লাইভ আত্মহত্যা সমাজমনের অসুখ

লাইভ,এখন সবকিছুই লাইভ,লাইভের মোহে আমরা ভুলতে বসেছি সুখ দুঃখ রাগ অভিমানের জন্য একটা গোপন ব্যক্তিগত পরিসর একান্ত দরকার।সবকিছুকে হাটের মাঝে নিয়ে আসলেই সবকিছুর ভাগাভাগি হয় না।সবার মাঝে থাকলেই একাকিত্ব দূর হয় না।শহর কলকাতার এক কিশোরী তার আত্মহত্যার ফেসবুক লাইভ সম্প্রচার করে বোধহয় সেই ভয়াবহ বার্তাটিই রটিয়ে দিয়ে গেলেন।আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভরতা আমাদের ভুলিয়ে দিতে বসেছে মানুষকে জানতে বুঝতে পারস্পরিক নৈকট্যের দরকার,দরকার মানবিক অনুভূতি আর গভীর সংবেদনশীলতা।এখন আমরা সোশ্যাল নেটওয়ার্ক মারফত বন্ধুত্ব পাতাই,যে বন্ধুত্বের বন্ধনে গভীরতা নয়,অস্থির চপলতা আর চটকদারি ব্যাপারগুলোই মুখ্য হয়ে ওঠে।মুঠিবদ্ধ ফোন বা কম্পিউটারের পর্দায় ফুটে ওঠে যে সাধারণ যাপনচিত্র তা থেকে আসল মানুষটির দুরত্ব কতটা তা জানতে কেউ কোন আগ্রহ দেখান না। অর্দ্ধসত্য বা মিথ্যাকে সত্য ধরে নিয়ে ছোট ছোট বিভ্রম ক্রমেই সামাজিক বিভ্রমের আকার নিতে থাকে।তৈরি হতে থাকে মানুষে মানুষে ব্যবধান দুরত্ব।আধুনিক প্রযুক্তির দৌলতে পৃথিবীটা ক্রমে ছোট হতে হতে হাতের তালুতে বন্ধী হয়,আর মানুষ পরস্পর সরে যেতে থাকে দূরে আর দূরে….।সবকিছুকে ভার্চুয়াল জগতে টেনে আনার মাসুল দেওয়ার কথাই বোধহয় নিরুচ্চারে বলে গেল কলকাতার কিশোরীর আত্মহত্যার লাইভ সম্প্রচার।যে ভাবে আমরা আমাদের প্রেম সুখ দুঃখ,ভাল থাকা-মন্দ থাকা বা দাম্পত্য থেকে সন্তান হওয়া বা না হওয়াকেও ফেসবুকের আওতায় এনে ফেলেছি তাতে মরণ যাত্রাই বা সেই আওতা থেকে দূরে থাকবে কেন!!গভীর এক অসুখে আক্রান্ত আমাদের গোটা সমাজ,বিষণ্ণতা সেই অসুখের প্রধান লক্ষণ।সামাজিক বন্ধন সেই অসুখের প্রতিষেধক হতে পারতো,কিন্তু ফেসবুক চর্চা আমাদের সেই প্রতিষেধককে দূর্বল করে দিচ্ছে প্রতিদিন।আমরা বুঝতেও পারছি না ফেসবুককে হাতিয়ার করে একাকিত্ব ঘোচানোর নামে আমরা আর বেশী করে একাকিত্বের গহ্বরে ঢুকে পড়ছি ক্রমশ।গুলিয়ে যাচ্ছে বাস্তব আর পরাবাস্তবের ব্যবধান,ফেসবুক আমাদের বন্ধুত্ব,প্রেম,অনুভূতি সবকিছুকে শিকড়হীন করে দিচ্ছে।শিকড়হীন পরিসরে ঘোরা ফেরা করা আজকের সমাজ মননে তাত্ক্ষণিক বিষয়গুলিই বেশী গুরুত্ব পায়,আর তাই ভাবনার গভীরতা,দীর্ঘস্থায়ী অনুসন্ধান সবকিছু বাতিল হয়ে যায়।আমাদের ভাবার সময় এসেছে,সেলফি জগত আদপে একা থাকা ও একা বাঁচার কথা বলে,সামাজিকতার সঙ্গে যা একেবারে বেমানান,বুঝতে হবে তথাকথিক লাইভ জগতে অনুভূতির ইমেজ থাকতে পারে,কিন্তু অনুভূতির গভীরতা থাকে না,সেখানে মানুষের হাতে হাত রেখে ভরসা দেওয়ার অবকাশ নেই,সুযোগ নেই সত্যি অর্থে মানুষের পাশে দাড়াঁনোর।প্রয়ুক্তির মর্মাথ অনুধাবনে ব্যর্থ আজকের প্রজন্ম যে ক্রমশ ফেসবুকের নিয়ন্ত্রনে এসে একাকিত্বের অতল গহ্বরে তলিয়ে যেতে বসেছে,সেই বার্তাই দিয়ে গেল কিশোরীর আত্মহত্যার লাইভ সম্প্রচার।আমরা কেউ জানি না আর কত জীবনের এমন ভয়াবহ অপচয়ের পর নতুন প্রজন্ম অনুধাবন করতে শিখবে প্রযুক্তির সত্যিকারের অর্থ।