অাধার নিয়ে জনগণের সঙ্গে প্রতারণার দায় কি নেবে সরকার?

সুপ্রিম কোর্টের ৫সদ্যস্যের বে‌‌ঞ্চের সংখ্যাগরিষ্ঠের রায় অাধার অাইন এখন সাংবিধানিকভাবে বৈধ। তবে শর্তাবলী প্রযোজ্য। এই রায়কে সরকার ও বিরোধী ২পক্ষই নিজেদের জয় বলে দেখতে শুরু করেছে।দেশের সর্বোচ্চ অাদালত জানিয়েছে ব‍েশ কতগুলি ক্ষেত্রে অাধার এখন অার বাধ্যতামূলক নয়। ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খুলতে বা মোবাইলের নতুন সিম পেতে বা চালু সিমের সঙ্গে এখন অার অাধার সংযুক্তি বাধ্যতামূলক নয়। একটু ভুল হলো বলা। অাসলে অাধারকে মোবাইলের সঙ্গে যুক্ত করার বিষয়টা সুপ্রিম কোর্ট কোনদিনই বলেনি। কেন্দ্রীয় মন্ত্রি রবিশঙ্কর প্রসাদ বা টেলিকম দফতর সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণকে ভুল ব্যাখ্যা করে জনগণের সংঙ্গে কার্যত প্রতারণা করেছিল। ২০১৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি সুপ্রিম কোর্টের তত্কালীন প্রধান বিচারপতি জেএস খেহরের নেতৃত্বাধীন ২ সদস্যের বেঞ্চ মোবাইল ফোনের কেওয়াইসির ক্ষেত্রে অাধারকে যুক্ত করার বিষয় নীতি ফাউন্ডেশন বনাম ভারত সরকারের একটি মামলার প্রেক্ষিতে সরকারের পদক্ষেপ নিয়ে পর্যবেক্ষণে কিছু মন্তব্য করেছিল মাত্র। অার তাকে সর্বোচ্চ অাদালতের অাদেশ বলে চালিয়ে ২০১৭ সালের ২৩ মার্চ মাসে টেলিকম দফতর একটি সার্কুলার জারি করে। ওই সরকারি বি‌জ্ঞপ্তিতে নির্দেশে দেওয়া হয় একটি নির্দিষ্ট তারিখের মধ্যে মোবাইল নম্বরের সঙ্গে অাধার সংযুক্তি করতে হবে এবং তা অাবশ্যিক। ধাপে ধাপে সেই চূড়ান্ত সময়সীমা কয়েকবার বাড়ানোও হয়। অাধার নিয়ে চূড়ান্ত রায়ের অাগেই এবছর এপ্রিল মাসে সুপ্রিম কাের্ট স্পষ্ট করে জানিয়ে দেয় মোবাইল সংযোগের ক্ষেত্রে অাধারকে বাধ্যতামূলক করার কোন রায় সর্বোচ্চ অাদালত অাগে কখনো দেয়নি। তাহলে সুপ্রিম কোর্টের নাম ভাড়িয়ে মোবাইলের সঙ্গে অাধার সংযুক্তির জন্য সরকারের একটি দফতর বা এক মন্ত্রী যে প্রতারণা করেছিলেন তার দায় কি সরকার নেবে? উত্তরটাও সকলেরই জানা। না। কারণ এদেশে সরকার বা প্রশাসনে জবাবদিহি নামক বস্তুটি কোন কালেই ছিল না , তাই এবারো দায় নেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।

ব্যাঙ্কের সঙ্গে অাধার লিঙ্ক না করা হলে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া এসএমএসের পর তড়িঘড়ি অাধার নম্বরের জন্য ছুটোছুটি করে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের সঙ্গে যুক্ত করেছেন বহু মানুষ। যাদের মধ্যে প্রবীণ নাগিরকদের সংখ্যা কম নয়। লিঙ্ক করতে হয়রানি ও নাজেহাল হয়েছেন অন্যদের থেকে এরা অারো বেশি। এখন সুপ্রিম কোর্ট জানাচ্ছে ব্যাঙ্কের সঙ্গে অাধার লিঙ্ক করতে হবে না। তাহলে অসংখ্য মানুষের এই হয়রানি হলো তার জন্য এখনো পর্যন্ত একটু দুঃখপ্রকাশ করতে শোনা যায়নি কোন মন্ত্রী বা বিজেপির নেতাকে। বরং অাধার রায় অাসলে প্রধানমন্ত্রীর জয় হিসাবেই দেখছে বিজেপি।

 

অাধার রায় সুপ্রিম কোর্টের বেঞ্চের সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতি জানিয়েছেন এখন থেকে কোন করপোরেট সংস্থা( সরকারি বা বেসরকারি) কেউই অার অাধার নম্বর অাপনার কাছ থেকে চাইতে পারবে না। কিন্তু ইতিমধ্যেই যে কোটি কোটি ব্যাঙ্ক গ্রাহক বা মোবাইল গ্রাহক তাদের অাধার তথ্য ব্যাঙ্ক বা মোবাইল কোম্পানিগুলিকে দিয়েছে সেক্ষত্রে সেই সব তথ্যের সুরক্ষার বিষয়টি কীভাবে নিশ্চিত হবে? কে বলতে পারে ওই সব জায়াগা থেকে বুড়ো অাঙ্গুলের অাপনার দেওয়া ছাপ অন্য কোন কাজে অপব্যবহার করা হবে না। ইতিমধ্যেই একাধিক এথিকাল হ্যাকারা দাবি করেছেন খুব সহজেই এই সব বায়ােমেট্রিক তথ্য হাতানো সম্ভব। সরকার অবশ্য এই দাবি মানতে নারাজ। যাকে বলে ডিনায়েল মোড এ থাকা। ব্যাপারটা যেন এরকম অাধার তথ্য ফাঁসের বিষয়টি সরকার অস্বীকার করছে বলেই অাধার তথ্য চুরি হচ্ছে না হবে না।

 

সরকারি ভরতুকি বা সাহা্য্য পেতে অাধারকে সরকার যে অাবশ্যিক করতে চাইছে তাতে সিলমোহর দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। এর মানে রাজ্য সরকারের কয়েকশো বিভাগের হাতে অাধার তথ্য থাকবে। ইতিমধ্যে ঝাড়খণ্ড সহ একাধিক রাজ্য সরকারের ওয়েবসাইটে অাধার তথ্য ফাঁসের খবর সংবাদ মাধ্যমে ইতিমধ্যেই প্রকাশিত হয়েছে। সেক্ষেত্র অাধার সংস্থা ইউঅাইডিএঅাইএর দাবি ওই সব তথ্য তাদের থেকে ফাঁস হয়নি তা হয়েছে থার্ড পার্টির থেকে। এক্ষেত্রে সরকারি বিভাগের দিকেই অাঙ্গুল উঠছে। তাই অাধার তথ্যের সুরক্ষা বা নিরাপত্তা নিয়ে সংশয় এখনো রয়েই যাচ্ছে।

কেন্দ্রীয় সরকার বারবার দাবি করে অাসছে গরীব মানুষের হাতে সরকারি সাহায্য যাতে সরাসরি পৌঁছয় তার জন্যই অাধার নম্বরকে সামাজিক প্রকল্পের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। এর ফলে দুর্নীতি অনেকটাই কমবে। হয়তো কিছুটা কমবে। কিন্তু অামরা ইতিমধ্যেই জেনেছি একাধিক ক্ষেত্রে রেশন দোকানে রেশন নিতে গিয়ে অাধারের বুড়ো অাঙ্গুলের ছাপ মেলেনি তাই রেশন দেওয়া হয়নি। এর জেরে অনাহারে মৃত্যু হয়েছে বেশ কয়েকজনের। অভিযোগ উঠেছে একই কারণে ১০০ দিনের কাজ করেও টাকা পাচ্ছেন না অনেকে। কেউ কেউ তো এমনটাও অভিযোগ করেছেন বুড়ো অাঙ্গুলের ছাপ দেওয়ার পরও লিঙ্ক ফেলিয়োর বলে টাকা অাত্মসাত্ও করে নেওয়া হয়েছে। ফলে সমাজকর্মীদের অাশঙ্কা অাধার বাধ্যতামূলক করলে সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প থেকে বাদ পড়ে যাবেন অনেক গরীব মানুষই। দিল্লিতে অনাহারে মৃত্যু ঠেকাতে পারে না যে প্রশাসন বা সরকার সেই তারা প্রত্যন্ত গ্রামে অাধার নিয়ে গড়মিল বন্ধ করবে কী করে? তাছাড়া সরকারি প্রকল্পে যারা দুর্নীতি করে তারা দুর্নীতির নতুন নতুন রাস্তা প্রতিদিন খুঁজে বার করছে বা করবে। তাই অাধার কী করে সেই দুর্নীতি রোধকে বন্ধ করতে পারবে তা স্পষ্ট নয়।

এটা বাস্তব অাধার অাইন এখন সাংবিধানিকভাবে বৈধ। সুপ্রিম কাের্টের ৫সদস্যের ডিভিশন বেঞ্চে ১সদস্য বিচারপতি ধনঞ্জয় চন্দ্রচূড় অবশ্য একে অবৈধ বলে মত দিয়েছেন। ব্যক্তিগত পরিসরে হস্তক্ষেপ থেকে শুরু করে অর্থ বিল হিসাবে রা্জ্যসভাকে বাইপাস করে অাধার অাইন পাশ করানো গণতন্ত্রের সঙ্গে প্রতারণা বলেও উল্লেখ করেছেন তিনি। তাঁর রায় অাধার নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের সংখ্যাগরিষ্ঠের রায় নয় ঠিকই ,কিন্তু বিচারপতি চন্দ্রচূড়ের রায় অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি সঠিক বলে মনে করেন অাধার মামলায় প্রথম অাবেদনকারী তথা কর্ণাটক হাইকোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি কেএস পুট্টাস্বামী। গণতন্ত্রে সংখ্যালঘুর স্বর বা ভিন্ন স্বরের অপেক্ষাকৃত বেশি গুরুত্ব থাকা উচিত। তবে এদেশে ভিন্ন স্বরকে শোনার সংস্কৃতি নেই। গুরুত্ব দেওয়া অনেক দূরের বিষয়। বরং অন্যস্বরকে দমিয়ে দিতে চায় সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বর। তা ডান বাম রাম যে রঙের সরকারই হোক না কেন। হয়তো এই কারণেই নিজের মতকে চাপানোর জন্যই সুপ্রিম কোর্টের নাম ( অপ)ব্যবহার করে অাধার মোবাইল ফোন লিঙ্ক করার ক্ষেত্রে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করেছে সরকার। অাধার অাইন এখন সাংবিধানিকভাবে বৈধ ঠিকই কিন্তু এখনো মিলছে না অনেকে প্রশ্নের উত্তর ।এই অাধার রায় সরকারের হাত শক্তিশালী করছে ঠিকই কিন্তু তা জনগণের কতট পক্ষে গেল হলো তা নিয়ে বোধ হয় বিতর্কের অবকাশ থেকেই গেলো।