ক্যানসার অাক্রান্ত চিকিত্সককে এই ‘হেনস্তা’ কেন? ক্ষমতা কবে ছুঁইয়ে দেখবে কান্নাকে?

ক্ষমতা তা যেরকমই হোক না কেন,কখোন ছুঁইয়ে দেখতে চায় না কান্নাকে-কষ্টকে।আসলে বোধহয় সব ক্ষমতারই একটা ঔদ্ধত্য থাকে,সে ঝুকতে চায় না। আর না ঝুঁকলে কান্নার স্পর্শ মিলবে কী ভাবে?ক্ষমতার এই চেনা চেহারাই দেখা গেল স্বাস্থ্য বিভাগেও। আর পরিহাসের, স্বাস্থ্য বিভাগ তার ক্ষমতার ঔদ্ধত্য দেখিয়ে দিল একজন চিকিত্সককেই। সম্প্রতি জানা গেছে মালদা মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের আ্যসোসিয়েট প্রফেসর কল্যান দে চৌধুরী,গুরুতর শারীরিক অসুস্থতার কারণে চাকরি থেকে স্বেচ্ছা অবসরের আবেদন করেন।তিনি তাঁর আবেদনে সরকারকে জানান গত জনুয়ারি থেকেই তিনি প্যানক্রিয়াটিক ক্যানসারে আক্রান্ত।পরীক্ষায় ধরা পড়েছে তাঁর রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে,বর্তমানে তাঁর রোগ স্টেজ ৪-এ।তাঁর পক্ষে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।তাই তাঁর আবেদন ছিল জীবনের শেষ কয়েকটা দিন তিনি বাড়িতে একান্তে থাকতে চান।সরকার যেন তাঁকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেয়।নিজের আবেদনের সঙ্গে ডাক্তার চৌধুরি বেসরকারি নামী প্রতিষ্ঠানে তাঁর শরীরের পরীক্ষা-নিরিক্ষার যাবতীয় নথী পেশ করেন।এর পরেই স্বাস্থবিভাগ থেকে তাঁকে বলা হয় মেডিকেল বোর্ডের সামনে এসে তাঁর অসুস্থতার নথী পেশ করতে।গত ১৬ জুলাই কলকাতা মেডিকেল কলেজের মেডিকেল বোর্ডের সামনে উপস্থিত হয়ে এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন ডাক্তার কল্যান দে চৌধুরী।মেডিকেল বোর্ডের সদস্যরা জানান নামী বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষা তারা গ্রাহ্য করবেন না,সমস্ত পরীক্ষা সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে করাতে হবে।এছাড়াও মেডিকেল কলেজের অঙ্কোলজি বিভাগের প্রধান,মেডিকেল বোর্ডের অন্যতম সদস্য ডাক্তার শিবাশিস ভট্টাচার্য অসুস্থ ডাক্তার চৌধুরীকে রিপোর্ট পরীক্ষা করে বলেন যে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের রিপোর্টেই তাঁর পারফরম্যান্স রিপোর্ট ০-১ তার মানে সাধারণ চলাফেরায় তাঁর কোন অসুবিধা নেই।মেডিকেল বোর্ডের এই সিদ্ধান্তে ভেঙে পড়েন ডাক্তার কল্যান দে চৌধুরী।তিনি তাঁর ফেস বুকে পোস্ট করেন যে তাঁর যাবতীয় পরীক্ষা আবার করতে কতটা হ্যাপা হবে।অসুস্থ শরীরে নতুন করে যাবতীয় পরীক্ষা করা কতটা যন্ত্রনা দায়ক তা বোঝার আবেদন করেন অসুস্থ চিকিত্সক।

মেডিকেল বোর্ডের এই চুড়ান্ত অমানবিক আচরণ নিয়ে ইতিমধ্যেই সরব হয়েছেন বিভিন্ন চিকিত্সক সংগঠন। সোশ্যাল মিডিয়ায় চিকিতসক বিষাণ বসু সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন কারোর ক্যানসার ধরা পড়ার পর তাঁর মানসিক ধাক্কা কতটা হতে পারে তা নির্ধারণ করার কোন মাপকাঠি কী মেডিকেল বোর্ডের আছে? ডাক্তার বসু তাঁর পোস্টে উল্লেখ করেছেন এর আগেও ভেন্টিলেশনে থাকা এক চিকিত্সককেও স্বেচ্ছা-অবসরের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মেডিকেল বোর্ডের কাছে হাজির হতে বলা হয়,সেই চিকিত্সক চাকরি করা অবস্থাতেই ভেন্টিলেশনেই মারা যান।ডাক্তার বিষান বসু সংগত প্রশ্ন তুলেছেন,ডাক্তাররা যদি ডাক্তারদের প্রতি সহমর্মিতা দেখাতে ভুলে যান,তবে তারা রোগীদের সহমর্মিতা দেখাতে পারবেন এ কথা লোকে বিশ্বাস করবে কেন?আমাদেরও প্রশ্ন মেডিকেল বোর্ডের যাঁরা সদস্য তাঁরা নিশ্চয়ই ডাক্তারি পেশায় দক্ষ ও উচ্চশিক্ষিত কিন্তু এঁরা ডাক্তার চৌধুরীর সঙ্গে যা করলেন তা থেকে তো মনে হয় বিবেক-মনুষ্যত্বের প্রাথমিক শিক্ষার পাঠটাও এঁরা নেন নি।যারা নিজেদের একজন সহকর্মীর প্রতি এতটা হৃহয়হীন-বিবেক শূণ্য তাঁরা অন্য রোগীদের প্রতি দরদী হবেন বিশ্বাস করা শক্ত নয় কি?ক্ষমতার প্রকোপ তবে কী সব ভুলিয়ে দেয়,মেডিকেল বোর্ডও তো আসলে একটা ক্ষমতার আধার,তাই কি ক্ষমতার চেনা চেহারাটাই বেরিয়ে এল ডাক্তার শিবাশিস ভট্টাচার্য়ের আচরণে।আর কত নিষ্ঠুরতা-অমানবিকতার পর ক্ষমতা কান্নাকে ছুঁয়ে দেখতে শিখবে কে জানে!!