রাজনীতির দাবার বোড়ে অসহায় নাগরিক

পুরুলিয়ায় গিয়ে রাজ্যের শাসক দল তৃণমূলকে রাজ্য থেকে উপড়ে ফেলার হুশিয়ারি দিয়েছিলেন বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি অমিত শাহ।তার আগে তিনি পুরুলিয়ায় কিছু গ্রামে গিয়ে সেখানকার গরিব  পরিবারের সঙ্গে কথাও বলে আসেন।আর তার দুদিন কাটতে না কাটতেই সেই গরিব পরিবারের কয়েকজনকে কালিঘাটে নিয়ে এসে শাসক তৃণমূলের পতাকা ধরিয়ে দিয়ে প্রচার কারা হোল তারা অমিত শাহের আচমকা তাদের বাড়িতে ঢুকে পড়ায় ভয় পেয়ে বাংলার রক্ষক মমতার কাছে চলে এসেছেন।যে মানুষগুলো সম্পর্কে এই প্রচার সেই পুরুলিয়ার প্রত্যন্ত গ্রামের শিশুবালা রাজোয়াড়,সঞ্জয়,অষ্টমী রাজোয়াড়রা নেহাতই দিন আনা দিন খাওয়া মানুষজন।একদিনের মজুরি মার খেলে তাঁদের অনাহারে দিন কাটে,তারা অমিত শাহকে যেমন চেনেন না,তেমনি তারা এ রাজ্যের শাসক দলের কাউকেই চেনেন না।চেনার কথাও নয়,জীবন যাপনের লড়াইটাই তাদের একমাত্র চেনা জানা।ফুটিফাঁটা সংসারকে নিয়েই তাদের চলা,তারা জানেন কোন রাজনীতিই তাদের পাশে দাঁড়াবে না,রাজনীতির কোন স্বপ্নের সওদাগড় এসে তাদের জীবন ছন্দ এক নিমেষে পাল্টে দেবেন এমন প্রত্যাশা তাদের মরে গেছে অনেক দিন।মারি মড়ক আর অনাহার নিয়ে ঘর করাটাই যে তাদের অবধারিত ভাগ্য লিখন তা মেনে নিয়েই জীবন যাপন করেন শিশুবালা সঞ্জয় অষ্টমীরা।প্রচলিত রাজনীতি তাদের কিছু দেয় না দেয় নি তা নিয়ে ক্ষোভ বিক্ষোভ কিছুই নেই শিশুবালাদের,তারা সব মেনে নিয়েছেন।রাজনীতির প্রতি শিশুবালারা আগ্রহ হারালেও রাজনীতি শিশুবালাদের নিয়ে আগ্রহ হারায় না কারণ ক্ষমতার রাজনীতি তো ক্ষমতার অংক কষেই চলে তাই শিশুবালারা সেই অংকের হিসেবে বার বার গুরুত্ব পায়,এদের নিয়ে তাই টানাটানি করে সব পক্ষ।ক্ষমতার রাজনীতি আচমকাই ঢুকে পড়ে শিশুবালাদের ঘরে তাদের বাধ্য করে রাজনীতির দাবার বোড়ে হতে।যে ক্ষমতার অংকের কথা মাথায় রেখে অমিত শাহ শিশুবালার ঘরে ঢুকে তাদের সঙ্গে আলাপ জমাতে চায়,সেই একই অংকের কথা মাথায় রেখে শাসক দল তাদের গ্রাম থেকে তুলে এনে কলকাতায় তাদের হাতে শাসক দলের পতাকা তুলে দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।ছবিগুলো খুব চেনা,বার বার ফিরে ফিরে আসে।মনে পড়বে নিশ্চয়ই বছরখানেক আগে সেই নকশালবাড়ির  আদিবাসী পরিবারের কথা,সেখানে গিয়ে রাজু মাহালির বাড়িতে  পাত পেড়ে খেয়ে এসেছিলেন অমিত শাহ,আর তার কয়েকদিনের মধ্যেই রাজু ও তাঁর স্ত্রীকে শাসকদলের পতাকা ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল,তাদের দিয়ে বলানো হয়েছিল তারা তৃণমূলের সঙ্গেই আছে।রাজু শিশুবালারা আসলে কিন্তু কারোর সঙ্গে নেই,তাঁরা  শুধু ভাঙা একচিলতে ঘরের সঙ্গে আছেন,দারিদ্র জর্জর অনিশ্চিত জীবন যাপনের সঙ্গে আছেন,তারা শীর্ণ চেহারার অপুষ্টির সঙ্গে আছেন,আছেন যে কোন দিন মৃত্যুর আশঙ্কার সঙ্গে।আর তাই এত সহজে তাদের দখল নিয়ে নিতে পারে ক্ষমতার রাজনীতি।শিশুবালারা কলকাতাকে চেনে না জানে না সেই কলকাতায় তাদের তুলে আনে ক্ষমতার রাজনীতি,তাদের একদিনের রুজি রোজগার বন্ধ হলে এই রাজনীতির কিছু যায় আসে না,যে রাজনীতি শিশুবালাদের কিছু দেয়. না সেই রাজনীতির কাছেই বার বার হাঁটু মুড়ে বসে আত্মসমর্পন করা ছাড়া কোন রাস্তা থাকে না শিশুবালাদের।শিশুবালারা তাদের মতো করে থাকতে পারে না,কারণ স্বাধীন নাগরিকত্বের যাবতীয় পরিসর অবরুদ্ধ হয়ে গেছে সোচ্চার দলতন্ত্রের প্রকোপে।গোটা দেশ জুড়ে চলতে থাকা গণতন্ত্রের নামে এই দলতন্ত্রের অবাদ চারণভূমিতে শিশুবালা রাজোয়াড়,রাজু মাহালিদের মতো আদিবাসীরা যে কতটা অসহায়,কতটা নীরব আত্মসমর্পনকারী তা তাদের রাতারাতি বদলে যেতে থাকা অবস্থান থেকেই পরিষ্কার হয়ে যায়।