৩৯জন ‘মাওবাদীর’ হত্যার তদন্ত হোক! তা না হলে ‘মৃত্যু উপত্যকা’ হবে আমাদের দেশ

এক আধজন নয় ৩৯জন মানুষ,দু দফায় যাঁদের গুলি করে হত্যা করা হয়েছে মাত্র কয়েক ঘন্টার ব্যবধানে।একাধিক সংবাদপত্রের রিপোর্ট অনুযায়ী মহারাষ্ট্রের গড়চিরোলিতে সি-৬০ কম্যান্ডো বাহিনীর গুলিতে নিহত হয়েছেন ৩৯ জন মাওবাদী।প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে মাওবাদীদের সঙ্গে বিশেষ কম্যান্ডো বাহিনীর সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন মাওবাদীরা।তবে নানা স্তরে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে সংঘর্ষ হলে সেনা বাহিনীর কেউ সামান্য জখমও কেন হোল না?অত্যাধুনিক অস্ত্র নিয়ে মুখোমুখি লড়াই হোল অথচ বেঘোরে শুধুমাত্র ৩৭জন মাওবাদী মারা গেল,এ যুক্তি খুব শক্ত যুক্তি নয়।এ যুক্তিতে ভরসা না করার আর একাটা বড় কারণ,এর আগেও ভারত রাষ্ট্রের পুলিস ও আধাসেনারা একাধিকবার ভুয়ো সংঘর্ষে(ফেক এনকাউন্টারে)মানুষ মেরেছেন।দেশের সর্বোচ্চ ন্যায়ালয় তা নিয়ে তাদের উদ্বেগও প্রকাশ করেছিল।আমরা নতুন করে এদেশের মানুষকে মনে করিয়ে দিতে চাইবো,মওবাদী নেতা আজাদকেও ভুযো সংঘর্ষে হত্যা করার অভিযোগ উঠেছিল,সেই সময় এ বিষয়ে চলা একটি মামলায় সুপ্রিম কোর্ট তাদের পর্যবেক্ষণে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছিল,সশস্ত্র রাষ্ট্রবিরোধী আন্দোলোন করছেন যাঁরা তাঁরাও প্রজাতন্ত্রের সন্তান,বিনা বিচারে কোন সন্তানের রক্তেই প্রজাতন্ত্র হাত রাঙাতে পারে না।তাই ওরা মাওবাদী, ওরা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে তাই ওদের গুলি করে হত্যা করায় কোন অন্যায় নেই বলে যারা মত দিচ্ছেন,তাঁরা ভারতের সংবিধান বিরোধী,প্রজাতন্ত্রের নীতি বিরোধী অবস্থান নিচ্ছেন,তাতে কোন সন্দেহ নেই।৩৭জন মানুষ যাঁদের কাছে নিছক কোন সংখ্যা নয়,যাঁরা গণতন্ত্র ও নাগরিক অধিকারে বিশ্বাস রাখেন,তাঁরা প্রশ্ন তুলুন তবে কি প্রজাতন্ত্রও তার সন্তানের রক্তে হাত রাঙাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল?নিজের তৈরি প্রতিশ্রুতি প্রজাতন্ত্র নিজেই ভুলে যেতে চাইছে,নিজের সাংবিধানিক রীতি নীতিকে নিজেই নঙ্ঘন করতে উদগ্রীব হয়ে যদি না হয় তা হলে এই ৩৭জন মানুষের হত্যার তদন্ত হোক।সংঘর্ষ হয়েছিল কিনা,হলেও এতগুলো মানুষের হত্যা এড়ান যেত কি না তা নিয়ে তদন্তের দরকার আছে,সেনা বা প্রশাসনের যুক্তিতে যে অনেক ফাঁক তা বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট থেকেই পরিষ্কার,প্রাথমিক ভাবে রাষ্ট্রীয় মদতে ৩৭জনকে খুন করা হয়েছে বলেই মনে হচ্ছে।৩৭জনই সরাসরি মাওবাদী কার্যকলাপের সঙ্গে যুক্ত কিনা তা নিয়েও সংশয় আছে,তারও তদন্ত দরকার।প্রজাতন্ত্র বা রাষ্ট্রের স্বার্থেই এই হত্যার কারণ সামনে আসা দরকার। অনেকেই প্রশ্ন করবেন মাওবাদীরা যখন নির্বিচারে পুলিস মারে তখনতো তার প্রতিবাদ করেন না মানবাধিকার কর্মী বা মাও সমর্থকরা ? আসলে আদিবাসীদের উপর অত্যাচারের রুখতে তারা এই পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয় বলে দাবি করে মাওবাদীরা। তাদের এই যুক্তি অনেকেই সঠিক বলে মনে করেন না। রাষ্ট্র তো নয়ই। তবে রাষ্ট্রের হাতে রয়েছে আইন আদালত ,জেলখানা, সেনা বাহিনী,সর্বপরি সংবিধান। তাই রাষ্ট্রের সাজে না ভুয়ো সংঘর্ষে নাগরিকদের হত্যা করা।  এই নির্বিচার হত্যাকে যদি প্রজাতন্ত্র মেনে নেয় তাহলে পরিষ্কার হয়ে যাবে,প্রজাতন্ত্রের মুখোশের আড়ালে এই ব্যবস্থাপনা আসলে সশস্ত্র খুনিদেরই একটি আলাদা সংগঠন। তাই প্রজাতন্ত্রকেই তার নিজের দেওয়া প্রতিশ্রুতিকে মান্যতা দিতে এগিয়ে আসতে হবে,৩৭জন মানুষকে হত্যার কৈফিয়ত প্রজাতন্ত্রকে দিতেই হবে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশকে সম্মান জানাতে হবে। এই হত্যাকান্ডের পরও শহুরে নাগরিক সমাজের  নির্লিপ্ততায় লজ্জা হচ্ছে আমাদের। তবে কি এই মৃত্যু উপত্যকাই আমাদের দেশ হয়ে উঠল!