শবররা মরে প্রমাণ করলেন তাঁরা ঠিকভাবে বেঁচে ছিলেন না।অাসুন রসগোল্লা দিবস উদযাপনে মেতে উঠি!

গত প্রায় একমাস ধরে রাজ্যজুড়ে পুজোর হুল্লোরের মধ্যে চাপা পড়েছিল খবরটা,জঙ্গলমহলের একটা অংশে শবর জনজাতির কিছু মানুষ দিনের পর দিন প্রশাসনিক অবহেলার শিকার হয়ে মারা গেছেন। মিডিয়ার খবর অনুসারে এখনও পর্যন্ত সাতজনের মৃত্যু হয়েছে, নানা অজানা রোগে ভুগে,বিনা চিকিত্সায়।এলাকা জুড়ে অভাব,কাজ না থাকা,খেতে না পাওয়ার চিত্র পরিষ্কার।প্রশাসনিক আধিকারিকরা জানাচ্ছেন,তারা বিষয়টি সম্পর্কে প্রথমে জানতে পারেন নি।ঘটনার পর্যালোচনায় পরিষ্কার এলাকার মানুষের স্বাস্থ্য ও আর্থিক অবস্থা নিয়ে প্রশাসনিক কর্তারা যদি একটু সতর্ক থাকতেন তা হলে হয়তো এই প্রান্তিক মানুষগুলোকে এভাবে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে হত না।অনাহারে মৃত্যু নিয়ে বার বার নানা জায়গায় রাজনৈতিক তরজা শুরু হতে দেখা গেছে,চা বাগানে শ্রমিক মৃত্যু নিয়ে এরকম তরজা তো আমাদের রাজ্যের চেনা গল্প।আমরা এই তরজায় না গিয়ে শুধু এই প্রশ্নটা তুলতে চাই রাজ্য জুড়ে যে উন্নয়নের ঢক্কানিনাদ,যে হৈ হুল্লোর আর মত্ততার আবহ তার সঙ্গে কী একেবারেই বেমানান নয় এই শবরদের মৃত্যু?প্রশাসন বলছে তারা বিষয়টি জানতেন না,এর দায় কে নেবে?রাজ্য জুড়ে গরীবদের জন্য কত প্রকল্প,তার কত প্রচার,তার সুবিধা যদি প্রন্তিক মানুষজনদের কাছে গিয়ে পৌঁছুতেই না পারে তবে তাতে কী লাভ?আর মিড়িয়া!মানুষগুলো মারা যাবার পর খবর হয়,জানা যায়।কেন এদের এই চরম দুরাবস্থার কথা আগে জানা গেল না,কেন মিডিয়ায় খবরটা আগে এলনা?উত্তর হল এমটাই মিডিয়ায় হয়,হয়ে এসেছে।দূর্গা পুজো পেরিয়ে কালী পুজো,জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন,মানুষের উদ্দামতা,হুল্লোর মজাকে আর উসকে দিতে ব্যস্ত সমস্ত মিডিয়া।আহা প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে কত ভিড়,কত রঙ বাহারি মানুষজন।চারপাশে মেলা,অফুরন্ত খাবার সব নিয়ে যেন আমরা একেবারে সব সমস্যার উর্দ্ধে উঠে যাই,চারপাশটা মিডিয়া প্রচারে মনে হয় যেন “সব পেয়েছির দেশ”তখন আর মনে পড়ে না শবরদের হাহাকারময় জীবন যাপনের কথা,ওদের বিনা চিকিতসায় অনাহারে দিন কাটানোর কথা।অথচ এই দায়িত্বটা পালন করতে পারতো মিডিয়া,ধরিয়ে দিতে পারতো উন্নয়নের প্রচারে টোল পড়ার এই আশঙ্কাকে।সে দায়িত্ব পালন করে না মিডিয়া,শুধু প্রন্তিক মানুষের মৃত্যু তাদের কাছে নিছক অন্য পাঁচটা খবরের মতোই একটা খবর।সভ্য গণতান্ত্রীক একটা দেশে এমন মৃত্যুর ভয়াবহতা নিয়ে কোন উদ্বেগ নেই মিডিয়ার,যেন এই মৃত্যু নতুন কিছু নয় এমন একটা অভ্যস্ত ভঙ্গি।আর তাই তো মিডিয়াতে এই মৃত্যুর চেয়েও বেশী গুরুত্ব পায় বাঙালির রসগোল্লা তৈরির স্রষ্টা হওয়ার স্বীকৃতি।সেই দিনকে স্মরণীয় করতে নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়,ঢালাও প্রচার চলে তার।

আসলে মধ্যবিত্ত ভোগবাদী মানসিকতাকে প্রশ্রয় ও আশ্রয় করেই চলে আমাদের মিডিয়া জগত।সাংবাদিকতার দায়বদ্ধতা,নৈতিকতা আদর্শ সবকিছুই নির্ধারিত হয় এই মধ্যবিত্ত ভোগবাদী মানসিকতার পরিপ্রেক্ষিতেই।তাই শবরদের ধারাবাদিক মৃত্যু মিডিয়াতে বাড়তি কোন আ্গ্রহ টানতে পারে না।ঘটনার মূলে গিয়ে এই ঘটনার পর্যালোচনার সাহস বা আগ্রহ কোন মিডিয়ার হয় না। প্রন্তিক মানুষজনদের জীবন সমস্যা মিডিয়াতে কোন আলোড়ন ফেলে না। এদেশের প্রন্তিক মানুষজনদের তাই মরে গিয়েই প্রমাণ করতে হয় তারা ঠিকঠাক বেঁচে ছিলেন না। তাদের মৃত্যুটা নিছকই ইন্সিডেন্ট , তার থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হল রসগোল্লা দিবস উদযাপন।