বড় একা লাগে এই আধাঁরে……-অনুপম কাঞ্জিলাল

হান চিজেঙ,শ্যামাপদ ভাদুড়ি কিংবা রবীন্দ্রনাথ রায় এঁরা কেউ কাউকে চেনেন না,বা চিনতেন না।চেনার কথাও নয়,কারণ হান জিচেঙ একজন চিনা নাগরিক। চিন দেশের এক প্রান্তভাগে তাঁর বাস,এখন তিনি জীবনের সায়াহ্ন বেলায় পৌঁছে গেছেন,জীবনের ইনিংস শেষের প্রতীক্ষায় রয়েছেন হান চিজেঙ।আর শ্যামাপদ ভাদুড়ি,তিনি গত হয়েছেন বছর কয়েক আগে,মৃত্যুর আগে নিজের স্ত্রীকে মানসিক বিকারে খুন করেন তিনি,তরপর  পুলিশি নজরদারিতে এক মানসিক হাসপাতালে জীবনের শেষ কয়েকটা মাস কাটান সোদপুরের শ্যামাপদবাবু। দক্ষিণ কলকাতার রবীন্দ্রনাথ রায় আত্মঘাতী হন মাস কয়েক আগে। মিডিয়ার রিপোর্ট অনুযায়ী স্ত্রী মারা যাওয়ার পর ছুড়ি দিয়ে নিজের গলা কেটে জীবন থেকে ছুটি নেন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি আধিকারীক রবীন্দ্রনাথবাবু। ভিন্ন দেশ,ভিন্ন পরিবেশ তবু কী আশ্চর্যরকম ভাবে এই সব চরিত্রের গল্প গুলো শেষ পর্যন্ত একবিন্দুতে এসে মিলে যায়,ভৌগলিক সাংস্কৃতিক সব ব্যবধানরেখা মুছে দিয়ে জীবনের অন্তিম পরিণতিতে চিনের হান জিচেঙ আর ভারতের এই বাংলায় শ্যামাপদ ভাদুড়ি,রবীন্দ্রনাথ রায়রা নিজেদের অজান্তেই কখন যেন হয়ে ওঠেন পরস্পরের সহচর।সময় পাল্টায়,স্থানও কিন্তু গল্পগুলো ফিরে ফিরে আসে,আসতেই থাকে।এই যেমন হান চিজেঙ,দিন কয়েক আগে একটি সংবাদ মাধ্যমথেকে জানা গেল,চিনের এই নাগরিকটি তাঁর বাড়ির কাছাকাছি একাধিক জায়গায় হাতে লেখা পোস্টার সাঁটিয়েছেন।সেই পোস্টারে ৮৫ বছরের বৃদ্ধ হান,কাতর আবেদন করেছেন যদি কেউ তাঁকে দত্তক নেন।হান জানিয়েছেন,তাঁর স্ত্রী গত হয়েছেন কয়েক বছর আগে,তাঁর একমাত্র সন্তান তাঁর থেকে অনেক দূরে থাকেন।ভয়াবহ একাকিত্ব আর নিঃসঙ্গতা থেকে মুক্তি পেতে হান মানুষের সাহচর্য় চান,চান কেউ তাঁকে দত্তক নিক,তিনি সঙ্গ চান,চান মানবিক অনুভুতির বন্টন।৮৫ বছরের এক বৃদ্ধের নিজেকে দত্তক নিতে বলার আবেদনে,হাসি আসতে পারে কারোর কারোর,কিন্তু হাসির দমক থামিয়ে একটু ভাবলেই দেখবেন জীবনের সায়াহ্ন বেলার এই একাকিত্ব আর নিঃসঙ্গতার গল্পগুলো বুকটা কেমন ভারী করে তোলে।একাকিত্বের অসহায়তা থেকে মুক্তি পেতেই তো সোদপুরের শ্যামাপদ ভাদুড়ি আর তাঁর স্ত্রী তাঁদের একমাত্র পুত্র সন্তান যে কীনা সুদূর বিদেশে কর্মরত তাঁকে বার বার ফিরে আসার কাতর আবেদন করতেন।কিন্তু বিদেশে থাকতে থাকতে শ্যামাপদবাবুর পুত্র শুধু তাঁর দেশকে নয়,ভুলে গেছিলেন তাঁর জনক-জননীকেও।সন্তান ভুলে গেলেও জনক-জননী কি ভুলতে পারেন তাঁদের আত্মজকে,বিশেষ করে জীবনের ঘোর প্রৌঢ় বেলায়,যখন তাঁদের অবলম্বন ছাড়া বেঁচা থাকা একপ্রকার অসম্ভব হয়ে ওঠে।তাই একমাত্র সন্তানের ফিরে আসার প্রত্যাশায় উপায়হীন বেঁচে থাকতে থাকতেই একসময় মানসিক ভারসাম্যহীনতার দিকে চলে যান,একদা সরকারি অফিসার শ্যামাপদ ভাদুড়ি।কিন্তু তাঁর মানসিক ভারসাম্যহীন জগতেও তাড়া করে আসে বৃদ্ধা স্ত্রীকে নিয়ে একরাশ উদ্বেগ।কোথায় থাকবে সে,তিনি চলে গেলে কে দেখবে তাঁকে?তাই একদিন এই সমস্যার সমাধান করে ফেলেন মানসিক বিকারে আক্রান্ত শ্যামাপদবাবু,স্ত্রীকে হাতুরির আঘাতে খুন করে দিয়ে।নিয়মমতো পুলিশ আসে।কেন খুন করলেন?জানতে চাওয়ায় পুলিশকে সেই বৃদ্ধ জানায়–কোথায় থাকবে,কে দেখবে,কোথাও কেউ নেই….সব অন্ধকার।মানসিক ভারসাম্যহীন এক ব্যক্তির এরকম অসংলগ্ন মন্তব্যের মধ্যে কোথায় যেন একাকিত্ব আর নিঃঙ্গতার তীব্র হাহাকার বেজে ওঠে।পুলিশ ঐ বৃদ্ধের বিরুদ্ধে খুনের অভিযোগ আনলেও এই ঘটনার পর ঐ বৃদ্ধের স্থান হয় এক মানসিক হাসপাতালে,সেখানেই বেশ কয়েক মাস পর  ইতি ঘটে শ্যামাপদ ভাদুরির জীবন কাহিনির।না শ্যামাপদবাবুর একমাত্র পুত্র এর পরেও বিদেশ থেকে ফিরেছিলেন বা বাবা মায়ের কোন খোঁজ নিয়েছিলেন বলে জানা যায় নি।বেশ কয়েক বছর আগে সংবাদ মাধ্যমে সাড়া ফেলা এই ঘটনা যে আদৌ কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়,দেশ বিদেশের অনেক মানুষই যে এরকম ভায়াবহ এক নিঃসঙ্গতা আস্কৃর একাকিত্বের গহ্বরে তলিয়ে যাচ্ছে তার প্রমাণ দিতেই যেন চিনা নাগরিক হান জিচেঙের জীবন বৃত্তান্ত সামনে চলে এল।হান জানিয়েছেন দীর্ঘ জীবনে সে অনেক কিছু দেখেছেন,দেখেছেন জাপানি আগ্রাসন,দেখেছেন চিনের গৃহযু্দ্ধ,এমকী মাও সে তুঙের সাংস্কৃতিক বিপ্লবেরও সাক্ষী থেকেছেন তিনি,এসব অভিজ্ঞতা তাঁকে ঋদ্ধ করেছে,সমৃদ্ধ করেছে।কিন্তু জীবন সায়াহ্নে পৌঁছে যে একাকিত্ব আর নিঃসঙ্গতার অভিজ্ঞতা তা তাঁকে নিঃস্ব করছে,রিক্ত করে তুলছে প্রতিদিন।ভয় হয় এই রিক্ত নিঃস্বতার অভিঘাত শেযপর্ন্ত তাকে আত্মহননে প্ররোচিত করবে না তো?যেমন করলো এ রাজ্যের অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মী রবীন্দ্রনাথ রায়কে মাস কয়েক আগে।স্ত্রীকে নিয়ে দক্ষিণ কলকাতায় এক বিশাল বাড়িতে থাকতেন রবীন্দ্রনাথ রায়,মেয়ের বিয়ে হয়েছে দুরে,ছেলেও থাকেন কর্মসূত্রে বাইরে।স্ত্রী অসুস্থ ছিলেন তবু তাঁকে পরিচর্য়া করেই দিন কাটতো প্রৌঢ়ের,আচমকা স্ত্রী মারা যাওয়ায় নিজের বেঁচে থাকার আর কোন মানে খুঁজে পাননি বৃদ্ধ রবীন্দ্রনাথ বাবু,স্ত্রীর মৃতদেহের পাশে বসে ছুড়ি দিয়ে নিজের কন্ঠনালী কেটে আত্মঘাতি হন এই বৃদ্ধ,অম্তত সংবাদ মাধ্যমের রিপোর্ট সেরকমই।এই সংবাদ যদি সত্য হয় তাহলে তো মানতে হবে,এ গল্পও আসলে সেই একাকিত্ব আর নিঃসঙ্গতার গল্পে গিয়েই মিশলো।আর মাত্র একদিন আগে গড়িয়ার বিনয় হালদার সে ও তো গলায় ফাঁস দিয়ে ঝুলে পড়ার আগে বার বার তাঁর প্রতিবেশীদের বলেছিলেন,মেয়ে বাড়ি বিক্রি করে তাঁকে তার কাছে চলে যেতে চাপ দিচ্ছে।কিন্তু সে এতদিনের পরিচিত পাড়া মানুষদের ছেড়ে চলে যেতে চায় না,একই সঙ্গে তাঁর আশঙ্কাও ছিল একলা বাড়িতে তাঁকে কে দেখবে,কে পরিচর্যা করবে?এখান থেকেই তৈরি হয় তাঁর অবসাদ,আর তার ফলশ্রুতিতে গত বৃহস্পতিবার মাঝরাতে গলায় দড়ি দিয়ে একলা ঘরে ঝুলে পড়েন বিনয়বাবু।জীবনের সায়াহ্ন বেলায় একাকিত্ব আর নিঃসঙ্গতার  মর্মান্তিক অভিঘাতে জীবনের এমন ধারাবাহিক ঝরে যাওয়া দেখতে দেখতে বুকের ভেতরটা কেমন যেন কেঁপে ওঠে,আশঙ্কা হয় আমাদের সকলের জন্যই এমন পরিণতি অপেক্ষা করে নেই তো?যে সমাজ,যে সভ্যতা তার অগ্রজদের ভায়াবহ এক নিঃসঙ্গতা আর একাকিত্বের গহ্বরে ঠেলে দিয়ে নির্বিকার থেকে যায়,সেই সমাজ,সেই সভ্যতা কোন উন্নয়নের গল্প শোনাবে,যে উন্নয়নের বিবেক নেই,আবেগ নেই,সে উন্নয়নকে সঙ্গি করে কোথায় পৌঁচুবো আমরা?হয়তো সেখানেই যে খানে পৌঁছে গেছেন শ্যামাপদবাবু রবীন্দ্রনাথ বাবুরা,যেখানে যেতে চান চৈনিজ বৃদ্ধ হান চিজেঙ।এই একাকিত্ব আর নিঃসঙ্গতার আজ আর কোন দেশ নেই,বর্ণও নেই, তা আজ সরাচর ব্যপ্ত।আমরা জানি যে রাজনীতি আজ দেশ দুনিয়া নিয়ন্ত্রন করছে সেই রাজনীতি এই একাকিত্ব নিঃসঙ্গতা ঘোচানোর কোন প্রেরণা দিতে অক্ষম,কারণ এই রাজনীতি শুধুমাত্র ক্ষমতার অভিমুখ ধরেই চলতে অভ্যস্ত,চেতনার অভিমুখ নিয়ে তার কোন আগ্রহই নেই।তাই তো এই সব রাজনীতির মিছিলে ওঠা স্লোগানের রেশ মিলিয়ে যায় মিছিল ভাঙলেই,বিভিন্ন দাবি দাওয়া আদায়ের জন্য মিছিলে ওঠা সংঘব্ধ মুষ্টিবদ্ধ হাত বাড়িতে পৌঁছেই একাকিত্বের অসহায়তায় নিস্তেজ হয়ে আসে।তখন চিনের হান চিজেঙ,আর এদেশের শ্যামাপদবাবু,রবীন্দ্রনাথবাবু,বিনয়বাবুরা হয়ে ওঠেন এক একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ।বার্ধক্যের একই একাকিত্ব আর নিঃঙ্গতার মিছিলে হাঁটলেও এরা কেউ কাউকে চিনতে পারেন না।এরা পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়েই একে একে তলিয়ে যেতে থাকেন নিঃসঙ্গতা আর একাকিত্বের অতল গহ্বরে।আমাদের আজকের বিশ্ব ব্যবস্থার কর্তা ব্যক্তিরা আমাদের ভুলিয়ে দিতে পেরেছেন হাতে হাত রেখে বেঁধে বেঁধে থাকার মন্ত্র।এখন আমরা সবাই একা থাকি এদেশে,বিদেশেও। অনেক সময় একসঙ্গে থেকেও আসলে একা! ছোটরা বড়রাও।আমাদের বাড়িতে এখন আর ঠাকুমা ঠাকুরদাদারা নেই,আমাদের বাচ্চারা এখন ঠাকুমার ঝুলি সিডিতে শুনতে শুনতে একলা ঘরে ঘুমিয়ে পড়ে।আধুনিকতা মানে গতি,প্রতিযোগিতা,বুড়ো বয়সে যখন গতি কমে যায়,প্রতিযোগিতায় টিঁকে থাকার শক্তি কমে যায়,তখন এ সমাজে সে ব্রাত্য বাতিল।চিনের হান চিজেঙ,এখানকার শ্যামাপদ ভদুড়ি,রবীন্দ্রনাথ রায়রা তো আসলে সেই বাত্য বাতিল তালিকারই এক একটা সংখ্যামাত্র।প্রত্যাশা করা যায় যতদিন যাবে এই তালিকা তত দীর্ঘ হতে থাকবে।