ডাউন সিন্ড্রমের অাশঙ্কায় গর্ভপাতে সায় হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চের। অামরা প্রশ্ন তুলেছিলাম অাগেই

সিঙ্গল বেঞ্চের রায়কে খারিজ করে হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ ডাউন সিনড্রমের অাশঙ্কা থাকায় ২৯ সপ্তাহের এর অন্তঃসত্ত্বাকে গর্ভপাতের অনুমতি দিল । ডিভিশন বেঞ্চ তার রায় বলেছে সংবিধান মানুষের মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার কথা বলা হয়েছে, শুধু পশুর মত অস্বিত্ব নিয়ে নয়। হাইকোর্টের এই মন্তব্যও যথেষ্ট বিতর্কিত বলে অামাদের মনে হয়। সপ্তাহ দুয়েক অাগে হাইকোর্টের সিঙ্গলবেঞ্চ অন্তঃসত্ত্বা মহিলার গর্ভপাতের অাবেদন খারিজ করে বলেছিল ডাউন সিনড্রম শিশুদেরও বাঁচার অধিকার অাছে। সেই সময়ও অামরা হাইকোর্টের ওই রায়কে প্রশ্ন করেছিলাম। ফিরে দেখা সেই লেখা ।

৩১।১।২০১৯ এ প্রকাশিত

বেলেঘাটার এক অন্তঃসত্ত্বাকে তাঁর গর্ভস্থ ডাউন সিনড্রোমের অাশঙ্কা থাকা ভ্রূণের গর্ভপাত করাতে কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি অনুমতি দেননি। অনুমতি না দেওয়ার কারণ হিসেবে বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তী জানিয়েছেন,অনুমতি চাওয়া হয়েছে যখন তখন গর্ভস্থ ভ্রূণ ২৬ সপ্তাহ অতিক্রম করে গেছে। এই সময়ের মধ্যেই ভ্রণের মানবাকার পাওয়া প্রায় সম্পূর্ণ।তার হাত-পা -মাথা সবই তৈরি হয়ে গেছে।এখন গর্ভপাতের অনুমতি দেওয়া মানে,একটা প্রাণকে হত্যা করা,একটা প্রাণের বেঁচে থাকার অধিকারকে কেড়ে নেওয়া।মায়ের প্রতি সহানুভূতি জানিয়েও বিচারক তাই গর্ভপাতের অনুমতি দিতে সম্মত হন নি।বিচারক এ বিষয়ে চিকিত্সকদের সঙ্গে কথা বলে জেনেছেন,ডাউন সিনড্রোম নিয়েও যে কেউ বেঁচে থাকতে পারে,দরকার প্রয়োজনিয় পরিবেশ ও পরিস্থিতি তৈরি করা। বিচারক চিকিত্সকদের পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা যেন এই বিষয়টি ওই মহিলাকে ভাল করে বোঝান। কোন সন্দেহ নেই বিচারক সংবেদনশীল রায়ই দিয়েছেন।কিন্তু তার পরেও প্রশ্ন থাকে, একটা নয়,অনেকগুলো প্রশ্ন। যেমন,গর্ভধারণের কুড়ি সপ্তাহের মধ্যে গর্ভপাতকে আইনসিদ্ধ করা হয়েছে,অথচ চিকিত্সাবিদ্যার ব্যাখ্যা অনুসারে ২০ সপ্তাহের মধ্যেই ভ্রূণের মধ্যে প্রাণ সঞ্চার হয়ে যায়। তাহলে সেক্ষেত্রেও তো প্রাণহানির ঘটনাই ঘটে,সেখানেও তো বেঁচে থাকার অধিকার কেড়ে নেওয়াই হয়,তাহলে?বাচারক যদি বলেন,কুড়ি সপ্তাহ কেটে যাওয়াতেই তাঁর পক্ষে গর্ভপাতের অনুমতি দেওয়া সম্ভব নয়,তাহলেও তো প্রশ্ন থাকে ঐ মহিলাকে তো কুড়ি সপ্তাহ কেটে যাওয়ার পরেই চিকিত্সকরা জানিয়েছিলেন তাঁর গর্ভস্থ ভ্রূণ ডাউন সিনড্রোমের সম্ভাবনা নিয়ে বেড়ে উঠছে।এই সস্তান জন্ম নিলে ধারাবাহিক ভাবে অত্যন্ত ব্যয়বহল চিকিত্সা চালিয়ে যতে হবে তাঁদের।তাহলে আইনানুগ গর্ভপাতের জন্য ২০ সপ্তাহ কেটে যাওয়ার দায় কেন শুধু ঐ মহিলার?প্রশ্মগুলো তুলতে হচ্ছে,বিচারকের সংবেদনশীলতাকে অগ্রাহ্য করতে নয়,বরং পরিস্থিতিটাকে সামগ্রিক ভাবে বুঝে নিতে।নিম্নবিত্ত একটা পরিবার কীভাবে পারবে মাসে ৩০ হাজার টাকা ব্যয় করে অসুস্থ ছেলের চিগিত্সা করাতে?শোনা যাচ্ছে এ রাজ্যে এইধরণের রোগের পরিচর্যার জন্য অপযুক্ত পরিকাঠামোই এখনও পর্যন্ত গড়ে ওঠে নি,তাহলে,কোন ভরসায়,কোন প্রতিশ্রুতিতে ভর করে নিম্নবিত্ত একটা পরিবার এতবড় একটা ঝুঁকি নিতে সাহস দেখাবে?হতে তো পারে,সেই সন্তান জন্ম নেওযার পর শুধু সেই নতুন শিশুই নয় তার পরিবারটাও শিশুর রোগের সঙ্গে লড়তে লড়তে আর বিপর্যের দিতে এগিয়ে গেল!তখন কী মনে হবে না মানবিকতার রক্ষা করার নামে আর বড় এক অমানবিকতাকে ডেকে আনা হল ! বিচারক পারবেন তো রাষ্ট্রকে বাধ্য করতে এই শিশুটির বেঁচে থাকার দায়িত্ব নিতে?যে দেশে অভাবের তাড়নায় মা সন্তানকে বেঁচে দেন,যে দেশে রাষ্ট্র-সরকার যাবতীয় সামাজিক দায় থেকে ক্রমশই হাত গুটিয়ে নিচ্ছে,সে দেশের রাষ্ট্রের কাছে কোন সামাজিক দায় প্রত্যাশা করাটা বোকামি ছাড়া আর কী বা হতে পারে।তাই মনে হয় শুধু বিবেকের বাণী নয়,মানবিকতা রক্ষার দায় ও দায়িত্ব নেওয়াটাও জরুরি।প্রাণের অধিকারের পাশাপাশি,প্রাণ রক্ষার ন্যূনতম ব্যবস্থা নিতে রাষ্ট্রকে সুপারিশ করার বিষয়টাও অাদালতের একটু ভেবে দেখলে ভাল হত ।