গুজরাটে ঘোড়ায় চাপায় উচ্চ বর্ণের হাতে খুন দলিত যুবক

এ দেশের মধ্যে অনেক দেশ,সেখানে পদে পদে ব্যবধান,জায়গায় জায়গায় কাঁটা-তাড়ের বেড়া,সেখানে,ঘাপটি মেরে থাকে ভয়াল ভয়ঙ্কর এক মানবিকতা-মনুষ্যত্ব বিরোধী জিঘাংসাও। আর এই বাস্তবতাকে সুচারু কথার ভানুসে ঢেকে রেখে আমাদে্র রাষ্ট্র নাায়ক-নায়িকারা আমাদের মেরা ভারত মহানের গল্প শোনান,সেই গল্পের মোহে আমরা ভুলে যাই এদেশে আদিবাসী দলিত মানুষের দিনের পর দিন নিপীড়িত-লাঞ্ছিত হওয়ার পরম্পরার ইতিহাস,ভুলে যাই এদেশের জল জমি জঙ্গল কীভাবে বড় বড় কর্পোরেট সংস্থার হাতে তুলে দিতে রাষ্ট্রীয় কর্তারা দিনের পর দিন প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন সে কথাও।ভুলে গিয়ে আমরা ভাল থাকি,অথবা ভাল থাকার প্র্যাকটিশ করি।তবে আমাদের সেই ভাল থাকার ছন্দ তাল সব কিছুকে ঘেটে দিয়ে সামনে চলে আসে কিছু ঘটনা,সেইসব ঘটনা কেমন যেন বিদ্রুপ আর শ্লেষ হানতে থাকে আমাদের মধ্যবিত্ত ছন্দময় জীবন যাপনকে,এদেশের মহানুভবতার গল্পকেও।এই যেমন গত বৃহস্পতিবার গুজরাটের ভবনগর জেলার ২১ বছরের এক তরতাজা যুবক আচমকাই খুন হয়ে গেলেন,কী অপরাধ ছিল,এই সদ্য তারুণ্য ছোঁয়া ছেলেটির?গুজরাটের ভাবনগর জেলার পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে যা উঠে এসেছে তা শুনে চমকে ওঠা ছাড়া উপায় নেই।ছেলেটিকে খুন হতে হয়েছে এই কারণে যে সে দলিত সম্প্রদায়ের মানুষ হয়েও একটা ঘোড়া কিনে তাতে সাওয়ার হতো মাঝে মধ্যেই।প্রদীপ রাউত নামের এই তরুণ মাস খানেক আগে একটা ঘোড়া কেনে,তাঁর বাবার খামার বাড়ি আছে সেটাই তাঁদের পারিবারিক ব্যবসা,সেই ব্যবসার কাজ দেখাশোনার পাশাপাশি প্রদীপ অবসরে ঘোড়া নিয়ে ঘুরতে বেরুতো,গত বৃহস্পতি বার রাতে ঘোড়া চড়তে বেরিয়ে সে অনেক রাত পর্যন্ত বাড়ি না ফেরায় তার বাবা তাঁকে খুঁজতে বেড়িয়ে রাস্তায় প্রদীপের নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখে,ঘোড়াটিকেও হত্যা করা হয়েছে।পুলিশের কাছে প্রদীপ রাউতের বাবা কালু রাউত অভিযোগ করেন দলিত হয়েও ঘোড়া চড়ে ঘুরবার জন্য স্থানীয় কিছু উচ্চসম্প্রদায়ের মানুষ তাঁর ছেলেকে ভয় দেখাচ্ছিল কিছুদিন ধরেই,ভয় পেয়ে প্রদীপ ঘোড়া বিক্রি করে দেওয়ার কথাও ভেবেছিলেন,কিন্তু তিনিই ছেলেকে সে বিষয়ে নিরস্ত করেন,প্রদীপের বাবার আক্ষেপ তখন যদি ওর কথায় সায় দিতেন তা হলে হয়তো তাঁর সন্তানকে এভাবে বেঘোরে মরতে হতো না।

সত্যিই,অপরাধ তো বটেই,ছোট নীচু জাতের একটা ছেলে সব উচ্চসম্প্রদায়ের মানুষের চোখের সামনে ঘোড়া চড়ে ঘুরে বেড়াবে,না হয় খামার বাড়ির ব্যবসা করে কিছু পয়সা হয়েছে,তা বলে দলিত সম্প্রদায়ের লেবেলটা তো আর মুছে যায় নি।তাই দোলিতের ঘোড়া রোগ ঘুচিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব নিতে এগিয়ে এসেছেন উচ্চসম্প্রদায়ের লোকেরা,নির্জন রাস্তায় দলিত সম্প্রদায়ের প্রদীপ রাউতের দেহকে ক্ষতবিক্ষত করেও তাদের আক্রোশ নিবৃত্ত হয় নি,সেই আক্রোশ ধেয়ে গেছে অবলা ঘোড়াটির উপরও,ঘোড়াটিকেও নির্মম ভাবে হত্যা করা হয়েছে,কারণ ঘোড়াটিও হয়ে উঠেছিল উচ্চসম্প্রদায়ের জাত্যাভিমানে আঘাতের প্রতীক।এই হোল একবিংশ শতাব্দীর আধুনিকতার বিজ্ঞাপনে মুখ ঢেকে যাওয়া ডিজিটাল ইন্ডিয়ার আসল ছবি।আমাদের ট্যুইটার আছে,ফেসবুক আছে,হাতে হাতে আছে অত্যাধুনিক মোবাইল আর একই সঙ্গে এ দেশ জুড়ে আছে জাত-ধর্ম আর অর্থনৈতিক বৈষম্যজনিত বিদ্বেষ।বিভেদের বৈচিত্র আছে,কিন্তু নেতা নেত্রীদের ভাষণ ছাড়া কোথাও ঐক্য নেই,রোহিত ভেমুলা থেকে প্রদীপ রাউতের মৃত্যুর ঘটনাগুলো সামনে এসে সেই মিথ্যার ভানুস মাঝে মধ্যেই ফাটিয়ে দেয়।আ-সোমুদ্র হিমাচল জুড়ে আর্ত পীড়িত মানুষের কান্নার সুরই বোধহয়  এদেশে একমাত্র সত্য।

,