তথাগতের বিতর্কিত টুইটের জবাব এক ফুটবল প্রেমীর পোস্ট এখন ভাইরাল

0
12

মেঘালযের রাজ্যপাল তথাঘত রায় মাঝেমধ্যেই নানা বিতর্কিত টুইট করে থাকেন। যার অধিকাংশটাই বিদ্বেষপূর্ণ। এবারের টুইট শতবর্ষের ইস্টবেঙ্গল ক্লাবকে নিয়ে। তথাগতর জবাব দিয়েছেন এক ফুটবল প্রেমি। সোশ্যাল মিডিয়ায় স‍েই পোস্ট এখন ভাইরাল। ফুটবল অাবেগের সঙ্গে এক সচেতন নাগরিকের এই পোস্ট অামরা হুবহু তুলে দিলাম।

মাননীয় তথাগতবাবু,

সিরিয়ার কোন এক শহরতলীতে, ধূলিধূসরিত ধ্বংসস্তূপের মধ্যে জামায় রক্তের দাগ লাগা কয়েকটা বাচ্চা কাপড়ের মণ্ড পাকিয়ে যে খেলাটা খেলে সেটা ফুটবল। ব্রাজিলের প্রত্যন্ত কোন এক গ্রামে, দুবেলা দুমুঠো খেতে না পাওয়া কিশোর যে খেলাটা নিয়ে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখে সেটা ফুটবল। ঘানার কোন এক কারখানার একদল শ্রমিক আজও পিঠে বেতের দাগ নিয়ে দিনের শেষে যে খেলাটা খেলে যন্ত্রণা ভোলে সেটা ফুটবল। পোলিও আক্রান্ত জার্মান মেয়েটা যে খেলাটা ভালোবেসে দাঁতে দাঁত চেপে ট্রেনিং করে, বড় হয়ে ব্রিজেট প্রিঞ্জ হবে বলে, সেটা ফুটবল। শকুনভর্তি আকাশের তলায় সোমালি ছেলেটা জীর্ণ চামড়ার বলটা ছিঁড়ে খেয়ে না ফেলে বুকে নিয়ে দৌড়াচ্ছে কারণ খেলাটার নাম ফুটবল।

আপনি আবেগ দেখেছেন? একটা পেনাল্টি মিস হওয়ায় লাখ লাখ মানুষের আর্তনাদ শুনেছেন? একটা ম্যাচ হেরে যাওয়ায় ট্রফির রেপ্লিকা জড়িয়ে কোন বৃদ্ধের কান্না দেখেছেন? জ্বলতে থাকা একটা গোটা দেশকে ম্যাচের আগেরদিন শান্ত হয়ে যেতে দেখেছেন? দেখেছেন ক্লাবকে সম্মানের লড়াইয়ে হেরে যেতে দেখে কাউকে আত্মহত্যা করতে? দেখেছেন লাল হলুদ বা সবুজ মেরুন জার্সি গায়ে প্রতিবন্ধী মানুষগুলোকে মাটি ঘষটে মাঠে যেতে? শুনেছেন কলকাতার কোন এক ক্লাবের সেই প্রৌঢ় সমর্থকের কথা যে ডার্বিতে দেরি করে কেন এলে-র উত্তর বলেছিল, ‘ছেলেটা অনেকদিন ধরে ভুগছিল, আজ পুড়িয়ে এলাম রে…’?

তথাগতবাবু, বাংলা ব্যতিক্রম নয় এবং এই কর্পোরেট যুগেও ফুটবল এখানে শুধুই সকারের মত সামান্য মার্কিনী পণ্য নয়। ফুটবল বেঁচে থাকার লড়াই। ফুটবল জীবনযাপনের ধরণ। ফুটবল জীবনযুদ্ধ থেকে মুক্তির স্বপ্ন।

মনিবের পদলেহন করতে করতে বাংলা থেকে কতটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন জানা নেই কিন্তু জেনে রাখুন – রক্তাক্ত খালিপায়ে সাহেবদের হারানোর গর্বের নাম যেমন মোহনবাগান, তেমনি হাজার হাজার ছিন্নমূল মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রামের নাম ইস্টবেঙ্গল। নিজেদের সব কিছু হারিয়েও অন্যায়, অত্যাচার, শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের নাম ইস্টবেঙ্গল। ইস্টবেঙ্গলের নাম যদি প্রতীকীও হয় তাহলে তা গর্বের প্রতীক, লড়াইয়ের প্রতীক, নিজের শিকড়ের প্রতি সম্মানের প্রতীক। একশ বছর ধরে ভারতীয় ফুটবলে অনস্বীকার্য অবদান রাখা একটা ক্লাবের নাম নিয়ে প্রশ্ন করার যোগ্যতা আপনি অর্জন করলেন কোত্থেকে!

হিন্দু মুসলমান নিয়ে রাজনীতি করতে করতে ভুলতে বসেছেন যে এই বাংলায় এখনও জেলায় জেলায়, গ্রামে গ্রামে, পাড়ায় পাড়ায় সব ধর্মের সেরা ধর্ম ফুটবল। আজও দুর্বার আবেগের একমাত্র নাম ফুটবল। সমস্যাটা হল সে আবেগে ধর্ম নেই, জাত নেই শুধুই খেলাটার প্রতি ভালোবাসা আছে। নিজেদের ক্লাবকে তীর্থস্থান মেনে চলার মত সততা আছে। তা আছে বলেই আজও ফুটবলটা মুষ্টিমেয় কয়েকজনের ‘ভিখারি মাচা’ বা ‘কাঁটাতারের দাগ’ বলার মত ঘৃণ্য হয়ে যায়নি।

অবশ্য মনিবের অনুদানে রাজ্যপালের মত একটি সম্মানীয় পদ অর্জন করেও যে নিজের প্রোফাইলে পরিচয় হিসেবে ধর্মের গান গেয়ে রাখে, তাকে এসব বলা অপাত্রে দান। তাই ‘আবাল্য’ যে দলেরই সমর্থক হোন না কেন আপনাকে ‘আপনাদের’ ভাষাতেই বলি – বাংলার আবেগ নিয়ে বাজারি রাজনীতি করবেন না। ওই – বাঙ্গালের ‘বা’ আর ঘটির ‘ঘ’ একসাথে মিলে গেলে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে।

চিরশত্রু ইস্টবেঙ্গল –

শতবর্ষের শুভেচ্ছা।

এটুকু নিশ্চয়ই বোঝা যাচ্ছে যে ময়দানে টিকে থাকতে গেলে ক্লাবগুলোকে স্পনসর, অপদার্থ কর্মকর্তা এবং দুর্নীতিগ্রস্থ IFA-র পাশাপাশি এখন বিচ্ছিন্নতাবাদী রাজনৈতিকদের সাথেও লড়তে হবে।
অতএব, অনেক পথ চলা বাকি।

অনেক লড়াইও।

চোখ থেকে চোখ যেন না সরে।

ফিস্ট ফাইভ!

– একটি গাঁট মাচা।

পলাশ হকের দেওয়াল থেকে