তথ্যের অধিকার আইনের সংশোধন,মৌলিক অধিকারের উপর আঘাত—উজ্জয়িনী হালিম

0
26

২৫ জলাই ২০১৯, ভারতের সংসদের উভয়কক্ষেই পাশ হয়ে গেল তথ্য অধিকার সংক্রান্ত আইনের সংশোধনী বিল।সমস্ত বিরোধী দলের যাবতীয় যুক্তি অগ্রাহ্য করে,সাধারণ মানুষকে কার্যত অন্ধকারে রেখেই দ্রুততার সঙ্গে সংশোধীত হয়ে গেল এমন এক আইন যা,নাগরিক সমাজ দীর্ঘ দিনের গণ-আন্দোলনের মধ্য দিয়ে অর্জন করেছিল।যে আইনের সার্বিক বাস্তবায়নের দাবিতে আন্দোলন করতে গিয়ে এখনও পর্যন্ত শহীদ হতে হয়েছে ৮০জনেরও বেশী মানুষকে।যে আইনকে বলা হত এদেশের স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে জনগণের ক্ষমতায়নের পক্ষে গৃহীত সেরা পদক্ষেপ।সেই জনমুখি তথ্যের অধিকার আইন সংশোধনের মাধ্যমে প্রকারন্তরে কেড়ে নেওয়া হল আজ জনতার তথ্য প্রাপ্তির সংবিধান স্বীকৃত মৌলিক অধিকার।নিছক বিপুল সংখ্যা গরিষ্ঠতার ঔদ্ধ্যত্যেই যেন কেন্দ্রের বর্তমান সরকার সংশোধনী নিয়ে সাধারণ মানুষের মতামত যাচাই করার কোন প্রয়োজনই বোধ করলো না।সরাসরি লোকসভায় পেশ করা হল সংশোধনী প্রস্তাব।অচিরেই সংসদে পাশ হয়ে গেল এই বিল।রাজ্য সভাতেও বিরোধীরা এই বিলের বিরোধিতায় এক জোট হতে ব্যর্থ হলেন।ফলে সংশোধিত বিল আইন হিসেবে স্বীকৃতি পেয়ে গেল,বর্তমান কেন্দ্রীয় শাসক দলের ইচ্ছে অনুযায়ী।তবে এখানে এটা উল্লেখ করে রাখা জরুরি যে, সব রাজনৈতিক দলেরই সদিচ্ছার অভাবে তথ্য কমিশনের কাজ ধারাবাহিকভাবেই ব্যহত হয়ে এসেছে।কমিশনের ১১ পদের মধ্যে ৮টি পদ দীর্ঘ দিন খালি পড়ে থাকার কারণে জমতে থাকা তথ্য সংক্রান্ত মামলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩২০০০।তাই স্বীকার করে নেওয়া ভাল যে জন্ম লগ্ন থেকেই তথ্যের অধিকার আইন প্রসঙ্গে রাজনৈতিক দল ও ক্ষমতাসীন সরকার কেউই খুব সদয় মানসিকতা দেখায় নি।তাই এই তথ্যটা এথানে দিয়ে রাখা দরকার যে ২০১৯ এর আগেও তিনবার এই আইনকে দূর্বল করতে সংশোধনী প্রস্তাব আনার চেষ্টা হয়েছিল।প্রত্যেকবারই জনরোষের কথা বিবেচনা করে সরকার শেষ পর্যন্ত পিছু হটতে বাধ্য হয়,কিন্তু এবার আর শেষ রক্ষা হল না।

তথ্য মানে খবর,গণতান্ত্রীক প্রক্রিয়ায় সাধারণ মানুষের অংশ নেওয়ার শক্ত একটা অবলম্বন হতে পারে,অথচ কোন ক্ষমতাসীন দল বা ব্যক্তি তথ্য সাধারণ মানুষজনের সঙ্গে বিনিময় করতে চায় না।মনে রাখা জরুরি সুশাসন সংক্রান্ত তথ্য মানুষকে সচেতন করে এবং একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক একটা সরকারের জবাবদিহিতার ক্ষেত্রটিকে আর মজবুত করে।তাই তথ্য জানার মৌলিক অধিকারের প্রায়োগিক দিকটা মাথায় রেখেই ২০০৫ সালে তৈরি হয় তথ্যের অধিকার আইন,যা অচিরেই গোটা দেশে তুমুল জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।গ্রাম থেকে শহরে সাধারণ মানুষ তথ্যের অধিকার আইনের অধিনে রেশনের চাল থেকে সরকারি চাকরির হালহকিকত,পঞ্চায়েত পরিকাঠামো,উন্নয়ন কল্পে বরাদ্দ বাজেট থেকে শুরু করে দেশের রিজার্ভ ব্যাঙ্কের আয়-ব্যয়ের হিসেব,এই সমস্ত বিষয়ে তথ্য পেতে বিগত ১৯ বছরে প্রায় ৬০ লক্ষ দরখাস্ত বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে জমা করেছেন।

তথ্য অধিকার আইন অনুসারে এতদিন যে কোন সরকারি সংস্থা ও সরকারের সাহায্য প্রাপ্ত সংস্থার যাবতীয় তথ্য সাধারণ নাগরিকের পাওয়ার অধিকার ছিল।২০০৫ এর তথ্য অধিকার আইন অনুযায়ী তথ্য কমিশনারের পদমর্যাদা নির্বাচন কমিশনের মত।সেই অনুযায়ী বেতন ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা।তথ্য কমিশনার কাজ করবেন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের মত নিরপেক্ষ ও স্বাধীনভাবে।কিন্তু সংশোধনী বিল এনে গোটা বিষয়টা একেবারে উল্টে দেওয়া হল।এখন এক নজরে দেখে নেওয়া যাক,তথ্য আইনের এই সংশোধনী কী ভাবে তথ্যের অধিকারকে নিঃশব্দে খুন করল।নতুন সংশোধনে তিনটি ধারায় বদল আনা হয়েছে,১৩(৪),১৬(৫),ও ২৭।এর ফলে এখন থেকে কেন্দ্র ও রাজ্যের সব তথ্য কমিশনারকেই সরাসরি কেন্দ্রীয় সরকারের অধিনে কাজ করতে হবে।তাঁদের স্বাধীন সত্তা কেড়ে নেওয়া হল।তথ্য কমিশনারের মেয়াদ,বেতন,সুযোগ সুবিধা সবই কেন্দ্রীয় সরকারের ইচ্ছাধীন হয়ে পড়ল।কেন্দ্রীয় সরকারই এঁদের বিষয়ে চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।এখান থেকেই তো প্রশ্ন আসে কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকা কোন তথ্য কমিশনারের পক্ষে কি সম্ভব এমন কোন তথ্য সামনে নিয়ে আসা যা কেন্দ্রীয় সরকারের ভাবমূর্তিকে কলুষিত করবে?এই সংশোধনীর পর আমরা যখন কেন্দ্রীয় সরকারের দায়বদ্ধতা বাড়াতে তাদের কাজ-কর্ম সংক্রান্ত প্রশ্ন তথ্যের অধিকার আইন অনুসারে করবো তখন তার সদুত্তর পাওয়া যাবে কী না তা নিয়ে আমাদের যথেষ্ট সংশয় থাকছে।এই বিল সরকারি আধিকারিকদের কাছে একটা পরিষ্কার বার্তা পাঠাচ্ছে,তা হল সরকারি তথ্য সাধারণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার বিষয়ে সাবধানী ও সতর্ক হতে হবে।এই বিলের আর একটা বিপদের দিক তা হল যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর উপর আঘাত।রাজ্য সরকারের তথ্য কমিশন এবার সরাসরি কেন্দ্রীয় স্তর থেকেই নিয়ন্ত্রীত হবে।রাজ্যগুলি এই প্রশ্নে এখনও কেন সেভাবে সরব হচ্ছে না তা নিয়েও ভাবতে হবে সাধারণ মানুষকে।

পরিশেষে একটা বিষয়ের উল্লেখ রাখা জরুরি বলে মনে হচ্ছে,তা হল তথ্যের অধিকার আইনের আওতায় আসতে প্রতিটি রাজনৈতিক দলেরই অনীহা আছে।রাজনৈতিক দলগুলি কেন তথ্য অধিকার আইনের আওতায় আসবে না তা নিয়ে একটা মামলা একনও সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন আছে।বর্তমান সরকার কোর্টে যে হলফনামা পেশ করেছে তাতে তারা চান রাজনৈতিক দলগুলোকে যেন তথ্য আইনের আওতায় আনা না হয়,এটা কিন্তু সব রাজনৈতিক দলের প্রবনতা।বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার গত কয়েক বছরে নোটবন্দি থেকে কালটাকা ফেরত নানা বিষয়ে তথ্যের অধিকার আইনের ফলে নাজেহাল হয়েছে তাই এবার সংখ্যা গরিষ্ঠতা পেয়েই তারা একেবারে যুদ্ধকালীন তত্পরতায় সেই অস্বস্তি ঘোচাতে ব্যস্ত।তাদের ব্যস্ততার তাগিদটা বোঝা যায়,কিন্তু অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোও যে এ বিষয়ে একেবারে সাধাু তা কিন্তু একেবারেই নয়।বরং ইলেকশন সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে আমরা বুঝেছি সবাই আসলে তথ্য সামনে আনতে সমান অনাগ্রহী।তাই বোধহয় বর্তমান কেন্দ্রীয় শাসক দলের এতবড় একটা গণতন্ত্রবিরোধী সিদ্ধান্তের পরেও কোন বিরোধী রাজনৈতিক দল রাস্তা ও মাঠে নেমে এর প্রতিবাদ করছে না।আসলে ক্ষতি নাগরিক সমাজের ও নাগরিক স্বার্থে আন্দোলনকারীদের,তাই তাদেরই এখন সংগঠিত হয়ে পথে নামতে হবে।এই আঘাতকে প্রথম থেকেই প্রতিরোধ করার কথা না ভাবলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনা ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা প্রবল।

——–লেখক সমাজকর্মী ও পশ্চিমবঙ্গ ইলেকশন ওয়াচের মুখ্য সংযোজক