বিচার তবে কি সত্যিই অন্ধ!

কেউ কেউ বলেন,সেই বিচার ব্যবস্থাই সেরা  যেখানে ১০০ জন অপরাধী খালাস পেয়ে গেলেও ক্ষতি নেই,কিন্তু  একজনও নিরাপরাধ ব্যক্তি সাজা পায় না।  সেই মানদন্ডে ভারতীয় বিচার ব্যবস্থাকে বিচার করতে বসলে ধন্ধ তৈরি হতে বাধ্য।বোঝা যায় না কখন কোন ধারায় এ দেশের বিচার ব্যবস্থা প্রবাহিত হতে চায়।এদেশে সলমান খানের মত সেলিব্রিটির বিরুদ্ধে বিচার বিভাগ রায় দেয়,আবার দিন কয়েকের মধ্যে তাঁর জামিনও হয়ে যায়।অন্যদিকে আবার কয়েকটা বিস্কুট চুরি করার অপরাধে কয়েক বছর জেলে কাটাতে হয় কোন এক বিস্কুট কারখানার কর্মীকে।পয়সা খরচ করে ভাল উকিল দিতে না পারার দায়ে কত কত নিরপরাধ মানুষ যে জেলের চারদেওয়ালের মধ্যে দিনযাপন করছেন কতদিন ধরে তার হিসেব কেউ দিতে পারবে না।এ রাজ্যে শাসক দলের নেতা কেষ্ট মন্ডল প্রকাশ্যে পুলিশকে বোম মারতে বলে,বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায়,আর ভাঙড়ে পাওয়ার গ্রিড বিরোধী গণতান্ত্রীক আন্দোলনকে সমর্থন করা ও কম খরচে সাধারণ মানুষকে স্বাস্থ্য পরিষেবা দেওয়ার দাবি তোলার অপরাধে মাঝরাতে বাড়ি থেকে পুলিশ গিয়ে তরুণ ডাক্তার রাতুল বন্দ্যোপাধ্যায়কে জেল বন্ধী করলে বিচার বিভাগ তাঁকে জেলের অন্দরে রাখার পক্ষেই রায় দেয়।জামিন হলেও তাঁর বিরুদ্ধে আর মামলা জুড়ে দিলে বিচার বিভাগ প্রশ্ন তোলে না কেন পুলিশের এত সক্রিয়তা একজন ডাক্তারকে জেল বন্দী রাখার?কেন এই সক্রিয়তা পুলিশ দেখাতে পারে না রাজনৈতিক গুন্ডা লুম্পেনদের বিরুদ্ধে?

আবার কোন কোন সময় কিছু প্রশ্ন তোলেন কিছু বিচারক,যেমন কলকাতা হাইকোর্টের বিচারক দীপঙ্কর দত্ত রাজ্য সরকারের কাছে একবার জানতে চেযেছিলেন,হৈ হুল্লোর মত্ততার জন্য অর্থ ব্যয় করলেও সরকারি কর্মীদের ন্যায্য পাওনা দেওয়ার সময় অর্থ থাকে না কেন সরকারের?আর কিছু প্রশ্ন সরকারকে বিচারকরা করেন যা সরকারের পক্ষে অস্বস্তিকর।কিন্তু সে সব আবার কোথায় হারিয়ে যায়,সব কেমন যেন চুপসে যায়। ন্যায় বিচার নিয়ে ধন্ধ বাড়তেই থাকে।এই যেমন পঞ্চায়েত নিয়ে মনে হচ্ছিল শাসক তথা সরকারকে এবার চেপে ধরবে আদালত।যেভাবে সন্ত্রাস ছড়িয়েছে গ্রাম গঞ্জে,যে ভাবে মহিলাদের কাপড় খুলে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে,মহিলাদের প্রকাশ্য রাস্তায় চুলের মুঠি ধরে টানতে টানতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে,তাতে কারোর বোঝার সমস্যা হওয়ার কথা নয় যে রাজ্য জুড়ে এক ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।কিন্তু আদালত কি শেষ পর্যন্ত তা বুঝলো?১০ তারিখের রায় দেখে সে বিষয় অনেকেরই সংশয় তৈরি হতে বাধ্য।রাজ্য নির্বাচন কমিশনের নির্ঘন্ট মেনে ১৪ তারিখ এক দফাতেই ভোট হবে বলে রায় দিল হাইকোর্ট।যদি গন্ডোগোল হয় যদি মানুষের প্রাণ হানি হয়,তাহলে কী হবে?এ নিয়ে অবাক হওয়ার মতো রায় দিল হাইকোর্ট,জানাল,যদি প্রাণহানির সংখ্যা ২০১৩ থেকে বেশী হয় তাহলে ক্ষতিপুরণ দিতে হবে,রাজ্য প্রশাসনকে।যেহেতু সেবার কেন্দ্রীর বাহিনীর পাহাড়ায় ভোট হওয়া সত্ত্বেও কিছু প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছিল তাই এবার কেন্দ্রীয় বাহিনী না থাকায় সেই সংখ্যক প্রাণ হানিকে ক্ষতিপুরণের আওতায় রাখছেন না মাহামান্য আদালতের বিচারপতি।তার মানে ২০১৩ তে মারা যাওয়া সংখ্যাটা তেমন খারাপ কিছু নয়,তার চেয়ে বেশী যেন মারা না যায় তা দেখতে হবে।এই রায়কে কোন মানবিক বোধ সম্পন্ন মানুষ মানতে পারেন,মানা যায়?এ কেমন বিচার যা মৃতের সংখ্যার নিরিখে ক্ষতিপুরণের মাপকাঠি নির্ধারিত হওয়ার কথা বলে!!আমরা তো জানতাম গণতন্ত্রে একজন মানুষের মৃত্যুও কাম্য নয়,আর বিচার বলছে মৃতের সংখ্যা দিয়ে নির্বাচনে শান্তি বা অশান্তি নির্ধারিত হবে।তাহলে আমাদের বিচার বিভাগই বলে দিল নির্বাচনে মৃত্যু নয় আসলে মৃত্যুর সংখ্যাটাই আসল কথা।মানে কিছু মৃত্যু তো হতেই পারে,কিন্তু সেই সংখ্যা যেন ২০১৩ কে না ছাড়িয়ে যায়।যারা বলেন আদর্শ বিচার ব্যবস্থা হল সেটা যেখানে কোন নিরাপরাধ মানুষ শাস্তি পায় না,তাঁরা বোধহয় সবাই এখন অতীত,তাঁরা থাকলে হয়তো বলতেন এ দেশের বিচার সত্যিই অন্ধ!