”বাছাই করার অর্থই ছেঁটে ফেলা…..” যাদবপুরে প্রবেশিকা বিতর্কে এক প্রাক্তনী জানাচ্ছেন

বাছাই করার অর্থই ছেঁটে ফেলা, প্রবেশিকা পরীক্ষা বা বোর্ডের পরীক্ষায় প্রাপ্ত নম্বর যাচাইয়ের মাপকাঠি যাই হোক না কেন, যারা একটি নির্দিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনও নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে পড়ার আকাঙ্ক্ষা ​রাখে তাদের মধ্যে থেকে একটা ছোট অংশকে বেছে নেওয়াই সেখানে উদ্দেশ্য, অর্থাত্ উদ্দেশ্য একটি বড় অংশকে বাদ দেওয়া। কোনও কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে বাস্তবিকই সম্ভব নয় যে যা বিষয় পড়তে চায় তাকে সেখানে সুযোগ করে দেওয়া, তাই বাছাই পদ্ধতির মধ্যে দিয়ে যাওয়াই সেখানে অনিবার্য, যোগ্যতর প্রার্থীকে বেছে নেওয়াই সেখানে এক মাত্র উপায়। আর যাবতীয় গোলমাল এই যোগ্যতর শব্দটিতেই, কে যোগ্যতর? এই যোগ্যতার বিচার হবে কীভাবে? যে বোর্ড নির্ধারিত শিক্ষাক্রমের ভিত্তিতে অনেক বেশি নম্বর পেয়ে স্কুল জীবনের শেষ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হল নাকি যে সাধারণ নম্বর পেয়েও প্রবেশিকা পরীক্ষায় নিজের চিন্তন, বিষয়ের প্রতি আগ্রহ, সাধারণ জ্ঞান, তার্কিক দক্ষতা ইত্যাদি ইত্যাদির ছাপ রাখতে পারল, যোগ্যতর কে? দু’টি উপায়েই বাদ পড়ে যাবে একটা বড় অংশ। অসাম্যই যে সমাজের মূল, সেখানে কোনও পদ্ধতিতেই কী আদৌ যোগ্যতা মেপে নেওয়া সম্ভব? দু’টি পদ্ধতিই তো আসলে মেপে নিতে চায় মেধাকে, আর মেধা ধারণাটির মূলেই রয়েছে শ্রেণি, বর্ণ, লিঙ্গ ও সাংস্কৃতিক পুঁজির প্রশ্ন। প্রবেশিকা পরীক্ষা থাকা মানেই একটি বাড়তি এলিটিস্ট ছাঁকনি একথা যেমন ঠিক নয়, তেমনই প্রবেশিকা পরীক্ষা মানেই সকলকে সমান সুযোগ করে দেওয়া নয়। প্রবেশিকা পরীক্ষা বেছে নেওয়ার একটি ভিন্ন পদ্ধতি, বাড়তি পদ্ধতি নয় অন্যদিকে যেখানে সমাজের বিভিন্ন অংশ থেকে আসা, বিভিন্ন স্তরের সুযোগ সুবিধা পাওয়া ছাত্রছাত্রীদের একই পরীক্ষার মাধ্যমে বেছে নেওয়া হয় তা কখনই সকলকে সমান সুযোগ দিতে পারেনা, এবং যারা এই ইলিউশন তৈরি করার চেষ্টা করছেন, তাঁরা নেহাতই অন্যায় করছেন। চিন্তন, আগ্রহ, সাধারণ জ্ঞান, তার্কিক দক্ষতা, লেখার ক্ষমতা, যুক্তিবোধ ইত্যাদি সবকিছুর সঙ্গেই পারিপার্শ্বের যোগ তীব্র এবং এই বাস্তবতাকে উপেক্ষা করা অপরাধ। সকলকে সমান সুযোগ দেওয়ার অর্থ সামাজিকভাবে কম সুবিধাপ্রাপ্তকে বাড়তি সুবিধা দেওয়া, যে কথা প্রায় কেউই বলে উঠছেন না, উঠে আসছেনা আন্দোলনের দাবিতে। আন্দোলনকারীদের বারবারই বলতে শোনা যাচ্ছে যাদবপুরে সমাজের নানা অংশ থেকে ছাত্রছাত্রী পড়ার সুযোগ পায় এই প্রবেশিকা পরীক্ষার জন্য, পাহাড় থেকে পড়তে আসে বেশ কিছু সংখ্যক ছাত্রছাত্রী, আসে জেলা মফস্বল থেকে। কিন্তু সংখ্যাটা কী আদৌ যথেষ্ট? আলোচনায় উঠে আসুক কীভাবে আরও বাড়ানো যায় প্রান্তিকের অংশগ্রহণ, দাবি উঠুক আরও বেশি সংখ্যক ‘অপর’কে স্থান করে দেওয়ার।
যেকোনও আন্দোলনের মূল শক্তি তার সঠিক রাজনৈতিক দিশা, প্রবেশিকা পরীক্ষা তুলে দিলে ‘হেজিপেঁজি’রা যাদবপুরে ঢুকে পড়বে, ধ্বসে পড়বে যাদবপুরের কৌলিন্য, এ কোনও প্রগতিশীল রাজনেৈতিক ভাষ্য হতে পারেনা, এক্সক্লুশনের রাজনীতি প্রগতিশীলতার পরিপন্থী। যেকোনও আন্দোলনেই উঠে আসে নানা মত, আন্দোলনের স্বতঃস্ফুর্ততাকে রাজনৈতিক দিশা দেওয়ার মধ্যেই থাকে আন্দোলনের সাফল্য, সাফল্য মানে কিছু নির্দিষ্ট দাবী ছিনিয়ে আনাই নয়, আন্দোলনের সাফল্য থাকে রাজনৈতিক বোধের উন্নতিতে, আন্দোলনে সাফল্য ডিসকোর্স তৈরিতে, আন্দোলনের সাফল্য উন্নত প্রগতিশীল চিন্তার মানুষ তৈরিতে। হোককলরব আন্দোলনের সাফল্য যতটা না রয়েছে ভিসি তাড়ানোতে তার থেকে অনেক বড় সাফল্য জেন্ডারের প্রশ্নকে ক্যাম্পাসের রাজনীতির মূল ডিসকোর্সে নিয়ে আসায়, হোককলরবের সাফল্য রাজনীতি সচেতন প্রগতিশীল মানুষ তৈরিতে। যাদবপুরের বর্তমান আন্দোলনও নিশ্চই খুঁজে নেবে তার সঠিক দিশা, রাজ্য সরকারের অগণতান্ত্রিক সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে লড়ে যাবে শেষ পর্যন্ত, যেখানে কেউ আন্দোলনের সমর্থনে কথা বলতে গিয়ে বিরোধিতা করে বসবে না সংরক্ষণের, যেখানে কেউ প্রশ্ন তুললে তাকে বলা হবে না এ ব্যাটা নিশ্চয়ই প্রবেশিকা পরীক্ষা দিয়ে সুযোগ পায়নি, এ বহিরাগত।

সানন্দা দাসগুপ্ত এর পোস্ট