আসুন রাতুলের চোখে চোখ রাখি

 

 

কম খরচে মানুষকে স্বাস্থ্য পরিষেবা দেওয়ার দাবিতে যেমন সোচ্চার ছিলেন,তেমনি গরীব মানুষের ন্যায্য অধিকারের লড়াইয়ের পাশে দাঁড়াতে কোন দ্বিধা ছিল না তাঁর।তাই ডাক্তারি পাশ করে ব্যক্তিগত সুখ স্বাচ্ছন্দ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ার চেনা পথে হাঁটতে চায় নি সে।সে যথার্থই রোদ্দুর হতে চেয়েছে,য়ে রোদ্দুরে শরীর সেঁকে সামাজিক অসাম্য-অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে আর দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে এগিয়ে চলার প্রেরণা পাবে প্রতিবাদী মানুষ।সে রাতুল বন্দ্যোপাধ্যায়,এই সময়ের এক তরুণ চিকিত্সক।যাঁরা বলেন আজকের প্রজন্ম আত্মসর্বস্বতায় মগ্ন,বলেন,রে ব্যান চশমায় চোখ ঢাকা,দামি জিনস্ সজ্জিত আজকের তারুণ্য হাত দুটো বুকের কাছে চেপে ধরে হৃদয়ের আকুতি অনুভব করতে ভুলে গেছে,তাঁরা শুনুন রাতুলের কথা।রাতুল কলকাতা মেডিকেল কলেজ থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে ডাক্তারি পাশ করেছিলেন।তার পর শ্রমজীবী স্বাস্থ্য উদ্যোগের সঙ্গে জড়িয়ে গরীব মানুষের কম খরচে স্বাস্থ্য পরিষেবা পাবার অধিকারের দাবিকে ছড়িয়ে দিতে বাংলার প্রান্তে প্রান্তে ছুটে বেড়িয়েছেন।পাশে দাঁড়িয়েছেন যে কোন গণতান্ত্রীক আন্দোলনের।ভঙড়ে যে ভাবে গায়ের জোড়ে গরীব মানুষের জমি জলের দরে ছিনিয়ে নিয়ে পাওয়ার গ্রিড তৈরির প্রয়াস চালাচ্ছে বর্তমান সরকার,তার বিরুদ্ধে ভাঙড়ের মানুষ যে প্রতিরোধ ও প্রতিবাদের বলয় তৈরি করেছে,তাকে সমর্থন ও সহযোগিতা দিয়েছে রাতুল।সেখানকার লড়াকু মানুষগুলোকে স্বাস্থ্য পরিষেবা দিতে চিগিত্সক হিসেবে বার বার সেখানে গেছেন রাতুল।আর এই জন্যই সরকার ও প্রশাসনের কাছে সে হয়ে উঠেছে বিপজ্জক ব্যক্তি।রাতের অন্ধকারে বাড়িতে পেয়াদা পাঠিয়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।তাঁর বিরুদ্ধে ইউএপিএ ধারার মতো রাষ্ট্রদ্রোহিতার ধারা প্রোয়োগ করা হয়েছে,যে ধারায় ছমাস বিনা বিচারে বন্দী রাখা যায় যে কোন ব্যক্তিকে।এ রাজ্যে সারদা,রোজভ্যালির মত চিট ফান্ডের সঙ্গে যোগসাজস করে যে সব নেতা নেত্রীরা গরীব মানুষের শেষ সম্বলটুকু হাতিয়ে নিয়ে কয়েকশো মানুষকে আত্মহত্যা করতে বাধ্য করায়,যাদের হাত পেতে টাকা ঘুষ নিতে দেখা যায় ক্যামেরার সামনে,তারা সব রাস্তার মোড়ে মোড়ে বর্ণবাহারি হোর্ডিং এ বিশিষ্ট সমাজসেবী বলে বিজ্ঞাপিত হন,পুলিশ এদের টিকিও ছোঁয় না,এরা সব দেশপ্রেমীক,আর রাতুল নামের যে ছেলেটা নিজস্ব গাড়ি বাড়ি সহ বৈভব তৈরির ইচ্ছে কে হেলায় ত্যাগ করে গরীব মানুষের পাশে দাঁড়ায়,তাঁদের পাশে থেকে তাঁদের জীবন যন্ত্রনার ভাগ নিতে চায় স্বেচ্ছায়,সে নাকি হয়ে যায় দেশদ্রোহী!! হায় রে!!এ দেশ সত্যিই মহান।

রাতুল কি জানতেন না যে কোন দিন তাঁকে চারদেওয়ালের বন্দীশালায় পাঠাতে পারে প্রশাসন?জানতেন,ভাঙড় আন্দোলনে যুক্ত থাকার অভিযোগে একাধিক ধারায় অভিযোগ করে যে কজনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দিযেছিল পুলিশ তাতে রাতুলের নামও ছিল,তাই গ্রেপ্তার হয়ে যাওয়াটা তাঁর কাছে অপ্রত্যাশিত মোটেই নয়।বরং গ্রেপ্তার এড়াতে আগাম ব্যবস্থা না নিতে চাওয়াটাই উল্লেখ করার মত বিষয়।বুধবার রাতুলের গ্রেপ্তারির বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদ সভায় অধ্যাপক শাশ্বতি ঘোষ এই প্রসঙ্গ উত্থাপন করে বলেন,চার্জশিটে নাম থাকার পর কেন আগাম জামিনের ব্যবস্থা করা হয় নি,সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে সেটা করা দরকার ছিল বলে মত দেন শাশ্বতি।তার প্রতিত্তরে,ভাঙড় সংহতি কমিটির পক্ষ থেকে রাতুলের সহযোগী জানান রাতুল জামিনের নিরাপত্তার ঘেরাটোপে থেকে ভাঙড়ের আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে রাজি হয় নি,তাঁর মত ছিল ভাঙড়ের সাধারণ মানুষের যদি কোন নিরাপত্তা না থাকে যদি তাঁদের যে কোন দিন পুলিশ ধরতে পারে তাহলে সেও আগাম জামিনের আবেদন করবে না,সেও আর পাঁচজনের মত হাজতে গিয়েই মুক্তির লড়াই করবে।এই যুক্তির পান্টা যুক্তি থাকতে পারে,যে কেউ বলতে পারেন বাইরে থাকলে লড়াইটা আর ভাল করে করতে পারতেন রাতুল,প্রশাসন যখন বিবেক বুদ্ধিকে বিসর্জন দিয়ে ভয়াবহ প্রতিহিংসা নামিয়ে আনতে চাইছে তখন কৌশলী হবার দরকার আছে,হয়তো ঠিক,কিন্তু ভেবে দেখলে বোঝা যায় রাতুলের সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে দৃঢ় আদর্শ বোধ,মানুষের প্রতি গভীর আস্থা।রাতুলরা আজও মাটির দিকে তাকায়,আজও মানুষের হাত ধরে,অন্যকে বলে তুমি মানুষের কাছে যাও সে কিছু বলতে চায়।রাতুল সততার মুখোশ নয়,সততার মুখ তাই, মাঝরাতে রাতুলদের মত মানুষকে যখন রাষ্ট্র বন্দী করে তখন সেটা সুখের সময় নয়,তখন বুঝতে হবে প্রতিটি গণতন্ত্র প্রিয় মানুষকেই নিশানা করছে রাষ্ট্র,যে কোন দিন যে কেউ মাঝ রাতে শুনতে পারেন স্বৈরাচারের কড়ানাড়া

তবু যাঁরা বলেন সময় এখন শুধুই ডাইনি মন্ত্র পড়ছে,বলেন,সবাই এখন নিজেকে নিয়ে বেঁচে থাকে,তাঁরা রাতুলের চোখে চোখ রেখে দেখতে পারেন,আত্মসর্বস্বতার রুক্ষ বাস্তবভূমিতেও স্বপ্নের বীজ বোনার নিরলস প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন কেউ কেউ-হাঁ এই আকালেও।