দেবী বন্দনা,নারী নির্যাতন সবটাই শুধু অভ্যাস! লিখছেন অনুুপম কাঞ্জিলাল

মাতৃ পক্ষ শুরু হয়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গে দেবী বন্দনায় মেতে থাকা আমাদের অনেকদিনের অভ্যাস।সেই অভ্যাসেই মহালয়ার দিন ভোর বেলায় আমাদের মহিষাশুরমর্দিনীর বন্দনা শোনা।সেই অভ্যাসই তো দুর্গা পুজো থেকে কালী পুজোর প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে ছড়িয়ে যায় দর্শনার্থীর ভিড় হয়ে।নির্বাচনি রাজনীতিতে সুবিধা পেতে সংখ্যা গরিষ্ট বাঙালির এই অভ্যাসে মিশে যেতে চায় সব রঙের রাজনৈতিক দল।সেই জন্য পুজো কমিটিকে সরকারি আর্থিক অনুদানের ঘোষণা হয়,সেই জন্যই সরকারি উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয় দুর্গাপুজোর ভাসান কার্নিভাল।
প্রশ্ন হল দেবী বন্দনার এই চেনা অভ্যাসে, বিশ্বাস ও ভক্তির জায়গা কতটুকু?বিশ্বাস ও ভক্তিকে সামনে রেখেই যে অভ্যাসের এমন জাঁকজমোকপুর্ণ আয়োজন, যদি দেখা যায় সেই আয়োজনে আসলে বিশ্বাস ও ভক্তির কোন স্থানই নেই,তবে তা কী বড় বিপদের কথা নয়?চারপাশে তাকালে এমন আশঙ্কাকে এককথায় উড়িয়ে দেওয়া যায় না।যে ভাবে দেবী বন্দনার এই মুরসুমে রাজ্য জুরে নারী নির্যাতনের খবর শিরোনামে উঠে আসছে তাতে বিশ্বাস করা শক্ত যে নারী শক্তিকে সত্যিই আমরা শ্রদ্ধা করি, সম্মান করি।কলকাতার রেড রোডে সরকারি উদ্যোগে যেদিন ভাসান কার্নিভালের আযোজন চলছিল,প্রদর্শিত পুজোর থিম নিয়ে বলতে গিয়ে সরকারি আমন্ত্রনে আসা ঘোষকরা যখন নারী শক্তিকে আমরা কত উঁচুতে রাখি তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিতে ব্যস্ত,ঠিক তখনই ধুপগুরির এক আদিবাসী গৃহবধূ ধর্ষণের শিকার হয়ে গ্রামীন এক হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়তে থাকেন। মহিলার দেবরের ছেলে,তার কয়েকজন সঙ্গি নিয়ে কাকিমাকে ধর্ষণ করেই ক্ষান্ত হয় নি,তাঁর যৌনাঙ্গে লোহার ফলা ঢুকিয়ে মৃত্যুকে নিশ্চিত করতে চেয়েছিল।না, এটা কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় এ রাজ্যে ধারাবাহিক ভাবে ঘটে চলেছে এরকম ঘটনা।গত বছর অক্টোবর মাসে ঐ ধূপগুড়িতেই অষ্টম শ্রেণীর এক আদিবাসী ছাত্রীকে তার বাবা মায়ের অনুপস্থিতে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করে খুন করার পর রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে বাড়িতে আবার রেখে গেছিল একদল দুষ্কৃতী।বছর থানেক আগে নদিয়াতে বাড়ির সামনে মদ খেয়ে বাওয়াল করার প্রতিবাদ করায় এক পৌঢ়াকে ধর্ষণ করে তাঁর যৌনাঙ্গে ভাঙ্গা মদের বোতলের টুকরো ঢুকিয়ে দেয় একদল মদ্যপ যুবক।এন আর এস হাসপাতালে ভর্তি করা হলে,কয়েকদিন পর যৌনাঙ্গে ভয়াবহ সংক্রমনের কারণে মারা যান সেই বৃদ্ধা।ঘটনাগুলো খবরে আসে,তবে কোন আলোড়ন তোলে না,আমাদের নাগরিক সমাজে ফেলে না কোন উদ্বেগের ছায়া।আমরা বোধহয় এসব ঘটনায় অভ্যস্ত হয়ে গেছি।এই নির্যাতনের অভ্যাসই তো প্রয়োগ করে চলেছিলেন কেন্দ্রীয় শিল্প নিরাপত্তা বাহিনীর সাব ইনস্পেক্টর দেবাশিস দত্তরায় তার স্ত্রীর উপর দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে।অবশেষে এবার লক্ষ্মী পুজোর দিন স্ত্রীকে যখন ঘাড় ধরে রান্নার গ্যাসের মধ্যে মুখ গুজে দেওয়ার চেষ্টা করেন তখন তার স্ত্রী অনুপা পুলিশে অভিযোগ জানাতে বাধ্য হন।আর এই দেবী বন্দনার মুরসুমেই বাগুইহাটির ২২ বছরের গৃহবধূ সঙ্গিতা দাস অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যাবার আগে ভিডিয়ো বার্তায় জানিয়ে গেলেন কী ভাবে দিনের পর দিন পণের জন্য তাঁর শ্বশুর বাড়ির লোকজন তাঁর উপর নির্যাতন করে গেছেন।
একদিকে দেবী বন্দনার এই মহা আয়োজন,অন্যদিকে নারী নির্যাতনের ধারাবাহিক ঘটনাক্রম প্রমাণ করে, যে কোন আচরণকে একবার অভ্যাসের কোটরে ঢুকিয়ে দিতে পারলে সেই আচরণ নিয়ে যুক্তি-তর্ক প্রশ্নের দরজা যেমন বন্ধ করে দেওয়া যায়,তেমনি তাতে এক প্রকার সামাজিক স্থিতাবস্থাও বজায় থাকে।ভাল মন্দের সব প্রশ্ন পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত আমারা অধিকাংশই তো সামাজিক স্থিতাবস্থার পক্ষে।তাই দেবী বন্দনার নামে এক প্রকার অভ্যাসকেই আমরা মান্যতা দিই।আর অভ্যাস কোন প্রশ্নের ধার ধারে না,তাই কারোর জানার তাগিদ হয় না,যারা নারী শক্তির পুজো করেন তারাই কীভাবে বাস্তবে নারী নির্যাতনের কারিগড় হয়ে ওঠেন।অভ্যাসের দাসত্ব করার কারণেই আমরা ধরতে পারি না দেবী বন্দনা ও নারী নির্যাতনের বৈপরিত্য।আর আমাদের এই বিপরীতমুখী অভ্যাসের দাসত্বের কারণে আমাদের বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা থেকে বঞ্চিত হতে থাকেন স্বর্গের দেবী,মর্ত্যের মানবীও।