মাঝরাতে পুলিসের কড়ানাড়া!

দরজা এঁটে ঘুমিয়ে আছে পাড়া,কেবল শুনি রাতের কড়ানাড়া,অবনি বাড়ি আছো?শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতার লাইন গুলো এখনও অনেককে চমকিত করে হয়তো, কিন্তু কবিত্বের কল্পনার জগত অতিক্রম করে বাস্তবের ধূসর ভূমিতে মাঝরাতের এই কড়ানাড়ায় বাঙালি মধ্যবিত্তের বুকে যে আতঙ্ক আর আশঙ্কার দপদপানি তার একেবারে ভিন্ন এক মান ও মাত্রা আছে।অনেকদিন ধরে সেই মান ও মাত্রাকে বুকের মধ্যে বহন করে চলেছেন বেশ কিছু বাঙালি পরিবার।শুরু হয়েছিল বোধহয় সেই সত্তর দশকে।দুনিয়া পল্টানোর স্বপ্নে বিভোর হয়েছিলেন কিছু যুবক যুবতী,তুমি আর আমি আর আমাদের সন্তান-এই ছোট্ট পৃথিবীর পরিসর ছেড়ে তাঁরা যেতে চেয়েছিলেন সেই আশ্চর্য স্থানের সন্ধ্যানে যেখানে মানুষই হয় মানুষের প্রধান অবলম্বন,যেখানে বিবেকহীন প্রতিযোগিতাকে রুখে দেওয়া যাবে,যেখানে পাটোয়ারি বুদ্ধিকে কেউ প্রতিভার মর্যাদা দেবে না।সেদিন এ রাজ্যে একদল যুবক যুবতী এক হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালার সুরে মাতোয়ারা হয়ে নতুন দেশ,নতুন পৃথিবীর খোঁজে ঘর বাড়ি ছেড়ে বেড়িয়ে পড়েছিলেন।ইতিহাস বলে তাঁদের চাওয়ায় বাস্তববোধের অভাব ছিল,ছিল আবেগ সর্বস্বতার আধিক্য,কিন্তু তাদেঁর চাওয়ায় কোন কৃত্রিমতা ছিল না।সেদিনের প্রতিবাদী যুবক-যুবতীদের প্রচলিত সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার গণদুশমনি চরিত্র সম্পর্কে মোহহীনতা ছিল চরম ও চূড়ান্ত,তাই এর স্থিতাবস্থাকে তাঁরা আঘাত করতে চেয়েছিলেন।আর ভারত রাষ্ট্র,সংবিধান অনুসারে যে দেশ তাঁর বিরোধীকেও সন্তান বলে মানার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল,যে দেশ কট্টর রাষ্ট্রবিরোধীকেও বিনা বিচারে না মারার অঙ্গীকার করেছিল,অহিংসার বার্তা যে দেশের মর্মবাণী বলে প্রচার করা হয়,সে দেশের পুলিস সেই সত্তরের বিদ্রোহী যুবক যুবতীদের বিপথগামি হঠকারিতা আটকাতে মাঝরাতে তাদের বাড়ির কড়া নাড়া দিয়েছে,তাঁদের নিয়ে গিয়ে নির্মম অত্যাচারে বিদ্ধ করেছে।সে সময় মাঝরাতে পুলিসের কড়ানাড়া অনেক বাঙালি পরিবারে চরম আতঙ্ক আর আশঙ্কার বার্তা নিয়ে হাজির হতো।সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার স্মৃতি এখনও বহন করে চলেছেন কেউ কেউ।

সময় পাল্টেছে,সত্তরের বিদ্রোহ স্থিমিত হয়ে গেছে,কিন্তু পাল্টায়নি শুধু মাঝরাতে পুলিসের কড়ানাড়া দেওয়ার সেই অভ্যাস।তথাকথিত বাম আমলেও মাঝরাতে গণআন্দোলনকারীদের কড়ানাড়া দিয়েছে পুলিস।মাঝরাতেই সরকারি অফিসার অভিজিত সিনহাকে তুলে নিয়ে গেছিল বাম সরকারের পুলিস,অভিযোগ উঠেছিল বিনা আ্যারেস্ট মেমোতেই অভিজিতকে মাঝরাতে বাড়ি থেকে তুলে থানায় নিয়ে যায় পুলিস।আর তার পর সেই ঘটনার অভিঘাতেই সরকারি অফিসার অভিজিত সিনহা রেলে গলা দিয়ে আত্মহত্যা করেছিল বলে বিতর্ক শুরু হয়েছিল বাম আমলে।মাঝরাতে পুলিসের কড়ানাড়া দেওয়ার  সেই স্মৃতি আজও নিশ্চয়ই রক্তক্ষরণ ঘটায় অভিজিত সিনহার পরিবারের মানুষজেনের বুকে।বাম সরকার আর নেই,এখন ক্ষমতার অলিন্দে বিরাজ করছে মা মাটি মানুষের সরকার,কিন্তু সেই সরকারের পুলিসও মাঝরাতে কড়ানাড়া দিয়ে আতঙ্কিত করছে মাকে,মানুষকেও।আর কী আশ্চর্য!রাজ্য জুড়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে দাগি আসামির দল,সিন্ডিকেট থেকে ধর্মীয় উন্মাদনায় অস্ত্র হাতে বেরিয়ে পড়ছে দামাল ছেলেরা তাদের কারোর বাড়ির ঠিকানা মনে করতে পারে না পুলিস,ধর্মীয় উন্মাদনায় মানুষ মরছে,অপরাধীদের ধরতে পারে না পুলিস,কিন্তু মাঝরাতে পুলিস ঠিক গিয়ে কড়ানাড়া দেয় গণআন্দোলনের কর্মী অমিতাভ ভট্টাচার্যকে থানায় নিয়ে যেতে,কিংবা মেডিকেল কলেজের কৃতি ছাত্র,গণস্বাস্থ্যের দাবিতে সোচ্চার তরুণ চিকিত্সক রাতুল বন্দ্যোপাধ্যায়কে বাগে আনতে।রাতুলকে মাঝরাতে বাড়ি থেকে তুলে তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহীতার অভিযোগের ধারা ইউএপিএ আরোপ করা হয়।সত্যিই  রাতুলতো ব্যবস্থাপনার কাছে বিপদ কারণ এই কঠিন আত্মস্বার্থ সর্বস্ব সময়ে দাঁড়িয়েও সে ডাক্তারি পাশ করে নিজেরটা গুছিয়ে না নিয়ে মানুষের কথা ভেবেছে,মাটির কাছাকাছি থাকা মানুষের দাবি দাওয়ার আন্দোলনকে সমর্থন করতে ছুটে গেছে,গড়পড়তা ভাবনার বাইরে যাঁরা ভাবেন তাঁরা ব্যবস্থাপনার কাছে বিপদতো বটেই।রাতুলকে বিপথ থেকে সরিয়ে আনতে তাই মাঝরাতে পুলিস তাঁর বাড়ির কড়ানাড়া দিতে ভুল করেনি।রাতুলের মা বার বার পুলিসকে ওর সঙ্গে খারাপ ব্যবহার না করার অনুরোধ করেছিলেন কিন্তু পুলিস তা শোনেনি বলে তাঁর অভিযোগ।পুলিসের কী বিবেক বোধ থাকে?কোন দিন ছিল?উত্তরটা বোধহয় তাঁরাই ভাল দিতে পারবেন,সত্তরের দশক থেকে আজ পর্যন্ত মাঝরাতে পুলিসের কড়ানাড়া দেওয়ার স্মৃতি যাঁরা আজও বুকে বয়ে বেড়াচ্ছেন।সেই স্মৃতি এখন থেকে বইবেন রাতুল বল্ধ্যোপাধ্যায়ের মা ও আগামী দিনে সেই তালিকায় জুড়ে যাবে অন্য কোন নাম,কারণ আমরা নিশ্চিত জানি সময় বদলায়,বদলায় না শুধু পুলিসের চরিত্র,কেননা ক্ষমতার অনুষঙ্গেই তো নির্মিত হয় সেই চরিত্র।তবে আমরা এটাও জানি মাঝরাতে পুলিশের কড়ানাড়া যতোই ভয়াবহ স্মতীর দ্যোতক হোক না কেন,রাতুলরা সত্তরে ছিল,এখন আছে আগামি দিনেও থাকবে,কারণ এঁরাই মানবিকতা বিবেক আর মনুষ্যত্ব টিঁকিয়ে রাখার গ্যারান্টি,সভ্যতা এই গ্যারান্টি হারিয়ে ফেলতে পারে না।

, ,