নব্বই বছরের স্বাধীনতা সংগ্রামী আজও পরাধীনতার গ্লানিতে ম্লান!

এলাকায় তাঁর পরিচয় বোকা বুড়ো-না, এ বোকা বুড়ো কোন রূপকথার বোকা বুড়ো নয়।ইনি পাঁশকুড়ার এক নব্বই ছোঁয়া বৃদ্ধ।নাম জগদীশ্বর পাঁজা।এক সময় দেশকে স্বাধীন করার লড়াই করেছেন।স্বদেশী লড়াইয়ের অগ্রণী সৈনিক সুশীল ধারার অনুগামি ছিলেন,কোনদিন নিজেকে স্বাধীনতা সংগ্রামী বলেন নি,বলেছেন সেবক।ইংরেজ দেশ ছেড়েছে,স্বাধীন দেশের সংবিধান তৈরি হয়েছে,দেশে প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে প্রচার চলে চারদিকে।এসব দেখেন আর হাসেন তিনি,হাসেন নির্বাচন নামক প্রহসন দেখেও।তাঁর মত ও যুক্তির পাল্টা কিছু বলতে না পেরে তথাকথিত বিদ্যাধরী ব্যক্তিরাও,মনে মনে তাঁকে বোকা বলেই ঠাওরান।তিনি তবু নাছোড়,জানতে চান গণতন্ত্রে শাসক থাকে কোন যুক্তিতে?আর শাসক যদি থাকে তবে শাসন-শোষণ থাকবে না তাই বা কী করে হবে?যুক্তি হিসেবে অকাট্য,তাই তাঁকে এড়িয়ে চলেন অনেকেই।তাঁর মতে এদেশে কোন গণতন্ত্র নেই আছে দলতন্ত্র।আর এই দলতন্ত্রের অনুমোদন দিয়েছে এদেশের সংবিধানই।সংবিধানের রীতি মেনেই এ দেশে দলের সরকার তৈরি হয়,দলের সরকার কখোন জনগনের সরকার হয় না।দলের সরকার কখোন নিরপেক্ষ হয় না হতে পারে না।জগদীশ্বর বাবুর আক্ষেপ এই স্বাধীনতা তাঁরা চান নি,তাঁরা দেশ বলতে দেশের মানুষকে বুঝতেন,দেশের গরিব মানুষকে স্বাচ্ছন্দ্য দেওয়া,তাঁদের জীবনের মান উন্নত করার লক্ষ্যেই তাঁরা দেশ সেবক হতে চেয়েছিলেন।কিন্তু এ দেশ স্বাধীনতার উল্টো ব্যাখ্যা করে দেশের মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে চলেছে বলে মনে করেন পাঁশকুড়ার এই বোকা বুড়ো।খুব বেশী পুঁথিগত শিক্ষা তাঁর নেই,তবু কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারীদের তিনি শিক্ষিত বলেন না বলেন,লেখাপড়া জানা মানুষ।তীব্র আক্ষেপ ঝড়ে পড়ে নব্বই ছোঁয়া মানুষটির গলায় বলতে থাকেন,এদেশে লেখাপড়া জানা মানুষের অভাব নেই কিন্তু শিক্ষিত মানুষের ভারি অভাব।সেই জন্য দেশটা এরকম দুর্নীতিতে ভরে গেল।তিনি বিশ্বাস করেন শিক্ষিত লোক দুর্নীতি করতে পারে না।

তাঁর সঙ্গে কথা বলতে শুরু করলে মনে হতে পারে মানুষটা কী তবে রাষ্ট্রবিরোধী!তাঁর জবাব না তিনি রাষ্ট্রবিরোধী নন,বরং রাষ্ট্র পরিচালনার নামে যা চলছে সেটাই রাষ্ট্র বিরোধী।তাঁর দ্বিধামুক্ত ঘোষণা,এদেশের দলীয় রাজনীতি হোল ভয়ানক এক ভাইরাস,যা গোটা দেশকে শেষ করে দিচ্ছে।মানুষে মানুষে সম্পর্ক,মানবিকতা সবকিছু নষ্ট হয়ে যাবার জন্য দায়ী এই ক্ষমতা মুখি দলীয় রাজনীতি।এই দলীয় রাজনীতির গ্রাস থেকে মানুষকে বার না করতে পারলে এদেেশের মুক্তি নেই।জগদীশ্বরবাবুর দাবি দেশের স্বার্থে প্রথম দরকার শিক্ষা-বিচার-প্রশাসনকে একেবারে দলীয় আনুগত্য থেকে মুক্ত করে স্বশাসন দেওয়া।নির্বাচিত গণপ্রতিনিধি হওয়ার বদলে নির্বাচিত শাসক হলে যা হবার এ দেশ জুড়ে তাই হচ্ছে বলে মনে করেন এই দেশ সেবক।জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়েও পরাধীনতার গ্লানিতে ম্লান এই বোকা বুড়ো,তাই সকলকে আহ্বান করেন,আমি চলে যাবো কিন্তু এদেেশের অগণিত যুবক যুবতী তরুণ-তরুণিরা তো থাকবেন,তাদের জন্য আর একটা স্বাধীনতার লড়াই দরকার,দরকার দেশটাকে ভালবাসা।যে গরিব কৃষক আদিবাসীরা চিরদিন বঞ্চনার শিকার হয়ে জীবন কাটিয়ে দিল,তাদের বাদ দিয়ে দেশ প্রেম হয় না,জাতীর উন্নয়ন হয় না হতে পারে না।এখনও এক উজ্জ্বল দিনের প্রত্যাশা জগদীশ্বর পাঁজার চেতনা জুড়ে।সেই চেতনার তাড়নাতেই যে কোন খবরের কাগজে ভাল লেখা প্রকাশিত হলে নিজের উদ্যোগে তা জেরক্স করে বিলি করতে থাকেন।তাঁর বিশ্বাস মানুষকে ঠিকটা বোঝালে মানুষ পরিবর্তিত হবে।মানুষের পরিবর্তনই একসময় সমাজের পরিবর্তন আনবে।এই মানুষটি একটা সময় সাংবাদিকতা করেছেন,নিজে বলেন সখের সাংবাদিকতা।বিভিন্ন কাগজে লিখেছেন,ছবি পঠিয়েছেন,সবই মানুষের চেতনা বাড়াতে।আজকের সাংবাদিকতা নিয়ে তাঁর গলায় তীব্র শ্লেষ,জানান এখন সবাই সঙবাদিক।লেখা পড়ে মনে হয় যেন সঙ সাজার বাদিক গ্রস্ত সবাই।বলে যান হয়তো তাঁদেরও কিছু করার নেই,সাংবাদিকতার নেশার চেয়েও পেশা যদি বড় হয়ে ওঠে তাহলে তো এটাই হবে।স্বামী বিবেকান্দের আদর্শের ধারক বাহক বলে দাবি করা মিশন ও মঠ নিয়েও তাঁর ক্ষোভ তীব্র।কেন এই সব জায়গাগুলোতে বড়লোক বা পয়সাওয়ালা ছেলেমেয়েরা  পড়বে,ভাল পরিবারের ছেলেমেয়েরা ভাল পড়াশুনো করবে সেটা তো স্বাভাবিক,স্বামীজি তো বলেছিলেন,মেথর,মুচির ঘর থেকে তুলে আনতে হবে ছেলেমেয়েদের,তাদের শিক্ষার আলো দিতে হবে,সেই আদর্শ পালন হচ্ছে কোথায়?তাঁর বিস্ময় ভরা প্রশ্ন,সাধু সন্ন্যাসীরা কেন এয়ার কন্ডিশনড গাড়িতে চড়ে ঘুরবেন?কেন মিশন চালানোর নামে কোটি কোটি টাকা সঞ্চয় করে রাখবেন?সন্ন্যাসীর আবার সঞ্চয় কিসের?এরকমই তীব্র তীক্ষ্ণ তাঁর প্রশ্ন,যা সরাসরি বিদ্ধ করবে যে কোন যুক্তি প্রিয় মানুষকে।জীবন সায়াহ্নে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির কথার পরতে পরতে লেগে থাকে গ্রামের মাটির গন্ধ,আর মাটি থেকেই উঠে আসা সত্যের নির্যাস।তাই এক সময় স্বদেশী আন্দোলন করা জগদীশ্বর পাঁজাকে মা মাটি আর মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে চেনা যায় কোন নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের পতাকা বাদ দিয়েই।বেঁচে থাকুন জগদীশ্বর পাঁজা,আর আর অনেক দিন,আপনি সততার ডালপালা ছড়িয়ে দেওয়া এক বৃক্ষ,যার নীচে দাঁড়ালে আমরা মানবিকতা আর মনুষ্যত্বের ছায়া পাবো,গোলমেলে আমাদের এই ব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে শানিত তীব্র প্রশ্ন করার সাহস অর্জন করতে পারবো।