বিশিষ্টজনদের স্বর সরকারের স্বর হলে তা অার বিশিষ্ট থাকে না!

সম্প্রতি দেশের বেশ কিছু পরিচিত ব্যক্তিত্ব দেশের প্রধানমন্ত্রীকে এক খোলা চিঠি লিখে আবেদন করেছেন যে ভাবে জয় শ্রী রাম স্লোগান বলতে বাধ্য করে দেশের নানা প্রান্তে মানুষজনকে মারধর করা হচ্ছে তা অত্যন্ত উদ্বেগের,এ বিষয়ে দেশের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদে আসীন ব্যক্তি যেন উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে প্রয়াসি হন,মূলত সেই আর্জি জানিয়েই প্রধানমন্ত্রীর কাছে চিঠি।চিঠিতে আবেদনকারীরা লিখেছেন,ভারত একটা গণতান্ত্রীক দেশ।গণতান্ত্রীক দেশে বিরুদ্ধ মতকে স্বীকার করা জরুরি,বিরোধি মতই গণতন্ত্রের ভিত্।খুবই নিরীহ ও যুক্তিগ্রাহ্য বক্তব্য।তবু এই বক্তব্য ঘিরেই গোটা দেশ জুড়ে শুরু হয়েছে তুমুল বিতর্ক।চিঠিতে যঁরা স্বাক্ষর করেছেন তাঁদের সুবিধাবাদী,একচক্ষু হরিণ বলে সমালোচনা শুরু হয়েছে।বিজেপি নেতা ও সমর্থকরা দাবি করছেন এই স্বাক্ষরকারীরা অহেতুক সরকারকে সমালোচনার মুখে ফেলতে চাইছেন,রাম নাম নেওয়াটাও কারোর গণতান্ত্রীক অধিকারের মধ্যে পড়ে,সেটা বন্ধ করার দাবিও অগণতান্ত্রিক।প্রথমত,আবেদনে কোথাও রামনাম বন্ধ করার দাবি নেই,বলা হয়েছে রাম নাম বলতে বাধ্য করিয়ে কাউকে প্রহার করা অনুচিত,যা সংসদে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রীও স্বীকার করেছেন।আবেদনকারীরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবি করেছেন শুধু স্বীকার করলে হবে না,এরকম ঘটনা যাতে না ঘটে তার ব্যবস্থা সুনিশ্চিত করতে হবে।এই দাবিতে অন্যায় কোথায়,এখানে সরকারের বিরুদ্ধে চক্রান্তের কথাই বা আসছে কোথা থেকে?এ রাজ্যের বিজেপি নেতাদের কেউ কেউ বলছেন,পশ্চিমবঙ্গে যখন সরকার নানা অনাচার করে তখন কেন চুপ থাকেন এঁরা,কেন সরকারি রোষে সাধারণ মানুষ পড়লেও রাজ্যের পরিচিত ব্যক্তিবর্গের মুখে প্রতিবাদের ধ্বণি শোনা যায় না?এ বক্তব্যের মধ্যে কিছু যুক্তি আছে,তবে এই যুক্তিতেও কিছুটা ফাঁক আছে,এবং অবশ্যই এই যুক্তির পাল্টা যুক্তিও আছে।প্রথমে বিজেপি নেতা ও কর্মীদের বক্তব্যের ফাঁকটা ধরিয়ে দেওয়া যাক,রাজ্য সরকারের অনাচার দেখেও এরাজ্যের সকল পরিচিত ব্যক্তিই চুপ ছিলেন তা সত্যি নয়, হাঁ অধিকাংশই চুপ ছিলেন,তারা সরকার থেকে নানা সুযোগ বাগিয়েছেন তাও সত্য,হতে পারে সেই বাধ্যবাধকতাই তাঁদের চুপ থাকতে বাধ্য করেছে।এর জন্য তাঁরা তাঁদের গ্রহণযোগ্যতা হারিযেছেন, তা নিযেও সন্দেহের কোন অবকাশ নেই, তবু এরাজ্যে তৃণমূল সরকারের নানা কাজের সমালোচনা করার ক্ষেত্রে বিজেপির অনেক নেতা নেত্রীদেরও আগে সরব হয়েছেন শঙ্খ ঘোষ,মিরাতুন নাহার,সুনন্দ সান্যাল,কৌশিক সেন, বোলান গঙ্গোপাধ্যায়ের মত মানুষজন।এঁদের মধ্যে কৌশিক সেন ও বোলান গঙ্গোপাধ্যায়ের নাম প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন কারীদের তালিকায় আছে।তাই সব আবেদনকারীরীই এ রাজ্যে সরকারের দোষ দেখেও চোখ বুজে থাকেন তা ঠিক নয়।আর পাল্টা যুক্তি হল একসময় যে কোন কারণেই হোক প্রতিবাদে কেউ সরব হতে পারেন নি বলে কোন সময়ই সরব হতে পারবেন না তার কোন মানে নেই,নৈতিকতার এরকম কোন মানদন্ড থাকতেই পারে না।কিছুদিন আগে নাট্যব্যক্তিত্ব বিভাস চক্রবর্তী ও অপর্ণা সেনরা এক সভায় এসে বলেছেন নাগরিক স্বরকে পুষ্টি দিতে তাঁদের উচিত ছিল রাজ্য সরকারের অনুগত্যকে উপেক্ষা করা,তা না করে তাঁরা ভুল করেছেন,এই স্বীকারুক্তি আন্তরিক হলে তো মানতেই হবে এ রাজ্যের পরিচিত ব্যক্তিবর্গ আবার নাগরিক স্বরকে জাগিয়ে তুলতে সক্রিয় হতে চাইছেন।প্রধানমন্ত্রীর কাছে পরিচিত কিছু মানুষজনের চিঠি লেখাকে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক আনুগত্যের দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে নাগরিক পরিসর তৈরির তাগিদ তৈরির দৃষ্টিতে দেখাই শ্রেয়।কোন রাজনৈতিক মতই যেন নাগরিক বোধকে আচ্ছন্ন করতে না পারে সে বিষয়ে সচেতন থাকা জরুরি।সমস্যা হল এ দেশে এখন সুস্থ রাজনীতির চর্চা হওয়ার পরিস্থিতি নেই,কোন রাজনৈতিক দলের প্রতি আনুগত্য না রেখেও যে রাজনৈতিক সচেতন হওয়া সম্ভব,ক্ষমতার অভিমুখ ধরে চলা প্রতিটি রাজনৈতিক দলকে চাপে রাখতে যে সচেতন নাগরিক ঐক্যই একমাত্র হাতিয়ার সেই বোধই বোধহয় এখন ক্রমশ কমে আসছে।তাই বোধহয় পরিচিত কিছু ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি লেখার পাল্টা হিসেবে সরকারের পক্ষ নিয়ে কেউ কেউ পাল্টা চিঠি দিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে আশ্বস্ত করেন ‘আমরা আপনার সঙ্গে আছি’ বলে, বোঝা দায় কার সঙ্গে আছেন এঁরা জয় শ্রী রাম বলে মানুষ মারার সঙ্গে,আদিবাসী-সংখ্যালঘু নিধনের সঙ্গে।প্রধানমন্ত্রী নিজেও তো এসবের সঙ্গে নেই বলে স্বয়ং জানিয়েছেন তাহলে?তার চেয়ে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে যদি বলা হত তিনি সমাজের পরিচিত ব্যক্তিবর্গের চিঠি পেয়েছেন তিনি নিশ্চয়ই বিষয়টি দেখবেন,যাতে জয় শ্রী রাম ধ্বণির কোন অপপ্রয়োগ না হয় সে বিষয় তিনি প্রশাসনকে সজাক থাকার নির্দেশ দেবেন,পরিচিত ব্যক্তিবর্গের উদ্বেগ তাঁকেও ছুঁযেছে,তবে কি ভাল হত না,গণতন্ত্রের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর ভাবমূর্তিও হয়ে উঠত না আর উজ্জ্বল?সংসদীয় রাজনীতিকরা অহিংসার কথা বলেন,শান্তির কথা বলেন অথচ যে কোন প্রসঙ্গেই তাঁরা কেমন রণংদেহী মেজাজ দেখান,পরস্পরকে দেখে নেওয়ার চুড়ান্ত নিদান দিতে থাকেন।একটা নেহাতই নিরীহ চিঠি নিয়ে দেশ জুড়ে যে উত্তাপ তা বুঝিয়ে দিচ্ছে ক্ষমতা কোন প্রশ্ন নিতে চায় না।তাই নাগরিক সমাজের উচিত আর বেশী করে নাগরিক পরিসরকে সংহত করা,আর তা করতে গিয়ে নাগরিককে সবসময় মনে রাখতে হবে নাগরিক স্বরকে সবসময় সরকারি স্বর থেকে দুরত্বই বজায় রাখতে হবে।প্রধানমন্ত্রীকে সমর্থন করে যাঁরা চিঠি লিখবেন তাঁদের স্বর আসলে ক্ষমতারই স্বর সেই স্বর কোনদিনই নাগরিক স্বরের সঙ্গে একবিন্দুতে মিলবে না, মিলতে পারে না।