স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অসুখটা ঠিক কী? লিখছেন রেজাউল করিম

অন্তত স্বাস্থ্যক্ষেত্রে, পশ্চিমবঙ্গ ভারতীয় অঙ্গরাজ্য গুলির মধ্যে এক বিরল উদাহরণ যেখানে রাজ্যের প্রায় প্রতিটি প্রান্তে কোন না কোন স্বাস্থ্য পরিকাঠামো আছে। প্রাথমিক (অর্থাৎ প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র ইত্যাদি), মধ্যমস্তরীয় (অর্থাৎ মহকুমা বা সদর হাসপাতাল ইত্যাদি) এবং উচ্চতর (সরকারী মেডিকেল কলেজসমূহ) – এই ত্রিস্তরীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থায় এই রাজ্য, অনন্য না হলেও, একটি উল্লেখযোগ্য ও প্রশংসনীয় নজির।

হ্যাঁ, উল্লেখযোগ্য একারণেই, যেহেতু, উত্তর ও পূর্ব ভারতীয় অন্য অঙ্গরাজ্য গুলি এ বিষয়ে অনেকখানি পিছিয়ে আছে। এমনকি পশ্চিম উপকূলের অনেক তুলনামূলক ভাবে সচ্ছল রাজ্যগুলির তুলনায়ও পশ্চিমবঙ্গ কৃতিত্ব দাবী করতে পারে। প্রসঙ্গত, উল্লেখ করা যেতে পারে, ইদানীং যে রাজ্য প্রায় সমগ্র জাতির কাছে আদর্শ হয়ে উঠেছে, সেইখানেও ত্রিস্তরীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থা এতো সংগঠিত নয়। এর সাথে যদি এই কথাটি মাথায় রাখা যায়, যে, এই তিনটি স্তরেই চিকিৎসা হয় প্রায় বিনেপয়সায়, তাহলে উদ্যোগ প্রশংসনীয় তো বটেই।

সম্প্রতি বেশ কয়েকটা ক্ষেত্রে, এই রাজ্য, প্রতিবেশী রাজ্যগুলির তুলনায় অনেকটা এগিয়ে গেছে – যেমন, শিশু মৃত্যু (২৫/১০০০) ও প্রসবকালীন মৃত্যুহারের (১১৭/১০০০০০) নিরিখে এই রাজ্য যথেষ্ট অগ্রসর। প্রসঙ্গত, বলে রাখি, একটি সমাজের সার্বিক স্বাস্থ্যের কী হাল, তা বোঝার জন্যে, এই সূচকদুটি বিশেষ কার্যকরী। কাজেই, সাধারণ স্বাস্থ্যসূচকে, আমরা অন্যান্য রাজ্যের থেকে খুব একটা পিছিয়ে তো নেই-ই, বরং বেশ কিছুটা এগিয়ে। নারী শিক্ষার হার ও গ্রামীন সড়কের সংস্কার ও নির্মান স্বাস্থ্য-সূচকের এই উন্নতিতে সাহায্য করেছে।

বর্তমান বছরে, এই রাজ্যে,বাজেটে, স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ, উল্লেখযোগ্য ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি, পূর্বতন সরকারের তুলনায় রোগী শয্যার অনুপাতও অনেকখানি বেড়েছে। আগে এই অনুপাত ছিলো খুব কম (১.০৪:১০০০), যা বর্তমানে বেড়ে দাঁডিয়েছে ১.৪২/১০০০।

কিন্তু, সামগ্রিক ভাবে স্বাস্থ্য-বিনিয়োগ ও পরিকাঠামো উন্নতির সাথে মানুষের চাহিদা ও প্রত্যাশার বেশ খানিকটা ফারাক রয়েই যাচ্ছে। তাই, দুর্ভাগ্যজনকভাবে, প্রাত্যহিক প্রচারমাধ্যমে, স্বাস্থ্য, সর্বদাই, ভ্রান্ত পরিপ্রেক্ষিতে শিরোনামে আসছে।

সরকারী স্বাস্থ্যব্যবস্থা – আকাশচুম্বী প্রত্যাশা

যেমন বলেছি, আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা অনুন্নত রাজ্যসমূহ ও প্রতিবেশী অনুন্নত দেশের তুলনায় প্রাগ্রসর। তদসত্ত্বেও, এই অগ্রগতি জনগনের আকাশচুম্বী প্রত্যাশার নিরিখে অপ্রতুল।

প্রথমেই বলি, আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতি আছে যা, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুসারে, সঙ্কটের কারন হয়ে দাঁড়াতে পারে। ২০১৭-১৮ সালে টীকাকরনের যে হিসাব আমরা দেখতে পাচ্ছি সেখানে পশ্চিমবঙ্গ থেকে অনেক তথ্য কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে জমা পড়ে নি। অতএব, বলা দুষ্কর যে, যেসব জীবানুবাহিত রোগ নতুন করে ফিরে আসছে তা প্রতিরোধে আমরা কতটা সক্ষম। পশ্চিমবঙ্গে গত বছরে প্রায় ৪২০০০ নতুন যক্ষ্মা রোগী পাওয়া গেছে। এই রোগীদের প্রায় শতকরা ৪০ ভাগই থুতুর সাথে যক্ষ্মার জীবানু নিষ্ক্রমন করেন। তাই, যক্ষ্মার প্রতিরোধে সামান্যতম অবহেলা মারাত্মক অবস্থা তৈরী করতে পারে। যক্ষ্মার সাম্প্রতিক প্রাদুর্ভাবের আরেকটি আশঙ্কা জনক দিক হল যে ৮৭০০০ রোগী এই বছর চিকিৎসা গ্রহন করছেন তাদের শতকরা প্রায় ১৫ ভাগই পুনরাক্রমনের শিকার। রাজ্য সরকারের সাম্প্রতিক একটি রিপোর্টে মেনে নেওয়া হয়েছে, যে, এই রাজ্যে শিশুদের অপুষ্টির হার প্রায় ৩০শতাংশ। যক্ষ্মা ও অপুষ্টি পরস্পরের সহায়ক। তাই,প্রতিরোধ ও চিকিৎসায় বিশেষ যত্নবান হওয়ার পাশাপাশি, অপুষ্টির দিকটাতেও তো নজর দিতে হবে। টীকাকরনের হার এ রাজ্যে বিগত পাঁচ বছরে উল্লেখযোগ্য ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে বলে, সরকারী তরফে দাবী করা হয়েছে; অথচ, কেন্দ্রীয় রিপোর্টে প্রকাশ, গুরুত্বপূর্ণ পেন্টাভালেন্ট ভ্যাকসিন, যক্ষ্মা প্রতিরোধক ও হেপাটাইটিস টীকা সংক্রান্ত কোন তথ্য রাজ্য সরকার পাঠান নি। আরেকদিকে, গত বছর প্রায় ৫৫০০ পরিকল্পিত টীকাকরন কর্মসূচী বাতিল হয়েছে, যা কিনা টীকাকরণে যথেষ্ট গুরুত্বের সপক্ষে বার্তা দেয় না।

সরকারী ক্ষেত্রে, হাসপাতালে গড়ে পায় ১১কোটি রোগী বহির্বিভাগে চিকিৎসা পান, তাদের প্রায় শতকরা ৫ভাগ রোগীকে ভর্তি করে নেওয়া হয়, প্রায় ৩লক্ষ৫০হাজার বড় অপারেশন ও ৯ লক্ষ প্রসব হয়। হাসপাতাল গুলির পরিচ্ছন্নতা বেড়েছে। প্রতিটি শয্যায় পরিষ্কার বেডশীট সরবরাহও বেড়েছে। অনেক ওষুধ বিনামূল্যে দেওয়া হয়, বেশির ভাগ পরিষেবাই, বিনামূল্যে বা নামমাত্র মূল্যে রোগীরা পেয়ে থাকেন।

এসবের পরেও, পরিকাঠামোগত বেশ কিছু অসুবিধা থেকেই যাচ্ছে, যার ফলে চিকিৎসাব্যবস্থার গ্রাহক যথেষ্ট সন্তুষ্ট হতে পারছেন না। আর এই অসন্তুষ্টিই, সমগ্র স্বাস্থ্যব্যবস্থার বদনামে ইন্ধন যোগাচ্ছে।

আগেই বলা হয়েছে, বিগত কয়েক বছরে, রোগীপিছু শয্যার সংখ্যা বেড়েছে। কিন্তু, তারপরেও, আমাদের শয্যাসংখ্যা (১.৪২/১০০০) ন্যূনতম লক্ষ্যমাত্রা বা চাহিদার (২.৫/১০০০) তুলনায় অপ্রতুল। ফলে হাসপাতালগুলিতে রোগীদের দীর্ঘ অপেক্ষা একরকম স্বত:সিদ্ধ।

বহির্বিভাগে একজন চিকিৎসককে গড়ে যে পরিমান রোগী দেখতে হয় তা প্রথম বিশ্বে কেউ কল্পনাও করতে পারেন না। খুব সঙ্গত কারনে বহির্বিভাগে রোগী-চিকিৎসক আলোচনার উপযোগী পরিবেশ ও সময়ের একান্ত অভাব। আবার, যে রোগী তাঁর একদিনের কর্মদিবস ব্যয় করে হাসপাতালে এলেন, তিনি তাঁর শারীরিক-মানসিক সমস্যার চিকিৎসককে বলে ভয়-ভীতি-আশঙ্কার উপযুক্ত চিকিৎসা প্রার্থনা করবেন তো বটেই, সাথে তাঁর সঙ্গত প্রত্যাশা, চিকিৎসক ওষুধ লেখার পাশাপাশি কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলে তাঁর দুশ্চিন্তার নিরসন করবেন। শত শত রুগীর চাপে পিষ্ট চিকিৎসকের সেই অবকাশ নেই, তাই রোগীকে সন্তুষ্ট করা সম্ভব হয় না। আর, কে-ই বা না জানে, যে, অসন্তুষ্ট উপভোক্তা যেকোনো প্রতিষ্ঠানের সুনামের কতটা পরিপন্থী!!!

হাসপাতালেকে বৃহৎ যৌথ পরিবার ভাবলে, পরিবারের কর্তা হয়তো চিকিৎসক। কিন্তু, যেকোনো যৌথ পরিবারের মতোই, কর্তার কার্যকরিতা পরিবারের বাকি সদস্যদের উপর নির্ভরশীল। এক্ষেত্রে, তাঁর সবচেয়ে শক্তিশালী বাহু, সেবিকাদের (নার্স) অপ্রতুলতা হাসপাতালে সন্তোষজনক পরিষেবার পরিপন্থী। টেকনিশিয়ান ও ল্যাবরেটরি পরীক্ষার সাথে জড়িত আনুষঙ্গিক কর্মচারীর অভাবও চিকিৎসকদের যথেষ্ট বিড়ম্বনার কারন। আর, প্রয়োজনের তুলনায় কম সংখ্যার চিকিৎসকের বিষয়টি তো আছেই।

অনেক অপ্রতুলতার মধ্যেই, কর্তা পরিবারটিকে নিয়ে তরী পার করছিলেন অনেকবছর ধরে, কিন্তু, ইদানিং, রোগী-চিকিৎসক বা রোগী-স্বাস্থ্যকর্মীর পারস্পরিক সম্পর্কের ক্রমাবনমন যেভাবে দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দিয়েছে, তাইতে, এবার, তরী না ডোবা-ই আশ্চর্যের। সম্পর্কের অবনতির কারণ বহুবিধ। প্রায়শই, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের একাংশ যথেষ্ট সংযম ও উপযুক্ত সম্ভ্রমের সাথে রোগীদের সাথে কথাবার্তা বলেন না। অনেক সময় চিকিৎসক রোগীকে তাঁর সমস্যা খুলে বলেন না কিম্বা বললেও জটিল পরিভাষা ব্যবহার করেন, যা রোগীর বোধগম্য হয় না। আবার, অনেকসময়, রোগীর প্রাথমিক পছন্দ থাকে বেসরকারী চিকিৎসাক্ষেত্র। নেহাত নাচার হয়েই তাঁর সরকারীক্ষেত্রে পদচারণ। সেক্ষেত্রে, তাঁকে তুষ্ট করা তো অলীক স্বপ্ন। সবমিলিয়ে, একথা স্বীকার করতে বাধা নেই, যে, উপভোক্তার সন্তুষ্টিপ্রদানের ক্ষেত্রে, সরকারী চিকিৎসাক্ষেত্র, কিছুটা পিছিয়ে।

বেসরকারী পরিষেবা – কতোখানি নিয়ন্ত্রণ জরুরী

পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ৪৩০০০ বেসরকারী শয্যা আছে। আর পাঁচটা ব্যবসার মত বিনিয়োগকারীর কাছে এই শয্যাগুলি অর্থ উপার্জনের হাতিয়ার। এই শয্যার বেশির ভাগের মালিক কোন অচিকিৎসক বিনিয়োগকারী। তাছাড়া প্রায় ২০০০এর কাছাকাছি সংখ্যায় ছোট ছোট নার্সিংহোম আছে যেগুলির এক বা একাধিক অংশীদার চিকিৎসক।

বেসরকারী প্রতিষ্ঠানগুলিতে দুধরনের খরচ আছে – মূল চিকিৎসা খরচ আর শয্যা ও আনুষঙ্গিক বিবিধ খরচ।

আনুষঙ্গিক স্বাচ্ছন্দ্যযুক্ত শয্যার ভাড়া অনুসারে, মূল চিকিতসাব্যয় ওঠানামা করার কোন যুক্তি নেই। সরকার নিশ্চয়ই মূল চিকিৎসা খরচ নিয়ন্ত্রন করে সর্বত্র একই দর ধার্য্য করতে পারেন। কিন্তু আনুষঙ্গিক স্বাচ্ছন্দ্যের মূল্যমান কোন হাসপাতাল কীরকম ধার্য্য করবেন, এমনকি শয্যার ভাড়া কতো থাকবে, এইসব নিয়ন্ত্রন করার দায় সরকারের নয়। উদাহারন স্বরূপ বলা যায়, পাইস হোটেলে খাবারের দাম ও পাঁচতারা হোটেলে খাবারের দাম কি সরকার নিয়ন্ত্রন করতে পারেন? করতে হয়তো পারেন, কিন্তু তার যুক্তি কতোটুকু? পুঁজি যেখানেই বিনিয়োগ হোক তা তার আপন ধর্মে কাজ করে যাবে – সেখানে কেবা আপন কে পর, কে ধনী কে নির্ধন, কে মুমূর্ষু কে স্বাস্থ্যবান তা হিসেব করে না – শোষন আর মুনাফা সেখানে মূল মন্ত্র।

আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার খরচের সমানুপাতিক হিসাব করলে দেখা যাবে যে খরচের সিংহভাগ (৬৪%) হল ওষুধ বা আনুষঙ্গিক সাজসরঞ্জামের দাম, যা সরকার ইচ্ছা করলেই নিয়ন্ত্রন করতে পারেন। এখানে মনে রাখা প্রয়োজন, ওষুধ ইত্যাদির দাম নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা প্রায় পুরোটাই কেন্দ্রের সরকারের হাতে, আর স্টেন্ট-প্রস্থেটিক্স ইত্যাদির ক্ষেত্রে আংশিক প্রয়োগের ফলে মানুষ সুফল পাওয়া সত্ত্বেও, এই ক্ষমতার সার্বিক প্রয়োগের উৎসাহ ততোটা দেখা যাচ্ছে না।

প্রতি বছর শতকরা ৭ভাগ রোগী নিজেদের সর্বস্ব বিক্রি করে চিকিৎসা খরচ মেটায়- সে খরচের মাত্র ১০-১৫% খরচ হয় পরিষেবাপ্রদানকারী অর্থাৎ চিকিৎসকের বেতন ও ফি বাবদ।

কিন্তু, একথা মেনে না নিলে ভাবের ঘরে চুরি করা হবে, যে, মূল্য নিয়ন্ত্রনে চিকিৎসকদের হাত না থাকলেও, সরকারী ও বেসরকারী পরিষেবার সাথে জড়িত একশ্রেনীর চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের অন্যায় অসদাচারণ মানুষের ভোগান্তির একটি বড় কারণ। নানারকম আইন থাকা সত্বেও অবাধে অপ্রয়োজনীয় ওষুধপ্রয়োগ ও পরীক্ষা নিরীক্ষা করানো, সাথে ফি-স্প্লিটিং-কমিশন একাধারে রোগীর ভোগান্তি আর সামগ্রিক চিকিৎসা ব্যয় দুইই বাড়ায়। রোগী-চিকিৎসক পারস্পরিক অবিশ্বাস-বিদ্বেষ আরো বেড়ে ওঠার এও এক বড়ো কারণ।

আরেকদিকে, আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের মূলস্তম্ভ, এভিডেন্স-বেসড মেডিসিন বা প্রমান-সাপেক্ষ চিকিৎসা পদ্ধতি যে সামগ্রিক চিকিৎসা ব্যয়ের উর্ধগতির অন্যতম কারণ, তাই নিয়ে আজ আর বিশেষ দ্বিমত নেই। নিত্যনতুন ব্যয়বহুল, এমনকি ব্যয়সর্বস্ব, চিকিতসাপদ্ধতির সমর্থনে হাজির হওয়া চটজলদি (অনেকক্ষেত্রে ওষুধনির্মাতাদের দ্বারা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে প্রস্তুত) সেই প্রমাণ, কী অনিবার্যভাবে চিকিৎসার খরচ করে তুলছে লাগামছাড়া, বিশ্বের সর্বমান্য চিকিতসাপ্রতিষ্ঠানগুলিতে, একথা আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁডিয়েছে।

স্বাস্থ্য রাজনীতি

আমাদের কথা, দাবীও বটে, স্বাস্থ্যের মূল চাবিকাঠি সরকারের হাতে থাকা উচিত। দেশের সরকার ডা: শ্রীনাথ রেড্ডীর নেতৃত্বে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি গঠন করেন। সেই কমিটির সুপারিশ হল: স্বাস্থ্য বাজেট যদি জিডিপির ২.৫% হয় তাহলে সারা দেশের সমস্ত মানুষের জন্য বিনামূল্যে সমমানের আধুনিক পরিষেবা দেওয়া সম্ভব। বর্তমানে চিকিৎসা ব্যয়ের শতকরা প্রায় ৭০শতাংশ রোগীকে খরচ করতে হয়, যদি সরকার স্বাস্থ্য বাজেট বৃদ্ধি করেন তাহলে সেই ব্যয় হবে শতকরা ৩৫ ভাগ।দেশের মানুষ স্বাস্থ্যবান হলে একদিকে যেমন অপ্রয়োজনীয় খরচ কমবে তেমনি দেশের গড় উৎপাদনশীলতার হারেও উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি হবে। এই ব্যবস্থায় বেসরকারী প্রতিষ্ঠানগুলিও লাভবান হবে, কারণ তাদের অব্যবহৃত শয্যার সংখ্যা কমবে। সরকার এই শয্যার একটি বড় অংশ রোগীদের জন্য ভাড়া নেবেন। সরকারী হাসপাতালে যথেষ্ট পরিমান পুঁজি বিনিয়োগ করতে পারলে তার পরিকাঠামোর মান বৃদ্ধি হবে ও সমমানের চিকিৎসা ব্যবস্থা গড়ে উঠবে।

উন্নত দেশগুলিতে, সরকারী আধিকারিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, যারা দেশের মুখ্য নিয়ামক, তাঁরা নিজেদের অসুখবিসুখ হলে, তাঁর চিকিৎসা সরকারী প্রতিষ্ঠানে করান। ফলে একদিকে যেমন পরিকাঠামোর মান নিয়ে তাঁরা অবহিত থাকেন তেমনি তার আভ্যন্তরীন শক্তি ও ত্রুটি-দুর্বলতা নিয়েও তাঁরা সম্যক ওয়াকিবহাল থাকেন। এতে সরকারী ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা জন্মায়। সমাজ বিজ্ঞানী ও অর্থনীতিবিদরাও সরকারী হাসপাতালে ক্ষমতাধর মানুষের চিকিৎসা করার পক্ষে জোরদার সওয়াল করেছেন।

আমাদের দেশের বেশিরভাগ মানুষ যেহেতু অর্থনৈতিক ভাবে নিষ্পেষিত, তাঁরা উদয়াস্ত পরিশ্রম করেও নিজেদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন করতে পারেন না, তাঁদের ক্ষোভের কেন্দ্র বিন্দু হল ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা। অন্তত সাধারণ মানুষের চোখে, চিকিৎসকেরা ক্ষমতাধর শ্রেণিরই অঙ্গ। আর পাঁচটা ক্ষমতার কেন্দ্রের তুলনায় হাসপাতালের নিরাপত্তাব্যবস্থা অনেক কম আটোসাটো। তাই, সেই অনাস্থা প্রায়শই হাসপাতালের উপর আছড়ে পড়ে। তারপর চলে ভাঙচুর, মারধোর। লাগামছাড়া স্বাস্থ্যবিজ্ঞাপন মানুষের মনে এই প্রত্যাশাও তৈরি করে দিচ্ছে, যে, অসুখমাত্রেই নিরাময়যোগ্য। যেকোনো মৃত্যুর পরেই পরিজনের শোক যে আছড়ে পড়ছে ক্ষোভ হয়ে, তার পেছনে এই অহেতুক ফাঁপানো প্রত্যাশা একটা বড়ো কারণ।

প্রথমেই প্রয়োজন ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ফেরানো। চিকিৎসক বিষয়ে সামাজিক মূল্যায়নের রাতারাতি পরিবর্তন সম্ভব নয়। কিন্তু , প্রচেষ্টা শুরু করা আশু প্রয়োজন আর এই পরিবর্তনে রাজনৈতিক দল ও সমাজের মতামত সৃষ্টিকারী ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও সংবাদপত্রের ভূমিকা অনস্বীকার্য।

সাম্প্রতিক চিকিৎসক আন্দোলন ও আনুষঙ্গিক বিষয়

গত বছরে এই রাজ্যে একশো জনের বেশি চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য কর্মী নিগ্রহ ও এমনকি গনধোলাইয়ের শিকার হয়েছেন। মহিলা চিকিৎসকরাও নির্যাতিত হয়েছেন।

বেশিরভাগ ঘটনার কোন বিচার হয় নি। অনেক ক্ষেত্রে নিগ্রহকারী রাজনৈতিক মদত ও আশ্রয় পেয়েছেন। পুলিশ এফআইআর গ্রহন করেন নি, এমনকি স্বত:প্রণোদিত হয়ে নিগৃহীতকে মিটমাট করে নেওয়ার চাপ দেওয়া হয়েছে। সরকারী কর্তাব্যক্তিরাও আক্রান্তদের পাশে দাঁড়ানো দূর অস্ত, তাদেরকে প্রকাশ্যে অপমান করেছেন, কোনরকম সহায়তা দেননি, শুধু তা-ই নয়, কোনও কোনও ক্ষেত্রে তাঁর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও গ্রহন করেছেন।

এই অবস্থায় চিকিৎসকরা নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত। সব চিকিৎসকের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বন্দোবস্ত করা সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু মানুষের আস্থা আছে মুখ্যমন্ত্রীর প্রতি, তিনি জননেত্রী, রাজ্যের অভিভাবক। তিনি যদি চিকিৎসকদের অবাধে ও নির্ভয়ে কাজ করতে দেবার আবেদন করেন তাহলে চিকিৎসকদের মনোবল বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে ও নতুন উৎসাহ ও উদ্যম নিয়ে তাঁরা নিজের কাজ আরো ভালোভাবে করতে পারবেন ।

চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে হামলায় যে সংঘবদ্ধ হিংস্রতা দেখা যায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সেখানে রোগীর পরিবার পরিজন জড়িত থাকেন না। শোক থেকে, পরিজনকে বাঁচাতে না পারার হতাশা থেকে আছড়ে পড়া ক্ষোভ নয়, হিংস্রতা-ভাঙচুরের মাধ্যমে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে সামাজিক সুস্থিতি নষ্ট করাই সেখানে মূল উদ্দেশ্য।

এই হামলা ও প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তার বিরুদ্ধে চিকিৎসকেরা আন্দোলনে সামিল হয়েছেন। এই আন্দোলনের কোন অর্থনৈতিক লক্ষ্য নেই। নেই কোনও দলীয় রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্য। নিজেদের মর্যাদা পুনরুদ্ধার, নিরাপদ পরিবেশে নিজের পেশার প্রতি দায়বদ্ধ থাকার সুযোগ ও সম্মানের সাথে কাজের দাবিতে চিকিৎসকরা সংগঠিত প্রতিবাদ আন্দোলনে সামিল হয়েছেন।

সাম্প্রতিক চিকিৎসা আন্দোলনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবী হল- স্বাস্থ্যের অধিকার। চিকিৎসকরা মনে করেন, মানুষের ক্ষোভের ন্যায়সঙ্গত কারণ নিহিত আছে দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্য বরাদ্দের অপ্রতুলতা ও কেন্দ্রীয় সরকারের রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার অভাবের মধ্যেই। তাই তুলনামূলক ভাবে পশ্চিমবঙ্গে বরাদ্দ বৃদ্ধি হলেও সামগ্রিক চিত্রের খুব বেশি পরিবর্তন হচ্ছে না। কেন্দ্রীয় বরাদ্দ বাডিয়ে জিডিপির ২.৫ শতাংশ করার পাশাপাশি, সরকারী-বেসরকারী চিকিতসাব্যবস্থাকে পারস্পরিক সহযোগীর ভূমিকা পালন করতে হবে। এ দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্য পরিকাঠামো প্রতিবেশী অনেক অনুন্নত দেশের তুলনায় খারাপ। শয্যা ও চিকিৎসকের সংখ্যার নিরিখে আমরা শ্রীলঙ্কার চেয়েও পিছিয়ে আছি।

এই পরিস্থিতিতে চিকিৎসকরা যে জনগনের স্বাস্থ্যের অধিকারের দাবীতে রাস্তায় নেমে আন্দোলন করছেন, তা একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইল ফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।ইতিপূর্বে ৮০ র দশকে আমরা এই আন্দোলন দেখেছি। কিন্তু, শুধুমাত্র গুটিকয়েক চিকিৎসক এই দাবী তুললে হবে না, সমাজের যারা বৃহত্তর নিয়ামক, দেশের মানুষের আবেগ ও চিন্তা চেতনা যাদের কথায় আন্দোলিত হয়, সেই তাঁরাই এই লড়াইয়ে সত্যিকারের অগ্রণী ভূমিকা নিতে পারেন ।

জনসাধারণের রাজনৈতিক দাবী হিসেবে “স্বাস্থ্যের অধিকার” তার উপযুক্ত স্থান না পেলে তা স্বল্প সংখ্যক বুদ্ধিজীবির টকশো হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকবে আর সেই লক্ষ্য কখনো পূর্ণতা পেতে পারে না। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে কোনও রাজনৈতিক ইস্তাহারেই এই গুরুত্বপূর্ণ দাবী যথাযথ গুরুত্বের সাথে উচ্চারিত হয় নি।

সবার জন্যে স্বাস্থ্যের দাবী নিয়ে চিকিৎসক সংগঠনগুলি নিশ্চয় বিতর্ক উত্থাপন করতে পারেন, কিন্তু সেই আন্দোলনের নেতৃত্ব জনগনের কাছে গ্রহনযোগ্য হতে হবে, আর সেই নেতৃত্বদানের পরীক্ষিত দক্ষতা আছে একমাত্র রাজনীতিকদেরই। তাই, প্রতিযোগী হিসেবে নয়, সাধারণের স্বাস্থ্যের দাবীকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সেই কাজে, স্বাস্থ্যের দাবীকে রাজনৈতিক দাবী হিসেবে মান্যতা দেওয়ার প্রয়াসে, চিকিৎসকরা রাজনীতিকদের সহযোগী হিসেবে কাজ করতে পারেন।

কিন্তু তারও আগে চাই চিকিৎসকদের সামাজিক সম্মান পুনরুদ্ধার, চাই সম্মান ও নিরাপত্তার সঙ্গে অবাধে পেশাগত দায়িত্ব পালনের পরিবেশ। এই পরিবেশ ফেরানোর দায় সরকারের। দায়িত্ব সমাজের বাকি সবাইয়েরও।

লেখক চিকিত্সক অান্দোলনের  অন্যতম সংগঠক