রাজেন্দ্র সাচার- মুসলমানদের দুর্দশায় যাঁর হৃদয় কেঁদে উঠত

সমাজতন্ত্রের আদর্শে বিশ্বাসী,মানবতাবাদী,মুসলিমদের দুরাবস্থা উন্মোচনকারী ও দিল্লি উচ্চ আদালতের প্রধান বিচারপতি রাজেন্দ্র সাচার সম্প্রতি প্রয়াত হলেন দিল্লির একটি হাসপাতালে।স্বাধীনোত্তর ভরতবর্ষে ইউপিএ সরকারের আমলে প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং,২০০৫ সালে সাত সদস্যের এক কমিশন গঠন করেছিলেন দেশে মুসলিমদের দুরাবস্থার বিষয়ে আলোকপাত করার জন্য।সেই কমিশনেরই চেয়ারম্যান করা হয়েছিল দিল্লি উচ্চন্যায়ালয়ের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি রাজেন্দ্র সাচারকে যা পরে সাচার কমিশন হিসেবে পরিচিত হয়।বিচারপতি সাচার -এর নেতৃত্বে এই কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশ পেতেই দেশজুড়ে হৈ চৈ পড়ে যায়।দেখা যায় সারা দেশে মুসলিমদের সামাজিক,অর্থনৈতিক ও শিক্ষাগত অবস্থা তাঁদের জনসংখ্যার তুলনায় আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বে তপসিলি জাতি ও জনজাতিদের থেকেও কম।বিশেষ করে আমলাতন্ত্রে ও সরকারি চাকরিতে মুসলিমদের উপস্থিতি সাংঘাতিক হারে কম।সাচারের এই রিপোর্ট ভারতবর্ষের রাজনৈতিক ইতিহাসে দিক নির্দেশিকা (মাইল স্টোন) বলে গন্য করা হয়।

নবতিপর সাচার দৈহিকভাবে অশক্ত হয়ে গেলেও তাঁর মস্তিষ্ক অসম্ভব সজীব ছিল।ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন সমাজতন্ত্রের আদর্শে বিশ্বাসী।তাঁর পরিচিতি ছিল রামমনোহর লোহিয়াপন্হী বলে।বিচারপতি সাচার ১৯৮৫ সালে দিল্লি হাইকোর্টে যখন প্রধান বিচারপতির পদ অলংকৃত করছেন,বিচারপতি জসপাল সিং সেসময় দিল্লির নিম্ন আদালতে কর্তব্যরত।দি টেলিগ্রাফকে ২০ এপ্রিল বিচারপতি সাচারের মৃত্যুর প্রতিক্রিয়া দিতে গিয়ে বিচারপতি সিং রাজেন্দ্র সাচারের মধ্যে যে দায়বদ্ধতা ও মুক্তচিন্তা বিরাজ করতো তা ব্যক্ত করেছেন এভাবে–বিচারপতি হিসেবে তাঁর উত্থান হওয়ার আগে তিনি ছিলেন একজন সমাজতন্ত্রী।তাঁর বাবা ভীম সেন সাচার যখন পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী সে সময় একদা পন্ডিত নেহেরু প্রাতরাশে আমন্ত্রিত হয়ে তাঁদের বাড়িতে যান।বিচারপতি সিং এরপর টেলিগ্রাফকে বললেন–পিতা আশা করেছিলেন পুত্র সেখানে উপস্থিত থাকবেন।কিন্তু সাচার সাব সেখানে থাকতে অস্বীকার করলেন।তিনি বললেন,আমি প্রাতরাশে এই জন্যই উপস্থিত থাকব না যে হেতু আমি তাঁর (এক্ষেত্রে নেহেরুর) অনেক নীতির সঙ্গে একমত নই।

বিচারপতি সাচারের সঙ্গে বেশ কয়েকবার কলকাতায় দেখা হয়েছে।শেষ বার দেখা হলো প্রেস ক্লাবে মাসুম আয়োজিত এক প্রেস কনফারেন্সে।মুসলিম যুবকদের বিভিন্ন অঞ্চলে উগ্রবাদী হিসেবে দেগে দেওয়ার বিরুদ্ধে মাসুমের এক ক্ষেত্র সমীক্ষায় বক্তব্য রেখেছিলেন।বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারের মুসলিম বিরোধী মনোভাবকে তিনি কঠোর সমালোচনা করেছিলেন।তাঁর প্রতিষ্ঠিত সোশ্যালিষ্ট পার্টিতে (গঠিত হয় ২০১৬ সালে) ৯৪ বছর বয়সেও(এই বয়সেই মৃত্যু হয় তাঁর) তিনি সক্রিয় ছিলেন।

লিখেছেনঃ নিত্যানন্দ ঘোষ