হিসেবি প্রতিবাদ শিল্পীর স্বাধীনতার রক্ষা কবজ হতে পারে কি?

0
72

বিতর্কটা বার বার ফিরে ফিরে আসে,আসতেই থাকে কখোন সিনেমা,কথোন নাটক,কখোন কবিতাকে ঘিরে।শিল্পীর স্বাধীনতায় বাঁধা দেওয়ার বিতর্ক।পৃথিবীর ইতিহাস ঘাটলে বোঝা যায় বিতর্কটা শুরু হয়েছে সভ্যতার সূচনা থেকেই।যতোই গণতন্ত্র,মুক্ত ভাবনা,বিজ্ঞানের কথা বলা হোক না কেন,যে কোন ক্ষমতাই টিঁকে থাকতে চায় আগ্রাসনকে হাতিয়ার করেই,তাই ক্ষমতাকে বিপদে ফেলতে পারে এমন কোন স্বর ক্ষমতা বরদাস্ত করে না।গণতান্ত্রীক পদ্ধতিতে ক্ষমতায় আসা রাজনৈতিক দলগুলিও তাই বিরুদ্ধ মতকে চেপে রাখতে সদা ব্যস্ত থাকে।আমাদের দেশ ও রাজ্যে তার অজস্র উদাহরণ ছড়িয়ে গেছে গত কয়েক বছরে।দিন কয়েক আগে শিলচরে গিয়ে এ রাজ্যের এক কবি শ্রীজাত যে হামলার শিকার হয়েছেন তা সেই ঘটনারই আর একটা বাড়তি উদাহরণ।এই ঘটনা-সমূহের প্রতিবাদ হওয়া উচিত,হচ্ছেও কিন্তু প্রশ্ন হল যারা প্রতিবাদ করছেন তাঁরা সকলে শিল্পী-শিল্পের স্বাধীনতার মানে ঠিকঠাক বোঝেন তো?প্রশ্নটা করতেই হচ্ছে কারণ শ্রীজাতের স্বাধীনতার পক্ষ নিয়ে যাঁরা কলকাতার এ্যকাডেমি অব ফাইন আর্টসের সামনে বিক্ষোভ দেখিয়েছেন,বা যে সব শিল্পী-বুদ্ধিজীবীরা বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে তাঁদের প্রতিবাদ ধ্বণিত করেছেন,তাঁরা তো এই কিছুদিন আগেও রাজ্যের শাসক দলের প্রতাপশালী নেতা অনুব্রত মন্ডল বর্ষিয়াণ কবি শঙ্খ ঘোষকে তীব্র অপমান করার পরেও প্রতিবাদ করেন নি,বলেননি,বলতে পারেননি শিল্পীর স্বাধীনতা নিয়ে রাজনীতিকদের অশ্লীল আক্রমণ অনুচিত।যে সময় শ্রীজাতকে হিন্দুত্ববাদীরা আক্রমণ করছেন,আর অসমের সরকার তাতে মদত জোগাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠছে,সেই সময়টাতেই এ রাজ্যের এক সিপিএম সমর্থককের বাড়িতে ঢুকে তাঁকে ও তার পরিবারকে মারধোরের অভিযোগ উঠছে এ রাজ্যে শাসক দলের কর্মীদের বিরুদ্ধে,ঐ সিপিএম কর্মীর অপরাধ তিনি রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে হোটাসআপে বনধের সপক্ষে একটা স্টেস্ট্যাস আপলোড করেছিলেন।এই ঘটনানাও কী নাগরিকের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ নয়! এ রাজ্যে পঞ্চায়েত ভোটের সময় যে ভাবে আরামবাগে বিরোধী প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দিতে যাওয়া এক মহিলাকে প্রকাশ্য রাস্তার শাড়ি খুলে লাঞ্ছনা করা হয়েছে,কোন স্বাধীনতার বার্তা শোনানো হয়েছিল তার মাধ্যমে?তবে কী প্রতিবাদ হয় হিসেব কষে?অসমে গিয়ে শ্রীজাত আক্রান্ত হলে প্রতিবাদ হবে,নাসিরুদ্দিনের স্বাধীন মত প্রকাশের অধিকারের পক্ষ নিয়ে এ রাজ্য থেকে প্রতিবাদ করা যাবে,অথচ এ রাজ্যে তসলিমার আসা যাওয়ার স্বাধীনতার পক্ষে বলা যাবে না।তসলিমাকে একসময় রাজ্য ছাড়া করেছিল বাম সরকার,কী আশ্চর্য ভাবুন,ঘাসফুলের সরকারও তসলিমা সম্পর্কে সেই বাম সরকারের মতই অনুসরণ করে চলেছে।আজ শ্রীজাতের শিল্পী স্বাধীনতার পক্ষে যাঁরা বলছেন,তাঁরা কেউ সোচ্চারে বলতে পারবেন তো তসলিমারও একই স্বাধীনতা প্রাপ্য?তসলিমার মতাদর্শ নিয়ে,তাঁর লেখার সাহিত্যগুন নিয়ে চূড়ন্ত মতবিরোধ থাকা সত্ত্বেও যাঁরা তসলিমার স্বাধীন মত প্রকাশের অধিকারের পক্ষে দাঁড়াতে পারেন না,কোন নৈতিক অধিকারে তাঁরা শ্রীজাতের পক্ষে দাঁড়ান?আমরা জানি এই প্রতিবাদের পেছনে কোন নৈতিক টান নেই,আছে অংক,হিসেব,এ রাজ্যের শাসক দলকে সন্তুষ্ট করার হিসেব।আর তার বিনিময়ে সরকার থেকে নানা সুযোগ সুবিাধা আদায় করে নেওয়ার কৌশলই হল এই প্রতিবাদ প্রতিবাদ খেলার আসল কারণ।

তবে কী প্রতিবাদ হওয়া উচিত নয়!হওয়া উচিত,একশবার হওয়া উচিত,প্রতিবাদের মঞ্চে অনেকে হয়তো ধান্দায় সামিল হন,কিন্তু সবাই তো তা নয়,কেউ কেউ তো থাকেন যারা সব রকম ক্ষমতাকেই চ্যালেঞ্জ করতে চান।যারা নাররিক স্বরকে বাঁচিয়ে রাখতে চান তথাকথিত সব বুদ্ধিজীবীদের সাহচর্য ছাড়াই,এই প্রতিবাদের মিছিলে তাঁদের উপস্থিতিই শিল্পী স্বাধীনতার একমাত্র রক্ষাকবচ হতে পারে। হিসেবি প্রতিবাদ কোন ভাবেই শিল্পী স্বাধীনতার রক্ষা কবজ হতে পারে না।যার আক্রান্ত হওয়া নিয়ে রাজ্যে আবার আলোড়ন সেই শ্রীজাত,শোনা যায় এখন রাজ্য সরকারের অনুগত,সব শিল্পীর স্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়ানোর মত শিঁড় দাডা়র জোর নাকি ও হারিয়ে ফেলেছে।এটা সত্যি হলে শ্রীজাতকে উদ্দেশ্য করে বলতে হয়,আপনিই আসলে অসমের আক্রমণকারীদেরই মদতদাতা,এ রাজ্যে শিল্পীর স্বাধীনতা হরণকারীদের নীরব থেকে মদত দিলে,অন্যরাজ্যের শিল্প স্বাধীনতার হরণকারীরাও তো মদত পাবে-আর আপনার মদতে তৈরি হওয়া হামলাকারীরা একদিন আপনার উপরই চড়াও হবে। শ্রীজাত, ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের গল্প আপনি শোনেন নি বুঝি!