সাংবাদিকের মৃত্যু দুঃখজনক, তবু কিছু প্রশ্ন তোলা জরুরি

সম্প্রতি ছত্তিশগড়ে দূরদর্শনের হয়ে ছবি তোলার কাজ করতে গিয়ে পুলিশ ও মাওবাদিদের সংঘর্ষের মাঝে পড়ে মৃত্যু হয়েছে দূরদর্শনের এক চিত্র সাংবাদিকের।মাওবাদীদের গুলিতেই প্রাণ হারিয়েছেন এই চিত্র সাংবাদিক।কোন সন্দেহ নেই ঘটনাটি খুবই দুঃখজনক।মাওবাদী সংগঠনের পক্ষে বিবৃতি দিয়ে বলা হয়েছে চিত্র সাংবাদিকের মৃত্যু খুবই দুর্ভাগ্যজনক,তবে ঐ চিত্র সাংবাদিক পুলিশের সঙ্গেই এলাকায় ঢুকেছিলেন,তাই পুলিসের সঙ্গে মাওবাদীদের সংঘর্ষের বলি হতে হয়েছে তাঁকে।মাওবাদীরা তাদের বিবৃতিতে এ দেশের সংবাদ মাধ্যমের কাছে আবেদন রেখেছে কোন সংবাদ মাধ্যমের প্রতিনিধিই  যেন সংবাদ সংগ্রহ করতে যাবার সময় পুলিশের ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত না হন।দূরদর্শনের চিত্র সাংবাদিকের মৃত্যু সত্যিই পুলিশের ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত হবার জন্য হয়েছিল কিনা আমরা জানি না,তাই এ বিষয়ে মাওবাদীদের দাবিকে ১০০ ভাগ ঠিক বলে  মেনে নেওয়ারও কোন কারণ নেই।তবে সব রাজনৈতিক মতাদর্শ ও রাজনৈতিক হিসেব নিকেশ এড়িয়ে শুধুমাত্র সাংবাদিকতার নৈতিকতার মাপকাঠিকে সামনে রেখে কিছু প্রশ্ন তোলাটা বোধহয় জরুরি।

সাংবাদিকতা মানে কি রাষ্ট্রের সুরে সুর মেলানো?গত কয়েক বছর ধরে গোটা ছত্তিশগড় জুড়ে যে ভাবে আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষের উপর অত্যাচার হয়েছে তার রিপোর্ট বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন তুলে ধরেছে।সেই বিরোর্ট থেকে জানা যায় আদিবাসী জেলার খনি জঙ্গলকে বড় বড় কর্পোরেট সংস্থার হাতে তুলে দিতে কতটা ব্যগ্র হয়ে উঠেছে সেখানকার সরকার।মানুষের প্রতিবাদকে গ্রাহ্য না করে আদিবাসী মানুষজনকে জেলে ভরে নির্মম অত্যাচার করা হয়েছে,মহিলাদের ধর্ষণ করা হয়েছে।এমনকী কোন কোন আদিবাসী মহিলাদের ধরে এনে তারা বিয়ে করে ঘর সংসার করে না মাওবাদী সংগঠন করে তা নির্ধারণ করতে কিছু আদিবাসী মহিলার স্তন টিপে দুধ বেরুচ্ছে কিনা তা দেখা হয়েছে।এমন ভয়াবহ রাষ্ট্রীয় নীপিড়নের কথা বলেছেন একাধিক মানবাধিকার সংগঠনের কর্মীরা।কেন এসব খবর কোন মূল ধারার সংবাদ মাধ্যমে উঠে আসেনি,কেন এদেশের অধিকাংশ মানুষ জানেন না যে সনু সোরি নামে এক সমাজকর্মী মহিলা ছত্তিসগড়ে আদিবাসীদের সাহায্য করতে যাওয়ায় তাঁর মুখে এ্যাসিড বাল্প মেরে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল?দিনের পর দিন ছত্তশগড়কে অবরুদ্ধ করে রেখে স্বাধীন সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে বাঁধা দেওয়া হয়েছে।কেন এদেশের সংবাদ মাধ্যম তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে নি?মাওবাদীরা খুন করলে হিংসা ছড়ালে তা অপরাধ,অবশ্যই তার বিরুদ্ধে খবর করতে হবে কিন্তু রাষ্ট্রের শাসক খুন করলে,হিংসা ছড়ালে সেটাও তো সমান অপরাধ, সেটা কেন খবর হয় না?কেন এ দেশের সাংবাদিকরা বার বার বিভিন্ন ঘটনায় পুলিশের ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকেন?আমরা তো দেখেছি এ রাজ্যেও জঙ্গল মহলে মাওবাদী ঘাঁটি দখল করতে পুলিশ গেছে সাংবাদিকদের সঙ্গে নিয়ে।পুলিশের ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত হতে সাংবাদিকদের নৈতিকতায় আটকায় না কেন?সাংবাদিকরা কেন ভুলে গেছেন নিরপেক্ষ-বস্তু নিষ্ট দৃষ্টি-ভঙ্গি নিয়ে ঘটনার মুল্যায়ন করতে।কেউ কেউ বলতে পারেন,সাংবাদিক কী করবেন তার প্রতিষ্ঠান যদি তাকে পুলিশের সঙ্গে যেতে বাধ্য করে,ভেবে দেখুন এই যুক্তিতেই কিন্তু পুলিশের ঢাল হওয়া সাংবাদিকের মৃত্যুর জন্য শুধু মাওবাদী নয়,রাষ্ট্র আশ্রিত সংবাদ মাধ্যমটাও সমান দায়ী।

তাই একতরফা মাওবাদীদের বিরুদ্ধে অভিযোগের আঙুল না তুলে,সাংবাদিকদের এমন মর্মান্তিক মৃত্যুর জন্য রাষ্ট্রের ভূমিকাটাও খতিয়ে দেখা দরকার।সাংবাদিকদের কখোন উচিত নয় কোন পক্ষ নেওয়া,আর মনে রাখতে হবে রাষ্ট্রব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধাচারণ করা মানে রাষ্ট্রের বিরোধীতা করা নয়।নাগরিক হিসেবে যে কেউই পারেন রাষ্ট্র ব্যবস্থার বিরোধিতা করতে,এটা সাংবিধানিক অধিকারের মধ্যে পড়ে।রাষ্ট্রের শাসক অসচেতন নাগরিক তৈরি করতে চায়,তাই যুক্তিহীন আবেগ সর্বস্ব দেশপ্রেমের বার্তা দেয় তারা।সাংবাদিকতার পেশায় যারা আছেন তাঁরা অনেকেই জানেন না,সাংবাদিকতা মানে স্রেফ দশ-পাঁচটার কেরাণীর চাকরী নয়,বোধ -বুদ্ধিকে এই পেশায় ক্রমাগত শান দিয়ে যেতে হয়,যে কোন ঘটনাকে মূল্যায়ন করতে হয় াযাবতীয় প্রেক্ষিতকে সামনে রেখে।তাই দূরদর্শনের সাংবাদিকের মর্মান্তিক মৃত্যু শুধু হিংসার রাজনীতিতে বিশ্বাসী মাওবাদীদের নিষ্ঠুরতা বলে মেনে নিলে,সম্পুর্ন সত্য ধরা পড়ে না,এক্ষেত্রে রাষ্ট্র ও তার সহযোগী হিসেবে মিডিয়ার ভূমিকাও নিয়েও প্রশ্ন তোলাটা জরুরি হয়ে পড়ে।

,