দিল্লির নির্ভয়ার থেকেও মর্মান্তিক মৃত্যু সুলতানার? ধর্ষণ করে খুনকে দুর্ঘটনা বলে চালানোর অভিযোগ প্রশাসনের বিরুদ্ধে

এ বছরের ১৭ এপ্রিল প্রচন্ড ঝড় বৃষ্টির রাতে কলকাতা থেকে বাড়ি ফেরার সময় গড়িয়া স্টেশনের কাছে রহস্যজনক ভাবে গাড়ির নীচে চাপা পড়েন সুলতানাবিবি নামে বছর ছাব্বিশের এক নিম্নবিত্ত পরিবারের গৃহবধূ। মৃতার ছবি স্যোশাল মিডিয়াতে আসতেই হৈ চৈ শুরু হয়ে যায়। দেখা যায় মহিলার দেহের নিম্নাংশ একেবারে রাস্তার সঙ্গে পিষে দেওয়া হয়েছে।তাঁর দেহের উর্দ্ধাংশে কোন কাপড় ছিল না।কাপড় চোপড় অন্য জায়গায় পাওয়া যায় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়।এই ভয়াবহ মৃত্যু নিয়ে এর পর থেকেই শুরু হয় বিতর্ক।বেশ কিছু গণসংগঠন ও মানবাধিকার সংগঠন এই ঘটনাকে ধর্ষণ ও খুন বলে দাবি করে পুলিশি তদন্তের জন্য সোচ্চার হয়।মৃতার পরিবার থেকেও বলা হয় যে সেদিন রাতে ছেলেকে নিয়ে কলকাতা থেকে ফিরার পথে গড়িয়া স্টেশনের কাছে অসুস্থ বোধ করায় সুলতানা,সেখানকার এক মিষ্টির দোকানের পাশে বসে পড়েন,তাঁর ছেলে বাড়িতে  ঠাকুমাকে ডেকে আনতে যায়,যাতে অসুস্থ সুলতানাকে বাড়ি নিয়ে যেতে সুবিধা হয়।কিন্তু সুলতানার শাশুড়ি ও ছেলে কিছু পরে ফিরে এসে ঐ জায়গাতে সুলতানাকে খুঁজে না পেয়ে অত রাতে কিছু পথচারিকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে থাকে,কেউ কেউ তাঁদের জানায় যে এক মহিলাকে তারা রাস্তা দিয়ে হাঁটতে দেখেছে।এরপর অনেক খোঁজাখুজি করেও সুলতানার হদিশ মেলে নি,সেদিনই ভোর বেলায় গড়িয়া স্টেশন সংলগ্ন একটি অপরিসর রাস্তায় বিবস্ত্র অবস্থায় সুলতানার মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখা যায়,তাঁর দেহের নিম্নাংশ একেবারে থেতলে দেওয়া হয়েছে।স্থানীয় সেনারপুর থানা প্রথম থেকেই এই ঘটনাকে দুর্ঘটনা বলে প্রমাণ করতে চেষ্টা করে,সেই মর্মেই অভিযোগ নথিভুক্ত করা হয়। তবে RADICAL  নামের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীক একটি রাজনৈতিক সংগঠন প্রথম থেকেই এই ভয়াবহ ঘটনাকে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনা বলে প্রতিবাদে সোচ্চার হয়। তারা পুলিশ প্রশাসনকে ঘটনার তদন্ত করতে চাপ দিতে থাকে।এর পরে মানবাধিকার সংগঠন এপিডিআর ও গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা সংগঠন সেভ ডেমোক্রেসিও এই ঘটনার সামগ্রীক তদন্তের দাবি তোলে।এলাকা জুড়ে প্রতিবাদ শুরু হওয়ায় পুলিশ প্রশাসন মৃত দেহের ময়না তদন্তের জন্য বিশেষ ডাক্তার টিম তৈরি করে,বলা হয় যাবতীয় বিষয় পর্যবেক্ষণ করে রিপোর্ট দিতে।সেই রিপোর্টেও পুলিশের প্রাথমিক ধারনার সঙ্গে সাজুজ্য রেখে বলা হয়েছে ভারি ট্রাকের চাপেই মৃত্যু হয়েছে ঐ তরুণীর।ধর্ষণের কোন প্রমাণ নেই বলেও বলা হয়েছে ডাক্তারি রিপোর্টে।ধর্ষণ হলে দেহের উর্দ্ধাংশে যে রকম ক্ষত চিহ্ন থাকার কথা তা নেই বলেই ডাক্তারি রিপোর্টে বলা হয়েছে।তবে এই যুক্তি মানতে রাজি নয় প্রতিবাদী গণসংগঠনগুলি,তাদের অভিযোগ পুলিশ গোটা বিষয়টাকে ধামাচাপা দিতে চাইছে,তাই তদন্তের আগে থেকেই এটাকে দুর্ঘটনা বলে চালাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল।পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে যোগসাজসেই এরকম ডাক্তারি রিপোর্ট তৈরি করা হয়েছে।এপিডিআর এই বিষয়টি নিয়ে আইনি লড়াই করবে বলে সিদ্ধান্ত নিতে চলেছে।তাদের পক্ষে সেনারপুর এপিডিআরের শাখা সম্পাদক জগদীশ সর্দ্দার জানান-ডাক্তারি রিপোর্টে অনেক প্রশ্নের উত্তর মিলছে না,যেমন দুর্ঘটনা হলে মৃতার জামা কাপড় খোলা থাকবে কেন?তাছাড়া মৃতার দেহের নীচের অংশ এমন ভাবে পিষে দেওয়া হয়েছিল যে ধর্ষণ হয়েছে কীনা বোঝার উপায় ছিল না,তাহলে ধর্ষণ হয় নি এটা বলা যায় না।জগদীশবাবুর আর প্রশ্ন যদি সত্যি দুর্ঘটনা হয়ে  থাকে তাহলে এতদিনে সেই ট্রাক চালককে গ্রেপ্তার করা হয় নি কেন?মানবািকার সংগঠন এপিডিআর মনে করছে গোটা ঘটনাকে চাপা দিতে প্রশাসন লাগাতার প্রয়াস চালিয়ে য়াচ্ছে,এর প্রতিকারে তারা কোর্টের দারস্থ হবে বলেই সিদ্ধান্ত নিতে চলেছে।একই কথা বলছেন সেভ ডেমোক্রাসির রাজ্য সম্পাদক চঞ্চল চক্রবর্তীও তাঁর মতে প্রথম থেকেই এটাকে দুর্ঘটনা বলে চালাতে চাইছে পুলিশ।চঞ্চলবাবু বলেন,তাঁরা যখন সোনারপুর থানায় যান তাঁদের বলা হয় দুর্ঘটনাটি ঘটেছে সকাল সাড়ে পাঁচটা থেকে ছটার মধ্যে,চঞ্চলবাবুরা জানতে চান তাহলে রাতে মেয়েটিকে বাড়ির লোকেরা এসে পেল না কেন,সোনারপুর থানার পুলিশের কাছে এ প্রশ্নের কোন উত্তর মেলেনি বলে জানান সেভ ডেমোক্রেসির রাজ্য সম্পাদক।চঞ্চল চক্রবর্তী তাঁর সংগঠনের কর্মীদের নিয়ে এলাকার স্থানীয় মানুষজনদের সঙ্গে কথা বলেছেন,তাঁদের মতে যে জায়গায় সুলতানার দেহ পিষে দেওয়া হয়েছে সেখানে বড় ট্রাক ঢোকার কথা নয়,অত ছোট রাস্তায় বড় ট্রাক ঢোকে না।সেভ ডেমোক্রেসির পক্ষ থেকেও প্রশ্ন তোলা হয়েছে এত বড় ঘটনার পড়েও কেন সেই ট্রাকটি সহ ট্রাক চালক ধরা পড়ল না?বলাই বাহুল্য ঐ ট্রাক চালক ধরা পড়লে সুলতানা হত্যার রহস্য পরিষ্কার হোতে পারতো,তবে প্রশাসন সে কাজে জোড় না দিয়ে যে ভাবে দুর্ঘটনার যুক্তি সাজাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে তাতে সন্দেহ আর বাড়ছে।ঘটনার ভয়াবহতায় উদ্বিগ্ন এপিডিআর সদস্য ও গণগায়ক অসীম গিরি বলেন,একটা অসহায় মেয়েকে রাস্তায় একা পেয়ে যে ভাবে ধর্ষণ করে,ধর্ষণের চিহ্ন লোপাট করতে শরীরের নীচের অংশ ট্রাকের চাপে পিষে রাস্তায় মিশিয়ে দেওয়া হোল,আর তাকে দুর্ঘটনা হিসেবে দেখাতে প্রশাসন যে ভূমিকা নিচ্ছে তাতে শুউরে উঠে ভাবতেই হচ্ছে বাংলা কী ক্রমেই আদিম বর্বরতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে!মানবাধিকার আন্দোলনের দীর্ঘ দিনের কর্মী সুজাত ভদ্র জানান-কোথাও ধর্ষণের অভিযোগ উঠলে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ হোল প্রাথমিক ভাবে সেটা সত্য ধরে নিয়ে তদন্ত শুরু করতে হবে,এখানে মনে হচ্ছে ধর্ষণ হয় নি প্রমাণ করতে তদন্ত হচ্ছে,এটা সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের উন্টোদিকে হাঁটা। প্রশাসনের তরফে সুলতানার অস্বাভাবিক মৃত্যুকে দুর্ঘটনা বলে চালানোর চেষ্টা হলেও তা মানতে রাজি নয় অনেকেই।

,