে ধরে থাকার জন্যই।বুঝতে অসুবিধা হয় না এঁদের মতে কমিউনিষ্ট গোঁড়ামিই সিপিএমের পতনের কারণ। সিপিএমের পতনের কারণ বলে চালাতে চাওয়া এই যুক্তিগুলোর  সারবত্তা কতটুকু। প্রথম কথা এ দেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে থেকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়ে সমাজ ব্যবস্থা পাল্টানোর যে স্বপ্ন সিপিএম ফেরি করে এসেছে দীর্ঘদিন ধরে,সাবেকী বামপন্থী মতাদর্শের সঙ্গে তার ব্যবধান যোজন যোজন। দ্বিতীয়ত,যে সব রাজ্যে সিপিএম দীর্যদিন ধরে ক্ষমতায় ছিল সেখানে তারা এমন কিছু করেনি যা দেখে মনে হয় তারা বামপন্থী মতাদর্শকে প্রতিষ্ঠা দিতে ইচ্ছুক। এ রাজ্যে ৩৪ বছর ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে শুধুমাত্র অর্থনীতিকে মুক্ত অর্থনীতির করকমলে তুলে দিয়েই তাঁরা থেমে যাননি,যুক্তি বুদ্ধি আর সংস্কারমুক্ত সামাজিক পরিবেশ তৈরি করতেও বিন্দুমাত্র আগ্রহ দেখান নি তথাকথিত বাম পরিচয়ধারীরা।৩৪ বছরের বাম শাসনের রাজ্যপাট জুড়ে তাই রমরমিয়ে চলেছে তাবিজ মাদুলি জ্যোতিষ,নানাবিধ পুজোর মোচ্ছব। তিথি দেখে,পাঁজি পড়ে বামপন্থী নেতা মন্ত্রীরা তাঁদের ছেলে মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন,শাখা সিঁদুরের মাহাত্ম্যের বিরুদ্ধে টু শব্দ করার সাহস  দেখাতে পারেন নি অতিবড় বামপন্থী তাত্ত্বিকটিও।এ রাজ্যের প্রয়াত এক ডাকসাইটে সিপিএম নেতা তো কোন এক মন্দিরে পুজো দিয়ে সোচ্চারে ঘোষণাও করেছিলেন তিনি আগে একজন হিন্দু ব্রাম্ক্ষণ,তারপর কমিউনিষ্ট।মানুষের চেতনায় ঘা দিয়ে তাদের মুক্ত যুক্তি বুদ্ধির শরিক করার কোন প্রযাস সিপিএম কখোন করেনি পাছে ভোটে ক্ষতি হয়!ভোটে জিততে এদেশের অন্যান্য দক্ষিণ পন্থী পার্টি গুলো যা যা করে সিপিএম সেগুলিই করে গেছে বার বার,তাই সিপিএমকে গোড়া বামপন্থী বলে চালাতে চাইলে সত্যের প্রতি অবিচার করা হয়।এ রাজ্যে সিপিএমের সংগঠন এক সময় রীতিমতো মিথ হয়ে উঠেছিল সংবাদ মাধ্যমের কাছে,ক্ষমতা থেকে সরে যেতেই দেখা গেল সেই সংগঠন কর্পূরের মতো উধাও হয়ে গেছে।পাইয়ে দেওয়ার রাজনীতিতে ভর করে গড়ে ওঠা সংগঠন ক্ষমতা হাত ছাড়া হতেই আবার নতুন ক্ষমতার দিকে চলে গেছে।সিপিএমের ক্ষমতায় থাকার সঙ্গে বামপন্থী আদর্শ বা তত্ত্বের কোন সম্পর্ক ছিল না,বামপন্থী মতাদর্শকে আঁকরে থাকায় সিপিএমের আজকের এই দুরাবস্থা বলে যারা বোঝাতে চাইছেন,তারা হয় বামপন্থা সম্পর্কে ধারনাহীন নতুবা ইচ্ছে করে বিষয়টা গুলিয়ে দেওয়ার লক্ষ নিয়েই তা করছেন।বামপন্থাকে সিপিএম অনেক আগেই ত্যাগ করেছিল,আঁকরে ধরেছিল এ দেশের সংসদীয় রাজনীতির ক্ষমতার লালসাকে।সেই লালসা সিপিএমকে টাটাদের কেশাগ্র রক্ষার পাহাড়াদার হতে বলে,উল্টোদিকে নন্দীগ্রাম আর সিঙ্গুরে কৃষকদের উপর অত্যাচার চালাতে প্ররোচিত করে,এর পরেও যারা সিপিএমকে গোড়া বামপন্থী বলে প্রচার করে তাদের বোধ ও বুদ্ধিকে আমাদের করুণা করে উপেক্ষা করতে হবে। যুক্তি  এটাই বলছে যে বামপন্থাকে আঁকরে ধরার জন্য নয় বরং বামপন্থাকে পরিহার করেই সিপিএম আজ অবলুপ্তির পথে।