কনক সরকারদের মত অধ্যাপকদের চিন্তার মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে ধর্ষণের মানসিকতা

0
25

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সম্প্রতি মহিলাদের সম্পর্কে কুরুচিকর মন্তব্য করায় চারপাশে আলোড়ন পড়ে গেছে।ওই অধ্যাপক মহিলাদের শারীরিক শুদ্ধতার নিদান দিয়ে সোশ্যাল মিডিয়াতে লিখেছেন,কুমারী মহিলারা হলেন অনেকটা সিল করা বোতলের মত, সিল খুলে ফেললে যেমন যে কোন পণ্যের শুদ্ধতা নষ্ট হয়ে যায় সেরকম কুমারী মহিলাদেরও উচিত বিয়ের আগে সেই সিল কোনভাবেই না খুলতে দেওয়া।যাদবপুরের এই অধ্যাপক কনক সরকারের মানসিক অবয়বটি খুব ভালভাবেই তাঁর এই প্রতিক্রিয়াতে ফুটে উঠেছে।বুঝতে অসুবিধা হয় না তিনি মহিলাদের শারীরিক ‘শুদ্ধতার” বাইরে আর কোন শুদ্ধতাকে দেখতে পান না,দেখতে শেখেন নি।আসলে সমস্যাটা এই অধ্যাপকের নয়,সমস্যাটা আমাদের সমাজ-মনের।আমাদের সমাজ দীর্ঘ-দীর্ঘদিন ধরেই তো এই ভাবনাকেই লালন করে এসেছে যে মহিলারা হল ভোগ্যপণ্য।অনেক বিতর্ক,অনেক লড়াই,অনেক তত্ত্ব,আধুনিকতা,বিজ্ঞান-প্রযুক্তি তবু বোঝা যায় মনের মধ্যে মোটা হয়ে পড়ে থাকা সেই পুরনো ভাবনার আস্তরন।কিছুতেই তা দূর হয় না।আসলে তা দূর করতে যে নিরন্তর প্রয়াস জরুরি তা করতে রাজি নয় আমাদের ব্যবস্থাপনার কর্তা-ব্যক্তিরা।কারণ এরাতো শুধু ক্ষমতার হিসেব কষেন,সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যেতে যে সাহস,যে নতুন ভাবনার উল্লফলন দরকার তা এঁদের ধাঁতে নেই।এখানে সবাই ভোটের হিসেব করেন,মানুষের মন বদলের তাগিদ নেই কারোর।তাই তো লেখাপড়া,আর শিক্ষকতা করেও কেউ কেউ কনকবাবুদের মতই আকাট অশিক্ষিত থেকে যান।ভেবে দেখলে বোঝা যায় যে ভাবনা ব্যক্ত করেছেন কনক সরকার,মহিলাদের সম্পর্কে সেই ভাবনাই তো বহন করেন আমাদের সমাজের একটা বড় অংশই। মনে পড়ছে এ দেশে লাগাতার ধর্ষণের সমস্যা নিয়ে একটা তথ্যচিত্র তৈরি করেছিলেন সাংবাদিক লেসলি উডউইন,তিনি বিবিসির সাংবাদিক।এদেশের নির্ভয়া কান্ড তাঁর তথ্যচিত্রে স্থান পেয়েছিল।তিনি জেলে গিয়ে নির্ভয়া ধর্ষণের প্রধান অভিযুক্ত মুকেশের সঙ্গে কথা বলেছিলেন,মুকেশকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন কেন সে এমন কাজ করল।মুকেশ তার উত্তরে জানায়,দোষ নাকি ধর্ষিতা নির্ভয়ারই,কেন সে অত রাতে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল,ভাল মেয়েদের অতরাতে একা একা বের হওয়া উচিত নয় বলে মত দিয়েছিল মুকেশ।নিজের প্রতিক্রিয়াতে মুকেশ আর বলে এদেশের মেয়েদের নিজেদের শরীর রক্ষায় আর সচেতন হওয়া প্রয়োজন।ভেবে দেখুন একজন ধর্ষক যে মত মহিলাদের সম্পর্কে দিয়েছে,তা কী হুবাহু যাদবপুরের এই অধ্যাপকের সঙ্গে মিলে যায় না?আর এ রাজ্যে সেই পার্ক স্ট্রিট ধর্ষণ কান্ড নিয়ে রাজ্যের এক মন্ত্রী ও শাসক দলের এক মহিলা সাংসদ তো পরিষ্কার বলে দিয়েছিলেন,ভদ্র ঘরের মেয়েরা অত রাতে বারে গিয়ে মদ খেয়ে নাচানাচি করে না,ঐ ঘটনা আসলে এক দেহব্যবসায়ীর সঙ্গে তার কাস্টমারের বচসার জের।মহিলাদের সম্পর্কে এই হল সমাজের সব ক্ষমতাবানদের মানসিকতা।কিছুই বদলায় না,পাল্টায় না,যতই হৈচৈ হোক মহিলাদের সম্পর্কে একই ভাবনার আঁচ ফিরে ফরে আসে,আসতেই থাকে।

দরকার সমাজের মূল স্তর ধরে প্রবল একটা ঝাঁকুনি দেওয়া,আগা-পাসতলা পাল্টে ফেলা,কিন্তু কে পাল্টাবে?ভোট প্রার্থী সব দল ভোটের হিসেব কষতে ব্যস্ত,স্থিতাবস্থা তাদের ভীষণ জরুরি,তাই নাগরিক চেতনাকে অবরুদ্ধ করে রাখতে তাদের প্রয়াসের কোন অন্ত নেই,ব্যতিক্রমি ভাবনা-চিন্তাকে বাতিল করতে তৈরি নানা ফন্দি ফিকির।সস্তা ঠুনকো ভাবাবেগে নাগরিক মনকে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে তৈরি সব প্রকার মিডিয়া।এই ভয়াবহ বদ্ধ জায়গায় মহিলাদের সম্পর্কে অন্যরকম ভাবে ভাবনার কোন পরিসর নেই,তাই তো বিবিসির সাংবাদিক লেসলি উডউনের ইন্ডিয়াস ডটার ছবিটিকে এদেশে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে কেন্দ্রের সরকার।লেসলি ভারত সরকারের কাছে আবেদন করে বলেছিলেন,তিনি আসলে ধর্ষকদের মনটাকে বুঝতে চাওয়ার তাড়না থেকেই ছবিটা তৈরি করেছিলেন,তাই ছবিটা নিষিদ্ধ করার আগে ছবিটা ভাল করে সরকারের কর্তাব্যক্তিরা যেন দেখেন।না, এ দেশের কেউ ধর্ষকের মন বুঝতে চায় না।হয়তো তা এই কারণেই যে ধর্ষকের মন আর আমাদের রাষ্ট্রীয় কর্তাব্যক্তি ও তথাকথিত ভদ্রসমাজের মন,মহিলাদের সম্পর্কে একই খাতে বয়ে যায়,পাছে তা ধরা পড়ে যায়,তাই হয়তো সত্যকে চেপে রাখতে চান সব ভদ্রবাবুরা।লেসলি উডউইন এ দেশের রাষ্ট্রীয় কর্তাদের শুভবুদ্ধির কাছে আবেদন রেখেছিলেন তাঁর তথ্যচিত্রটি প্রদর্শনীর অনুমোদন দিতে,লেসলি জানেন না তাঁর ছবি এ দেশে নিষিদ্ধ হয় রাষ্ট্রীয় কর্তাদের শুভবুদ্ধির অভাবে নয়,বরং অশুভবুদ্ধির প্রভাবে-এই অশুভবুদ্ধির প্রভাব এদেশে এতটাই সক্রিয় যে মহিলাদের সম্পর্কে অপমানকর ভাবনার জন্য শুধু এক আধজন কনক সরকারকে কাঠগড়ায় তুললে মূল সমস্যার একচুলও বদল হবে না।