আর কত ‘সঞ্জিত’ মরলে তবে মানবে তুমি শেষে…….

হাঁ আপনাদের কাছেই জানতে চাইছি,হে নষ্ট রাজনীতির কারবারি, হে ক্ষমতার অভিমুখ ধরে চলতে থাকা রাজনীতির ব্যবসায়ীরা আপনারাই বলুন আর কত কত জীবনের অপচয়ের পরে আপনাদের থেকে মুক্তি মিলবে আমাদের। আর কত প্রাণের মূল্যে আপনারা মানবিকতা মনুষ্যত্বের কাছে দায়বদ্ধ হতে শিখবেন?আর কতকাল আমাদের এই প্রজন্মের যুবক যুবতীরা দু হাঁটু মুড়ে বসে হাত জোড় করে আপনাদের  কাছে সাহায্যের প্রার্থনা করবে?আর আপনারা তাদের নিজের অঙ্গুলি হেলনে নাচিয়ে নাচিয়ে এক সময় ঠেলে ফেলে দিতে থাকবেন মৃত্যুর অতল গহ্বরে। বলুন আর কত কাল কত কাল এরকম মৃত্যুমিছিল দেখে যেতে হবে আমাদের?পঞ্চায়েত ভোট যা কি না গ্রামের মানুষকে নিজের নিজের রাজনৈতিক অধিকার বুঝে নেওয়ার শক্তি দেবে বলে বলা হয়েছিল সেই ভোটকে কেন্দ্র করেই এখনও পর্যন্ত বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের খবর অনুযায়ী মারা গেল ১৬ জন মানুষ।আর আপনারা ক্ষমতা লোলুপ রাজনীতিররা বলছেন নাকি এসব ছোট ঘটনা,আগের জামানার পরিসংখ্যান দিয়ে বোঝাতে চাইছেন আগে এর চেয়েও বেশী মারা যেত।আপনাদের কাছে মৃত্যু হয়তো শুধুই কতগুলো সংখ্যা কিন্তু আমাদের কাছে মৃত্যু যে কেবল সংখ্যা নয়,যে পরিবার,যার পরিজন যায় সে বোঝেন।আপনারা মৃত্যুতেও লাভ লোকসানের হিসেব কষেন,আমাদের না ওদের বিভাজন করেন,কারণ আপনারা রাজনীতির ব্যবসায়ী। ক্ষমতার লেনদেন করাই আপনাদের পেশা। আর আমজনতা ক্ষমতার অলিন্দ নিয়ে যাঁদের কোনদিন কোন আগ্রহ ছিল না,যাঁরা শুধুমাত্র বেঁচে থাকার তাড়নায় আপনাদের দিকে চেয়ে থাকেন,তাঁদের যন্ত্রনা হাহাকারকে স্পর্শ করে দেখেছেন আপনারা কোনদিন,না  দেখেন নি তাই ওঁদের স্বজন হারানোর হাহাকার কোনদিন আপনাদের বিদ্ধ করবে না,রাজনৈতিক চাপানউতোর পেরিয়ে আপনারা কোনদিন মানবিকতার আয়নায় নিজেদের চেহাড়াটা দেখতে চাইবেন না। সঞ্জিত নামের যে ২৭ বছরের ছেলেটা পঞ্চায়েত ভোটে শাসক দলের হয়ে শান্তিপুরে বুথ দখল করতে গিয়ে গণপিটুনিতে বেঘোরে মারা গেল,সেই ছেলেটি সদ্য এমএ পাশ করেছিল। একটা চাকরির খুব দরকার ছিল নদিয়ার বাসিন্দা এই তরুণের। বাবা মায়ের একমাত্র ছেলে,প্রাইভেট টিউশানি করে দিন চলতো কোনক্রমে।সঞ্জিত প্রামানিকের বাবা মা জানাচ্ছেন একটা চাকরির প্রত্যাশাতেই স্থানীয় বিধায়কের কাছে বার বার যেতেন সঞ্জিত।প্রতিশ্রুতি ছিল,দলের হয়ে কাজ করলে তাঁর চাকরীর ব্যবস্থা হবে।আর সোমবার পঞ্চায়েত ভোটে দলের হয়ে বুথ দখলের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল তাঁকে,সেই বেআইনি কাজ করতে গিয়েই জনরোষে প্রাণ হারাতে হোল ২৭ বছরের তরতাজা এই তরুণকে।চাকরী দেওয়ার প্রতিশ্রুতির কথা অস্বীকার করেছেন ঐ বিধায়ক,করারই কথা,তিনি তো রাজনীতি করেন কখন কাকে কোন প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তা তাঁর মনে থাকার কথা নয়,আর সেটা যখন প্রমাণ করার উপায় নেই তখন তাঁকে দায়ী করাও যায় না।আমরা বরং নির্দিষ্টভাবে কাউকে দায়ী না করে এই নষ্ট রাজনীতির প্রকোপে জীবনের এই ভয়াবহ অপচয়ের গভীরতাকে একটু অনুধাবনের চেষ্টা করি।আমাদের সমাজে লেখাপড়া জানা একটা যুবকের বেকার থকার জ্বালা মর্মান্তিক,তা থেকে মুক্তি পেতেই তাঁরা নানা ভাবে খারাপ কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন,চলে আসেন নষ্ট রাজনীতির কারবারীদের আওতার মধ্যে।ভেবে দেখুন সঞ্জিত নামের এই ছেলেটির জীবন বৃত্তান্তের সঙ্গে হুবাহু মিলে যাচ্ছে আজ থেকে অনেকদিন আগে চিত্র পরিচালক তপন সিনহার একটি ছবি আতঙ্কের বিষয়বস্তু। সেই ছবিতেও একটি মেধাবী ছেলে চাকরীর প্রত্যাশায় নষ্ট রাজনীতির খপ্পরে পড়ে শেষ পর্যন্ত খুনি হয়ে ওঠে। আর তাকে খুন করতে দেখে ফেলে তারই একসময়কার স্কুলের মাস্টার মশাই। আর তার পর থেকে মাস্টারমশাই যাতে পুলিশকে কিছু না জানায় তাই সে মাস্টারমশাইকে ভয় দেখিয়ে চলে এই বলে যে,মাস্টার মশাই আপনি কিন্তু কিছুই দেখেন নি। মাস্টারমশাইকে ভীত সন্ত্রস্ত করে রাখতে তাঁর ছেলে মেয়ের নিরাপত্তা নিয়ে তাঁকে হুমকি দেওয়া শুরু হয়।শেষ পর্যন্ত সিনেমার সেই নষ্ট রাজনীতির খপ্পরে পড়া ছেলেটি খুনের দায়ে ধরা পড়ে,বৃদ্ধ মাস্টার মশাই পুলিশকে সব সত্যি বলে দেওয়ায়।আর সঙ্গে সঙ্গে ঐ ছেলেটির যাবতীয় অপরাধে নিজেদের দায় অস্বীকার করেন নষ্ট রাজনীতির কারবারী নেতারা,বলেন এই সব অপরাধীদের ফাঁসি হওয়া উচিত।আর বাস্তবের স়্ঞ্জিতের বুথ দখল যে কোন রাজনৈতিক নেতার নির্দেশেই হয়েছে তা কেনই বা স্বীকার করবেন আজকের নষ্ট রাজনীতির কারবারীরা!সবটাই বিরোধীদের ও মিডিয়ার অপপ্রচার।আহা এমনটাই তো বলেছিলেন আতঙ্ক ছবির সেই রাজনৈতিক নেতারাও।সিনেমায় খুন হয়ে যাওয়া সন্তানের মৃতদেহের সামনে বধির হয়ে বসেছিলেন বৃদ্ধ মা বাবা,বাস্তবেও একমাত্র পুত্রের মৃত্যুর হাহাকার আর যন্ত্রনা নিয়ে জীবনের বাকি দিনগুলো কাঁটাতে হবে শুধু মাত্র সঞ্জিতের বাবা মাকেই,নষ্ট রাজনীতির কারবারিদের সঞ্জিতের বাবা মায়ের জন্য কিছুই যাবে আসবে না।আমরা দেখতেই থাকবো নষ্ট রাজনীতির প্রকোপে জীবনের এই ভয়াবহ অপচয়।তবু ফারাক একটা আছে,একসময় বাস্তবের এই চেহাড়াটা ধরা দিত সিনেমায়,তপন সিনহারা ছিলেন কঠিন রুক্ষ বাস্তবের উপর শিল্পের আলো ফেলতে।এখন তাঁরা অতীত,এখন এ রাজ্যের এই নষ্ট রাজনীতি নিয়ে কেউ কোন কথা বলবেন না,একের পর এক এই নোংরা রাজনীর প্রভাবে আমাদের তরুণ প্রজন্মের তলিয়ে যাওয়া নিয়ে,অধঃপতন নিয়ে সবাই যেন কানে ও চোখে তুলো দিয়ে রেখেছেন।কে জানে হয়তো নিরুচ্চারে সবার কানের কাছেই নষ্ট রাজনীতির পান্ডারা ছড়িয়ে দিতে পেরেছেন ভয়ের সেই অমোঘ বাণী–মাস্টার মশাই আপনি কিন্তু কিছুই দেখেন নি।আতঙ্ক ছবির সেই মাস্টার মশাইও কিন্তু প্রথমে ভয়ে সত্য থেকে দূরে সরতে চেয়েছিলেন,তবে শেষ রক্ষা তাতেও হয় নি,তাঁর ছেলেকে মেরে হাত পা ভেঙে দেয় নষ্ট রাজনীতির নির্দেশ মানা চ্যালারা,তারপর তাঁর মেয়ের মুখ আ্যাসিডে পুড়িয়ে দেওয়া হয়,তাই শেষ পর্যন্ত সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা দেখাতে এগিয়ে যান সিনেমার বৃদ্ধ মাস্টার মশাই।তাই আজ যে সব শিল্পী সাহিত্যিকরা ভাবছেন গা বাচিয়ে থেকে যাবেন,ভাবছেন পঞ্চায়েত নিয়ে ১৬ জনের মৃত্যু কী এমন বেশি!ভেবে দেখুন জীবনের ভয়াবহ অপচয় একদিন আপনার ঘরের কড়া নাড়া দেবে না তো? দুর্বৃত্ত পরিবেষ্টিত রাস্তা দিয়ে তো আপনার ঘরের মেয়েটাকেও যাতায়াত করতে হয়,কোনদিন যদি দেখেন সে রাস্তায় রক্তাক্ত হয়ে পড়ে আছে। চুপ করে থাকতে পারবেন তো,সেদিন কিন্তু এই সব নষ্ট রাজনীতির কারবারীদের দিকে আঙ্গুল তুলে আপনাদেরও বলতে হবে-বল কত হাজার মরলে পরে মানবে তুমি শেষে বড্ড বেশি মানুষ গেছে বাণের জলে ভেসে…….