আসানসোলের দাঙ্গায় সদ্য পুত্রহারা ইমাম জ্বালালেন মনুষ্যত্বের প্রদীপ

আসানসোলের নুরানি মসজিদ সংলগ্ন এক ফাঁকা প্রান্তর,বৃহস্পতিবার সেই প্রন্তর জুড়ে জমায়েত হয়েছেন হাজার হাজার মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ।তাঁদের প্রত্যেকের চোখেমুখে ঘৃণা আর প্রতিহিংসার আগুন,তাঁদের শ্রদ্ধেয় ও প্রিয় মানুষ ইমাম মৌলানা ইমদাদুল্লাহ্ রশিদির পুত্রকে নৃসংশ্যভাবে খুন করেছে হিন্দুত্ববাদী একদল ধর্মোন্মাদ।১৬-১৭ বছরের ইমাম পুত্র সাবিল্লাহ্ রসিদির কলজে ছিঁড়ে তার দেহ টুকরো টুকরো করতেও দ্বিধা হয় নি মানসিক বিকারগ্রস্তদের।বৃহস্পতিবার বিকেলের পড়ন্ত আলোয় আসানসোলের নুরারি মসজিদ সংলগ্ন প্রান্তরটি যেন ক্রমেই বদলে যাচ্ছিল ঐতিহাসিক সেই বিয়োগান্তক কারবালা প্রান্তরের প্রতিচ্ছ্ববিতে।আর সেখান থেকেই যেন ক্রমে ঘনীভূত হচ্ছিল এক অন্য সর্বনাশের আশঙ্কা,শোকস্তব্ধ হাজার হাজার মুসলিম যুবকের বুকে তখন দ্রিম দ্রিম শব্দে বেজে উঠছে প্রতিশোধ স্পৃহার দামামা,তাঁরা চাইছিলেন তাঁদের প্রিয় ইমাম একবার বলুন তাঁর সন্তানকে যারা খুন করেছে,তাদের শাস্তি নিশ্চিত করতে ঝাঁপিয়ে পড়ুক মুসলিম যুবক-যুবতীর দল।শোক মিছিলের নিরুচ্চার এই দাবি বুঝতে অসুবিধা হয় নি,আসানসোলের নুরানি মসজিদের ইমাম মৌলানা ইমদাদুল্লাহ্ রশিদির।সেদিন চৈত্রমাস,ইমাম মৌলানা ইমদাদুল্লাহ রশিদি তাঁর ধর্মীয় স্বগত্রীয়দের চোখে দেখলেন সভ্যতা কৃষ্টি আর মনুষ্যত্বের সর্বনাশ।সেই মুহূর্তে তাই পৃথিবীর সবচেয়ে ভারি বোঝা,পুত্র সন্তানের লাশ কাধেঁ নিয়েই সেই সর্বনাশ রুখতে এগিয়ে এলেন ইমাম সাহেব,সবাইকে বললেন,তাঁর সস্তানকে আল্লাহ্ যতোদিন বেঁচে থাকার নিদান দিয়েছিলেন,সে ততদিন বেঁচে ছিল,তাঁর সন্তানকে যারা হত্যা করেছে আল্লাহ্ তাদের শাস্তি দেবেন।মানুষে মানুষে হত্যা হানাহানি আল্লাহ্ পছন্দ করেন না,শন্তি বজায় রাখাই মানুষের ধর্ম।এরপর সমবেত সকলকে উদ্দেশ্য করে আশ্চর্য এক দৃঢ়তায় সেই ইমাম জানিয়ে দেন,যদি তাঁর সন্তানের হত্যার প্রতিশোধ নিতে কেউ পাল্টা হিংসা আর হত্যায় প্ররোচনা দেন তাহলে,তিনি মনে করবেন আসানসোলের কোন মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ তাঁকে ভালবাসেন না,তিনি চিরদিনের মতো চলে যাবেন তাঁর পরিচিত এলাকা বাড়ি ছেড়ে,নির্বাসনে।এর পর সমবেত সকলের মধ্যে উত্তেজনার পারদ থিতিয়ে আসে,স্বজন হারা যন্ত্রনা বুকে নিয়ে,শান্ত আবহে একে একে বাড়ি ফিরতে থাকেন সকলে।সদ্য কৈশর পেরুনো সন্তানের ক্ষতবিক্ষত দেহ সমাধিস্থ করে,একবুক হাহাকার যম্ত্রনা নিয়ে মসজিতে ফিরে যান ইমাম।

হাঁ এভাবেই তো দিগন্তবিস্তৃত অন্ধকারের মধ্যেও ঝলসে ওঠে আলোর ঝলকানি।হানাহানি আর হিংসাকে উসকে দিয়ে যারা ক্ষমতার অলিন্দের দখল নিতে চান,তারা অবাক হয়ে দেখেন তাদের সব ষড়যন্ত্র ভেস্তে দিতে সমাজের নাড়ী ধরে এখনও বসে থাকেন কেউ কেউ,সামাজ অসুস্থ হলে এঁরাই সবার আগে টের পেয়ে যান,বেড়িয়ে পড়েন সমাজকে পরিচর্যা দিয়ে সুস্থ করে তুলতে।এঁদের পরিচর্যাতেই ধ্বণিত হয় সামাজিক সুস্থতার বার্তা।এই বার্তাই তো দিয়েছিলেন অঙ্কিত সাক্সেনার বাবা।দিল্লিবাসী তরুণ অঙ্কিতকে হত্যা করেছিল তাঁর বান্ধবীর পরিবারের লোকেরা।অভিযোগ উঠেছিল হিন্দু পরিবারের ছেলে অঙ্কিতকে মেনে নিতে পারের নি,তাঁর বান্ধবীর মুসলিম পরিবার,তাই তাঁকে হত্যা করেছিল সেই মুসলিম পরিবারের লোকজন।এই হত্যার প্রতিবাদে হিন্দু আগ্রাসীপনাকে চুপসে দিয়ে অঙ্কিতের বাবা জানিয়ে দিয়েছিলেন,তাঁর সন্তানকে যারা হত্যা করেছে তারা অপরাধি,আইন অনুযায়ী তাদের শাস্তি হোক কিন্তু অপরাধীদের ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে কোন জিগির তাঁরা তুলতে চান না,হিন্দু হত্যার দায় নয়,মানুষ হত্যার দায় শাস্তি হোক খুনিদের।সদ্য সন্তান হারানোর যন্ত্রনা বুকে বহন করেও দিল্লিবাসী অঙ্কিত সাক্সেনার বাবা ভেস্তে দিয়েছিলেন সাম্প্রদায়িক উসকানিদাতাদের অভিসন্ধি।আর আসানসোলের নুরানি মসজিদের ইমাম,তাঁকে বৃহস্পতিবারের পর কী আর শুধু নির্দিষ্ট কোন ধর্মীয় গোষ্ঠীর তালিকাভুক্ত করে রাখা যাবে,নাকি মেনে নিতে হবে সমাজ সভ্যতা মানবিকতাকে টিঁকিয়ে রাখতে এঁরাই আলোর দিশারি,এঁরাই আমাদের পথ দেখাবেন,অন্ধকার সুরঙ্গ বেয়ে এগিয়ে যেতে আজকের বাস্তবতায় এঁদেরকেই রাখতে হবে সামনের সারিতে।এঁরা আলো দিক সেই আলোর উজ্জ্বলতায় ভরে থাক চারপাশ  । সন্তানের লাশ কাধেঁ নিয়েও যাঁরা সভ্যতা কৃষ্টি মানবিকতার পাহাড়াদার হতে এগিয়ে আসতে পারেন,হাতে হাত রেখে বেঁধে বেধেঁ থাকার দীক্ষা তাঁদের চেযে ভাল আর কেই বা দিতে পারবেন!!!