শুধু উন্নাও নয়,মেয়েদের দেশ নেই কোথাও !

0
33

গোটা দেশে ‘বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও’স্লোগান আছে,এ রাজ্যেও আছে ‘কন্যাশ্রী’,’রূপশ্রী’র প্রচার। আর এসবের মধ্যেই গোটা দেশ জুড়ে নিরবচ্ছিন্ন ধারাবাহিকতায় ঘটে যেতে থাকে নারী নিধন-নারী নির্যাতন।নির্ভয়া কান্ডের সম্মিলিত প্রতিবাদ কিংবা কাশ্মীরের কাঠুয়ার ঘটনার নির্দয়তার প্রতি প্রতিবাদী মানুষের একত্রিত ধিক্কার কোন কিছুই নারীর উপর চলতে থাকা নিপীড়নে লাগাম পড়াতে পারে না।রাষ্ট্র ও ক্ষমতার প্রতিভূ যারা তারা এই একবিংশ শতাব্দীর প্রথম পর্বে দাঁড়িয়েও নারীকে দেখে মধ্যযুগীয় পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিতেই।তাই আজকের সমাজেও নারী আসলে ভোগ্য,ক্ষমতাবানদের ক্ষমতা প্রয়োগের আধার।আর সেই জন্যই তো উন্নাওয়ের এক কিশোরী সেখানকার এক বিধায়ক কুলদীপ সিং সেনগারের কাছে কাজ চাইতে গিয়ে ধর্ষিতা হলে,পুলিশ প্রশাসন তাতে খুব একটা গুরুত্বই দিতে চায় নি প্রথমে।কিন্তু জেদি নাছোড় মেয়েটি যখন ক্ষমতাবান মানুষজনদের বিরুদ্ধে তাঁর প্রতিবাদ জানিয়েই যেতে থাকেন তখন তৈরি হয় তাঁকে ধারাবাহিক নির্যাতনের নীল নক্সা।প্রথমে মেয়েটিকে তার নিজের এলাকা থেকে কাজ দেওয়ার নামে সরিয়ে নিয়ে গিয়ে আর একবার ধর্ষণ করা হয়।এরপর তাঁর বাবাকে জেলবন্দি করে চলে ভয় দেখানো।জেলেই মারা যায় মেয়েটির বাবা।অসহায় মেয়েটি বার বার প্রশাসনের কড়া নাড়তে থাকে একটু নিরাপত্তা-একটু নিশ্চয়তার প্রত্যাশায়।এরই মধ্যে বিষয়টি জনসমক্ষে চলে আসায় নড়ে চড়ে বসে প্রশাসন ও বিচারবিভাগ। গ্রেপ্তার হতে হয় অভিযুক্ত বিধায়ককে।মেয়েটির জন্য নিরাপত্তারক্ষী দেওয়ার নির্দেশ দেয় আদালত।কিন্তু সেই নিরাপত্তা রক্ষীর নিরাপত্তার বেষ্টনি ভেঙে দিয়ে কয়েক দিন আগে মেয়েটি যখন তাঁর মা ও কাকিকে নিয়ে অটো চড়ে কোথাও যাচ্ছিলেন তখনই তাঁদের অটোতে ধাক্কা দেয় একটি ট্রাক।মারা যায় উন্নাওয়ের সেই ধর্ষিতা কিশোরীর মা ও কাকিমা।ধর্ষিতা কিশোরী এখন হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্চা লড়ছে।সন্দেহ জেলে বসেই মেয়েটিকে শেষ করে দেওয়ার ছক কষছিলেন ধর্ষণে অভিযুক্ত বিজেপি বিধায়ক।তাঁর সঙ্গে ক্ষমতাবানদের নিত্য যোগাযোগ,তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগকারী মেয়েটির গতিবিধি সম্পর্কিত যাবতীয় খবর সে জেলে বসেই পেয়ে যায়।

উন্নাওয়ের এই কিশোরীর জীবন কথা কোন ব্যতিক্রম নয়,এরকম উদাহরণ ছড়িয়ে রয়েছে গোটা দেশ জুড়ে।ধর্ষণ এখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা প্রকাশের হাতিয়ার।এই ক্ষমতা প্রযুক্ত হতে দেখা গেছে গুজরাট দাঙ্গার সময়,এই ক্ষমতা প্রয়োগ করা হয়েছে কাশ্মীরের মানুষকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে তুলতে।এই ক্ষমতা বার বার প্রয়োগ হয়েছে মণিপুরে,পাঞ্চাবে জঙ্গী দমনের নামেও।এ দেশের ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতাপ্রত্যাশী কোন রাজনৈতিক দলই মেয়েদের পূর্ণ মানুষ বলে বিবেচনা করে না,তাই বোধহয় মেয়েদের লাঞ্ছনা উতপীড়নে সবাই থেকে যায় একই রকম উদাসীন।এবিষয়ে ডান ও বামে কোন ফারাক নেই।আমাদের সবার মনে আছে নিশ্চয়ই সেই বানতলার ধর্ষণের পর সেই সময়ের এরাজ্যের বাম মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু বলেছিলেন,’ও রকম তো কতই হয়।’বাম আমলেই একবার বিরাটিতে গণধর্ষণের ঘটনার পর ধর্ষিতার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন করতে আটকায় নি এক বাম নেত্রীর।আর এখন আমাদের মহিলা মুখ্যমন্ত্রীর আমলে এ রাজ্যে তৈরি হচ্ছে ধর্ষণের ধারাবাহিক ‘কাব্য’,কখোন পার্কস্ট্রিট,কামদুনি,বিরাটি,রাণাঘাট,কখোন আবার প্রত্যন্ত গ্রাম লাভপুরে।আমাদের মুখ্যমন্ত্রী ‘বলছেন সবই ছোট ঘটনা।’পার্কস্ট্রিটের ঘটনার পর ধর্যিতা সুজেট জর্ডনকে দেহব্যবসায়ী বলতেও কুন্ঠা বোধ করেন নি এ রাজ্যের শাসক দলের এক মহিলা সাংসদ।কী আশ্চর্ষ এরা বাম নয়,তবু বাম শাসকদের সুরই এদের গলায়।বাইরের রঙ যাই হোক,শাসকের স্বর একই রকম থাকে।একদিকে ডিজিটাল ইন্ডিয়ার বাগড়ম্বর,অন্যদিকে মধ্যযুগীয় পুরুষবাদী ভাবনায় মহিলাদের শুধুই ভোগ্য বলে গণ্য করা।বেটি বাঁচানোর প্রচার আসলে মেকি,মেয়েদের কোন দেশ নেই জীবন দিয়ে সেকথা বলে গেছে নির্ভয়া,কাশ্মীরের কাঠুয়ার নির্যাতিতা,বলে গেছেন পার্কস্ট্রিটের ধর্ষিতা সুজেট জর্ডন,কামদুনির ধর্ষিতাও।আর এখন হাসপাতালের বেডে শুয়ে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়তে লড়তে হয়তো নিরুচ্চারে সেই একই কথা বলে চলেছেন উন্নাওয়ের ধর্ষিতা কিশোরীও।